ব্যাংকের নিরাপত্তারক্ষী খুনের ঘটনায় আনুষ্ঠানিক সংবাদ সম্মেলন

প্রকাশ:| শনিবার, ১৬ মে , ২০১৫ সময় ০৭:০৭ অপরাহ্ণ

Ctg23নগরীর মুরাদপুরে ব্যাংকের নিরাপত্তরক্ষী খুন করে ডাকাতির চেষ্টার মামলায় পরিকল্পনাকারীসহ গ্রেপ্তার হওয়া চারজনকে অবশেষে মিডিয়ার সামনে এনেছে গোয়েন্দা পুলিশ। গত বুধবার তাদের গ্রেপ্তার করলেও এনিয়ে গোয়েন্দা পুলিশ তথ্য প্রদানে গণমাধ্যমকর্মীদের সাথে চোর-পুলিশ খেলায় মেতে উঠেছিল।

গত তিন দিন ধরে তাদের গ্রেপ্তারের বিষয়টি প্রকাশ্য হলেও আনুষ্ঠানিক কোন বক্তব্য দেননি সিএমপির কোন কর্মকর্তাই। তবে ‘দেখে দেখে’ কয়েকটি গণমাধ্যমকে ব্যাংক ডাকাতির সিসিটিভির ফুটেজসহ যাবতীয় তথ্য সরবরাহ করেছে বলে অভিযোগ তুলেছেন অন্য গণমাধ্যমকর্মীরা।

এনিয়ে শনিবার বেলা ১২টার দিকে সিএমপি কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে প্রকাশেই নিজের অসন্তোষ প্রকাশ করেন বেশ কয়েকজন সাংবাদিক। সিএমপি কমিশনারের কাছে এনিয়ে প্রশ্ন রেখে বলেছেন, ‘বেশ কয়েকটি মিডিয়ায় বিষয়টি চলে আসার পর আনুষ্ঠানিক সংবাদ সম্মেলনের আর প্রয়োজন আছে কিনা? অবশ্য এর উত্তরে নিজেদের পক্ষ থেকে তথ্য কিংবা ফুটেজ সরবরাহ করার কথা অস্বীকার করে পুলিশ কমিশনার আব্দুল জলিল মন্ডল বলেছেন, কোথায় কি প্রকাশিত হয়েছে তা আমরা দেখিনি। সেটা আপনারা জানেন।

এদিকে ব্যাংকের নিরাপত্তারক্ষী খুনের ঘটনায় গ্রেপ্তার হওয়া চারজনকে মিয়িার সামনে হাজির করা হলেও কোন কথা বলতে দেয়া হয়নি। তারা হল-পরিকল্পনাকারী গিয়াস উদ্দিন (৩০), জাবাইকারী মো.সাগর (২৫), মাহাবুল (২৬) ও মাজারুল ইসলাম আরিফ (২৪)। এদের সাথে মাসুদ ও রায়হান নামে আরো দু’জন জড়িত বলে জানানো হয়।

লিখিত বক্তব্যে জানানো হয়, গ্রেপ্তার হওয়া আসামীদের কাছ থেকে হত্যাকান্ডে ব্যবহৃত একটি মটরসাইকেল, দুটি ছুরি, একটি বটি, একটি রড, আসামীদের ব্যবহৃত রক্তমাখা জামা ও পেন্ট এবং ভিকটিম ইব্রাহিমের ব্যবহৃত একটি মোবাইল ফোনসেট।

গোপন সংবাদের ভিত্তিতে নগরীর শাহ আমানত মার্কেট থেকে মূল পরিকল্পনাকারী গিয়াস উদ্দিনকে গ্রেপ্তার করা হয়। তার দেয়া স্বীকারোক্তিতে, বাকলিয়া থানার বগারবিল এলাকার ভাড়া বাসা থেকে মাজহারুল ইসলাম আরিফকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরবর্তীতে মাহবুবুল আলমকে কিশোরগঞ্জের অষ্টগ্রাম থানার আলীনগরের নিজ বাড়ী থেকে এবং একই জেলার মিঠামাইন উপজেলার বিরামচরের বোনের বাসা থেকে জবাইকারী সাগরকে গ্রেপ্তার করা হয়।

তবে তাদের কোন কোন স্থান থেকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে তা উল্লেখ করলেও সিএমপির পক্ষ থেকে দেয়া বিজ্ঞপ্তিতে কখন কাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে তা উল্লেখ নেই। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আইন বর্হিভূতভাবে গ্রেপ্তার হওয়া আসামীদের ২৪ ঘন্টার বেশি সময় নিজেদের হেফাজতে রাখার কারণে কৌশলে গ্রেপ্তারের সময় উল্লেখ করেনি পুলিশ।

ইতোমধ্যে ব্যাংক ডাকাতির চেষ্টায় গ্রেপ্তার হওয়া চারজনই যুবলীগের রাজনীতে জড়িত থাকার কথা গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। এমনকি বেশ কয়েকজন আওয়ামী লীগ নেতা ও বাকলিয়ার সরকার দল সমর্থিত এক কাউন্সিলরের তদবিরের কারেণ গত তিন দিনেও গ্রেপ্তারকৃতদের মিডিয়ার সামনে হাজির করেনি বলে অভিযোগ উঠেছে।

তবে বিষয়টি অস্বীকার করে সিএমপি কমিশনার আব্দুল জলিল মন্ডল বলেছেন, ‘আসামীদের নিয়ে জড়িত অন্য আসামীদের গ্রেপ্তারে অভিযান পরিচালনা করায় মিডিয়ার সামনে আনতে একটু দেরি হয়েছে। দু’জনকে কিশোরগঞ্জের হাওড় অঞ্চল থেকে গ্রেপ্তার করে আনা হয়েছে। আমাদের কাছে তাদের একমাত্র পরিচয় তারা কিলার। তাদের কোন পরিচয় আমাদের জানা নেই, প্রয়োজনও মনে করিনা। কোন তদবিরও ছিলনা।’

লিখিত বক্তব্যে জানানো হয়, আসামীরা জিজ্ঞাসাবাদে জানিয়েছে, ঘটনার সাথে জড়িত ছিল আরিফ, মাহাবুল, সাগর, গিয়াস, রায়হান ও মাসুদ। আরিফ, সাগর, গিয়াস রায়হান এবং মাসুদ পূর্ব পরিচিত। এক পর্যায়ে তাদের সাথে পরিচয় হয় মাহাবুলের। ঘটনার প্রায় এক মাস পূর্ব হতে তারা উক্ত ব্যাংকটি ডাকাতির পরিকল্পনা করে। প্রস্তুতির অংশ হিসেবে বিভিন্ন সময়ে ব্যাংকের চতুর্দিক রেকি করে। রায়হান একদিন ব্যাংকের ভিতরেও রেকি করে আসে।

পরিকল্পনা মোতাবেক গত ৭ মে দিবাগত রাত আড়ইটায় ব্যাংকের পিছনের জানালার রড ভেঙ্গে মাহাবুল, সাগর ও মাসুদ ব্যাংকের ভিতর প্রবেশ করে। দারোয়ান তখন ঘুমে ছিল। ঘুমন্ত অবস্থায় তারা দারোয়ানকে চেপে ধরে। দোরোয়ান ধ্বস্তাধ্বস্তি করলে মাসুদ রড দিয়ে তার মাথায় আঘাত করে এবং ছুরি দিয়ে গলায় দুটি আঘাত করে। দারোয়ান ইব্রাহীম চিৎকার দিলে মাহাবুল তার মুখ চেপে ধরে এবং মাসুদ তার মাথা চেপে ধরে। সাথে সাথে সাগর তার হাতে থাকা ছুরি দিয়ে দারোয়ানকে জবাই করে। মৃত্যু নিশ্চিত হওয়া সত্ত্বেও দারোয়ানকে তারা কাপড় দিয়ে বেঁধে রাখে। এরপর তারা দা, রড ইত্যাদি দিয়ে ভোল্ট ভাঙ্গার চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়। পরে অফিসের ড্রয়ার ভেঙ্গে কোনকিছু না পেয়ে একই জানালা দিয়ে বের হয়ে যায়। যাওয়ার সময় আসামী সাগর ভিকটিমের ব্যবহৃত মোবাইল সেট নিয়ে যায়।

এ ঘটনার সময় আসামী গিয়াস ও রায়হান মটর সাইকেল নিয়ে মুরাদপুর মোড়ে অবস্থান করছিল। মাহাবুল, সাগর ও মাসুদ ব্যাংক হতে বের হয়ে গিয়াস ও রায়হানের কাছে আসে এবং দারোয়ানকে খুন করার ঘটনা বলে। তখন সবাই সিদ্ধান্ত নিয়ে যার যার মত করে চলে যায়। ৬ মে রাওে আসামীরা উক্ত ব্যাংক ডাকাতি করার জন্য যায়। কিন্তু মুরাদপুর মোড়ে ফ্লাই-ওভারের কাজে নিয়োজিত শ্রমিকরা জাগ্রত থাকায় ঐ দিনের পরিকল্পনা বাদ দিয়ে তারা চলে যায়।

পুলিশ কমিশনার বলেন, ‘মূলত তারা ছোট চোর থেকে ডাকাতির পথ বেছে নিয়েছিল। তারা ভেবেছিল দিনের বেলায় যেহেতু ব্যাংকের ক্যাশ থেকে টাকা দেয়া হয়। রাতেও একই স্থানে টাকা রাখা হয়। সেজন্য তারা অনভিজ্ঞ হওয়া সত্ত্বেও ব্যাংক ডাকাতির পরিকল্পনা করে ব্যর্থ হয়। ডাকাতি করতে গিয়েই প্রহরী ইব্রাহিমকে খুন করে।’

ঘটনায় জড়িত গিয়াস বেকার হলেও নিজেকে ব্যবসায়ী হিসেবে পরিচয় দেয়। আসামী আরিফ ও সাগর গার্মেন্টস কর্মী। আসামী মাহাবুল একজন ভ্রাম্যমান সবজি বিক্রেতা এবং আসামী রায়হান একজন আইনজীবী সহকারী বলে জানাযায়।

খুন হওয়া নিরাপত্তারক্ষী মো. ইব্রাহিম (৩৪) চট্টগ্রামের চন্দনাইশ পৌরসভার আলী আহমদের ছেলে। এ ঘটনায় পাঁচলাইশ থানায় একটি মামলা দায়ের হয়েছে।

সংবাদ সম্মেলনে আরও উপস্থিত ছিলেন নগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার (ট্রাফিক, অর্থ ও প্রশাসন) একেএম শহীদুর রহমান, অতিরিক্ত কমিশনার (অপরাধ ও অভিযান) বনজ কুমার মজুমদার, উপ পুলিশ কমিশনার ফারুক আহমেদ, নগর গোয়েন্দা পুলিশের উপ কমিশনার কুসুম দেওয়ান ও অতিরিক্ত উপ কমিশনার এস এম তানভির আরাফাত প্রমুখ।