মাছ চাষ সমস্যা ও সমাধান

প্রকাশ:| মঙ্গলবার, ২৮ জুলাই , ২০১৫ সময় ১০:২৯ অপরাহ্ণ

আফতাব চৌধুরী::
১৭ হাজার টাকায় মাছ চাষ শুরু, এখন কোটিপতিকৃষিভিত্তিক অর্থনীতির ওপর প্রতিষ্ঠিত এদেশের জাতীয় আয় বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান, দারিদ্র্যবিমোচন এবং পুষ্টির চাহিদা পূরণে মৎস্য সেক্টরের অবদান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও সম্ভাবনাময়। বাংলাদেশের জলাশয়ে ২৬০ প্রজাতির দেশীয় মাছ, ১২ প্রজাতির বিদেশি মাছ এবং ২৪ প্রজাতির চিংড়ি রয়েছে। এ ২৬০ প্রজাতির মধ্যে ৫৬ প্রজাতির মাছ আজ একেবারে হারিয়ে যেতে বসেছে। যেমন- সরপুঁটি, রানী, মহাশোল, মেনী, নান্দিনা, রিটা, বাঘাইর, বাচা, কালিবাউশ, গনিয়া, চিতল, মধুপাবদা, শিং, নাপতেকই, লাল চান্দা, নামা চান্দা, তেলীটাকি, বাটা ইত্যাদি। মাছ যে হারিয়ে যাচ্ছে, এ ব্যাপারে বিজ্ঞানভিত্তিক বিশ্লেষণের প্রয়োজন নেই। আমরা তো দেখছি, অনেক মাছ আমাদের খালবিল, নদীনালায় আর নেই। মাছের বংশ বৃদ্ধি, বিস্তার ও উৎপাদনের জন্য কয়েকটি দিক বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য-

* কিছু প্রজাতির প্রজননের জন্য বিশেষ ধরনের জায়গার প্রয়োজন। * কিছু প্রজাতির প্রজনন ও বিচরণের জন্য বিশেষ পরিবেশ প্রয়োজন। * কিছু প্রজাতির প্রজননের পর বিশেষ পরিচর্যা প্রয়োজন।

একসময় এ দিকগুলো ছিল প্রকৃতির দান। কিন্তু বর্তমানে কোনো নির্দেশ মানা হচ্ছে না বলে বিপর্যয় ঘনিয়ে আসছে। প্রশ্ন আসতে পারে, উলি্লখিত বিষয়গুলো কি শুধু প্রায় বিলুপ্ত প্রজাতির ক্ষেত্রে প্রযোজ্য, না অন্য প্রজাতির জন্য? বিলুপ্তপ্রায় মাছের প্রজনন, লালন ও বিচরণ ক্ষেত্র ইত্যাদির দিকে তাকালে বোঝা যায়, উলি্লখিত নির্দেশগুলো মানা হয় না। এ কারণে পিছিয়ে রয়েছে মানুষ। প্রকৃতির কারণে পরিবেশ যতটা বদলাচ্ছে, মানুষের কারণে বদলাচ্ছে তার চেয়ে বেশি। মৎস্য প্রজাতি বিলুপ্ত হওয়ার ফলে যেসব সমস্যা দেখা দিতে পারে, তা হলো-

* মৎস্যসম্পদের জীববৈচিত্র্য নষ্টসহ পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট। * বিলুপ্ত প্রজাতির মধ্যে অধিকাংশ মাছ গ্রামের সাধারণ মানুষের পুষ্টির উৎস। যেমন- সরপুঁটি, পাবদা, ভেদা, বাটা, নামা, চান্দা, গনিয়া, শোল, টাকি, বাঘা, ফলি, বাচা, একঠোঁটা ইত্যাদি। উলি্লখিত মাছগুলো খালবিল, হাওর-বাঁওড়, নদীনালা ইত্যাদিতে আগের মতো না পাওয়ায় দরিদ্র জনসাধারণ আমিষের চাহিদা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। * জেলে সম্প্রদায়সহ দরিদ্র মানুষের জীবিকা নির্বাহের প্রধান উৎস ছিল এসব প্রজাতির মাছ, যা হারিয়ে গেছে বা যাচ্ছে বলে বন্ধ হয়ে যাচ্ছে জেলেদের কর্মসংস্থান। প্রভাব পড়ছে জাতীয় আয়সহ রফতানি আয়ে।

এবার দেখা যাক, মৎস্যসম্পদ কীভাবে উজাড় হচ্ছে- জলাশয় ভরাট হয়ে যাওয়া, কারেন্ট জালের ব্যবহার, প্রজনন মৌসুমে ডিমওয়ালা মাছ ধরা, রাসায়নিক সার ও কীটনাশকের যথেচ্ছ ব্যবহার, অপরিকল্পিত বাঁধ ও রাস্তা নির্মাণ, পানি সেচ দিয়ে সব মাছ তুলে ফেলা, পাটি বাঁধ দিয়ে বিলের সব মাছ ধরা, কলকারখানার বর্জ্য জলাশয়ে ফেলা, জলাশয়ে বিষ প্রয়োগ, আধুনিক পদ্ধতিতে মাছ চাষ, সচেতনতার অভাব ইত্যাদি।

উলি্লখিত কারণগুলোর মধ্যে ঘটে যাওয়া কিছু কারণ, যার সংশোধন বর্তমানে হয়তো সম্ভব নয়; কিন্তু কিছু কারণ আছে, যা এখনও রোধ করতে পারি, যদি আমরা একটু সচেতন হই। যেমন- কারেন্ট জালের ব্যবহার : শুধু কারেন্ট জাল নয়, নির্ধারিত ফাঁসের মাপ অনুসারে জাল ব্যবহার নিশ্চিত করা যায় তাহলে মাছের বিলুপ্তি রোধ করা অনেকটা সম্ভব এবং সেসঙ্গে মাছের উৎপাদনও অনেকটা বেড়ে যাবে। বছরে যে পরিমাণ জাটকা ধরা পড়ে, তার শতকরা ২৫ ভাগ যদি রক্ষা করা যায়, তাহলে বছরে ১.৫ লাখ টন ইলিশ উৎপাদন সম্ভব, যার বাজার মূল্য ১ হাজার কোটি টাকা। শুধু ইলিশ নয়, বর্ষা মৌসুমে এসব জালের অবাধ ব্যবহারে ডিমওয়ালা মাছসহ ধরা পড়ছে অনেক জলজ জীব ও কীটপতঙ্গ। ফলে বিপন্ন হচ্ছে পরিবেশের ভারসাম্য।

প্রজনন মৌসুমে ডিমওয়ালা মাছ না ধরা : বছরে বর্ষা মৌসুমে মাছ আমরা অনেকটা হাতের নাগালেই পেয়ে থাকি। এ মৌসুমে মাছের ডিম ছাড়ার সময়। এ সময় যদি আমরা মাছ না ধরি তাহলে মাছের উৎপাদন অনেক বেড়ে যাবে।

পাটি বাঁধ এবং সেচ দিয়ে জলাশয় শুকিয়ে ফেলা : পাটি বাঁধ এবং সেচ দিয়ে জলাশয় শুকিয়ে সব মাছ ধরে ফেলায় পরের বছরের মাছের উৎপাদন আগের তুলনায় কমে যাচ্ছে। এমনকি অনেক প্রজাতি হারিয়ে যাচ্ছে কোনো ‘মা’ মাছ না থাকায়।

রাসায়নিক সার, কীটনাশক ও কলকারখানার বর্জ্য : ‘নিরাপদ পানি চাই’ সেস্নাগান বর্তমানে সবার দাবি। মাছের অস্তিত্ব, সংখ্যা, বিকাশ ও সংরক্ষণে নিরাপদ পানি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। পানি ছাড়া মাছ কল্পনা করা যায় না বলে পানি সর্বোতভাবে মাছের উপযোগী হতে হবে। রাসায়নিক সার, কীটনাশক ও কলকারখানার বর্জ্যের কারণে পানির উপকারিতা ও গুণাবলি আজ বিনষ্ট হচ্ছে। রাসায়নিক সার, কীটনাশক ও বর্জ্যের প্রভাবে অপেক্ষাকৃত নাজুক প্রকৃতির মাছের প্রজনন, বিচরণ এবং মাছের খাদ্য প্লাংটন উৎপাদনসহ বিভিন্ন জৈবিক প্রক্রিয়ায় বিপর্যয় নেমে আসতে পারে। কই, শিং, মাগুর, পুঁটি, শোল, টাকি, গজার, বেলে, টেংরা ইত্যাদি মাছ সাধারণত কম পানিতে ধানের জমিতে ডিম দেয় এবং বাচ্চা লালন করে। কাতলা, রুই, মৃগেল, কালিবাউশ ইত্যাদিসহ অন্যান্য মাছের ছোট পোনা নিচু জমির ধানক্ষেত লালনভূমি হিসেবে ব্যবহার করে। রাসায়নিক সার, কীটনাশক ও কলকারখানার বর্জ্যের কারণে মাছের পাশাপাশি জলজ অন্যান্য প্রাণীর প্রজনন, বিচরণ এবং লালন ক্ষেত্র দূষিত হচ্ছে।

অপরিকল্পিত বাঁধ ও রাস্তা নির্মাণ : মাছের পরিবেশ প্রকৃতি স্থির করে দিয়েছে। মানুষ তা পাল্টে দিচ্ছে, নষ্ট করছে। বন্যা নিয়ন্ত্রণ, সেচ, বাঁধ, অপরিকল্পিতভাবে রাস্তা নির্মাণের ফলে মাছের অবাধ বিচরণ যে সীমিত হচ্ছে তা নয়, অনেক গুরুত্বপূর্ণ প্রজাতি তার বাঁচার মতো খাবার না পেয়ে শেষ হয়ে যাওয়ার পথে। কয়েক বছরে বাংলাদেশে মোট ৬ হাজার ১৩৪ কিলোমিটার বাঁধ নির্মাণ করা হয়েছে। এতে খাদ্য উৎপাদন কিছুটা বাড়লেও মৎস্য উৎপাদন বৃদ্ধির ক্ষেত্রে বিরূপ প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়েছে। উদাহরণস্বরূপ চাঁদপুর বন্যা নিয়ন্ত্রণ ও সেচ প্রকল্পের ফলে প্রথম দুই বছরে মাছের উৎপাদন কমেছে ৩৫ শতাংশ।

আধুনিক পদ্ধতিতে মাছ চাষ : বর্তমানে আধুনিক পদ্ধতিতে মাছ চাষ ব্যবস্থায় ছোট প্রজাতির মাছকে অবাঞ্ছিত এবং বোয়াল, টাকি, গজার ইত্যাদিকে রাক্ষুসে মাছ হিসেবে উল্লেখ করে কীটনাশক প্রয়োগের মাধ্যমে মেরে ফেলার ফলে নদনদী, খালবিলের পাশাপাশি বদ্ধ জলাশয় ও পুকুর থেকে এসব মাছ দিন দিন হারিয়ে যাচ্ছে। পাশাপাশি বিদেশি মাছ চাষের প্রবণতাকে উৎসাহিত করা হচ্ছে। আমরা অবশ্য আমাদের প্রয়োজনে বিদেশি মাছ চাষ করব, তাই বলে দেশি প্রজাতির মাছকে ধ্বংস করে নয়। আমাদের দেশি প্রজাতির ছোট মাছ যে পুকুর বা বদ্ধ জলাশয়ে চাষ করা যায় এবং তা লাভজনক, সেদিকে আমাদের নজর দিতে হবে। একটি বিদেশি জাতের মাছ নিয়ে আমাদের দেশে যত গবেষণা হয়েছে; দেশি জাতের মাছ নিয়ে তা করা হয়নি মোটেও। বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউট বেশকিছু দেশি মাছের সফল কৃত্রিম প্রজনন এবং চাষ করে আশানুরূপ ফল পেলেও পরে সম্প্রসারণ বা চাষিদের মধ্যে আগ্রহ সৃষ্টির জন্য মাঠ পর্যায়ে সরাসরি চাষিদের সঙ্গে কাজ করে, তাদের মাধ্যমে এসব প্রযুক্তি হস্তান্তর করে দেশি প্রজাতির মাছ চাষে উদ্বুদ্ধ করা যেতে পারে। পাশাপাশি মাছের প্রজনন ও বিচরণ ক্ষেত্র চিহ্নিত করে সেখানে অভয়াশ্রম তৈরি করা, নিরাপদ প্রজনন ও বিচরণ ক্ষেত্রে মাছের নিরবচ্ছিন্ন ও নির্বিঘ্ন চলাচলে বিঘ্ন না ঘটানো, বর্ষা মৌসুমে ডিমওয়ালা ও পোনা মাছ না ধরা, ক্ষতিকর শিকার সরঞ্জাম ব্যবহার না করা ইত্যাদি ব্যবস্থা গ্রহণ করা যেতে পারে। পৃথিবীর অনেক দেশে বিলুপ্তপ্রায় প্রজাতি শিকার সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। আমাদের দেশে প্রজাতি বিশেষে এরূপ পদক্ষেপ নেয়া জরুরি।

আফতাব চৌধুরী : কলাম লেখক ও সাংবাদিক