মধুকবির জন্মজয়ন্তীতে মধুমেলা

প্রকাশ:| রবিবার, ২৫ জানুয়ারি , ২০১৫ সময় ১১:২২ অপরাহ্ণ

‘দাঁড়াও পথিকবর, জন্ম যদি তব/বঙ্গে! তিষ্ঠ ক্ষণকাল! এ সমাধি স্থলে.. কবিতার মহাকবি মাইকেল মধুসূদন দত্তের ১৯১তম জন্মজয়ন্তী রোববার। ১৮২৪ সালের আজকের দিনে ঊনবিংশ শতাব্দীর বিশিষ্ট বাঙালি কবি ও নাট্যকার তথা বাংলার নবজাগরণ সাহিত্যের অন্যতম পুরোধা ব্যক্তিত্ব মাইকেল মধুসূধন দত্ত জন্ম গ্রহণ করেন যশোরের কেশবপুরের কপোতাক্ষ নদের পাড়ে সাগরদাঁড়ি গ্রামে।

তার জন্মদিন উপলক্ষে প্রতিবারের মতো এবারও অনুষ্ঠিত হচ্ছে সপ্তাহব্যাপী মধুমেলা। এসএসসি পরীক্ষার কারণে এবার জন্মদিনের দুদিন আগে এ মেলার আয়োজন করে জেলা প্রশাসন।

মাইকেল মধুসূদন দত্ত জন্মগতভাবে বাঙালি হলেও পাশ্চাত্য সাহিত্যের প্রতি আকর্ষণবশত তিনি প্রথম থেকেই ইংরেজি ভাষায় সাহিত্য রচনায় মনোনিবেশ করেন। তবে জীবনের দ্বিতীয় পর্বে তার ভ্রম কাটে। মাইকেল নিজ মাতৃভাষায় প্রথমে নাট্যকার হিসেবেই সাহিত্য চর্চা শুরু করেন। তার সাহিত্যের প্রতিটি ক্ষেত্রে বিচরণের পূর্বে একটি ইতিহাস রয়েছে। বাংলা নাটকের ক্ষেত্রেও তা বাদ যায়নি।

উনিশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে বাংলা সাহিত্যের প্রভাবশালী নাট্যকার রামনারায়ণ তর্করত্ন তার ‘রত্মাবলী’ নাটকের ইংরেজি অনুবাদ করতে গিয়ে তিনি বাংলা নাট্যসাহিত্যে উপযুক্ত নাটকের অভাব বোধ করেন। এজন্য তিনি নিজে নাটক লেখায় হাত দেন। রচনা করেন সাড়াজাগানো নাটক শর্মিষ্ঠা ও কৃষ্ণকুমারী।

১৮৬০ সালে সমাজে বহমান দুইটি বিপরীতমুখী ধারা নিয়ে ‘একেই কি বলে সভ্যতা’ এবং ‘বুড়ো শালিকের ঘাড়ে রোঁ’ নামে দুইটি প্রহসন রচনা করেন। প্রথমটিতে তিনি সদ্য ইংরেজি শিক্ষায় শিক্ষিত এদেশের হিন্দু সমাজের একাংশের অসামাজিক তৎপরতার ধারাবিবরণী লিখেছেন। আর দ্বিতীয় প্রহসনে ধর্মকে পুঁজি করে এদেশের সাধারণ মানুষের ওপর নিপীড়ন চালানো সনাতনপন্থিদের নৈতিক অধঃপতনের বাস্তব চিত্র তুলে ধরেন। প্রহসন দুটি প্রকাশিত হওয়ার পর মধুসূধনের ওপর ওই দুই শ্রেণীর প্রতিনিধিরা রুষ্ট হন। তাই বেলগাছিয়া রঙ্গমঞ্চে বুড়ো শালিকের ঘাড়ে রোঁ প্রহসনটি মঞ্চস্থ হওয়ার কথা থাকলেও, শেষপর্যন্ত তা হয়নি।

বাংলায় সাহিত্য রচনার বেশ আগে ১৮৪৩ সালে মধুসূদন প্রশ্চাত্য প্রভাবে হিন্দু ধর্ম ত্যাগ করে খ্রিস্টধর্ম গ্রহণ করেন। তখন থেকে তার নাম হয় মাইকেল মধুসূদন দত্ত। ঘটনার পর বাবা রাজনারায়ণ দত্ত মধুসূদনকে ‘ত্যাজ্যপুত্র’ ঘোষণা করেন। তবে ত্যাজ্যপুত্র ঘোষণার পরেও মধুসূদনকে তার বাবা চার বছর ধরে অর্থ জোগান দিয়েছেন। পরে তিনি টাকা দেয়া বন্ধ করে দিলে চরম আর্থিক সঙ্কট পড়েন মধুসূদন। সেই নিদারুণ দারিদ্রের মধ্যেই রচনা করেন ‘দ্য ক্যাপটিভ লেডি’ নামে তার প্রথম কাব্যগ্রন্থটি। মাত্র ২৫ বছর বয়সে লেখা কাব্যগ্রন্থটি প্রকাশিত হওয়ার পর কবি ও দক্ষ ইংরেজি লেখক হিসেবে তার সুনাম ছড়িয়ে পড়ে।

মোহভঙ্গ হলে ১৮৫৬ সালে দেশে ফিরে মধুসূদন একাগ্রচিত্রে বাংলায় সাহিত্য রচনা হাত দেন। ১৮৬১ সালে অমিত্রাক্ষর ছন্দে রচনা করেন ‘মেঘনাদ বধ কাব্য’। যেখানে মূল রামায়নে খলচরিত্র হিসেবে দেখানো রাবন ও তার পুত্র ঈন্দ্রজিৎকে নায়ক হিসেবে উপস্থাপন করেন মধুসূদন। ধর্মীয় গ্রন্থ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত রামায়নের ঠিক বিপরীতে ‘স্রোত বহমান’ করানো এই উদ্যোগ তৎকালীন ভারতবর্ষে সহজ কাজ ছিলো না। তবে তিনি সেই সাহসিকতার পরিচয় দিয়ে বাংলা সাহিত্যেকে নিয়ে যান অন্যন্য উচ্চতায়।

মধুসূদনের শেষ জীবন চরম দুঃখ ও দারিদ্রের মধ্য দিয়ে অতিবাহিত হয়। বাবার মতো আইন ব্যবসায়ে তিনি সফল হননি। এছাড়া অমিতব্যয়ী স্বভাবের কারণে তিনি ঋণগ্রস্তও হয়ে পড়েন। ১৮৭৩ খ্রিস্টাব্দের ২৯ জুন আলিপুর জেনারেল হাসপাতালে কপর্দকহীন (অর্থাভাবে) অবস্থায় তিনি মারা যান।

এদিকে, মধুমেলার দ্বিতীয় দিন শনিবার সন্ধ্যায় মহাকবির ১৯১তম জন্মজয়ন্তী ও সপ্তাহব্যাপী মধুমেলার দ্বিতীয় দিনে মধুমঞ্চে “বাংলা কবিতায় আধুনিকতা ও মাইকেল মধুসূদন” বিষয়ভিত্তিক আলোচনা সভায় প্রধান অতিথি কবি ও কথা সাহিত্যিক সৈয়দ শামসুল হক।
যশোরের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) সাবিনা ইয়াসমিনের সভাপতিত্বে আলোচনা সভায় বিশেষ অতিথি হিসেবে আলোচনায় অংশ নেন খুলনা বিএল বিশ্ববিদ্যালয় কলেজের প্রাক্তন অধ্যক্ষ সাধন রঞ্জণ ঘোষ। অন্যদের মধ্যে আলোচনায় অংশ নেন- মনিরামপুর উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান আমজাদ হোসেন লাভলু, দৈনিক কল্যাণ সম্পাদক ও যশোর প্রেসক্লাবের সাবেক সভাপতি একারাম-উদ-দ্দৌলা, কলামিস্ট ও মুক্তিযোদ্ধা সংহতি পরিষদের সভাপতি আমিরুল ইুসলাম রন্টু, মধুসূদন একাডেমি পরিচালক কবি খসরু পারভেজ, যশোর সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের সাধারণ সম্পাদক সুকুমার দাস, ঝিকরগাছা রঘুনাথপুর কলেজের সহকারী অধ্যাপক কবি হোসাইন নজরুল, মফিজুর রহমান নান্নু, মদনপুর ডিগ্রি কলেজের সহকারী অধ্যাপক শফিয়ার রহমান।