বিজয় দিবসের পর থেকেই শুরু হয়ে ৫ জানুয়ারি পর্যন্ত টানা অবরোধ কর্মসূচি

প্রকাশ:| সোমবার, ১৬ ডিসেম্বর , ২০১৩ সময় ১২:৫৯ পূর্বাহ্ণ

টানা অবরোধনির্বাচন বাতিলের দাবিতে আগামী ৫ জানুয়ারি ভোটের দিন পর্যন্ত টানা আন্দোলন কর্মসূচির দিকে যাচ্ছে বিএনপি নেতৃত্বাধীন ১৮-দলীয় জোট।নির্বাচনকালীন সরকার ইস্যুতে অবরোধ কর্মসূচির পাশাপাশি জাতিসংঘের মধ্যস্থতায় সংলাপের টেবিলে বসেছিল বিএনপি। রাজপথে প্রতিবাদী নেতাকর্মীদের ওপর চরম দমন-পীড়নের মুখেও শান্তিপূর্ণ সমাধানের পথে হেঁটেছিল ১৮ দল। কিন্তু দু’পক্ষের অনড় অবস্থানের কারণে ভেস্তে গেছে সংলাপ। সরকার দশম জাতীয় নির্বাচনের ঘোষিত তফসিল বাতিল বা স্থগিত না করায় শেষ হয়েছে বিরোধীদলের অংশগ্রহণের সুযোগ। রাজপথের আন্দোলনে প্রতিদিন বাড়ছে নেতাকর্মীদের লাশের সংখ্যা। দীর্ঘ হচ্ছে গুম-নিখোঁজের মিছিল। এমন অবস্থায় নির্দলীয় সরকারের দাবিতে আসছে ১৮দলের সর্বাত্মক আন্দোলনের ঘোষণা। ১৬ই ডিসেম্বর বিজয় দিবসের পর থেকেই শুরু হতে পারে টানা অবরোধ কর্মসূচি। রাজপথের আন্দোলনে খোদ বিরোধী নেতা খালেদা জিয়ার অংশগ্রহণের মাধ্যমে বিরোধী জোট সেটা পরিণত করতে চায় আইন অমান্য তথা অসহযোগ আন্দোলনে। চলমান আন্দোলনকে জোরালো করতে তৃণমূল নেতাদের সঙ্গে সরাসরি কথা বলছেন খালেদা জিয়া। গতকাল বিএনপিসহ ১৮দলীয় জোটের বেশ কয়েকজন কেন্দ্রীয় নেতা এমন তথ্য জানিয়েছেন। গতকাল এক বাণীতে খালেদা জিয়া মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বলীয়ান হয়ে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন দেশবাসীকে। দলের পক্ষে স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান বলেছেন, শান্তিপূর্ণভাবে পরিস্থিতি মোকাবেলা করে জনগণের আন্দোলনকে বজ্রকঠিন শপথের মাধ্যমে কণ্টকাকীর্ণ পথ অতিক্রম করতে হবে। গড়তে হবে গণতান্ত্রিক আন্দোলনে বিজয়ের এক নতুন ইতিহাস। বিরোধী নেতারা জানান, সংলাপের নিষ্ফল সমাপ্তির ব্যাপারে আগেই ধারণা করেছিলেন শীর্ষ নেতারা। তবে শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস ও বিজয় দিবসের কারণে কর্মসূচিতে কয়েকদিন বিরতি দেয়ার সিদ্ধান্ত নেন তারা। ১২ই ডিসেম্বর দেয়া বিবৃতিতে বিরোধী দলীয় নেতা খালেদা জিয়া সংলাপের সম্ভাব্য ব্যর্থতার দিকে ইঙ্গিত করেছেন। বিবৃতিতে তিনি সরকার ‘অস্ত্রের ভাষায় কথা বলেছে’, ‘রাষ্ট্রীয় ও পেশিশক্তির মাধ্যমে ভিন্নমত দমিয়ে দিতে ও প্রাধান্য বিস্তার করতে চাইছে’ মন্তব্য করে দেশবাসীকে দেশবাসীকে শান্তিপূর্ণ আন্দোলনে অংশগ্রহণের আহ্বান জানান। বিরোধী নেতারা বলছেন, আওয়ামী লীগ সরকার কখনও চায়নি বিএনপির নেতৃত্বাধীন ১৮ দল নির্বাচনে অংশ নিক। তাই তারা দেশের মানুষের মনোভাব, রাজনৈতিক দলের আন্দোলন ও আন্তর্জাতিক মহলের আহ্বানকে বিভ্রান্ত করে একতরফা নির্বাচনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। সংলাপে সরকারের অনড় অবস্থানকে হতাশাব্যঞ্জক মন্তব্য করেছেন বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা ড. ওসমান ফারুক। তিনি বলেন, একতরফা নির্বাচনের ট্রেন শেষ পর্যন্ত চূড়ান্ত স্টেশনে নিতে পারবে না সরকার। জনতাই তার গতিরোধ করে দেবে। বিরোধী দলের নতুন কর্মসূচি সম্পর্কে বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান মেজর (অব.) হাফিজউদ্দিন আহমেদ বীরবিক্রম বলেন, এখন রাজপথের আন্দোলন করে নির্বাচন ঠেকানো ছাড়া বিরোধী দলের কোন বিকল্প নেই। বাংলাদেশে অতীতে কোন সমস্যার সমাধানই সংলাপের টেবিলে আসেনি। এখন আর আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের সুযোগ নেই। রাজপথের আন্দোলনেই নির্দলীয় সরকার প্রতিষ্ঠা করতে হবে। যতদিন এ দাবি পূরণ না হবে ততদিন আন্দোলন চলবে এবং তীব্রতর হবে। জোট নেতাদের সঙ্গে আলোচনা করে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া সর্বাত্মক আন্দোলনের কর্মসূচি চূড়ান্ত করবেন। তিনি বলেন, এবার টানা অবরোধ, অসহযোগ ও আইন অমান্য আন্দোলনের কর্মসূচি আসতে পারে। যুবদল সভাপতি সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল বলেন, জাতিসংঘের উদ্যোগকে সম্মান দেখিয়ে সংলাপে সর্বোচ্চ ইতিবাচক মানসিকতা দেখিয়েছে বিএনপি। কিন্তু প্রধানমন্ত্রীর একগুঁয়েমির কারণে সে উদ্যোগ ভেস্তে গেছে। এখন সর্বাত্মক আন্দোলনে যাবে বিএনপির নেতৃত্বাধীন ১৮দল। তিনি বলেন, সারা দেশে আন্দোলন ছড়িয়ে পড়েছে। তৃণমূল কর্মীরা কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের জন্য অপেক্ষায় বসে নেই। চলমান আন্দোলনে সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বিপুল। চলমান আন্দোলনে রীতিমতো যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে নোয়াখালী, লক্ষ্মীপুর, সাতক্ষীরা, সিলেট, ফেনী, হবিগঞ্জ, বগুড়া, রাজশাহী, চট্টগ্রাম, খুলনা, যশোর, নরসিংদী, চাঁদপুর, জামালপুর, কিশোরগঞ্জ, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, গাজীপুর, নাটোর, নওগাঁ, কক্সবাজার ও সুনামগঞ্জ। তিনি বলেন, রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীদের বর্জন এবং মনোনয়ন প্রত্যাহারের মাধ্যমে ঘোষিত তফসিলের অধীনে নির্বাচন আনুষ্ঠানিক প্রহসনে পরিণত হয়েছে। সর্বাত্মক আন্দোলনের মাধ্যমে প্রহসনকে প্রতিহত করা হবে। বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতা আবুল খায়ের ভূঁইয়া এমপি বলেন, সরকার যখন আন্দোলনরত নেতাকর্মীদের রাজপথে গুলি করে হত্যা করছে তখনও বিরোধী দল শান্তির জন্য সংলাপে বসেছে। সংলাপকে ব্যর্থ করে সরকার জনগণের সঙ্গে যুদ্ধ ঘোষণা করেছে। জনগণকে সঙ্গে নিয়েই বিরোধীদলীয় নেতাকর্মীরা এ যুদ্ধ মোকাবিলা করবে। লক্ষ্মীপুর জেলা বিএনপির এ সভাপতি বলেন, আমার জেলায় গত কয়েকদিন ধরে যেভাবে পাখির মতো মানুষ মারা হয়েছে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে তাদের প্রতিটি ফোঁটা রক্তের বদলা নেবে লক্ষ্মীপুরবাসী। এদিকে রাজপথে যখন নেতাকর্মীদের লাশের সংখ্যা বাড়ছে তখন নিষ্ফল সংলাপে বিরোধী দলের অংশগ্রহণ নিয়ে বিক্ষুব্ধ তৃণমূল কর্মী-সমর্থকরা। জেলা নেতাদের মাধ্যমে কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের কাছে সে ক্ষোভের কথা জানাচ্ছেন তারা। কয়েকজন নেতা জানান, পরিস্থিতি এমন দাঁড়িয়েছে চলমান আন্দোলন নেতৃত্ববিহীন গণমানুষের আন্দোলনে রূপ নিতে পারে। তৃণমূল কর্মীদের অভিযোগ যেখানে ঘোষিত তফসিলের মাধ্যমে একতরফা নির্বাচনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিতের সংখ্যা বাড়ছে সেখানে বৈঠকে লিখিত প্রস্তাব দিচ্ছে বিএনপি। সংলাপের মাধ্যমে দাবি পূরণ সম্ভব হলে কেন এতদিন বিলম্ব করেছে বিএনপি। তৃণমূলের এমন মনোভাবের বিষয়টি গত মঙ্গলবার বিএনপি চেয়ারপারসন কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে প্রকাশ করেছেন দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান। সেদিন তিনি বলেন, বর্তমানে গণতান্ত্রিক দুর্বার আন্দোলন শহর-বন্দর-নগর পেরিয়ে গ্রাম-গ্রামান্তরের প্রতিটি জনপদে বিস্তৃতি লাভ করেছে। সময়ের পরিক্রমায় প্রয়োজনের নিরিখে তৃণমূল থেকে যেভাবে আন্দোলনের নেতৃত্বেও বিকাশ ঘটছে তাতে কেন্দ্রীয় নেতাসহ উচ্চ পর্যায়ের সকল নেতাকে গ্রেপ্তার করা হলেও আন্দোলনের এই দাবানল প্রশমিত করার শক্তি বর্তমান স্বৈরশাসকের নেই। নেতারা বলেন, বিএনপির আন্দোলনের শক্তি হচ্ছে সাধারণ মানুষের সমর্থন। আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর দমন-পীড়ন, সরকারি দলের নেতাকর্মীদের হামলা, নেতাকর্মীদের গুম-নিখোঁজ ও গ্রেপ্তার আতঙ্ক কর্মী-সমর্থকদের মধ্যে যেমন প্রভাব ফেলতে পারেনি তেমনি উল্টো অংশগ্রহণ বাড়ছে সাধারণ মানুষের।


আরোও সংবাদ