বোরো ফলন কমাবে নেক ব্লাস্ট, কৃষকের মাথায় হাত

প্রকাশ:| মঙ্গলবার, ১৯ এপ্রিল , ২০১৬ সময় ০৯:০৬ অপরাহ্ণ

ব্লাস্ট
মুহাম্মদ আতিকুর রহমান আতিক ঃ
এবার বোরো আবাদে গাজীপুরে কৃষকেরা ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছেন। নেক ব্লাস্ট রোগের কারণে কৃষকেরা এবার কাঙ্খিত উৎপাদন পাবেন না। অনেকে রোপণ খরচ উঠাতে না পারার আশঙ্কায় ধান মাড়াই না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।

পুরো গাজীপুর জেলার প্রত্যন্ত এলাকায় কৃষকদের সাথে কথা বলে এরকম তথ্য পাওয়া গেছে।

গাজীপুরের শ্রীপুর উপজেলার ফাউগান গ্রামের মোঃ আমান উল্লাহ। তিনি এ বছর সাড়ে আট বিঘা জমি বর্গা নিয়ে ব্রি-২৮ ধানের চাষ করেছেন। আমান উল্লাহ জানান, তিন সপ্তাহ আগে জমির ধান পাকতে শুরু করেছে। ধান গাছের শীষের গোড়ার অংশ হলুদ হয়ে গেছে। হলুদ অংশ ভেতরে ফাঁকা। ধান পাকা রংয়ের কিন্তু ধানে চাল নেই।

আমান উল্লাহ আমাদের গাজীপুর জেলা প্রতিনিধি মুহাম্মদ আতিকুর রহমান আতিককে বলেন, স্থানীয় কৃষি বিভাগের লোকদের সাথে পরামর্শ করে ইউরিয়া ও কীটনাশক দিয়েছি। কোনো লাভ হয়নি। দিনে দিনে জমির সব ধান চিটা হয়ে যাচ্ছে। চোখের সামনে এরকম অবস্থা দেখে সহ্য করতে পারছি না।

গত তিন বছর এ জাতের চাষ করেছি, এরকম ক্ষতি হয়নি। বিঘা প্রতি কমপক্ষে ২০ মণ ধান পেয়েছি। এবার এক মণ ধান পাব না। অথচ বিঘা প্রতি খরচ হয়েছে ১২ হাজার টাকা।

তিনি আরও বলেন, কৃষি বিভাগের লোকজন ধান রোপণের আগে প্রশিক্ষণ দিয়েছেন। তাদের কথামতো সরকারী প্রতিষ্ঠান (বিআইডিসি) থেকে বীজ সংগ্রহ করে বীজতলা তৈরী করেছি, চারা রোপণ করেছি। তারপর এরকম অবস্থায় কীভাবে আর্থিক সঙ্কট কাটিয়ে উঠব ভেবে পাচ্ছিনা। সন্তান সন্ততি নিয়ে কষ্টেসৃষ্টে সংসার চালাই। আরেকজনের জমি বর্গা করেছি। এখন কোথায় যাব, কী করব, কোনো পথ খুঁজে পাচ্ছি না।

একই গ্রামের আলফাজ উদ্দিন আমাদের গাজীপুর জেলা প্রতিনিধি মুহাম্মদ আতিকুর রহমান আতিককে বলেন, তিনি চার বিঘা জমিতে ব্রি-২৮ ধানের জাত আবাদ করেছেন। প্রতি বিঘায় খরচ হয়েছে ১২ হাজার টাকা। অন্যান্য বছর প্রতি বিঘায় ২০ মণ ধান পাওয়া যেত। এবার সব ধান পরিপক্ক হওয়ার আগেই পেকে গেছে। কিন্তু ধানের চাল অপরিপক্ক।

একই গ্রামের মোঃ জালাল উদ্দিন আমাদের গাজীপুর জেলা প্রতিনিধি মুহাম্মদ আতিকুর রহমান আতিককে বলেন, সাড়ে তিন বিঘা জমি চাষ করেছি। শীষের গোড়া পঁচে যাওয়ায় ধান মাড়াইয়ের চিন্তা নেই। গরু নেক ব্লাস্ট আক্রান্ত ধানের খড় খেতে চায় না।

শ্রীপুর পৌরসভার কাজীপাড়া আবাসিক এলাকার আলহাজ্ব কাজী গিয়াস উদ্দিন আমাদের গাজীপুর জেলা প্রতিনিধি মুহাম্মদ আতিকুর রহমান আতিককে বলেন, এবার ৮৫ শতক জমিতে ব্রি-২৮ ধানের আবাদ করেছি। ফলন পেয়েছি মাত্র চার মণ। তার প্রতিবেশী আলাউদ্দিন বলেন, আড়াই বিঘা জমিতে ব্রি-২৮ করেছি, পাঁচ মণ পাই কিনা সন্দেহ রয়েছে।

বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের উদ্ভিদ রোগতত্ত্ব বিভাগের প্রধান এবং প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ডঃ মোঃ আব্দুল লতিফ আমাদের গাজীপুর জেলা প্রতিনিধি মুহাম্মদ আতিকুর রহমান আতিককে জানান, নেক ব্লাস্ট ধানের একটি ছত্রাকজনিত রোগ। ধানের ফুল আসার পর শীষের গোড়ায় রোগটি পরিলক্ষিত হয়। বোরো মৌসুমে হাইব্রিড জাতের মধ্যে এ রোগের ব্যাপক প্রাদুর্ভাব দেখা যায়। এটি আবহাওয়ার ওপর বিশেষভাবে নির্ভরশীল। দিনে গরম রাতে ঠান্ডা, গুড়ি গুড়ি বৃষ্টি এবং ঝড়ো হাওয়া এ রোগের জন্য উপযোগী।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের গাজীপুর জেলা প্রশিক্ষণ কর্মকর্তা মোঃ জসীম উদ্দিন আমাদের গাজীপুর জেলা প্রতিনিধি মুহাম্মদ আতিকুর রহমান আতিককে বলেন, প্রশিক্ষণে কৃষকদের প্রয়োজনীয় সকল বিষয়ে জ্ঞান দেওয়া হয়েছে। এবারের নেক ব্লাস্ট ছাড়ানোর জন্য পরিবেশটা উপযোগী। এ বিষয়ে কৃষকদের পরামর্শ দেওয়া হলেও তারা যথাসময়ে তা আমলে নেয়নি। ধানের বাজারমূল্য কম থাকায় কৃষকেরা রোগ প্রতিরোধে ব্যবস্থা নিতে আগ্রহ হারিয়েছে।

তিনি জানান, ধানের থোর অবস্থায় তাপমাত্রা ১৮ সেন্টিমিটারের নিচে নেমে আসলে রোগের সৃষ্টি হবে। একটানা কয়েক বছর একই জমিতে একই জাতের ধান আবাদ করলে এ রোগ দেখা দিতে পারে। এ রোগের জীবাণু দ্রুত বাতাসের মাধ্যমে ছড়ায়। ফলে কৃষকদেরকে আগাম সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। এজন্য বীজতলার তৈরীর আগে বীজ শোধন করতে হবে।

এ রোগে যা করতে হবে তা হল-ধানের শীষ বের হওয়ার পরই ছত্রাক নাশক ট্রুপার বিঘা প্রতি ৫৪ গ্রাম অথবা নেটিভো বিঘা প্রতি ৩৩ গ্রাম শেষ বিকেলে ৭-১০ দিন পর পর স্প্রে করতে হবে। এ রোগের প্রথম অবস্থায় জমিতে পানি ধরে রাখতে পারলে এর ব্যাপকতা অনেকাংশে হ্রাস পায়।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ পরিচালক মোঃ মাসুদ রেজা আমাদের গাজীপুর জেলা প্রতিনিধি মুহাম্মদ আতিকুর রহমান আতিককে বলেন, কৃষি বিভাগের মাঠ কর্মীদের মাধ্যমে তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে। নেক ব্লাস্ট রোগ প্রতিরোধে কৃষকদের মধ্যে সতর্কবার্তা পৌঁছানো হয়েছে। আমরা ধানের এ রোগ মোকাবিলা করতে পারব।

তিনি জানান, গাজীপুর জেলায় ৫৯ হাজার ২৮৬ হেক্টর জমিতে বোরো আবাদ করা হয়েছে। এর মধ্যে ৭৫ হেক্টর জমির ধান নেক ব্লাস্টে আক্রান্ত। আবাদকৃত জমির মধ্যে ব্রি-২৮ ছাড়াও ব্রি-৫৮ এবং চায়না হীরা ধান রয়েছে।