বৈসাবিকে ঘিরে সেঁজেছে পাহাড়

প্রকাশ:| শনিবার, ১২ এপ্রিল , ২০১৪ সময় ০৮:৫৮ অপরাহ্ণ

বৈসাবি
চাংক্রান উৎসবের মাধ্যমে বান্দরবানে বর্ষবরণ উৎসব শুরু
আলাউদ্দিন শাহরিয়ার বান্দরবান ॥
বৈসাবী উৎসবকে ঘিরে সেঁজেছে পাহাড়ী জেলা বান্দরবান। বাংলা নববর্ষ বরণ এবং বর্ষবিদায় অনুষ্ঠানের মাধ্যমে সকল পাপাচার ও গ্ল¬¬ানী ধুয়ে মুছে নিতে পাহাড়ী বান্দরবানে বসবাসত পাহাড়ী-বাঙ্গালী সম্প্রদায়ের বৈচিত্রময় নানা অনুষ্ঠানমালায় মেতে উঠেছে পাহাড়ী-বাঙ্গালী সম্প্রদায়েরা। আজ শনিবার থেকে পাহাড়ী জেলা বন্দরবানে সাত’দিনব্যাপী বৈসাবী উৎবস শুরু হয়েছে। সাংগ্রাই উৎসব উদযাপন কমিটি, তঞ্চঙ্গ্যা বিষু উদযাপন কমিটি, জেলা প্রশাসন এবং ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী সাংস্কৃতিক ইনস্টিটিউটের নানা আয়োজনে বর্ষবরণ উৎসব চলবে আগামী ১৮ এপ্রিল পর্যন্ত। শনিবার সকালে সদর উপজেলার টংকাবর্তী ইউনিয়নের সাকখয় পাড়ায় পাহাড়ী ম্রো সম্প্রদায়ের চাংক্রান উৎসবের উদ্ধোধন করেন পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রনালয়ের প্রতিমন্ত্রী বীর বাহাদুর। বর্ষবরণের চাংক্রান উৎসব নাচে-গানে অনুষ্ঠান মাতিয়েছেন ম্রো তরুন-তরুনীরা এবং নারী-পুরুষেরা। এছাড়াও ম্রো জনগোষ্ঠীদের লোকনৃত্য, লোকসংগীত, কোমর তাঁতে কাপড় বুনন ও পিঠা তৈরির প্রতিযোগীতার আয়োজনও চলে। অনুষ্ঠানে অন্যান্যদের মধ্যে জেলা প্রশাসক কেএম তারিকুল ইসলাম, জেলা পুলিশ সুপার দেবদাস ভট্টাচার্য, সদর উপজেলা চেয়ারম্যান আব্দুল কুদ্দুছ, পার্বত্য জেলা পরিষদের সদস্য কাঞ্চন জয় তঞ্চঙ্গ্যা’সহ পাহাড়ী ব্যক্তিবর্গরা উপস্থিত ছিলেন।
বর্ষবরণ এবং বর্ষবিদায় উৎসবকে পাহাড়ী জনগোষ্ঠীরা ভিন্নভিন্ন নামে পালন করে। মারমা ভাষায় সাংগ্রাই, ত্রিপুরা ভাষায় বৈসু, তঞ্চঙ্গ্যা ভাষায় বিষু এবং চাকমা ভাষায় বিজু’র সংক্ষেপিত রুপ হচ্ছে বৈসাবী। পাহাড়ী চার সম্প্রদায়ের প্রধান এই সামাজিক উৎসবকে সমষ্টিগত ভাবে বৈসাবি বলা হয়। ধারণা করা হচ্ছে বিষুব সংক্রান্তি শব্দ থেকে ভাষা, সংস্কৃতি ও অঞ্চল ভেদে একই উৎসব বিভিন্ন নামে সংস্কারায়িত হয়েছে। অহোম ভাষায় বিহু, মনিপুরী ভাষায় বিষু, চাকমা ও তঞ্চঙ্গ্যা ভাষায় বিজু এবং ত্রিপুরা ভাষায় বৈসু মূলতঃ মৌলিক একটি শব্দ। যা বিষূব থেকে এসেছে। আবার থাইল্যান্ডের সংক্রান, মায়ানমার এবং বাংলাদেশের মারমা, চাক, ম্রো, খুমী ও রাখাইন সম্প্রদায়ের “সাংগ্রাই” একই শব্দ থেকে উদ্ভুত, যা বাংলা সংক্রান্তিরই ভিন্ন রুপ। অর্থাৎ চৈত্র মাসের ২৯ ও ৩০ তারিখ বছরের শেষ দু’দিন এবং নতুন বছরের প্রথম দিন বৈসাবীকে মারমা সম্প্রদায় সাংগ্রাই, ম্রো সম্প্রদায় চাংক্রান, খেয়াং সম্প্রদায় সাংগ্রান, খুমী সম্প্রদায় সাংগ্রায়, চাকমা সম্প্রদায় ও তঞ্চঙ্গ্যা সম্প্রদায় বিজু এবং ত্রিপুরা সম্প্রদায় বৈসু নামে বৈসাবী উৎসব পালন করে আসছে বহুকাল ধরে।
বিষু উদযাপন কমিটির আয়োজন:
ঘিলা খেলার মাধ্যমে আজ শনিবার (১২ এপ্রিল) বান্দরবানে সদর উপজেলার রেইছায় তঞ্চঙ্গ্যা সম্প্রদায়ের বিষু উৎসব শুরু হচ্ছে। ঘিলা হচ্ছে জঙ্গলি লতায় জন্মানো এক প্রকার বীজ বা গোটা। ঘিলা তঞ্চঙ্গ্যা সম্প্রদায়ের নানা কাজে ব্যবহৃত প্রয়োজনীয় বস্তু। তঞ্চঙ্গ্যার সম্প্রদায়ের বিশ্বাস- ঘিলার লতায় ফুল থেকে বীজ (গোটা) জন্মালেও এর ফুল পবিত্র দেবংশি (স্বর্গীয়) বস্তু হওয়ায় সাধারণ মানুষ ঘিলা ফুলের দেখা পাননা। শুধুমাত্র যারা মহামানব হয়ে জন্ম গ্রহণ করেছেন তারাই একমাত্র ফুলের দেখা পান। ফুলের পরিবর্তে ঘিলা (বীজ গোটা) পবিত্র হিসেবে সংগ্রহ রাখেন তঞ্চঙ্গ্যারা। ঘিলা বাড়িতে রাখলে বজ্রপাত বিপদ এবং অপদেবতা বাড়িতে প্রবেশ করতে পারে না। ঘিলা খেলায় বান্দরবান-রাঙামাটি জেলার ২৭টি গ্রামের তঞ্চঙ্গ্যা তরুন-তরুনীরা চৌদ্দটি দলে বিভক্ত হয়ে ঐতিহ্যবাহী এই খেলায় অংশ নেবেন। এছাড়াও বয়স্ক পূজা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে।
সাংগ্রাই উৎসব উদযাপন কমিটির আয়োজন:
সংস্কৃতির শেখড়েই বৈচিত্রময় ঐতিহ্যে ঐক্য: প্রতিপাদ্য বিষয় নিয়ে রোববার সকাল সাড়ে আটটায় পুরাতন রাজবাড়ি মাঠ থেকে আপন ঐতিহ্যে সাজো: বর্ণাঢ্য সাংগ্রাই র‌্যালী বের করা হবে। র‌্যালীটি শহরের প্রধান প্রধান সড়ক প্রদক্ষিণ করে রাজবাড়ি মাঠে গিয়ে শেষ হবে। র‌্যালীতে মারমা, চাকমা, ত্রিপুরা, তঞ্চঙ্গ্যা, ম্রো, চাক, খেয়াং, খুমী, বম, লুসাই, পাঙ্খোয়া সম্প্রদায়ের তরুন-তরুনী এবং শিশু-কিশোরসহ নারী-পুরুষেরা অংশ নেয়। ঐদিন র‌্যালী শেষে পুরাতন রাজবাড়ি মাঠে শিশু-কিশোরদের চিত্রাংকন প্রতিযোগী এবং বসস্ক পূজা অনুষ্ঠিত হবে। পরেরদিন ১৪ এপ্রিল দুপুর আড়াইটায় উজানী পাড়াস্থ সাঙ্গূ নদী চড়ে অনুষ্ঠিত হবে পবিত্র বুদ্ধমূর্তি ¯œান। রাজগুরু কিয়াং হতে সাড়িবদ্ধভাবে বৌদ্ধ ধর্মীয় গুরুরা (ভান্তেরা) কষ্টি পাথর এবং স্বর্ণের বৌদ্ধ মূর্তি সহকারে পায়ে হেটে নদীর চড়ে গিয়ে সমবেত হবে। সেখানে সম্মলিত প্রার্থণায় বিভিন্ন বয়সের নারী-পুরুষ এবং তরুন-তরুনী, শিশু-কিশোররা অংশ নেয়। একইদিন রাত সাত টায় রাজবাড়ি মাঠে টিআইবি উদ্যোগে প্রামান্য চিত্র প্রদর্শণ এবং রাত সাড়ে দশটায় উজানী পাড়াস্থ বিসিক গলি, মধ্যমপাড়াস্থ ছয়নং গলি, জাদী পাড়া গলিসহ বিভিন্ন মহল্লায় তরুন-তরুনীদের পিঠা তৈরির প্রতিযোগীতা অনুষ্ঠিত হবে। রাতব্যাপী সাড়িবদ্ধ ভাবে বসে তরুন-তরুনীরা হরেক রকমের পিঠা তৈরি পাড়া-প্রতিবেশীদের ঘরে ঘরে বিতরণ করেন।
সাংগ্রাই উৎসবের মূল আকর্ষণ-মৈত্রী পানি বর্ষণ জলকেলী উৎসব অনুষ্ঠিত হবে আগামী ১৫ ও ১৬ এপ্রিল। এদুদিন সদর উপজেলার রেইছা থলি পাড়া, রোয়াংছড়ি উপজেলার হাইস্কুল মাঠ এবং পুরাতন রাজবাড়ি মাঠে তরুন-তরুনীরা মেতে উঠবে জলকেলী বা পানি খেলায়। জলকেলী উৎসবে তরুন-তরুনীরা একে অপরের গায়ে পানি ছিটিয়ে ভাবের আদান-প্রদান করে। জলকেলীর আকর্ষণীয় দিক হচ্ছে- পানি খেলায় বিবাহিত নারী পুরুষরা অংশ নিতে পারে না। জলকেলী উৎসবের মাধ্যমে পাহাড়ী তরুন-তরুনীরা সর্ম্পকের সেতু বন্ধন তৈরি করে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়। ঐদিন সন্ধ্যা সাতটায় পুরাতন রাজবাড়ি মাঠে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে মারমা শিল্পী গোষ্ঠীসহ স্থানীয় শিল্পী গোষ্ঠীরা নাচ-গান পরিবেশন করবে। ঐদিন রাত সাড়ে দশটায় উজানী পাড়াস্থ বিসিক গলি, মধ্যমপাড়াস্থ ছয়নং গলি, জাদী পাড়া গলিসহ বিভিন্ন মহল্লায় তরুন-তরুনীদের পিঠা তৈরির প্রতিযোগীতা অনুষ্ঠিত হবে। এছাড়াও সন্ধ্যায় রাজগুর বৌদ্ধ বিহারসহ (ক্যায়াং) বিভিন্ন বৌদ্ধ বিহারগুলোতে মঙ্গল প্রদ্বীপ প্রজ্জলন অনুষ্ঠান হবে। এসময় হাজার হাজার প্রদ্বীপ প্রজ্জলনের মাধ্যমে পাহাড়ী নারী-পুরুষরা প্রাথর্ণায় দেশ ও জাতীর মঙ্গল কামনা করেন। এরপর ১৯ এপ্রিল বিকালে “মারমা জাতীয়তা,ভাষা,ধর্ম ও সাংস্কৃতিক কর্মকান্ড যথাযযথভাবে পালনের মাধ্যমে মারমা জাতির উন্নয়নে যুব সমাজের ভূমিকা” আলোচনা সভা এবং ধর্ম দেশনা শ্রবণ অনুষ্ঠিত হবে। সাংগ্রাই উৎসব আয়োজক কমিটির সভাপতি অংচ মং মারমা জানান, মারমা প্রধান বান্দরবানে ছয়দিন ব্যাপী সাংগ্রাই উৎসবের আয়োজন করা হয়েছে। মারমা জনগোষ্ঠীরা সাংগ্রাই উৎসব উপলক্ষে দু’দিন ব্যাপী জলখেলী বা পানি খেলা, পিঠা তৈরি, বলিখেলা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানসহ নানা আয়োজন রয়েছে।
জেলা প্রশাসনের আয়োজনে:
পহেলা বৈশাখ সকালে সতটায় স্থানীয় রাজবাড়ি মাঠ থেকে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রনালয়ের প্রতিমন্ত্রী বীর বাহাদুরের নেতৃত্বে বর্ণাঢ্য আনন্দ শোভাযাত্রা বের করা হবে। শোভাযাত্রাটি শহরের প্রধান প্রধান সড়ক প্রদক্ষিণ করে পুনরায় রাজারমাঠে গিয়ে শেষ হবে। সকাল সাড়ে ৭টায় রাজারমাঠস্থ আদর্শ সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয় চত্বরে বাঙ্গালী ঐতিহ্যবাহী খাবার পান্তা, ইলিশ, আলু ভর্তা খাবার পরিবেশন চলবে। সকাল ৮টায় রাজারমাঠে পাহাড়ী-বাঙ্গালী শিশু-কিশোর এবং শিল্পীদের পরিবেশনায় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান চলবে। বিকাল ৩টায় শিশু একাডেমীতে শিশুদেও চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগীতা হবে। বিকাল ৩টায় রাজারমাঠে পুরুষদের বলিখেলা এবং সাড়ে ৩টায় মহিলাদের দাড়িয়াবান্দা খেলা, বালক-বালিকাদের মোড়ক লড়াই এবং ৫টায় র‌্যাফেল ড্র অনুষ্ঠিত হবে।
ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী সাংস্কৃতিক ইনস্টিটিউটের আয়োজন:
সম্প্রীতির বর্ষবরণ শ্লোগানে বান্দরবানে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর আয়োজনে তিনদিন ব্যাপী বর্ষবরণ উৎসব আয়োজন করা হয়েছে। শনিবার টংকাবর্তীর সাকখয় পাড়ায় ম্রো সম্প্রদায়ের চাংক্রান উৎসবের মাধ্যমে শুরু হয়েছে। এছাড়াও মারমা’দের সাংগ্রাই, ত্রিপুরা’দের বৈসু, তঞ্চঙ্গ্যা’দের বিষু এবং চাকমা’দের বিজু উৎসব’কে ঘিরে অনুষ্ঠামালা রয়েছে। এছাড়াও পহেলা বৈশাখেরদিন সন্ধ্যায় ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী সাংস্কৃতিক ইনস্টিটিউট সম্প্রীতির নববর্ষ শিরোনামে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হবে।


আরোও সংবাদ