ভূমিকম্প আতঙ্ক নয়, চাই সচেতনতা

প্রকাশ:| বুধবার, ১৩ এপ্রিল , ২০১৬ সময় ১১:২৩ অপরাহ্ণ

বাংলাদেশে সংঘটিত প্রাকৃতিক দুর্যোগণ্ডলোর একটি ভূমিকম্প। আমাদের দেশে প্রায় প্রতি বছর মৃদু মাত্রার ভূমিকম্প অনুভূত হয়। পরিবেশগত বিপর্যয়ের কারণে যে-কোনো সময় ভূমিকম্প আঘাত হানতে পারে। বাংলাদেশ ভূমিকম্পের জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ, বিশেষ করে উচ্চমাত্রায় ভূমিকম্প হলে রাজধানী ঢাকা ধ্বংসস্তূপে পরিণত হবে। দেশ-বিদেশের বিভিন্ন গবেষণায় বিষয়টি উঠে আসছে। বাংলাদেশে যে-কোনো সময় শক্তিশালী ভূমিকম্প আঘাত হানতে পারে। ভূমিকম্পের সম্ভাব্য ক্ষয়ক্ষতির হাত থেকে রক্ষার জন্য আমাদের সচেতন থাকার পাশাপাশি প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে।
বাংলাদেশ মূলত ইন্ডিয়ান প্লেটের ওপর অবস্থিত। আর এ প্লেট ক্রমাগতভাবে উত্তর ও উত্তর-পূর্ব দিকে ইউরোশিয়ান প্লেটের দিকে ধাবিত হচ্ছে, যার পরিমাণ প্রতিবছরে ৪ দশমিক ৬ থেকে ৪ দশমিক ৮ সেন্টিমিটার। এর ফলে ইন্ডিয়ান প্লেট ইউরোশিয়ান প্লেটের নিচে ঢুকে যাচ্ছে।
ভূ-অভ্যন্তরে শিলায় পীড়নের জন্য যে শক্তির সঞ্চয় ঘটে, হঠাৎ সেই শক্তির মু্ক্তি ঘটলে ভূ-পৃষ্ঠ ক্ষণিকের জন্য কেঁপে ওঠে এবং ভূ-ত্বকের কিছু অংশ আন্দোলিত হয়। এইরূপ আকস্মিক ও ক্ষণস্থায়ী কম্পনকে ভূমিকম্প বলে। ভূমিকম্পকে ইংরেজিতে ঊধৎঃযয়ঁধশব বলা হয়। সাধারণত ভূ-পৃষ্ঠের অগভীর তলদেশে ৫ থেকে প্রায় ১,১২৬ কি. মি. গভীরে ভূকম্পন সৃষ্টি হয়ে থাকে। এণ্ডলোর মধ্যে প্রায় প্রতি ৫০০টিতে একটি মারাত্মক আকার ধারণ করে। আগ্নেয়গিরির লাভা প্রচণ্ড শক্তিতে ভূঅভ্যন্তর থেকে বের হয়ে আসার সময়ও ভূমিকম্পের সৃষ্টি হয়। চালর্স এফ রিখটার নামক একজন ভূমিকম্পনবিদ ভূকম্পন শক্তি পরিমাপের একটি গাণিতিক স্কেল ব্যবহার করেন। যা বর্তমানে রিখটার স্কেল নামে পরিচিত। বিশেষজ্ঞদের মতে, ভূমিকম্প মাপক রিখটার স্কেলে ৩ থেকে ৩.৯৯ পর্যন্ত মৃদু ধরনের, ৪ থেকে ৪.৯৯ পর্যন্ত হালকা ধরনের ৫ থেকে ৫.৯৯ পর্যন্ত তীব্র ভূমিকম্প, ৭ থেকে ৭.৯৯ প্রলয়ংকরী এবং ৮ থেকে ৮ এর ওপরে গেলে মহাপ্রলয়ংকরী ভূমিকম্প হিসেবে গণ্য।
বাংলাদেশে ঘন ঘন ভূমিকম্প না হলেও দেশটি ভূমিকম্প অঞ্চলের মধ্যে অবস্থিত। বিভিন্ন তথ্য থেকে জানা যায়, গত ২০০ বছরের মধ্যে প্রতি ৩০ বছরে এই অঞ্চলে গড়ে একটি প্রচণ্ড ভূমিকম্প অনুভূত হয়েছে। বাংলাদেশে প্রতি বছর গড়ে ৩০ থেকে ৩৫টি মৃদু ভূমিকম্প হয়। বাংলাদেশে ভয়াবহ ভূমিকম্পে বহু ঘরবাড়ি ধ্বংস হওয়াসহ, অগণিত জীবজন্তু ও মানুষের মৃত্যু এবং সর্বোপরি নদীর গতিপথ পরিবর্তনের ইতিহাস পাওয়া যায়। স্মরণকালের মধ্যে বাংলদেশে অনুভূত ভয়াবহ ভূমিকম্পণ্ডলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য ১৮৮৫ সালের বেঙ্গল ভূমিকম্প, ১৯৩২ সালের উত্তরবঙ্গ ভূমিকম্প, ১৯৩৫ ও ৪২ সালের মধ্যে বাংলার ভূমিকম্প বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
ভূমিকম্প বিশারদদের মতে কোনো এলাকায় একবার ভূমিকম্প হলে সেখানকার মাটির স্তর আলগা হয়ে যায়। আলগা মাটিরস্তর ধীরে ধীরে শক্ত হতে থাকে এবং এতে প্রায় ১০০ বছর লেগে যায়। মধুপুর বা আসামের ডাউকি নদীর তলদেশচ্যুতি থেকে যদি ৮ মাত্রা বা তার চেয়ে অধিক মাত্রার ভূমিকম্প আঘাত হানে তবে বাংলাদেশের ব্যাপক ক্ষতি হবে। বিশেষ করে ঘনবসতিপূর্ণ ঢাকার ক্ষতি হবে অকল্পনীয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রায় ৭০ হাজার বাড়ি মুহূর্তেই ধসে পড়বে। লাখ লাখ মানুষ নিমিষেই প্রাণ হারাবে। কারণ ঢাকা শহরের ৩৫ ভাগ স্থাপনা শক্ত মাটিতে এবং বাকি ৬৫ ভাগ স্থাপনা বালু দিয়ে বিভিন্ন জলাশয় ভরাট করে তৈরি করা হয়েছে।
বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগের পূর্বাভাস পাওয়া গেলেও ভূমিকম্পের বেলায় সে সুযোগ নেই। ভূমিকম্পে ঘরের ছাদ বা দেয়াল ধসে, বৈদ্যুতিক খুঁটি বা গাছ পড়ে গিয়ে ক্ষয়ক্ষতি ঘটে থাকে। এছাড়া বৈদুতিক তার পড়ে বা গ্যাস লাইন ফেটে অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে এবং তাতে ক্ষয়ক্ষতি বেড়ে যায়। ফলে ভূমিকম্প সম্পর্কে সচেতনতা গড়ে তুলে হতাহতের ঘটনা কমিয়ে আনা সম্ভব।
ভূমিকম্পের পূর্বপ্রস্তুতি হিসেবে আমাদের জরুরি পদক্ষেপ নিতে হবে। ইমারত নির্মাণ বিধিমালা মেনে বাড়ি নির্মাণ করা; গ্যাস, বিদ্যুৎ ও পানি সরবরাহের সংযোগ ঝুঁকিমুক্ত কি-না তা নিয়মিত পরীক্ষা করা ও এণ্ডলোর অবস্থান এবং বন্ধ করার নিয়ম সম্পর্কে বাসার সকলকে জানিয়ে রাখা; জরুরি অবস্থায় বাড়ি থেকে বের হওয়ার সম্ভাব্য একাধিক পথ ও বাড়ির পাশের ফাঁকা জায়গা পরিবারের সকলকে দেখিয়ে রাখা; ভূমিকম্পের কারণে ঘরের ভারী আসবাবপত্র যেমন- আলমারি, শেল্ফ, ফুলের টব, ছবির ফ্রেম ইত্যাদি পড়ে গিয়ে যাতে দুর্ঘটনা না ঘটতে পারে সেজন্য পেছনে থেকে আংটা লাগিয়ে দেয়ালের সাথে আটকিয়ে রাখা; ভারী ও ভঙ্গুর জিনিসপত্র সেলফের নিচের দিকে রাখা; ফায়ার স্টেশন, হাসপাতাল, ক্লিনিক ও স্বাস্থ্যকেন্দ্রের টেলিফোন নম্বর বাড়ির প্রকাশ্য স্থানে রাখা যাতে সকলে তা দেখতে পারে; বহুতল ভবন, মার্কেট, হোটেল, বিদ্যালয়ের সিঁড়ি প্রশস্থ করা এবং জরুরি দরজা ও সিঁড়ির ব্যবস্থা রাখা, ভূমিকম্পের সময় আত্মরক্ষার জন্য ঘরে একটি ব্যাগে রেডিও, টর্চ লাইট, হাতুড়ি, হেলমেট, কুড়াল ও প্রাথমিক চিকিৎসার সরঞ্জামসমূহ মজুদ রাখতে হবে।
ভূমিকম্পের সময় কী করা উচিত এবং কী নয়_ এ বিষয়ে ধারণা থাকা খুবই জরুরি। ভূকম্পন অনুভূত হলে শান্ত থাকতে হবে, আতঙ্কিত হয়ে ছোটাছুটি করা বা সাথে সাথেই বাড়ি থেকে বের হওয়ার চেষ্টা করা উচিত নয়। কারণ ভূমিকম্প সাধারণত ৩০ থেকে ৪০ সেকেন্ড স্থায়ী হয় এবং তা বুঝে উঠতেই ৫ থেকে ১০ সেকেন্ড সময় চলে যায়। তাই ভূমিকম্পের সময় ভবন থেকে দৌড়ে বের হওয়া খুবই ঝূঁকিপূর্ণ। ভূমিকম্পের সময় বিছানায় থাকলে বালিশ দিয়ে মাথা ঢেকে নিতে হবে এবং টেবিল, ডেস্ক বা শক্ত কোনো আসবাবপত্রের নিচে আশ্রয় নিতে হবে। যার নিচে আশ্রয় নেবেন তা এমনভাবে ধরে থাকতে হবে যাতে সেটি মাথার ওপর থেকে সরে না যায়। এ সময় শক্ত দরজার চৌকাঠের নিচে অথবা পিলারের পাশে আশ্রয় নেয়া উত্তম। রান্নাঘরে থাকলে যত দ্রুত সম্ভব বের হয়ে আসতে হবে। সম্ভব হলে দ্রুত বাড়ির বিদ্যুতের মূল সংযোগ বিচ্ছিন্ন করতে হবে এবং গ্যাসের চাবি বন্ধ রাখতে হবে। উঁচু বাড়ির জানালা, বারান্দা বা ছাদ থেকে লাফ দিয়ে বাঁচার চেষ্টা করা বোকামি। এ সময় লিফ্ট ব্যবহার করা বিপজ্জনক। ঘরের বাইরে থাকলে গাছ, উঁচু বাড়ি, বিদ্যুতের খুঁটি থেকে দূরে খোলাস্থানে আশ্রয় নিতে হবে। জনাকীর্ণ ঘর যেমন- গার্মেন্টস ফ্যাক্টরি, হাসপাতাল, সিনেমা হল, মার্কেটে থাকলে বাইরে বের হওয়ার জন্য দরজার সামনে ভিড় করা উচিত নয়। গাড়িতে থাকলে ওভারব্রিজ, ফ্লাইওভার, গাছ ও বিদ্যুতের খুঁটি থেকে দূরে গাড়ি থামাতে হবে। ভূকম্পন না থামা পর্যন্ত গাড়ির ভেতরেই অবস্থান করতে হবে। ভূমিকম্পের ফলে ভাঙা দেয়ালের নীচে চাপা পড়লে বেশি নড়াচড়ার চেষ্টা করা উচিত নয়। এ সময়ে কাপড় দিয়ে মুখ ঢেকে রাখতে হবে যাতে ধুলোবালি শ্বাসনালিতে না ঢোকে। সম্ভব হলে দেয়ালের পাশে সরে আসতে হবে এবং উদ্ধারকারীদের মনোযোগ আকর্ষণের চেষ্টা করতে হবে। শেষ প্রচেষ্টা হিসেবে উচ্চস্বরে চিৎকার করতে হবে। খেয়াল রাখতে হবে, এ সময় যাতে শ্বাসযন্ত্রে ধুলোবালি প্রবেশ না করে।
এ সকল বিষয় ছাড়াও ভূমিকম্প পরবর্তীতে করণীয় কিছু বিষয় রয়েছে। কারণ সাধারণত একবার ভূমিকম্প হলে পরপর কয়েকটি কম্পনের ঘটনা ঘটে থাকে। ভূমিকম্প পরবর্তী করণীয়সমূহ হলো- প্রথমবার অনুভূত কম্পন থেমে যাওয়ার পর ঘর থেকে সিঁড়ি দিয়ে সারিবদ্ধভাবে বের হয়ে খালি জায়গায় আশ্রয় নেওয়া; বৈদ্যুতিক বা টেলিফোনের খুঁটি ও তার, উঁচু দেয়াল ও ভবন থেকে দূরে থাকা; গ্যাস বা অন্য কোনো রাসায়নিক দ্রব্যের গন্ধ পেলে নিরাপদ দূরত্বে সরে যাওয়া; জরুরি তথ্য পাওয়ার জন্য সম্ভব হলে রেডিওসেট ব্যবহার করা; কেউ অসুস্থ হলে যথাসম্ভব দ্রুত প্রাথমিক চিকিৎসার ব্যবস্থা করা; উদ্ধার কাজে নিয়োজিত সংস্থাসমূহকে সহযোগিতা করা; উদ্ধারের ক্ষেত্রে শিশু, বৃদ্ধ, অসুস্থ ও প্রতিবন্ধীদের অগ্রাধিকার দেওয়া। মনে রাখতে হবে- প্রথমবার কম্পনের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত বা আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত ভবন, ব্রিজ ও বিভিন্ন অবকাঠামো পরবর্তী ভূকম্পনে ধসে যেতে পারে, তাই সেণ্ডলো থেকে দূরে থাকতে হবে।
ভূমিকম্পের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলা করতে হবে। তবে আতঙ্কিত না হয়ে সচেতনতা সৃষ্টির মাধ্যমে ক্ষয়ক্ষতি কমিয়ে আনা সম্ভব। তাই এ সকল বিষয়ে নিজে জানতে হবে ও প্রতিবেশীকে জানাতে হবে। সর্বোপরি ভূমিকম্পের ঝুঁকি মোকাবিলায় প্রয়োজন নিজ দায়িত্ব পালনের সাথে সাথে সম্মিলিত প্রচেষ্টা।-পিআইডি ফিচার