বিরল প্রজাতির ৫ টি শকুন উদ্ধার

প্রকাশ:| বৃহস্পতিবার, ১ ডিসেম্বর , ২০১৬ সময় ১০:৪৪ অপরাহ্ণ

শাহ্ আলম শাহী,দিনাজপুর থেকেঃ দিনাজপুরের চিরিরবন্দর উপজেলার সাতনালা ইউনিয়নের ঝারুয়ার পাড় এলাকা থেকে বিরল প্রজাতির ৪ টি পাখি উদ্ধার করেছে দিনাজপুর বন-বিভাগ। বৃহস্পতিবার সকাল ১১ টায় পাখি গুলোকে চিরিরবন্দর প্রাণীসম্পদ এর সহাযোগীতায় উদ্ধার করা হয় ।

%e0%a6%a6%e0%a6%bf%e0%a6%a8%e0%a6%be%e0%a6%9c%e0%a6%aa%e0%a7%81%e0%a6%b0%e0%a7%87-%e0%a6%ac%e0%a6%bf%e0%a6%b0%e0%a6%b2-%e0%a6%aa%e0%a7%8d%e0%a6%b0%e0%a6%9c%e0%a6%be%e0%a6%a4%e0%a6%bf%e0%a6%b0

%e0%a6%a6%e0%a6%bf%e0%a6%a8%e0%a6%be%e0%a6%9c%e0%a6%aa%e0%a7%81%e0%a6%b0%e0%a7%87-%e0%a6%ac%e0%a6%bf%e0%a6%b0%e0%a6%b2-%e0%a6%aa%e0%a7%8d%e0%a6%b0%e0%a6%9c%e0%a6%be%e0%a6%a4%e0%a6%bf%e0%a6%b0এর আগে বুধবার বিকালে ফুটবল খেলতে গিয়ে এমন সময় হঠাৎ করে একটি বিরল প্রজাতির পাখি বাশঁঝাড়ে পড়লে সবাই ছুটে গিয়ে পাখিটিকে ধরে রাখে । একই এলাকার বিভিন্ন স্থানে একই রকমের আরো চারটি শকুন পাখি মাটিতে পড়লে এলাকাবাসী ধরে রাখে।
শকুন ( ইংরেজি: Vulture) এক প্রকার পাখি। এটি মৃত প্রাণীর মাংস খেয়ে থাকে। সাধারণত এরা অসুস্থ ও মৃতপ্রায় প্রাণীর চারিদিকে উড়তে থাকে এবং প্রাণীটির মরার জন্য অপেক্ষা করে। পাখিগুলো তীক্ষ্ম দৃষ্টির অধিকারী শিকারি পাখিবিশেষ।
শকুনের গলা, ঘাড় ও মাথায় কোনো পালক থাকে না। প্রশস্ত ডানায় ভর করে আকাশে ওড়ে।লোকচক্ষুর আড়ালে মহীরুহ বলে পরিচিত বট, পাকুড়, অশ্বত্থ, ডুমুর প্রভৃতি বিশালাকার গাছে সাধারণত শকুন বাসা বাঁধে। সাধারণত গুহায়, গাছের কোটরে বা পর্বতের চূড়ায় ১-৩টি সাদা বা ফ্যাকাসে ডিম পাড়ে।
সারা বিশ্বে প্রায় ১৮ প্রজাতির শকুন দেখা যায়, এর মধ্যে পশ্চিম গোলার্ধে ৭ প্রজাতির এবং পূর্ব গোলার্ধে (ইউরোপ, আফ্রিকা ও এশিয়া) ঈগলের সাথে সম্পর্কিত ১১ প্রজাতির শকুন দেখা যায়। দক্ষিণ এশিয়ার দেশ বাংলাদেশে প্রায় ৬ প্রজাতির শকুন রয়েছে, এর মধ্যে ৪ প্রজাতি স্থায়ী আর ২ প্রজাতি পরিযায়ী। শকুন বা বাংলা শকুন ছাড়াও এতে আছে রাজ শকুন, গ্রীফন শকুন বা ইউরেশীয় শকুন হিমালয়ী শকুন, সরুঠোঁট শকুন, কালা শকুন ও ধলা শকুন। তবে শুধু গ্রীফন প্রজাতির শকুনই মাঝে মাঝে দেখা যায় (পরিপ্রেক্ষিত ২০১০)। এসব প্রজাতির শকুনই সারা বিশ্বে বিপদাপন্ন। স্থায়ী প্রজাতির মধ্যে রাজশকুন মহাবিপন্ন ।এটি ডিম থেকে বাচ্চা ফুটানোর জন্যে ঠোঁটে পাথরের টুকরো বহন করে ও ডিমের উপর নিক্ষেপ করে।

উপজেলা প্রাণি সম্পদ কর্মকর্তা ডাঃ মো: আবু সাঈদ জানান, আমরা পাখি গুলো দ্রুত উদ্ধার করে পাখি গুলোকে চিকিৎসা ও স্যালাইন দিয়ে সুস্থ করার চেষ্টা করি। তবে এগুলো শকুন পাখি’র মতো দেখতে। পরে পাখি গুলোকে চিরিরবন্দর বন বিভাগের কাছে হস্তান্তর করি।
চিরিরবন্দর বন-বিভাগ কর্মকর্তা মো: আমজাদ হোসেন জানান, আমারা পাখি ৪টিকে দিনাজপুর বন-বিভাগ ডিভিসনাল অফিসে পাঠানো হয়েছে ।
পাখি নিয়ে কাজ করা পরিবেশবাদি সংগঠন সেতুবন্ধনের কেন্দ্রীয় প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি মো: আলমগীর হোসেন পাখিগুলোকে দেখে জানান, পাখিগলোর শরীরের বিভিন্ন স্থানে আগাতের চিহ্ন রয়েছে। বর্তমানে পাখি গুলো খুবই দুর্বল।

উল্লেখ্য শকুনকে বলা হতো প্রাকৃতিক ঝাড়ুদার। তবে একসময় মানুষ মনে করতো শকুন পাখিটা অশুভ। অনেকে আবার মৃত্যুর প্রতীক হিসেবেও কল্পনা করেন এটিকে। লোকবিশ্বাস অনুযায়ী, শকুন যেহেতু মরা পশুর মাংস খায়, তাই প্রাণীটা সবসময় অন্য পশুর মৃত্যু কামনা করে থাকে। কারো বাড়ির ওপর দিয়ে যদি শকুন উড়ে যায়, তাহলে তা অমঙ্গলের আভাস বলেই ধরে নেয়া হয়। বাংলাদেশের লোকালয়ে একসময় শকুন দেখা যেতো। মৃত প্রাণীর চারপাশ ঘিরে রাখতো এই পাখিটি। প্রধান শকুন ডানা মেলে অনুমতি দিতো মৃত প্রাণী ভক্ষণের। মুহূর্তেই নাই হয়ে যেতো প্রাণীর দেহ। কিন্তু বিশেষজ্ঞদের মতে, শকুন অশুভ তো নয়ই, হিংস্রও নয়। চিল, ঈগল বা বাজপাখির মতো শিকারিও নয়। এটা আমাদের পরিবেশের পরম বন্ধু। মৃত পশু খেয়ে শকুন আমাদের পরিবেশের ভারসাম্য বজায় রাখে। শকুন কখনোই জীবিত মানুষকে আক্রমণ করে না।

দেশে দু’শ’ প্রজাতির পাখি হুমকির মধ্যে রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে শকুনও। ক্রমাগত কমছে শকুনের সংখ্যা। সত্তরের দশক থেকে এ পর্যন্ত শকুন হ্রাসের পরিমাণ ৯৮ শতাংশ। স্বাধীনতা-পূর্বে ৫০ হাজার শকুন থাকলেও বর্তমানে সবমিলিয়ে এ সংখ্যা ৩০০’র নিচে। বাংলাদেশের হাওর অঞ্চলে এখনো শকুন দেখা যায়। ২০০৩ সালে যুক্তরাষ্ট্রের কলেজ অব ভেটেরিনারি মেডিসিন-এর গবেষক ড. লিন্ডসে ওক তার এক গবেষণায় প্রমাণ করেন, গবাদিপশুর চিকিত্সায় ব্যথানাশক ডাইক্লোফেনাক ও কিটোপ্রোফেন জাতীয় ওষুধ ব্যবহার শকুন কমে যাওয়ার অন্যতম কারণ। ওই গবেষণায় তিনি প্রমাণ করেন, ডাইক্লোফেনাক সোডিয়াম (ডাইক্লোফেন) ওষুধ ব্যবহার করা গরু ও ছাগলের মৃতদেহ ভক্ষণ করলে কিডনি নষ্ট হয়ে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে শকুন মারা যায়। ফলে ভারত ও পাকিস্তান ২০০৬ সালে, নেপাল ২০০৯ সালে ডাইক্লোফেনাক সোডিয়াম (ডাইক্লোফেন) বন্ধ করে পরিবর্তে মেলোক্সিম্যাসহ বিকল্প ওষুধ ব্যবহার শুরু করে। বাংলাদেশ সরকার ২০১০ সালে গবাদিপশুর চিকিত্সায় ডাইক্লোফেনাক সোডিয়াম উত্পাদন ও ব্যবহার নিষিদ্ধ করে। তবে কোথাও কোথাও এখনও ব্যবহার হয়।

বিশেষজ্ঞদের মতে, মৃত পশুর মাংস শকুনের কোনো ক্ষতি করে না। কিন্তু ডাইক্লোফেনাক দেয়া হয়েছে এমন মৃত পশুর মাংস খেলে কিডনি নষ্ট হয়ে ২-৩ দিনের মধ্যে শকুনের মৃত্যু ঘটে। এ কারণে গত তিন দশকে উপমহাদেশে ৯৭% শকুন মারা গেছে। এ ছাড়া আবাসস্থল, খাদ্য সংকট তো রয়েছেই। শকুনের জন্য ঘোষিত নিরাপদ এলাকাতেও শকুন নিরাপদে নেই। ধারণা করা হয়, সচেতনতা সৃষ্টি সম্ভব না হলেও পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষাকারী এ প্রাণীটির বাংলাদেশ থেকে চিরতরে হারিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। অথচ কয়েক দশক পূর্বে প্রতিটি গ্রামে শকুনের দেখা মিলত। বর্তমানে পাখিটির দেখা পাওয়া দুষ্কর। দেশে তিন প্রজাতির শকুন স্থায়ীভাবে বসবাস করত। এর মধ্যে এক প্রজাতি ইতোমধ্যে বিলুপ্ত হয়ে গেছে। বিলুপ্তির পথে দেশি প্রজাতির বাংলা শকুনও।

শকুন হারিয়ে যাওয়ার কারণ সম্পর্কে শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে মেডিসিন অ্যান্ড পাবলিক হেলথ বিভাগের চেয়ারম্যান ড. কে. বি. এম. সাইফুল ইসলাম ইত্তেফাককে বলেন, শকুন একটি মৃতজীবী পাখি, যা পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় যথেষ্ট ভূমিকা রাখে। এরা সাধারণত মৃত প্রাণী ভক্ষণ করে পরিবেশকে পরিষ্কার রাখে। কিন্তু ইদানীং বিভিন্ন দেশে গবাদি পশু চিকিত্সায় ব্যবহূত ‘ডাইক্লোফেনাক’ নামের ব্যথানাশক ওষুধের প্রভাবে শকুন মারা যাচ্ছে। এ কারণে ডাইক্লোফেনাক বাংলাদেশসহ ভারত, পাকিস্তান ও নেপালে পশু চিকিত্সায় নিষিদ্ধ ঘোষিত হয়েছে। তারপরও বাংলাদেশে কিছু কিছু ক্ষেত্রে নিষিদ্ধ ঘোষিত ডাইক্লোফেনাক পশু চিকিত্সায় যথেষ্ট ব্যবহারের কারণে শকুন বিলুপ্তির মুখে। কেননা এর পার্শ্ব প্রতিক্রিয়ায় শকুনের কিডনিতে পানি জমে। আর কিছুক্ষণের মধ্যেই মৃত্যু ঘটে।

এই বিশেষজ্ঞ আরো বলেন, ডাইক্লোফেনাকের পরিবর্তে মেলক্সিক্যাম গ্রুপের ওষুধ যদি গবাদি পশুতে ব্যবহার করা হয় তাহলে শকুনের কোনো ক্ষতি হয় না। এ কারণে গবাদি পশুতে ডাইক্লোফেনাকের পরিবর্তে মেলক্সিক্যাম গ্রুপের ওষুধ ব্যবহারের জন্য পরামর্শ দিয়েছেন তিনি।

ইন্টারন্যাশনাল ইউনিয়ন ফর কনজারভেশন অব নেচার (আইইউসিএন)-এর সহযোগী সংগঠন বার্ডসলিস্ট অর্গানাইজেশনের মতে, ফসলের মাঠে কীটনাশক ও সারের মাত্রাতিরিক্ত ব্যবহারের ফলে পানির দূষণ, খাদ্য সংকট, কবিরাজি ওষুধ তৈরিতে শকুনের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের ব্যবহার, বিমান-ট্রেনের সঙ্গে সংঘর্ষ, ঘুড়ির সুতার সঙ্গে জড়িয়ে পড়া, ইউরিক অ্যাসিডের প্রভাবে বিভিন্ন রোগ, বাসস্থানের অভাব প্রভৃতি কারণ জড়িত রয়েছে। শকুনের বাসা বাঁধার স্থানের অভাবের জন্য তাদের বংশবৃদ্ধির হার আশঙ্কাজনকভাবে কমছে।

ড. কে. বি. এম. সাইফুল ইসলাম বলেন, বাসস্থানের অভাব শকুন বিলুপ্ত হওয়ার অনেকগুলো কারণের মধ্যে অন্যতম। শিমুল, ছাতিম, দেবদারুর মতো বড় গাছগুলো এখন আর চোখে পড়ে না সেভাবে। এ গাছগুলো নির্বিচারে ব্যবহার হয়েছে চায়ের পেটি আর দেয়াশলাইয়ের কারখানায়। ইটের ভাটা, তামাক শুকানো আর পিচ গলিয়ে রাস্তা বানানোর জন্য গায়েব হয়ে গেছে রাস্তার পাশের বট, শেওড়া আর গাবের গাছ। সংরক্ষিত বনের ভেতরেও চলে নির্বিচারে বড় গাছ নিধন।

বন বিভাগের তথ্য মতে, সারা পৃথিবীতে ২৩ প্রজাতির শকুন রয়েছে। দেশে এক সময় ৬ প্রজাতির শকুনের দেখা মিললেও এর ৩ প্রজাতি স্থায়ীভাবে বসবাস করত। বাংলা ও সরুঠোঁট প্রজাতির শকুন প্রকৃতির সঙ্গে যুদ্ধ করে টিকে থাকলেও বিলুপ্ত হয়ে গেছে স্থায়ীভাবে বসবাস করা রাজশকুন।

শকুন রক্ষার জন্য বাসস্থান নিশ্চিত করার পাশাপাশি প্রাকৃতিক খাদ্য সরবারহ নিশ্চিত, নিষিদ্ধ ঘোষিত ওষুধের ব্যবহার কমানো, প্রাণী চিকিত্সক প্রয়োজন। এমনকি মৃত প্রাণীকে সঙ্গে সঙ্গে সত্কার না করে শকুনের জন্য ফেলে রাখার জন্যও উত্সাহিত করার মত দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। পাশাপাশি জনসচেতনতা বাড়াতে বাংলাদেশ সরকারের বন বিভাগ, বাংলাদেশ বন্যপ্রাণী ট্রাস্ট ও বাংলাদেশ বার্ডস ক্লাব কাজ করতে পারে।