মান-অভিমান ভুলে গেছি, আমার নেতা মহিউদ্দিন: বিএসসি

প্রকাশ:| রবিবার, ৭ জুলাই , ২০১৩ সময় ০৭:৩০ অপরাহ্ণ

সংসদ সদস্য নূরুল ইসলাম বিএসসি চট্টগ্রাম নগর আওয়ামী লীগের সিনিয়র সহ-সভাপতি, নেতাকর্মীদের একটি অংশের উপর দৃশ্যত নিয়ন্ত্রণ আছে তার। শনিবার রাতে নগরীর খুলশীতে সাংসদ বিএসসি’র সঙ্গে আলাপের শুরুতেই প্রথম প্রশ্নটি ছিল, চট্টগ্রামে আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক অবস্থা কেমন ? nurul-islam-BSC20130707071233

উত্তর দেন বিএসসি, ‘আগের চেয়ে একটু গতিশীল হয়েছে, একটু এগিয়ে গেছে, কিছুটা ধারাবাহিকতা এসেছে। মহিউদ্দিন চৌধুরী ওয়ার্ডে ওয়ার্ডে গিয়ে আপ্রাণ চেষ্টা করছেন যাতে সংগঠনটাকে গুছিয়ে ফেলা যায়। মহিউদ্দিন চৌধুরী তার মতো করে গোছাচ্ছেন, আমরা কিন্তু কোন বিরোধিতা করছিনা, বিতর্কেও জড়াচ্ছিনা। কারণ আমি জানি, মহিউদ্দিন যাদের নেতৃত্বে বসাবেন, তারা আর যা-ই হোক নৌকা মার্কার প্রার্থীর বিরোধিতা করবেনা।’

এবিএম মহিউদ্দিন চৌধুরীর সঙ্গে এখন সম্পর্ক কেমন, এ প্রশ্নটি শুরু করতেই মুখের কথা কেড়ে নিয়ে জবাব দেন বিএসসি, ‘আমাদের মধ্যে সম্পর্ক কখনোই খারাপ ছিলনা। সামান্য মান-অভিমান ছিল, সেগুলো ভুলে গেছি। আমি মহিউদ্দিনের ছেলের বিয়েতে গেছি। তিনিও আমার বাসায় দাওয়াত খেতে এসেছিলেন। আমাদের ব্যক্তিগত সম্পর্ক অটুট আছে।’

বিএসসি বলেন, ‘মহিউদ্দিন চৌধুরী একজনই, তিনি আমার নেতা। তিনি দলের জন্য অনেক করেছেন, এখনও করছেন। আমি কখনও তার বিরুদ্ধে কোন বক্তব্য-বিবৃতি দিইনি। মহিউদ্দিন নগর আওয়ামী লীগের সভাপতি, আমি তো আর সভাপতি হতে যাবনা। আমি ভোটের প্রার্থী। সুতরাং আমার সঙ্গে দ্বন্দ্ব থাকার কোন প্রশ্নই আসেনা।’

দলের ভেতর ঘাপটি মেরে থাকা সুযোগসন্ধানীরা, অরাজনৈতিক সুবিধাবাদীরা ফায়দা লুটতে সবসময় নেতাদের মধ্যে দ্বন্দ্ব সৃষ্টিতে তৎপর থাকেন বলে মনে করেন নূরুল ইসলাম বিএসসি। তিনি বলেন, ‘এ সমস্যা শুধু চট্টগ্রামে নয়, কেন্দ্রেও আছে। স্বার্থপর, সুবিধাবাদীরা সব জায়গায় আছে। আমি জানি এরা কারা, মহিউদ্দিন চৌধুরীও জানেন, প্রধানমন্ত্রীও জানেন।’

নগর আওয়ামী লীগের কাউন্সিল প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘আমি চাই, সংসদ নির্বাচনের আগে কাউন্সিল হোক। তবে সেটা সম্ভব হবে বলে মনে হচ্ছেনা।’

জলাবদ্ধতা দূর করতে না পারার আক্ষেপ বিএসসি’র
প্রথমবারের মতো সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার পর নিজ নির্বাচনী এলাকায় শিক্ষাখাতে ব্যাপক উন্নয়ন করেছেন সাংসদ নূরুল ইসলাম বিএসসি। তিনি জানালেন, নিজ নির্বাচনী এলাকায় অর্ধশতাধিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে তিনি নতুন ভবন নির্মাণ করে দিয়েছেন। ৫১টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে কম্পিউটার দিয়েছেন। পানীয় জলের সমস্যা সমাধানে ১৪টি ওয়ার্ডে ৮১টি গভীর নলকূপ স্থাপন করা হয়েছে।

বিএসসি’র প্রচেষ্টায় চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতাল আড়াই’শ শয্যায় উন্নীত হলেও সেটিকে মেডিকেল কলেজ বানাতে পারেননি। অন্কে চেষ্টার পরও চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজকে বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপ দিতে পারেননি। এসব বিষয়ে তার আক্ষেপ আছে।

আর সবচেয়ে বড় ‍অতৃপ্তি আছে নগরবাসীকে জলাবদ্ধতার হাত থেকে মুক্তি দিতে না পারায়। সাংসদ বিএসসি বলেন, ‘প্রতিবছর জলাবদ্ধতার কারণে কাপাসগোলা, চান্দগাঁও, বহদ্দারহাট, বাকলিয়াসহ বিভিন্ন এলাকার মানুষের দু’হাজার কোটি টাকার সম্পদ নষ্ট হয়। এ সমস্যা জরুরি ভিত্তিতে সমাধান দরকার।’

তার মতে, জলাবদ্ধতা সমস্যা সমাধানের জন্য সিটি কর্পোরেশন, সিডিএ, ওয়াসা, নগরীর সব সংসদ সদস্য, স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়কে সমন্বয় করে কাজ করতে হবে। বিশেষজ্ঞ নগর পরিকল্পনাবিদ না থাকলে প্রয়োজনে চীন কিংবা জাপান থেকে আনতে হবে।

মেয়রের মধ্যে লিডারশিপ নেই
বিএনপি থেকে নির্বাচিত চট্টগ্রামের মেয়র এম মনজুর আলমের মধ্যে কর্মদক্ষতা এবং নেতৃত্ব নেই বলে মনে করেন সাংসদ নূরুল ইসলাম বিএসসি। তিনি বলেন, ‘মেয়র এফেক্টিভ নন। তার মধ্যে কোন কর্মদক্ষতা নেই, লিডারশিপও নেই। তাকে দিয়ে হবেনা। চট্টগ্রামের মেয়র হতে হবে এমন একজনকে যার মধ্যে পরিকল্পনা থাকবে, যাকে সবাই মানবে।’

তিনি বলেন, ‘নগরীতে রাস্তাঘাট সংস্কারের দায়িত্ব মেয়রের। বর্তমান মেয়র সেই দায়িত্ব পালন করতে পারছেন না আর মানুষ গালি দিচ্ছে এমপিদের। মানুষ ভাবছে এটা সরকারের ব্যর্থতা। অথচ আমি সংসদে সবসময় এলাকার মানুষের কথা বলেছি, উন্নয়নের কথা বলেছি।’

সিডিএ’র উন্নয়ন কাল হতে পারে
চট্টগ্রাম নগরীতে দু’টি ফ্লাইওভার নির্মাণ, রাস্তাঘাট প্রশস্ত করা, সংস্কারসহ ব্যাপক ‍অবকাঠামোগত উন্নয়নের কাজ হাতে নিয়েছে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ)। এর মধ্যে অনেক উন্নয়ন কাজ ইতোমধ্যে সমাপ্ত হলেও দৃশ্যমান বড় বড় প্রকল্পগুলোর কাজ এখনও শেষ হয়নি। অসমাপ্ত উন্নয়ন কাজের জন্য সৃষ্ট জনভোগান্তিতে নগরবাসীর মধ্যে অসন্তোষও আছে।

বিষয়টি স্বীকার করে নূরুল ইসলাম বিএসসি বলেন, ‘উন্নয়ন প্রকল্পগুলোর কাজ যদি আগামী নির্বাচনের আগে শেষ হয়, তাহলে আমরা সুফল পাব। নির্বাচনে এর ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। কিন্তু নির্বাচনের আগে শেষ না হলে এসব উন্নয়ন কাজই আওয়ামী লীগের জন্য কাল হবে।’

টেন্ডারবাজি কেড়ে নিয়েছে ১৪ হাজার ভোট
গত ২৪ জুন রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের টেন্ডারকে কেন্দ্র করে সিআরবিতে যুবলীগ ও ছাত্রলীগের সন্ত্রাসীদের মধ্যে গোলাগুলিতে দু’জনের নিহতের ঘটনার প্রভাব আগামী নির্বাচনে পড়বে বলেও আশংকা করছেন এলাকায় সংসদ সদস্য নূরুল ইসলাম বিএসসি।

বিএসসি বলেন, ‘সিআরবিতে যে ঘটনা ঘটেছে সেটা কখনও সমর্থনযোগ্য নয়। এ ঘটনা কখনও মেনে নেয়া যাবেনা। আমি অনেক কষ্ট করে সিআরবি এলাকার প্রায় ১৪ হাজার ভোটারকে আমার পক্ষে এনেছিলাম। এখন তাদের ছেলে মারা গেছে, আমি কিভাবে তাদের কাছে ভোট চাইতে যাব ? এ ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের দ্রুত বিচারের মাধ্যমে শাস্তি দেয়া উচিৎ।’

রাজনীতি ছাড়ার চাপ
রাজনীতিতে দিন দিন কালো টাকা, পেশীশক্তি, দুর্নীতি আর দুর্বৃত্তদের প্রভাব যেভাবে ‍বাড়ছে তাতে ভাল মানুষের জন্য রাজনীতি করা কঠিন হয়ে উঠেছে বলে মনে করছেন সাংসদ নূরুল ইসলাম বিএসসি। রাজনীতি ছেড়ে দেয়ার জন্য পরিবার থেকেও চাপের মুখে আছেন তিনি।

বিএসসি বলেন, ‘আমার পরিবার থেকে মাঝে মাঝে চাপ আসে। বলে, আপনি রাজনীতি ছেড়ে দেন। এখন যে রাজনীতি চলছে সেটার জন্য আপনি উপযুক্ত না। আমি মাঝে মাঝে বিভিন্ন স্কুল-কলেজে গেলে ছাত্রছাত্রীদের সঙ্গে রাজনীতি নিয়ে কথা বলি। আমাকে একজন ছেলেও কখনও বলেনি, রাজনীতি নিয়ে তার আগ্রহ আছে। তারা রাজনীতিকে ঘৃণার চোখে দেখে। কিছু লোকের অপরাধে আজ আমরা সবাই অপরাধী হয়ে গেছি।’

তিনি বলেন, ‘আমরা সহনশীলতার রাজনীতি চাই। রাজনীতি মানে তো শত্রুতা নয়। পরস্পরের মধ্যে সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক না থাকলে মানুষের কল্যাণে রাজনীতি কিভাবে হবে ?’

এখনও নিয়মিত লিখছেন
সক্রিয় রাজনীতিক কিংবা সংসদ সদস্য হিসেবে নিয়মিত ব্যস্ততা বাড়লেও লেখালেখি থেকে দূরে সরে যাননি নূরুল ইসলাম বিএসসি। নিয়মিত দৈনিক আজাদী, যুগান্তর, সমকাল পত্রিকায় কলাম লিখছেন। রাজনৈতিক বিশ্লেষণধর্মী প্রবন্ধ, আত্মজীবনীসহ বিভিন্ন বইয়ের পাশাপাশি তিনি লিখেছেন বেশ কয়েকটি মঞ্চ নাটকও। টেলিভিশনের জন্যও নিয়মিত নাটক লিখেন এ রাজনীতিক।

এত ব্যস্ততার মধ্যেও লেখালেখির সময় কিভাবে পান, এ প্রশ্নের জবাবে সাংসদ বিএসসি বলেন, ‘আমি ভোর ৫টায় ঘুম থেকে উঠি। সকাল ৭টা পর্যন্ত লেখালেখি করি। এখন বরং আগের চেয়ে লেখালেখি আরও বাড়িয়ে দিয়েছি।’

ফের জয়ের ব্যাপারে আশাবাদী বিএসসি
আগামী নির্বাচনেও একই আসন থেকে মনোনয়ন চাইবেন নূরুল ইসলাম বিএসসি এবং নির্বাচনে মনোনয়ন পাওয়া ও জয়ের ব্যাপারে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ তিনি।

তিনি বলেন, ‘আমি জয়ী হবই। কারণ, আমি কারও কাছে হাত পাতিনি, কোনদিন সন্ত্রাসী লালন করিনি, চাঁদাবাজদের ঘরে ঢুকতে দিইনি, দুর্নীতির সঙ্গে আপোষ করিনি। আশা করি, মানুষ আমাকে আবারও গ্রহণ করবে।’

সংসদ সদস্য নূরুল ইসলাম বিএসসি বলেন, ‘জনগণের আস্থা পুনরুদ্ধার করে আমাদের আবারও ক্ষমতায় আসতে হবে। না হলে, হেফাজত ও জামায়াত মিলে নৌকার ভোটার, সংখ্যালঘুদের উপর ভয়াবহ নির্যাতন চালাবে। হেফাজতের ১৩ দফায় দেশকে মধ্যযুগে নিয়ে যাবার ইঙ্গিত আছে। বিএনপি, জামায়াত, হেফাজত ক্ষমতায় এলে দেশ আফগানিস্তানে পরিণত হবে।’

সংসদ সদস্য নূরুল ইসলাম বিএসসি’র সঙ্গে কথা বলেছেন বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কমের সিনিয়র করেসপন্ডেন্ট  রমেন দাশগুপ্ত

বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কমের  সৌজন্যে