বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের প্রবারণা পূর্ণিমা উৎযাপিত

প্রকাশ:| শুক্রবার, ১৮ অক্টোবর , ২০১৩ সময় ০২:৫৬ অপরাহ্ণ

প্রবারণাভিক্ষুদের অনুষ্ঠান। তা সত্ত্বেও ইহা বৌদ্ধদের শ্রেষ্ঠতম সামাজিক, ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। প্রবারণা শব্দের অর্থ হলো আত্মনিবেদন।বৌদ্ধ ভিক্ষুরা আষাঢ়ী পূর্ণিমা থেকে আশ্বিণী পূর্ণিমা পর্যন্ত তিন মাস ব্যাপী সময়ে বর্ষাব্রত পালন করেন। তখন তারা বিহারে অবস্থান এবং জ্ঞানচর্চা করেন। সে সময়ে তাদের মধ্যে ভুলভ্রান্তি হতে পারে। তাই বর্ষাব্রত পালন শেষে তারা আশ্বিণী পূর্ণিমায় প্রবারণা করে। সেদিনে তারা যদি গোচরে এবং অগোচরে কোন ভুল করে থাকেন তার জন্য জেষ্ঠ ভিক্ষুর কাছে তা জানান এবং তা সংশোধনের আহবান জানান। তেমনিভাবে জ্যেষ্ঠ ভিক্ষুরাও নবীনদের কাছে তাদের ভুলের কথা জানাবেন। এজন্য এটি হলো ভিক্ষুদের আত্নসমর্পন ও আত্ননিবেদনের অনুষ্ঠান। একে কেন্দ্র করেই এ পবিত্র দিনে বৌদ্ধরা উৎসব করে। বৌদ্ধভিক্ষুদের এ নিয়ম হলেও এটি সাংস্কৃতিক, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় জীবনেও প্রযোজ্য।প্রবারণার পর গৌতমবুদ্ধ ভিক্ষুদের বহুজনের হিতের জন্য দিকে দিকে বের হওয়ার আহবান জানান এবং ধর্মপ্রচারের নির্দেশ দেন। তিনি সেসময় বলেছেন, এমন ধর্ম প্রচার না করতে যা মানবের জন্য হিতকর নয়। সাথে সাথে সত্যকে বরণের কথা এবং লোভকে বর্জনের কথা বলেন। সেজন্য বরণ ও বারণের কারণেও এটা প্রবারণা পূর্ণিমা।প্রবারণাকে বৌদ্ধেরা বলে বড় ছাদাং। এর অর্থ বড় উপোস দিবস। উপোস হলো গৃহীদের চবিবশ ঘণ্টার জন্য অষ্টশীল ব্রত পালন করা। এদিন সকালে বৌদ্ধ নরনারী শুচি শুভ্র হবে, পরিস্কার পোশাকে বৌদ্ধ বিহার সমবেত হয়, বুদ্ধকে পূজা দেয়, ভিক্ষুদের আহার্য দেয়, দান দেয়, অষ্টশীল ও পঞ্চশীল গ্রহণ করে, দুপুরে বিহারে বিহারে ভাবনা হয়, বিকেলে আয়োজিত হয় ধর্মসভা। এতে পন্ডিতজন অংশ নেয়, বৌদ্ধধর্মের মূল বাণীগুলি আলোচিত হয়, রাতে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান পরিবেশিত হয়। এদিন ঘরে ঘরে ভাল রান্না হয়, অতিথিদের পায়েস পরিবেশন করা হয়। দিনের সর্বশ্রেষ্ঠ আকর্ষণ হলো- সন্ধ্যায় ফানুস উড়ানো উৎসব। দেশের বিহারে বিহারে অনেক ফানুস উড়ানো হয়। ফানুস উড়ানোর উদ্দেশ্য হলো আকাশে ভাসমান গৌতমের পবিত্র কেশধাতুকে প্রদীপ দিয়ে বন্দনা করা। এসময় জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে নরনারী সমবেত হয় এবং ফানুস উড়ানো উপভোগ করেন। এই তিথিতে বিহার গৃহশীর্ষে আকাশ প্রদীপ জ্বালানো হয়।লক্ষণীয় যে, এদিন সন্ধ্যায় বৌদ্ধেরা পঞ্চশীল গ্রহণ করে এবং বুদ্ধমূর্তির সামনে প্রদীপ ও মোমবাতি জ্বালায়, নবীনেরা প্রবীণদের প্রনাম করে, প্রবীণেরা ছোটদের আশীর্বাদ করে। সমবয়সীরা কোলাকুলি করে, প্রবাসীরা ঘরে ফিরে, বধুরা নাইয়র যায়।এই উৎসব মিলনের উৎসব, দূরকে নিকট এবং পরকে আপন করার উৎসব।

প্রবারণা, বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের অন্যতম একটি ধর্মীয় উৎসব। বছর ঘুরে সেই উৎসবটি আবারো ফিরে এসেছে বৌদ্ধদের মাঝে। সব দুঃখ-ব্যথা ভুলে গতকাল সেই উৎসবে মেতে উঠে বৌদ্ধ সম্প্রদায়।

আষাঢ়ী পূর্ণিমা থেকে আশ্বিনী পূর্ণিমা পর্যন্ত সময়কে বৌদ্ধ পরিভাষায় বর্ষাবাস বলা হয়। ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে বর্ষাবাসের এই তিন মাস বৌদ্ধদের কাছে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।

বুদ্ধের সময়ে ভিক্ষু সংঘ দেব মানবের কল্যাণে ধর্ম প্রচারের জন্য দিকে দিকে ছড়িয়ে পড়তেন, বিচরণ করতেন। তাঁদের এই অভিযান কোন পার্থিব স্বার্থ সিদ্ধির জন্য ছিল না। পরহিত বা কল্যাণ সাধনই ছিল মূল লক্ষ্য। কিন্তু বর্ষা ঋতুতে ভিক্ষু-সংঘের চতুর্দিকে বিচরণ করা দুঃসাধ্য ছিল। যার কারণে কোন এক জায়গায় স্থির থেকে বর্ষাঋতু পালনের জন্য ভিক্ষু সংঘকে কিছু নিয়ম নীতি বেঁধে দেন তথাগত বুদ্ধ। তিন মাসব্যাপী কঠোর বিধি বিধান পালনের মাধ্যমে ভিক্ষু-সংঘের বর্ষাঋতু উদযাপনের বিনয় সমৃদ্ধ এই পদ্ধতিকে বর্ষাবাস বা বর্ষাব্রত বলা হয়ে থাকে । এই বর্ষাব্রতের শেষতম দিনটি হলো আশ্বিনী পূর্ণিমা। যা প্রবারণা পূর্ণিমা হিসেবে অধিক পরিচিত। অর্থাৎ তিনমাস কঠোর নিয়ম-নীতি অনুসরণের পর প্রবারণা পূর্ণিমার দিন ভিক্ষু-সংঘের এই বর্ষাব্রতের সমাপ্তি ঘটে।

আভিধানিক অর্থে, প্রবারণার অর্থ হল বরণ করা আর বারণ করা। অর্থাৎ সকল প্রকার হিংসা, হানাহানি, বিদ্বেষ, সংঘাত বা পাপকর্ম বর্জন বা বারণ করে কুশল কর্ম বা পুণ্যকর্ম সম্পাদন বা বরণ করার শিক্ষা প্রবারণা দিয়ে থাকে।

প্রবারণায় মিশে আছে বুদ্ধের জীবদ্দশায় ঘটে যাওয়া কিছু মধুময় স্মৃতি।

এই দিনে তথাগত গৌতম বুদ্ধ তাবতিংস স্বর্গে তিনমাস ব্যাপী বর্ষা যাপনের পর সাংকাশ্য নগরে অবতরণ করেছিলেন। বুদ্ধের সময় বৈশালী ছিল এক সমৃদ্ধ নগরী। হঠাৎ এই রাজ্যে ত্রি উপদ্রব দেখা দেয়। দুর্ভিক্ষ, মহামারি ও অমনুুষ্যের উপদ্রব বেড়ে যায়। রাজ্যের মানুষের জীবন হয়ে ওঠে দুর্বিষহ। রাজ্যের শান্তি সমৃদ্ধি ফিরিয়ে আনতে এই দিনেই তথাগত বুদ্ধ পাঁচশত ষড়াবিজ্ঞ অর্হৎ শিষ্যসহ গঙ্গা নদী হয়ে বৈশালীতে গমন করেন। বুদ্ধগুণ প্রভাবে বৈশালী ত্রি উপদ্রব মুক্ত হয় এবং রাজ্যবাসীর অন্তহীন দুর্দশা লাঘব হয়।

আনন্দে উদ্বেলিত হয়ে বৈশালীবাসী যথাযোগ্য পূজার মাধ্যমে বুদ্ধকে বিদায় জানালেন।

অন্যদিকে নাগলোকের মহাঋদ্ধিমান (অলৌকিক ক্ষমতাসম্পন্ন) নাগেরা চিন্তা করলেন বুদ্ধপূজার এই দুর্লভ সুযোগ তারা হাত ছাড়া করবেন না। সাথে সাথে নাগলোকের পাঁচশত নাগরাজ বিমানের (জাহাজের) মত পাঁচশত ঋদ্ধিময় ফনা বুদ্ধপ্রমুখ পাঁচশত ভিক্ষুসংঘের মাথার উপর বিস্তার করলেন।

এদিকে, নাগদের পূজা করতে দেখে দেবলোকের দেবতাগণ ও ব্রহ্মলোকের ব্রহ্মরাও বুদ্ধকে পূজা করতে এসেছিলেন। ঐ সন্ধিক্ষণে মানুষ, দেবতা, ব্রহ্মা ও নাগসহ সকলেই শ্বেতছত্র ধারণ করে ধর্মীয় ধ্বজা উড্ডয়ন করে বুদ্ধকে পূজা করেছিলেন। বুদ্ধ সেই পূজা লাভ করে পুনরায় রাজগৃহে প্রত্যাবর্তন করেছিলেন। সেই শুভ ক্ষণটি ছিল আশ্বিণী পূর্ণিমা বা প্রবারণা পূর্ণিমার দিবসে। চিরভাস্বর এই স্মৃতিসম্ভারকে অম্লান করে রাখার জন্য বাংলাদেশের বৌদ্ধরা প্রবারণা দিবসে নিকটবর্তী নদীতে দৃষ্টিনন্দন কারুকার্য খচিত কাগজী জাহাজ ভাসিয়ে প্রবারণা উদযাপন করে থাকে। এছাড়া, প্রবারণার সন্ধ্যার আকাশ ছেয়ে যায় অসংখ্য ফানুসে। উল্লেখ রয়েছে, তাবতিংস স্বর্গে রক্ষিত রয়েছে তথাগত বুদ্ধের অমূল্য ধাতু। বুদ্ধের সেই ধাতুর প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদনের উদ্দেশ্যে বৌদ্ধ সম্প্রদায় আকাশে এই ফানুসগুলো উড়িয়ে থাকে।

২০১২ সালের কথা বাদ দিলে (উল্লেখ্য, গত বছরের ২৯শে সেপ্টেম্বর দিবাগত রাতে কক্সবাজারের রামু উপজেলায় এবং পরের দিন উখিয়া, টেকনাফ ও চট্টগ্রামের পটিয়ায় বৌদ্ধ বিহার ও বসতিতে সাম্প্রদায়িক ন্যক্কারজনক হামলার ঘটনায় অনাড়ম্বর পরিবেশে উদযাপন করা হয় গতবারের প্রবারণা উৎসব। সরকারের কর্তা ব্যক্তিদের অনুরোধে শেষ পর্যন্ত ফানুস উড়ানোর সিদ্ধান্ত নেয়া হলেও উল্লেখযোগ্য সংখ্যক বৌদ্ধ বিহারে ফানুস উড্ডয়ন থেকে বিরত থাকে বৌদ্ধ সম্প্রদায়) প্রতিবারের ন্যায় এবারও দেশব্যাপী আড়ম্বরপূর্ণ পরিবেশ ও ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্যে পালিত হল শুভ প্রবারণা।

‘ফানুসের আলোয় দূর হোক সাম্প্রদায়িকতাসহ সমস্ত অপশক্তির আঁধার’ এই প্রত্যাশা নিয়ে গতকাল প্রবারণা উৎসবে মেতে উঠে দেশের বৌদ্ধ সম্প্রদায়।

দিনটি উদ্‌যাপনে সারাদেশের ন্যায় নগরীর চট্টগ্রাম বৌদ্ধ বিহার, কাতালগঞ্জ নব পণ্ডিত বিহার, চট্টগ্রাম সর্বজনীন বৌদ্ধ বিহার, দেবপাহাড় পূর্ণাচার আন্তর্জাতিক বৌদ্ধ বিহার, মোগলটুলী শাক্যমুনি বিহার, চট্টগ্রাম সংঘরাজ শাসনশ্রী বিহার, চান্দগাঁও সার্বজনীন ও শাক্যমুনি বৌদ্ধ বিহারসহ চট্টগ্রামের সকল বৌদ্ধ বিহারে দিনব্যাপী অভিন্ন কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়। ভোরে বৌদ্ধ বিহারগুলোতে ধর্মীয় পতাকা উত্তোলনের মাধ্যমে প্রবারণা পূর্ণিমা উদযাপনের আনুষ্ঠিকতা শুরু হয়। সকালের সূর্য উঁকি দেওয়ার পর সময় গড়ানোর সাথে সাথে হাজার হাজার বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের পদচারণায় মুখরিত হয়ে ওঠে বৌদ্ধ বিহার প্রাঙ্গণ। সকালে ধর্মপিপাসু উপাসক-উপাসিকার আয়োজনে প্রতিটি বিহারে অনুষ্ঠিত হয় বুদ্ধ পূজা ও মহাসংঘদান অনুষ্ঠান।

বিকেলে ধর্মসভা ও সন্ধ্যায় প্রদীপ প্রজ্বলনের মধ্যদিয়ে চলে বিশ্বশান্তি কামনায় সমবেত প্রার্থনা। এছাড়া, বিহারে বিহারে ধর্মীয় বিভিন্ন অনুষ্ঠানাদির পর উৎসর্গের মাধ্যমে সন্ধ্যায় শুরু হয় ফানুস উত্তোলনের পর্ব। ফানুস উেত্েতালন শুরু হওয়ার সাথে সাথে নগরীর বৌদ্ধ বিহারগুলির প্রাঙ্গণ যেন পরিণত হয় জনসমুদ্রে। কেবল বৌদ্ধ সম্প্রদায় নয়, সব কিছু ভুলে মিলে মিশে একাকার হতে দেখা যায় হিন্দু-বৌদ্ধ-মুসলিমসহ সকল সম্প্রদায়ের মানুষকে। সকলকে উৎফুল্ল চিত্তে উপভোগ করতে দেখা যায় ফানুস উড্ডয়নের দৃশ্য। সন্ধ্যার পর আকাশ ছেয়ে যায় নানা রঙের অসংখ্য ফানুসে।

নগরীর কাতালগঞ্জ নব পন্ডিত বিহারের সম্মুখে মূল সড়কে আয়োজন করা হয় ফানুস উড্ডয়নের। মুগ্ধ দৃষ্টিতে ফানুস উড্ডয়নের দৃশ্য উপভোগ করছিলেন আবাল-বৃদ্ধ-বণিতা। এসময় কথা হয় চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে এমবিএ অধ্যয়নরত শিক্ষার্র্থী শিরুপা বড়ুয়া অদিতার সাথে। মা ও বড় বোনের এক মেয়েকে নিয়ে ধর্মীয় আচারাদি পালনে এখানে এসেছেন তিনি। আকাশে ফানুস উড্ডয়নের উদ্দেশ্য সম্পর্কে জানতে চাইলে অদিতা বলেন, ‘তথাগত বুদ্ধের অমূল্য ধাতু তাবতিংস স্বর্গে রক্ষিত রয়েছে। স্বর্গে রক্ষিত বুদ্ধের এই ধাতুর প্রতি শ্রদ্ধা জানানোর উদ্দেশ্যেই আকাশে (বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের) এই ফানুস উড্ডয়ন।’ একই মত ব্যক্ত করেন নব পন্ডিত বিহারের অধ্যক্ষ উপানন্দ মহাথের। গতবছর ২৯ ও ৩০ সেপ্টেম্বর বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের উপর ঘটে যাওয়া ন্যাক্কারজনক সাম্প্রদায়িক হামলার কথা মন থেকে মুছে না গেলেও এই দু’জনের মতো সকল বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের আশা ‘ফানুসের আলোয় সাম্প্রদায়িকতাসহ সকল অপশক্তির আঁধার কেটে যাবে।’