মাদক নিরাময় কেন্দ্রের সাথে আমরা আগেই কথা বলে রেখেছিলাম…

প্রকাশ:| মঙ্গলবার, ১০ জুন , ২০১৪ সময় ০৮:৫৮ অপরাহ্ণ

মোঃ বাবুল আক্তার।।
বয়সী এক ভদ্রলোক স্যারের অফিসে বসা। আমাকে বসতে বলে স্যার বললেন, এই লোকটার উপকার করতে হবে| আমি ভদ্রলোকটির দিকে তাকালাম। তিনি মাথা নীচু করে তাকিয়ে আছেন নীচের দিকে। আমি কিছু বললাম না। আবার স্যারের দিকে তাকালাম। স্যার বললেন, ভদ্রলোকের একটাই ছেলে, ছেলেটা মাদকাসক্ত। কি করা যায়? বললাম, স্যার আইনত আমাদের তেমন কিছুই করার নেই। তবে যদি অবস্থা খারাপ হয় তাহলে মাদক নিরাময় কেন্দ্রে পাঠানো যেতে পারে। বিষয়টি নিয়ে আমরা কথা বলছিলাম। এরই মধ্যে স্যার দুপুরের খাবার আনালেন। ভদ্রলোককে খেতে অনুরোধ করার সাথে সাথেই তিনি হাউমাউ করে কেঁদে উঠলেন। বললেন, মুখ দিয়ে খাবার যায় না। আমার জীবনের সব শেষ। একটাই ছেলে, যে আমার চোখের দিকে তাকিয়ে কখনো কথা বলেনি, সে কি-না আমার সাথে খারাপ ব্যবহার করে, ঠিকমত খায় না, কথা বলে না কারো সাথে। দরজা বন্ধ করে থাকে, ঘুমায়। স্যার সান্ত্বনা দিয়ে বললেন, ভেঙ্গে পড়বেন না, আমরা আছি তো। ব্যবস্থা একটা হবেই।

খাওয়া শেষ করে ছেলেটার বাবার কাছ থেকে বিস্তারিত শুনলাম। সিদ্ধান্ত হল, ওকে মাদক নিরাময় কেন্দ্রে পাঠাতে হবে। তবে সে যেন বুঝতে না পারে যে, তার বাবা বিষয়টি জানেন। আমরা তখন ভদ্রলোকের নিকট থেকে ছেলের নেশাগ্রস্থ বন্ধুদের ঠিকানাসহ বিস্তারিত তথ্য নিলাম। খোঁজ নিয়ে জানলাম ওরা এলাকার খারাপ ছেলে।
পরদিন সন্ধ্যায় পরিকল্পনামত আমাদের ডিবির টিমসহ গেলাম ভদ্রলোকের বাসায়। ছেলেটার রুমে গিয়ে দেখা গেল সে শুয়ে আছে। লম্বা চুল, হাতে চুড়ি, কানে দুলও আছে। খোচা খোচা দাড়ি তার মুখে। গিয়েই আমাদের লোকজন তাকে বলল, তুমি রনি ও সুমন (ছদ্মনাম) কে চিন? ওরা তো খারাপ ছেলে। তাদের কাছ থেকে তোমার নাম পেয়েছি। ছেলেটা বার বার বলার চেষ্টা করছে যে ওরা ভালো। এর মধ্যে আমাদের একজন তার রুম তল্লাশি করতে গিয়ে একটা ছোট খেলনা পিস্তল পেল। জিজ্ঞেস করলাম, পিস্তল কেন? বলল, খেলনা পিস্তল, কিনেছি আমি। তখন আমাদের অভিনয় আরো পূর্ণাঙ্গ রূপ পেল।

মাদক নিরাময়পূর্ব পরিকল্পনা মতো আমরা বললাম তোমাকে থানায় যেতে হবে| এরমধ্যে বাইরে থেকে ওর বাবা এলেন। হাত জোড় করে কাঁদো কাঁদো কণ্ঠে বললেন, আমার ছেলেকে জেলে দিবেন না, আর যা হয় করেন| ইতিমধ্যে তার ফোনটা এগিয়ে দিয়ে বললেন, আপনাদের পুলিশে আমাদের পরিচিত এক অফিসার আছে, কথা বলেন। আমি কথা বললাম। তারপর ভদ্রলোকটিকে বললাম, আপনার ছেলেকে তো জেলে যেতে হবে। আর যদি জেলে না যায় তাকে মাদক নিরাময় কেন্দ্রে যেতে হবে। কারণ সে যে পর্যায়ে গেছে, কারো জন্য নিরাপদ নয়। যেহেতু আমাদের স্যার অনুরোধ করেছেন সে জন্য তাকে জেলে না পাঠিয়ে মাদক নিরাময় কেন্দ্রে পাঠাতে পারি। ছেলেটার মাও কাঁদতে লাগল। কাঁদতে কাঁদতে ছেলের জন্য ব্যাগ গুছিয়ে দিল। মাদক নিরাময় কেন্দ্রের সাথে আমরা আগেই কথা বলে রেখেছিলাম। সেখানে যাবার পর নিরাময় কেন্দ্রের স্টাফরা ওকে বুঝিয়েছে, পুলিশ তাকে দিয়ে গেছে, তার কেসটা মারাত্মক।

এরপর মাঝে মাঝে আমরা নিরাময় কেন্দ্রে গিয়ে ছেলেটার খোঁজ নিতাম। কয়েক মাস থাকার পর ছেলেটা ভালো হয়ে যায়। তারপর বাসায় আসে। মাসখানেক পর ছেলেটা বিদেশ চলে যায় লেখাপড়া করতে। যাবার আগে আমাকে একটা চিঠি লিখেছিল। এক জায়গায় সে লিখেছিল Life without drug is too beautiful which I am realizing now. চিঠিটা নিয়ে এসেছিলেন তার বাবা। তিনি বললেন, একটাই ছেলেতো, বেশি আদরে এমনটা হয়েছিল। তাছাড়া, আমরাও সময় দিতাম না ছেলেটিকে। বন্ধুদের পাল্লায় পড়েছিল, আমরা খেয়াল করিনি। ছেলেটা ভালো না হলে আমার জীবনের কোন মূল্য থাকতো না।

সচেতন হোন, নিরাপদ থাকুন।

লেখক-মোঃ বাবুল আক্তার, বিপিএম, পিপিএম (বার)
অতিঃ উপ-পুলিশ কমিশনার, মহানগর গোয়েন্দা বিভাগ, চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ।।

সূত্র-সি এম পি, ফেইসবুক পেইজ


আরোও সংবাদ