বাড়ছে শুঁটকি রপ্তানি

প্রকাশ:| মঙ্গলবার, ১৮ নভেম্বর , ২০১৪ সময় ১১:৪৭ অপরাহ্ণ

সিনিয়র করেসপন্ডেন্ট

দেশের শুঁটকি বাজার বন্দর নগরী চট্টগ্রামকে ঘিরেই গড়ে উঠেছে। ভোজন রসিক বাঙালির কাছে অত্যন্ত পছন্দের খাবার শুঁটকি মাছ। দিন দিন বাড়ছে এর চাহিদাও। চট্টগ্রামের নদী ও সাগর উপক’লে কীটনাশক ছাড়াই এখন স্বাস্থ্যসম্মত ও সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক উপায়ে রোদ-বাতাসে শুকিয়ে শুঁটকি প্রক্রিয়াজাতকরণ করা হচ্ছে। এখানকার মুখরোচক শুঁটকি বিদেশে রপ্তানি করে প্রতি মাসে আয় হচ্ছে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা। বিশেষ করে ভারত, মধ্যপ্রাচ্য, হংকং, ভিয়েতনাম, সিঙ্গাপুর, চীন ও তাইওয়ানের মতো দেশেও চট্টগ্রামের শুঁটকির কদর রয়েছে।

জেলা মৎস্য অফিস সূত্রে জানা গেছে, ২০১০-২০১১ অর্থবছরে চট্টগ্রাম থেকে ১হাজার ১শ ৯৯ দশমিক ৭৬৬ মেট্রিক টন বিভিন্ন মাছের শুঁটকি বিদেশে রপ্তানি হয়েছে, যার মূল্য ৩৫ কোটি ৪০ লাখ ১১হাজার ১শ ৪০টাকা। ২০১১-২০১২ অর্থবছরে ১হাজার ৫শ ৬দশমিক ৯১৮ মেট্রিক টন রপ্তানি হয়েছে, যার মূল্য ৩৩ কোটি ৬০ লাখ ৬৭ হাজার ১শ ৩০ টাকা। ২০১২-২০১৩ অর্থবছরে রপ্তানি হয়েছে ১হাজার ৩শ ২৪দশমিক ১৫৩ মেট্রিক টন, যার মূল্য ৩২ কোটি ৬০ লাখ ২২হাজার ৭শ ৬০টাকা। এছাড়া ২০১৩-২০১৪ অর্থবছরে ২হাজার ৯শ ৪২দশমিক ০৬৫ মেট্রিক টন শুঁটকি রপ্তানি করে ৪৬ কোটি ৫০ লাখ ২৫ হাজার ৮শ ৯০ টাকার বৈদেশিক মুদ্রা আয় হয়েছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, অন্যান্য অর্থবছরগুলোর চেয়ে গত অর্থবছরে দ্বিগুণের বেশী শুঁটকি রপ্তানি হয়েছে। এছাড়া ভারতে শুঁটকি রপ্তানি বাড়ছে। এটা অত্যন্ত পজেটিভ দিক। এ ধারাবাহিকতা রক্ষা করতে পারলে দেশের অর্থনীতিতে শুঁটকি শিল্প শুরুত্বপূর্ণ ভ’মিকা রাখতে পারবে।

এছাড়া শুঁটকি এখন অভিজাত পরিবারের খাবার মেন্যুতে যুক্ত হচ্ছে। চট্টগ্রামের চাক্তাই হচ্ছে শুঁটকির প্রধান আড়ত। চাক্তাইয়ে একটি শুঁটকি পট্টিও আছে। এছাড়া রেয়াজউদ্দিন বাজার সহ নগরীর সবকটি বাজারে বিভিন্ন জাতের শুঁটকি পাওয়া যায়। জানা গেছে, বছরের বেশির ভাগ সময় শুঁটকি প্রক্রিয়াজাত করে ব্যবসায়ীরা যেমন লাভবান হন, তেমনি এ কাজ করে শত শত অভাবগ্রস্ত পরিবারের নারী-পুরুষেরাও কর্মসংস্থানের সুযোগ পান।

চট্টগ্রামের কর্ণফুলী নদীর তীরবর্তী ডাঙ্গারচর, চরপাথরঘাটা, চরল্যা, মইজ্যারটেক, জুলধা, ইছানগর, খোয়াজনগর, পটিয়ার শিকলবাহা, কালারপুল, পাইপের গোড়া, চর জব্বার, রাঙ্গাদিয়া, বঙ্গোপসাগর উপক’লের নগরীর সাগরিকা, কাট্টলী, আনোয়ারার রায়পুর, বাঁশখালীর শেখেরখীল, গন্ডামারা, খানখানাবাদ সহ উপক’লের বিভিন্ন স্পটে শুষ্ক মওসুমের শুরুতে এখন শুঁটকি প্রক্রিয়াজাতকরণের ধুম পড়েছে। এসব এলাকায় সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক উপায়ে রোদ ও বাতাসে শুকিয়ে ছুরি, লইট্যা, হাঙ্গর, ফাইস্যা, বাইল্যা, কোরাল, রূপচাঁদা, হাইছচাঁদা, চিংড়ি, লা, তাইল্যা, ফাতারা, পোঁপা, মইল্যা, চৈক্কা, চাপিলাসহ নানা প্রজাতির মাছের শুঁটকি প্রক্রিয়াজাত করা হয়। ক্ষতিকারক কীটনাশক ও ডিটিটি পাউডার ছাড়াই রোদ ও বাতাসে শুকিয়ে তৈরি করা এসব শুঁটকির সুখ্যাতি দেশের গন্ডি ছাড়িয়ে বিদেশেও ছড়িয়ে পড়েছে।

সরেজমিন কর্ণফুলী উপক’লের মইজ্যারটেক এলাকায় গিয়ে দেখা যায় শুঁটকি তৈরির বিভিন্ন কলাকৌশল। শুঁটকি ব্যবসায়ী আবদুল করিম জানান, ১৭ বছর ধরে প্রাকৃতিক উপায়ে বিভিন্ন প্রজাতির শুঁটকি তৈরি করে আসছেন তিনি। প্রতি কেজি শুঁটকি ছুরি ১০০ থেকে ৫০০ টাকা, লইট্যা ২০০ থেকে ৫০০ টাকা, কইস্যা ৫০ থেকে ২৫০ টাকা, চৈইক্যা ১০০ থেকে ৩০০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি করেন বলেও জানান তিনি।

এদিকে প্রতিক’ল আবহাওয়া, মাছের অপ্রতুলতা, নদী-সমুদ্র দূষণ ও সাগরে ডাকাতের উপদ্রবসহ নানা প্রতিবন্ধকতা সত্ত্বেও ব্যবসায়ীরা শুঁটকি যোগান দিয়ে যাচ্ছেন। ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, শুঁটকি সংরক্ষণে সরকারি গুদামের ব্যবস্থা করা গেলে সারা বছরই শুঁটকি সংরক্ষণ করা সম্ভব হবে। ফলে এ শিল্প আরো এগিয়ে যাবে এবং উল্লেখযোগ্য বৈদেশিক মুদ্রা আয়ে সক্ষম হবে।

চট্টগ্রাম জেলা মৎস্য কর্মকর্তা প্রভাতী দেব নিউজচিটাগাং২৪ডটকমকে বলেন, শুঁটকি রপ্তানির মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা দেশে আসছে। এটি একটি সম্ভাবনাময় খাত। বিশ্ববাজারে শুঁটকির চাহিদাও ভালো। এ প্রেক্ষিতে শুঁটকি তৈরীর এলাকাগুলোতে সুষ্ঠু তদারকি করা হচ্ছে ও শুঁটকি তৈরির কাজে নিয়োজিত শ্রমিকদের প্রশিক্ষণ দেয়া হচ্ছে।