গুঞ্জন ও শঙ্কায় রুদ্ধশ্বাস টানা ব্ল্যাকআউট

প্রকাশ:| শনিবার, ১ নভেম্বর , ২০১৪ সময় ১১:৪০ অপরাহ্ণ

বিদ্যুৎসারা দেশ বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন হয়েছে সেই বেলা সাড়ে ১১টায়। এরপর থেকে বিদ্যুৎ আসছে, আসবে করে যতই সময় গড়িয়েছে, ততই নানা গুঞ্জন ছড়িয়েছে মানুষের মধ্যে। সংশয়, শঙ্কা ও উৎকণ্ঠার মধ্য সময় পার করেছে তারা। অফিসে একের পর এক ফোন এসেছে, ‘বিদ্যুতের আসলেই কী হয়েছে’, জানতে চেয়ে।

টানা ৯ ঘণ্টা সারা দেশ বিদ্যুৎবিচ্ছিন্ন থাকা স্মরণকালের ইতিহাসে বড় ধরনের বিদ্যুৎ বিপর্যয়। পরপর দুইবার গ্রিড বিপর্যয়ে ১২ ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে বিদ্যুৎহীন হয়ে পড়েছে সারা দেশ।অবশ্য এ সময়ের ব্যবধানে রাজধানীর কিছু এলাকাসহ দেশের কোথাও কোথাও বিদ্যুৎ এসেছে। তবে বিষয়টিকে সহজভাবে নিতে পারেনি দেশের মানুষ। হয়তো নেওয়ারও কথা নয়। যেখানে বর্তমান সরকারের সবচেয়ে বড় সাফল্য বলে দেখানো হয় বিদ্যুৎখাতকে, সেখানে হঠাৎ বিপর্যয়ে একটানা এই দীর্ঘসময় বিদ্যুৎহীন থাকাকে সন্দেহের চোখে দেখেছেন অনেকে।

বিদ্যুৎ যাওয়ার পর থেকে অধিকাংশ অফিস, আদালত, শিল্পকারখানা, বাণিজ্যিক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান, সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান কার্যত নিষ্ক্রীয় হয়ে পড়ে। বিদ্যুৎ আসার অপেক্ষায় থাকতে থাকতে বিরক্ত হয়ে অনেক প্রতিষ্ঠান দিনের অবশিষ্ট কার্যদিবসের জন্য ছুটি ঘোষণা করে।

এই দীর্ঘ অপেক্ষার মধ্যে গুঞ্জনের ডালাপালা প্রসারিত হয়েছে শহর থেকে প্রত্যন্ত গ্রামেও। সারা দেশ থেকে আমাদের প্রতিনিধি ও প্রতিবেদকরা জানিয়েছেন, জনগণের মধ্যে ঘুরপাক খাওয়া নানা উৎকণ্ঠার কথা। সেই সঙ্গে বিদ্যুৎহীন থাকায় জনজীবনের চরম বিড়ম্বনার কথাও উঠে এসেছে।

বিদ্যুৎবিভ্রাটের কারণ জানতে চাওয়ার সঙ্গে ফোন করা ব্যক্তিরা জানিয়েছেন নানা শঙ্কার কথা। বেশ কয়েকজন প্রশ্ন করেছেন, ‘দেশে বড় ধরনের কোনো অঘটন ঘটেছে, নাকি ঘটতে চলেছে?’ প্রশ্নের ফাঁকে অনেকে বলে ফেলেছেন, ‘কোনো ধরনের অভ্যুত্থান হওয়ার আশঙ্কা আছে কিনা।’ আবার অতি উৎসাহী কিছু কিছু ব্যক্তি গুজবের ওপর ভর দিয়ে জানতে চেয়েছেন, ‘বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া কি গ্রেফতার হচ্ছেন?’ অনেকের প্রশ্ন ছিল, ‘বিদ্যুৎবিপর্যয় কি পরিকল্পিত নাশকতার কোনো চেষ্টা?’

এসব গুঞ্জনের মধ্য দিয়ে সন্ধ্যার পর রাজধানীবাসীর মধ্যে দেখা দেয় ভয়ংকর আতঙ্ক। ব্যাংক-বিমাসহ আর্থিক প্রতিষ্ঠানে লুটপাটের আশঙ্কা দেখা যায়। অবশ্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ এলাকা ও ভবনকে ঘিরে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করে।

এ ছাড়া প্রধানমন্ত্রীর সরকারি বাসভবন গণভবন ও রাষ্ট্রপতির বাসভবন বঙ্গভবনেও বিদ্যুৎ না থাকার খবর জনগণকে চরম উদ্বেগে ফেলে। যদিও এ দুই বাসভবনে সর্বোচ্চ নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিত করে প্রশাসন। কিন্তু সারা দেশে অন্ধকারে থাকা মানুষেরা নানা আশঙ্কায় ভুগেছে।

এদিকে বিদ্যুৎ বিপর্যয়ের সুযোগ নিয়ে কোনো কোনো পক্ষ অরাজকতা ও নাশকতা সৃষ্টির পায়তারা করতে পারে বলে যে আশঙ্কা বিরাজ করছিল, রাত সাড়ে ৯টা পর্যন্ত সে ধরনের কোনো কিছু শোনা যায়নি।

তবে সরকারের পক্ষ থেকে বিদ্যুৎ বিপর্যয় নিয়ে নির্দিষ্ট কোনো কারণের কথা না বলায় জনগণের মধ্যে এই বিভ্রান্তি ও সংশয়ের জন্ম বলেই ধরে নেওয়া যায়। সরকারের দায়িত্বশীল ব্যক্তিরা বিদ্যুৎ চলে যাওয়ায় দুঃখ প্রকাশ করলেও সঠিক কোনো ব্যাখ্যা দিতে পারেননি।

জানা যায়, কুষ্টিয়ার ভেড়ামারা সাবস্টেশন বিকল হওয়ায় সারা দেশ বিদ্যুৎবিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। এ ছাড়া সন্তোষজনক কোনো কারণ জানা যায়নি।

এদিকে বিদ্যুৎবিভ্রাটের কারণে টেলিভিশন চালাতে না পারায় এ নিয়ে সরকারের কোনো তথ্য আছে কিনা- তাও জানতে পারেনি মানুষ।

অবশেষে রাজধানীসহ দেশের কোথাও কোথাও বিদ্যুৎ আসার খবরে অনেকে স্বস্তি প্রকাশ করেছেন। অবশ্য তারা জানতে চেয়েছেন, তাদের এলাকায় কখন বিদ্যুৎ আসবে। এ বিষয়ে সরকারের পক্ষ থেকে ‘পর্যায়ক্রমে সব এলাকায় বিদ্যুৎ পৌঁছাবে’, এমন কথা বলা হয়েছে।

জাতীয় গ্রিডের সমস্যার কারণে বিদ্যুৎ​ বিপর্যয়ে সবচেয়ে বিপদে হাসপাতালের রোগীরা।

শ্বাসকষ্টে ভুগতে থাকা এক বছরের ছেলে জেবল হাসানকে নিয়ে আজ শনিবার দুপুরে ফটিকছড়ি থেকে চট্টগ্রাম নগরে আসেন শাহনাজ বেগম। বেলা দুইটায় তাকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। কিন্তু সকাল থেকে বিদ্যুৎ না থাকায় শিশুটিকে নেবুলাইজ করা যাচ্ছিল না। পরে বিকেল পাঁচটার দিকে ওয়ার্ড মাস্টারের কার্যালয়ে নিয়ে জেনারেটরের মাধ্যমে তাকে নেবুলাইজ করা হয়।
আজ জাতীয় গ্রিডে বিপর্যয়ের পর বিদ্যুৎ না থাকায় চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের প্রতিটি ওয়ার্ডে এভাবে রোগীদের দুর্ভোগে পড়তে হয়। জেনারেটরের সাহায্যে সীমিত আকারে বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হলেও সার্বিকভাবে চিকিৎসা কার্যক্রম ব্যাহত হয়। বিদ্যুৎ না থাকায় পানির সংকট দেখা দেয়। এতে দুর্গন্ধযুক্ত হয়ে পড়ে ওয়ার্ডের শৌচাগারগুলো।
বিদ্যুৎবিভ্রাটের কারণে হাসপাতালের মতো নগরের বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি কার্যালয় ও পেট্রলপাম্পে স্বাভাবিক কাজকর্ম ব্যাহত হয়। ব্যাহত হয় শিল্পপ্রতিষ্ঠানে উৎপাদন। বিভিন্ন ব্যাংকের এটিএম বুথে টাকা লেনদেন বন্ধ হয়ে যায়।

জাতীয় গ্রিডে বিপর্যয়ের পর চমেক হাসপাতালে বিদ্যুৎ চলে যায়। এর পর হাসপাতালের জেনারেটরের সাহায্যে সীমিত আকারে বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হয়। এ সময় বিভিন্ন ওয়ার্ডের দু-একটি বৈদ্যুতিক বাতি ছাড়া পাখা, শীতাতপনিয়ন্ত্রণব্যবস্থা বন্ধ থাকে। এমনকি নেবুলাইজার মেশিন চালানোর সকেটও বন্ধ রাখা হয়।
বিকেল চারটায় হাসপাতালের শিশুস্বাস্থ্য ওয়ার্ডে গিয়ে দেখা যায়, নিউমোনিয়া ও শ্বাসকষ্টের রোগীদের নেবুলাইজ করা হচ্ছে পাশের ওয়ার্ড মাস্টারের কার্যালয়ে নিয়ে। সেখানে জেনারেটরের মাধ্যমে নেবুলাইজার মেশিন চালানোর সকেট চালু রাখা হয়।
হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল শহিদুল গনি বিকেল পাঁচটার দিকে বলেন, ‘বিদ্যুৎ না থাকায় আমরা জেনারেটর দিয়ে বিদ্যুতের ব্যবস্থা করেছি। মোটামুটিভাবে কাজ চালিয়ে যাচ্ছি। অস্ত্রোপচার কক্ষ, সিসিইউ, আইসিইউ চলছে। ওয়ার্ডে লাইট জ্বলছে।’ তিনি বলেন, ‘কিছু সমস্যা তো থাকবেই। তবে আমরা তেল মজুত করে রেখেছি, যাতে বিদ্যুৎ না এলেও চালানো যায়।’
হাসপাতালের অর্থোপেডিক ওয়ার্ডে গিয়ে দেখা যায়, গরমে রোগীদের কাহিল অবস্থা। তাদের বাতাস করছে স্বজনেরা। ওয়ার্ডে দু-একটি বৈদ্যুতিক বাতি জ্বললেও আলো পর্যাপ্ত নয়।
রওশন বেগম নামে রোগীর এক স্বজন বলেন, ‘বিদ্যুৎ যাওয়ার পর হাসপাতালের বাথরুমে পানি বন্ধ হয়ে যায়। এর পর ময়লায় তা একাকার হয়ে পড়েছে।’
বিদ্যুৎ না থাকায় হাসপাতালে পানিসংকট দেখা দেয়। জরুরি ছাড়া সাধারণ অস্ত্রোপচার বন্ধ রাখা হয়।

বন্দর সূত্র জানায়, চট্টগ্রাম বন্দরে নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় বিদ্যুৎ সরবরাহ সচল ছিল। বন্দরের নিজস্ব জেনারেটরের মাধ্যমে চার-পাঁচ দিন টানা বিদ্যুৎ সরবরাহ করা সম্ভব। বিপর্যয়ের পর সন্ধ্যা সাড়ে ছয়টায় রাজস্ব বোর্ড থেকে বন্দর কর্তৃপক্ষকে জানিয়ে দেওয়া হয়, বিদ্যুৎ পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হলে সন্ধ্যা সাতটায় কাস্টমের সার্ভার বন্ধ করে দেওয়া হবে। তবে সাতটার আগে বন্দর এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক হয়। ফলে বন্দরের কার্যক্রমে ব্যাঘাত ঘটেনি।
এদিকে বিদ্যুতের অভাবে নগরের অনেক ফিলিং স্টেশনও বন্ধ হয়ে যায়। বড় ফিলিং স্টেশনগুলোতে জেনারেটর দিয়ে তেল বিক্রি করা হলেও অনেক স্টেশন বন্ধ করে দেওয়া হয়।
একই কারণে শিল্প উৎপাদনও ব্যাহত হয়। নগরের নাসিরাবাদ ও কালুরঘাট শিল্প এলাকার বিভিন্ন কারখানায় বিদ্যুতের অভাবে উৎপাদন বন্ধ হয়ে যায়। কিছু কিছু কারখানায় জেনারেটর দিয়ে উৎপাদন চালু রাখা হয়। একই পরিস্থিতি দেখা গেছে নগরের পোশাক কারখানাগুলোতেও।
এ বিষয়ে চট্টগ্রাম চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি মো. মাহবুবুল আলম বলেন, বিদ্যুৎসংকটের কারণে কিছু কিছু কারখানায় উৎপাদন ব্যাহত হয়েছে। টানা এভাবে বিদ্যুৎ না থাকলে বিকল্প ব্যবস্থায় কারখানা চালু রাখা কষ্টসাধ্য।
বিদ্যুৎ না থাকায় জনজীবনও বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। বিভিন্ন বাসাবাড়িতে পানির সমস্যা দেখা দেয়।

বিপর্যয়ের পর চট্টগ্রামে প্রথম বিদ্যুৎ সরবরাহ হয় বিকেল পাঁচটা ৪৬ মিনিটে। নাসিরাবাদ, ষোলশহর ও বন্দর এলাকায় পর্যায়ক্রমে বিদ্যুৎ সরবরাহ হয়।