ভারতের স্ট্রিট ক্রিকেট

প্রকাশ:| শুক্রবার, ৫ জুন , ২০১৫ সময় ০৮:৫৩ অপরাহ্ণ

ক্রিকেটপ্রথমবার তাকিয়ে মনে হবে, এক দঙ্গল বিশৃঙ্খল কিশোরের হুড়োহুড়ি। চোখের দৃষ্টি খানিকটা ধাতস্থ হলে, অনেকটা যেভাবে আমরা রাতের পরিষ্কার আকাশে দূরের তারা দেখে থাকি, বোঝা যায় সবাই আসলে ক্রিকেট খেলতে মত্ত। কিন্তু এক মাঠে তো একটা ম্যাচেরই আয়োজন করা যায়। সেখানে এক ময়দানে একসঙ্গে ৩০টি ম্যাচ? কীভাবে সম্ভব? জায়গাটার নাম যদি হয় শচীন টেন্ডুলকারের প্রসবভূমিখ্যাত মুম্বাইয়ের শিবাজি পার্ক, তাহলে এক মাঠে একই সঙ্গে ৩০টি ম্যাচ অনুষ্ঠিত হওয়াই স্বাভাবিক!

গত অক্টোবরের এক উষ্ণ বিকাল। ইএসপিএনক্রিকইনফোর সহসম্পাদক সুভাস জয়ারমন তার এক সাংবাদিক বন্ধুকে নিয়ে শিবাজি পার্কে হাজির। ধুলায় মাখামাখি সব কচি মুখ। তাদের দেখে শৈশব মনে পড়ে যায় জয়ারমনের। ঘরের বারান্দায় স্যান্ডেলকে ব্যাট আর সুপারিকে বল বানিয়ে কত শত ড্রাইভ! বাদ পড়েনি কলোনির ছাদ থেকে ব্যস্ত রাস্তাও। শৈশব সবসময়ই মধুর। ব্যাপারটা আরো মধুর হতো, যদি দুনিয়ার সব জায়গায়ই ক্রিকেট খেলা যেত— সায় দেয় জয়ারমনের ভাবুক মন।

ম্যাচগুলোর শুরু ও শেষের কোনো মাথামুণ্ডু নেই। জয়ারমন অনেক ধৈর্য নিয়ে বোঝার চেষ্টা করেও ব্যর্থ। শিবাজি পার্কে এসে তার পুরনো ছবির অ্যালবামের ধুলা ঝাড়ার মতো অনুভূতি হচ্ছে। উঁকি দিচ্ছে একের পর এক স্মৃতি। ত্যাবড়ানো স্ট্যাম্প। বেলস নেই। এবড়ো-খেবড়ো উইকেট। চোখা খোয়া বিছানো মাঠ। তার ওপর খালি পায়ে ক্রিকেটের আঁশ মেটাচ্ছে শত শত কচি মুখ। কারো হাতে টেপ প্যাঁচানো টেনিস বল। কয়েকটার আবার উপরের চামড়া নেই। ব্যাটগুলোর অবস্থাও বেগতিক। কোনোটার হ্যান্ডেল ভাঙা, কোনোটা আবার ক্ষয়প্রাপ্ত বৃদ্ধের মতো জীর্ণ-শীর্ণ। চকচকে নতুন ব্যাটও আছে। কিন্তু সেটা শুধু তার মালিকের খেদমতে নিয়োজিত। এক হাত ছেড়ে দুই হাত হওয়ার উপায় নেই। জয়ারমন ভেবে নেয়, উপমহাদেশের ক্রিকেটভক্তদের মধ্যে এই একটাই মিল— বেশির ভাগের শৈশব চিত্রনাট্য একই ছাঁচে গড়া।

ব্যাট করাতেই বেশি মনোযোগী সবাই। এক্ষেত্রে ভূমিকা রাখছে ব্যক্তিগত প্রভাব-প্রতিপত্তি ও দৈহিক আকৃতি। দেখা যাচ্ছে, যে ছেলেটার বয়স একটু কম, দেহের কাঠামোও ছোটখাটো, তার কাজ সারা দিন ফিল্ডিং করা। খুশি মনেই সে তা করছে! যে ছেলেটার হাতে বল, তার চোখ দুটো অগ্নিগর্ভ। যেন ২২ গজের অপর প্রান্তেই সব সুখ নিহিত। অতএব, গতির আগুনে ব্যাটসম্যানকে ধ্বংস করে দাও!

শিবাজি পার্কের ময়দানকে খুব ভালো করে খেয়াল করে জয়ারমন। মাঠের কেন্দ্রস্থলে কিছু উইকেট বানানো হয়েছে। ওটা পেশাদার ক্রিকেটারদের অনুশীলন ক্ষেত্র। ওখান থেকেই উঠে এসেছেন শচীন টেন্ডুলকার! পেশাদার ক্রিকেটারদের এ অনুশীলন ক্ষেত্রকে চারপাশ থেকে ঘিরে বাকি জায়গাটুকুর দখল নিয়েছে ক্ষুদে অপেশাদার ক্রিকেটাররা। তারা স্রেফ মনের চাহিদা মেটাতে খেলছে। শুরুর দিনগুলোয় টেন্ডুলকারও তা-ই করতেন। এ শিবাজি পার্কেই এখনকার ক্ষুদেদের মতো তাকেও খেলতে হয়েছে টেপ টেনিস ক্রিকেট। সেখান থেকে উত্তরণ ঘটিয়ে তবেই শিবাজি পার্কের হূেকারক উইকেটে দ্রোণাচার্য রমাকান্ত আচেরকারের সাহচর্য পেয়েছেন টেন্ডুলকার। গোটা ভারতবর্ষে শিবাজি পার্কই হয়তো একমাত্র ময়দান, যেখানে পেশাদার ক্রিকেট ও অপেশাদার ক্রিকেট যুগ যুগ ধরে একই ভূমিতে সংসার করে যাচ্ছে— অবাক হয়ে ভাবে জয়ারমন।

চেন্নাই থেকে ১৭০ কিমি দক্ষিণ-পশ্চিমের শহর পোলুরে শৈশব কেটেছে জয়ারমনের। ১১ বছর বয়সে তার দিনের গোটা সময়ের দখল নিত ক্রিকেট। বন্ধু-শত্রু ভেদাভেদ নেই, যেখানেই সুযোগ পেয়েছেন সেখানেই ক্রিকেট খেলেছেন। ছুটির দিন কিংবা স্কুলের দিন— ক্রিকেট থাকবেই। স্কুলে যাওয়ার পথে ক্রিকেট; আসার পথেও ক্রিকেট। শৈশবের সেই দিনগুলোয় খেলোয়াড় সংখ্যা ও মাঠের ওপর নির্ভর করে খেলার নিয়মে কাঁচি চালানো হতো। অবশ্য মাঠ বলতে যে সবসময় সবুজ ভূমিতে খেলা হতো, তা নয়। রাস্তা-ছাদ-বারান্দা, এমনকি স্কুলের করিডোর পর্যন্ত বাদ পড়ত না! নির্ধারিত জায়গার বাইরে বল পাঠালে সে ব্যাটসম্যান আউট। শুধু এক প্রান্তে ব্যাট করতে হতো বলে কিছু জায়গা ১ কিংবা ২ রানের জন্য বেঁধে দেয়া থাকত। আর স্ট্যাম্প? এক দঙ্গল বইকে কোমর সমান উঁচু পর্যন্ত সাজিয়ে কিংবা একটা ভাঙা চেয়ার অথবা একটা চক আর দেয়াল পেলেই স্ট্যাম্পের ঝামেলা মিটে যেত। কখনো কখনো আবার এক হাতে ক্যাচ ধরলে তা বাতিল করে দেয়া হতো। এ নিয়ে কত বচসা, কত কথা কাটাকাটি। হায়! সেই স্বর্ণালি শৈশব এখন কোথায়?

ভারতের ‘স্ট্রিট ক্রিকেটে’র ভাষাটা বাকি জায়গাগুলো থেকে স্বতন্ত্র। অঞ্চলভেদে তার সে ভাষার বর্ণ পাল্টে যায়। চেন্নাইয়ে যাদের ক্রিকেটীয় শৈশব কেটেছে, তাদের কাছে ‘গাজী’ ‘দক্ষু’ কিংবা ‘অ্যাদেতেইল’ শব্দগুলো খুবই পরিচিত। ‘গাজী’ শব্দের অর্থ— ইনিংস। ডিফেন্সিভ শটকে নেতিবাচক অর্থে বলা হয়— ‘দক্ষু’। ইনিংস শেষের দিকে যখন পাঁচ-ছয় ওভার বাকি থাকে, তখন ‘দক্ষু’ টাইপের ব্যাটসম্যানদের নিচের দিকে ব্যাট করতে পাঠানো হয়। এ কৌশলটির নাম— ‘অ্যাদেতেইল।’

যদি দুই দল মিলে ২২ জন খেলোয়াড় না হয়, তখন? এক্ষেত্রেও সমাধানের রাস্তা বের করে নিয়েছে সবাই। ‘কমন ফিল্ডার’— অর্থাত্ ব্যাটিং দলের খেলোয়াড়রাও ফিল্ডিং করে থাকেন। কোনো বোলার বেধড়ক মার খেতে থাকলে তাকে দিয়ে সর্বশেষ যে ওভারটি করানো হয়, তার নাম— ‘বেবি ওভার।’ চেন্নাইয়ে বেশির ভাগ স্ট্রিট ক্রিকেটেই পিচের আয়তন ছোট থাকে। এসব ক্ষেত্রে ফুল পেসে বোলিং করা নিষিদ্ধ।

২০০৭ সালে রিলিজ পাওয়া ‘চেন্নাই ৬০০০২৮’ তামিল সিনেমাটির কথা মনে পড়ে যায় জয়ারমনের। চেন্নাইয়ের একটি উপশহরের পিনকোড ব্যবহার করা হয়েছে সিনেমাটির টাইটেল হিসেবে। সেখানকার স্ট্রিট ক্রিকেট দারুণভাবে উঠে এসেছে সিনেমাটিতে। গত বছরের অক্টোবরে চেন্নাইয়ের রা পুরুম এলাকায় সস্ত্রীক গিয়েছিলেন জয়ারমন। সেখানকার করপোরেশন মাঠ তার শৈশব ক্রিকেটের চারণভূমি। সে দিনগুলো হারিয়ে গেলেও ক্রিকেটের ভাষাটা আজো পাল্টায়নি। শুধু দক্ষতার দিক থেকে এখনকার কচি মুখগুলো সেই আমলকে টেক্কা দিয়েছে— ভেবে নেয় জয়ারমন। অক্টোবরে সেই করপোরেশন মাঠে গিয়ে আম্পায়ারিং করার সময় এক অদ্ভুত অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হতে হয় তাকে। আম্পায়ার হিসেবে তার কাজ মাত্র তিনটি— ওয়াইড, নো বল ও রান আউট ডাকা। ওভার কিংবা কে কয় ওভার বোলিং করল, রানের পাশাপাশি সে হিসাবটা রাখে দুই দলের খেলোয়াড়রা। লেগ বিফোর নেই! রান আউটের ক্ষেত্রে আম্পায়ারের ঝামেলাটা শতভাগ। বিতর্ক হবেই। নিয়মটা তাই একটু কাটাছেঁড়া করা হয়েছে। ফিল্ডার বল লুফে নেয়ার পর তার স্ট্যাম্প না ভাঙলেও চলবে, শুধু শরীরের যে কোনো অংশের সঙ্গে স্ট্যাম্পের সংস্পর্শ থাকলেই ব্যাটসম্যান রান আউট!

আশির দশক থেকে ভারতে স্ট্রিট ক্রিকেটের শুরু হলেও এখনকার প্রজন্ম অনেক কিছু পাল্টে নিয়েছে। জয়ারমন নিজেই লক্ষ করে, শিবাজি পার্কে খেলতে আসা শত শত ক্ষুদের গায়ে টেন্ডুলকার কিংবা রোনালদোর জার্সি। পকেটে দামি স্মার্টফোন। পায়ে আরামদায়ক রাবার স্পাইক। জয়ারমন ও তার বন্ধুটি কিছু ছবি তুলতেই আগ্রহী লোচনে তাদের দিকে এগিয়ে আসে কিছু কিশোর। প্রশ্নের পর প্রশ্ন— ফোনটা কোন ব্র্যান্ডের? ক্যামেরা কত মেগাপিক্সেল? কোত্থেকে কিনেছেন? জয়ারমন এসব প্রশ্নের জবাব ভুলে ফিরে যায় তার অতীত দিনগুলোয়। অগ্রজ ছয় ভাইয়ের ছত্রচ্ছায়ায় তাকে বেড়ে উঠতে হয়েছে। আশির দশকের সেই সাদা-কালো দিনগুলোয় সবাই সুনীল গাভাস্কার কিংবা কপিল দেব হতে চাইত। জয়ারমনের নিজের ‘আইডল’ ছিল গাভাস্কার। রান কম হোক কিন্তু আউট হওয়া যাবে না— এটাই ছিল তার দর্শন। কিন্তু এখনকার দিনে এমন ব্যাটসম্যানদের জন্য আগেই নাম ঠিক করে রেখেছে চেন্নাই— ‘দক্ষু’।

১৯৯৮ সাল নাগাদ গাভাস্কার-কপিলকে ভুলে শচীন টেন্ডুলকারের পেছনে ছোটা শুরু করে ক্ষুদেরা। তখন সবাই টেন্ডুলকার হওয়ার ধ্যানমগ্ন। একেক ক্ষুদে যেন ক্রিকেটের মুনি-ঋষি! কিন্তু এখন দিন পাল্টেছে। এখন সবাই ধোনি কিংবা কোহলি হতে চায়। জয়ারমন নিজেই দেখে, শিবাজি পার্কে অনেকেই ধোনির হেলিকপ্টার শট খেলার চেষ্টা করছে। তাদের একজন ডাক দিতেই ছুটে আসে। জয়ারমন নাম জিজ্ঞেস করতেই ছেলেটা ফিক করে হেসে দিয়ে বলে— ধোনি। খেলতে ফিরে যাওয়ার আগে আবারো হাসি উপহার দেয় ছেলেটা। তার পকেটে একটা ট্যাবলেট ফোন।

শৈশবের সেই দিনগুলোয় সারা দিন ক্রিকেট খেলার পর রাতে বিছানায় শুয়ে জয়ারমন কপিল-গাভাস্কারদের স্বপ্নে দেখত। কখনো লর্ডসে, কখনোবা মেলবোর্নে। জয়ারমন নিজেই কখনো কখনো কপিলের পিঠ চাপড়ে দিত স্বপ্নের মাঝে! তখনো কেবল টিভির আশীর্বাদ তিলক পড়েনি তার পরিবারে। বেশির ভাগের অবস্থাটা ছিল একই রকম। কিংবদন্তিদের খেলাটা তাই স্বপ্নেই দেখতে হতো। কিন্তু এখন কোনো কিছুর অভাব নেই। ধরে ধরে ম্যাচ দেখা আর দেখানোর পাশাপাশি চলে এন্তার বিশ্লেষণ। জয়ারমন অবাক হয়ে ভাবে, এত সুযোগ-সুবিধা থাকার পরও ক্রিকেটে এখন কিংবদন্তি প্রসবের সংখ্যা তুলনামূলক কম! সেটা কি স্বপ্ন দেখতে ভুলে যাওয়ার জন্য? মানুষ পাল্টে গেলেও খেলাটার কিছু মৌলিক ব্যাপার তো থেকে গেছে একই রকম। গতকাল শিবাজি পার্কের ধুলাবালিতে লুটোপুটি খেয়ে ক্রিকেট খেলেছে যে ছেলেটা, সে তো আগামীকাল ধোনি-কোহলি হওয়ার স্বপ্ন দেখে। শিবাজি পার্ক যদি হয় এসব অসংখ্য ক্ষুদের সেই সব স্বপ্নের চারণভূমি, তাহলে যত দেরিই হোক না কেন, আরেকজন টেন্ডুলকার উঠে আসবেই। নিশ্চিন্ত হয়েই মাঠ ছাড়েন জয়ারমন।

দ্য ক্রিকেট মান্থলি অবলম্বনে