‘বিগ বিউটিফুল বেলুন’

প্রকাশ:| বৃহস্পতিবার, ৬ জুন , ২০১৩ সময় ০৬:২২ অপরাহ্ণ

প্রস্তাবিত জাতীয় বাজেটকে ‘বিগ বিউটিফুল বেলুন’ আখ্যায়িত করেছে বিরোধী দল। সংসদে অর্থমন্ত্রীর বাজেট প্রস্প্তাব পেশের পর তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় এbnp
আখ্যা দেয় বিরোধী দল। জাতীয় সংসদের মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে তারা বলেন, প্রয়োজনের তুলনায় বাজেট উচ্চাকাঙক্ষী নয়। কিন্তু প্রশাসনিক সামর্থ্যহীনতার কারণে অর্থ সংগ্রহ করে বাজেট বাস্তবায়ন সম্ভব নয়। এটা অর্থনৈতিক উন্নয়নের চেয়ে রাজনৈতিক লক্ষ্য সামনে রেখে ভোটের বাজেট হিসেবে প্রণয়ন করা হয়েছে। সাধারণ মানুষের প্রত্যাশার প্রতিফলন ঘটেনি। প্রস্তাবিত বাজেটের কারণে করের আওতা বাড়বে। সাধারণ মানুষের ওপর করের বোঝা বাড়বে। কালো টাকা সাদা করার শর্তহীন সুযোগ  দেয়ায় সৎ মানুষকে অনৈতিক পথে ঠেলে দেয়া হবে। বিএনপির দুই সিনিয়র এমপি ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ ও এমকে আনোয়ার বাজেটের তাৎক্ষণিক এ প্রতিক্রিয়া জানান।
তিনি বলেন, বাজেট কি শুধুই হিসাবের খাতা? কেবলই আয়-ব্যয়ের হিসাব? নাকি জাতীয় সঙ্কট নিরসন ও মানুষের আশা-আকাঙক্ষার দিকনির্দেশনা। কিন্তু অর্থমন্ত্রীর ৫ ঘণ্টার বাজেট বক্তব্যে আত্মতুষ্টি ছাড়া জনগণের জন্য কিছুই বলেননি। তিনি বলেন, বাজেট অর্থায়নের যে নির্দেশনা দেয়া হয়েছে তার সঙ্গে বাস্তবতার কোন মিল নেই। এ বাজেটে যথারীতি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি কমেছে। কিন্তু জাতীয় পরিসংখ্যান ব্যুরোকে চ্যালেঞ্জ করেছেন অর্থন্ত্রী। অথচ উন্নয়ন সমুন্বয়, বিশ্বব্যাংকসহ বিভিন্ন অর্থনৈতিক পযবেক্ষক প্রতিষ্ঠান বলেছে, প্রবৃদ্ধি কোনভাবেই ৬ এর বেশি হবে না।
এমকে আনোয়ার বলেন, প্রস্তাবিত বাজেটের আকার গত বারের চেয়ে ১৬ ভাগ বেশি। এতে অর্থায়নের জন্য জাতীয় রাজস্ব থেকে ২১ ভাগ উৎস দেখানো হয়েছে। এতে দ্রব্যমূল্য বাড়বে। অনেক মানুষ করের আওতায় আসবে। গরিবের নিত্য-ব্যবহার্য জিনিসপত্রের ওপর কর বাড়বে। অথচ গত ৪ বছরে দ্রব্যমূল্য  বেড়েছে ৫৮ ভাগ। কিন্তু সরকার গুণগান গাইছে দারিদ্র্যবিমোচন হয়েছে বলে। তিনি বলেন, বাজেটে অনুন্নয়ন খাতে ২৫ ভাগ বরাদ্দ বৃদ্ধি করা হয়েছে। বাজেটকে বড় করার জন্য অতীতের রীতি  ভেঙে স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের বাজেটকে জাতীয় বাজেটে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। ‘বৈদেশিক ঋণ কোথা থেকে আসবে তার কোন উৎস দেখানো হয়নি’ মন্তব্য করে তিনি বলেন, বৈদেশিক ঋণ ২১ ভাগ বাড়ানো হয়েছে। অভ্যন্তরীণ ঋণ খাতে সরকার বাজেটে বুদ্ধিবৃত্তিক অসততার আশ্রয় নিয়েছে। অভ্যন্তরীণ ঋণ কমিয়ে দেখানো হয়েছে। গত বাজেটে যেখানে ৫৫০০ কোটি টাকা বেড়েছিল সেখানে এবার কমিয়ে দেখানো হয়েছে। এটা মূলত অনেক বেড়ে যাবে। এতে বেসরকারি শিল্পকলকারখানা নির্মাণ বাধাগ্রস্ত হবে। চাঁদাবাজি বাড়বে। আনোয়ার বলেন, ব্যাংক বহির্ভূত ঋণ ধরা হয়েছে ৮০০০ কোটি টাকা। গত বাজেটে ছিল ৩৯০০ কোটি টাকা। এ হিসাব  কোনভাবেই মিলবে না। এছাড়া সরকার নিজের হাতে জাতীয় সঞ্চয় প্রকল্পকে নিজের হাতে মেরে ফেলেছে। এর ওপর কর বসানো হয়েছে, সুদ কমানো হয়েছে। সেটা উৎস কর হিসাবে কাটা হচ্ছে।
তিনি বলেন, একজন অর্থনীতিবিদ তো বলেছেন, দেশের অর্থনীতির অবস্থা নাকি রানা প্লাজার মতো হয়ে গেছে। অর্থমন্ত্রী ছাড়া কেউ বলছে না অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ৬-এর বেশি হবে। এ বাজেট যদি বাস্তবায়ন করতে হয় তাহলে ব্যাংক থেকে ঋণ নিতে হবে নইলে জনগণের ওপর অধিকতর করারোপ করতে হবে। অন্যথায় অর্থায়নের কোন সুযোগ নেই। সাবেক এ কৃষিমন্ত্রী বলেন, সরকার কৃষি মন্ত্রণালয় নিয়ে অনেক কথা বলছেন। কিন্তু কৃষিখাতে উন্নয়ন-অনুন্নয়ন খাতে বরাদ্দ ১৮ ভাগ কমিয়ে দেয়া হয়েছে। কৃষি খাতে ভর্তুকি সংশোধিত বাজেটের চেয়ে ৩০০০ কোটি টাকা কমানো হয়েছে। বিদ্যুতে ভর্তুকি দেয়া হলেও তা জনগণের কাছ থেকে আদায় করে নেয়া হয়েছে। সাবিকভাবে ভর্তুকি ৮ ভাগ কমিয়ে দেয়া হয়েছে। এ টাকা জনগণের কাছ থেকে তুলে নেয়া হবে।
পদ্মা সেতুতে সরকারের দুর্নীতি চিত্র ও বিশ্বব্যাংকের অবস্থান তুলে ধরে তিনি বলেন, এ সেতু করার নামে অর্থনীতিতে একটি বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির সৃষ্টি করা হয়েছে। এটা দেশের অর্থনীতিকে দীর্ঘদিন  ভোগাবে। রাজনৈতিক জেদ হিসেবে এ সেতু নিয়ে অর্থনীতিতে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি না করে বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে সমঝোতায় ফিরতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, বাংলাদেশের মতো একটি দেশের শুধু অর্থ হলেই সব কিছু সম্ভব নয়। এ রকম একটি বড় প্রকল্পের টেন্ডারে সক্ষম কতটি প্রতিষ্ঠান অংশগ্রহণ করে তা বিবেচ্য বিষয়। আনোয়ার বলেন, সেনাবাহিনীর বাজেট উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ানো হয়েছে। সেনাবাহিনীর আধুনিকায়নের জন্য এটার প্রয়োজন রয়েছে। তবে যাদের বাহুবল নেই, যেমন কৃষি ও সমাজকল্যাণের মতো খাতে বরাদ্দ কমানো হয়েছে।
আনোয়ার বলেন, বাজেটে ভ্যাটের বিস্তৃতি ঘটবে। এতে পরোক্ষভাবে গরিবের বোঝা বোড়াবে। এটা বড় ধরনের সমস্যা হিসাবে দেখা  দেবে। করের বোঝা বাড়বে। এমনকি পদ্মা সেতুতে যে সারচার্জ আরোপ করা হয়েছে তা-ও জনগণের কাছ থেকে তোলা হবে। তিনি বলেন, বিশেষ খাতে থোক বরাদ্দ বাড়ানো হয়েছে। এসব কোথায় যাবে তার উল্লেখ নেই। এসব তারা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করতে পারে। কাজের বিনিময়ে খাদ্যসহ বিভিন্ন প্রকল্পে গড়ে ২৬ শতাংশ অপচয় ও দুর্নীতি হয়। আওয়ামী লীগের ৫ বছরে প্রতি বাজেটেই কালো টাকা সাদা করার সুযোগ রাখার সমালোচনা করে তিনি বলেন, এটা অনৈতিক। এটা সৎ মানুষকে কর দিতে নিরুৎসাহিত করে। এবার মাত্র ১৪০০ কোটি টাকা কর পেয়েছে এ খাতে। কিন্তু এতে শাস্তি দেয়া হয়েছে সাধারণ করদাতাদের। সরকার অনৈতিকতার দিকেই ধাবিত হয়েছে। তিনি বলেন, বিএনপি শাসনামলে ২০০১-০৫ পর্যন্ত কালো টাকা সাদা করার  কোন সুযোগ ছিল না। আগে কালো টাকা নির্দিষ্ট খাতে বিনিয়োগ করার শর্তে সাদা করার সুযোগ দেয়া হতো। কিন্তু এখন কোন শর্ত ছাড়াই এ সুযোগ দেয়া হচ্ছে। তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী, তার মন্ত্রিসভা ও এমপিদের সম্পদের হিসাব দেয়ার কথা ছিল। কিন্তু  সেটা দেয়া হয়নি। এবার কালো টাকা সাদা করতে ব্যবসায়ীদের চেয়ে আওয়ামী লীগের লোকজনের চাপ ছিল বেশি। আসলে তারা কালো টাকা সাদা করে ভবিষ্যতে হিসাব থেকে রক্ষা পাওয়ার সুযোগ করে নিয়েছেন। এমকে আনোয়ার বলেন, অর্থমন্ত্রী ৫ ঘণ্টা দাঁড়িয়ে যে বাজেট বক্তব্য দিয়েছেন এ জন্য তাকে আন্তরিক ধন্যবাদ জানাচ্ছি।
ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ এমপি বলেন, প্রস্তাবিত বাজেটে সাধারণ মানুষের প্রত্যাশার প্রতিফলন ঘটেনি। এটি আসলে এক বিগ বিউটিফুল বেলুন (চোখ ভোলানো বড়সড় ফাঁপা বেলুন)। ব্যারিস্টার মওদুদ বলেন, বুধবার জাতীয় সংসদে একজন মন্ত্রীর অশ্লীল বক্তব্য ও একজন এমপিকে পয়েন্ট অব অর্ডারে কথা বলার সুযোগ না দেয়ায় আমরা প্রতিবাদ জানিয়েছি। ইচ্ছা থাকার পরও আজ আমরা সংসদে যোগ দিতে পারিনি। এ সময় বিরোধীদলীয় ভারপ্রাপ্ত চিফ হুইপ শহীদউদ্দিন  চৌধুরী এ্যানী, বিএনপি দলীয় এমপি জাফরুল ইসলাম চৌধুরী, জয়নাল আবেদিন ভিপি, ব্যারিস্টার মাহবুবউদ্দিন খোকন, মোস্তাফা আলী মুকুল, নাজিমউদ্দিন আহমেদ, সৈয়দা আসিফা আশরাফি পাপিয়া ও রেহেনা আক্তার রানু উপস্থিত ছিলেন।