গহিরায় সাকার বাড়িতে যা যা ঘটলো…

প্রকাশ:| রবিবার, ২২ নভেম্বর , ২০১৫ সময় ১০:১১ অপরাহ্ণ

স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট, রাউজান থেকে ফিরে


গহিরায় সাকার বাড়ি2চট্টগ্রামে রাউজান উপজেলায় গহিরা ইউনিয়নে পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হয়েছে যুদ্ধাপরাধের দায়ে মৃত্যুদন্ডপ্রাপ্ত সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীকে। রোববার সাড়ে ৯টার দিকে পৌর এলাকার মধ্যগহিরায় গ্রামের বাড়ি ‘বাইতুল বিলালে’র পাশেই সাকাকে দাফন করা হয়। পুলিশ, র‌্যাব ও বিজিবির কঠোর প্রহরায় সম্পন্ন করা হয় এ কার্যক্রম।

গহিরায় সাকার বাড়ি1তার আগে সকাল সোয়া ৯টায় কবরস্থানের পাশের খালি জায়গায় অনুষ্ঠিত হয় জানাজার নামাজ। জানাজায় ইমামতি করেন হেফাজতে ইসলামের সিনিয়র নায়েবে আমির মুহিবুল্লাহ বাবুনগরী।

রোববার সকাল ৭টার দিকে চট্টগ্রামের মীরসরাইয়ে পৌঁছায় সাকার লাশবাহী এ্যাম্বুলেন্স। সামনে পেছনে র‌্যাব ও পুলিশের নিরাপত্তা থাকা এ গাড়ি রাউজান পৌঁছে সকাল ৮টা ২০ মিনিটে। এ সময় রাউজানের গহিরা, ইছাপুর ও হালদা সেতুসহ প্রতিটি স্থান ছিল পুলিশের নিরাপত্তা বেষ্টনির মধ্যে।

সকাল ৮টা ১০ মিনিটে প্রথমে বায়তুল বিলালে প্রবেশ করেন যুদ্ধাপরাধের দায়ে মৃত্যুদন্ডপ্রাপ্ত সাকার বড় ছেলে ফাইয়াজ কাদের চৌধুরী ও তার স্ত্রী দানিয়া খন্দকার। এরপর সকাল সাড়ে ৮টার দিকে বাড়িতে পৌঁছান সাকার স্ত্রী ফরহাত কাদের চৌধুরী, ছেলে হুম্মাম কাদের চৌধুরী, মেয়ে ফারজিন কাদের চৌধুরীসহ পরিবারের অন্যান্য সদস্যরা।

বাড়ির উঠোনে সাকার জানাজা
সাকা’র জানাযা সম্পন্নপৌনে ৯টার দিকে যুদ্ধাপরাধের দায়ে মৃত্যুদন্ডপ্রাপ্ত সাকার লাশ পৌঁছে তার গহিরা ইউনিয়নের বাড়ি বায়তুল বিলালে। সরাসরি লাশ নিয়ে যাওয়া হয় সাকার পিতা ফজলুল কাদের চৌধুরীর ঘরে। এরপর নিয়ে যাওয়া হয় জানাজার জন্য নির্ধারিত স্থানে। এ সময় যুদ্ধাপরাধের দায়ে মৃত্যুদন্ডপ্রাপ্ত সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর স্ত্রী ও সন্তান হুম্মাম কাদের চৌধুরী লাশ গোসল করানোর জন্য পুলিশ কর্মকর্তাদের অনুরোধ করেন।

এ সময় পুলিশের পক্ষ থেকে লাশ গোসল করানো হয়েছে বলে জানানো হয়। এ নিয়ে পরিবারের সদস্যদের সাথে কিছু সময় বাক-বিতন্ডা হয় পুলিশের সাথে। তবে পুলিশী বাঁধার কারণে পরিবারের ইচ্ছায় পুনরায় গোসল করানো সম্ভব হয়নি। সোয়া ৯ টার দিকে অনুষ্ঠিত হয় জানাজার নামাজ। স্বজনরা ছাড়া কেউ যুদ্ধাপরাধের দায়ে মৃত্যুদন্ডপ্রাপ্ত সাকার জানাজায় অংশ নিতে পারেনি। জানাজায় তিন শতাধিক আত্মীয় স্বজন অংশ নেয়। এর পরপরই পারিবারিক কবরস্থানের প্রথম অংশে ছোট ভাই সাইফুদ্দিন কাদেরের পাশে দাফন করা হয় সাকাকে।

গহিরায় সাকার বাড়িএদিকে রাউজানের ইছাপুর থেকে গহিরা ইউনিয়ন মোড় পর্যন্ত এ সময় রাস্তায় দাড়িয়ে থাকতে দেখা যায় হাজার হাজার উৎসুক মানুষকে। জানাজায় অংশ নিতে প্রস্তুতি নিয়ে সাকার বাড়ি থেতে আধা কিলোমিটার দুরে গহিরা কলেজ মাঠ এলাকায় জড়ো হতে থাকে এলাকাবাসী।

এ মাঠে জানাজা আয়োজন করতে পুলিশের অনুমতি চায় সাকার চাচাতো ভাই ফেরদৌস কাদের চৌধুরী। তবে নিরাপত্তার অজুহাত দেখিয়ে অনুমতি দেয়নি পুলিশ প্রশাসন। এ প্রসঙ্গে চট্টগ্রামের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (উত্তর) মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘নিরাপত্তার বিষয়টি চিন্তা করে বাড়ির উঠানেই জানাজার অনুমতি দেওয়া হয়েছে।’

জানাজায় ছিলেন না সাকার দুই ভাই
যুদ্ধাপরাধের দায়ে মৃত্যুদন্ডপ্রাপ্ত সাকার জানাজায় অংশ নেননি তার দুই সহোদর গিয়াস উদ্দিন কাদের চৌধুরী ও জামাল উদ্দিন কাদের চৌধুরী। এছাড়া জানাজায় দেখা যায়নি রাউজানের সংসদ সদস্য ও সাকার চাচাতো ভাই এবিএম ফজলে করিম চৌধুরীকে। তবে ফজলে করিম চৌধুরীর ছেলে এবিএম ফয়েজ কাদের চৌধুরীকে জানাজায় অংশ নিতে দেখা গেছে।

জানাজায় অংশ নেন ফজলে করিমের ছোট ভাই ফেরদৌস কাদের চৌধুরী। সাকার নিকটাত্মীয় ও চট্টগ্রাম নগর আওয়ামী লীগের সভাপতি এবিএম মহিউদ্দিন চৌধুরীও জানাজায় অংশ নেননি।

রাউজান জুড়ে কড়া নিরাপত্তা
গহিরায় সাকার বাড়ি3যুদ্ধাপরাধের দায়ে মৃত্যুদন্ডপ্রাপ্ত সাকার লাশ দাফনকে কেন্দ্র করে শনিবার সন্ধ্যার পর থেকেই রাউজান এলাকায় নিয়ন্ত্রণ নেয় র‌্যাব, এপিবিএন, পুলিশ ও বিজিবি। বিশেষ করে হাটহাজারীর শেষ প্রান্তে রাউজানের শুরু থেকে গহিরা বাজার পর্যন্ত পুলিশ নিয়ন্ত্রন নেয়। শনিবার গভীর রাত হতে সকাল ১০টা পর্যন্ত রাস্তায় কাউকে জড়ো হতে দেওয়া হয়নি। গাড়ি চলাচল ছিল নিয়ন্ত্রিত।

শনিবার রাত থেকে ১০ প্লাটুন পুলিশ ও দুই প্লাটুন বিজিবি মোতায়েন করা হয়। এর বাইরে রোববার সকালে আরও ১০ প্লাটুন পুলিশ ও দুই প্লাটুন বিজিবি মোতায়েন করা হয়েছে। রাউজানের গহিরা বাজার থেকে সাকা চৌধুরীর বাড়ি পর্যন্ত এলাকায় আইন শৃংখলা বাহিনীর এসব সদস্য মোতায়েন করা হয়।সাকা১ৎ

রোববার সকালে গহিরা বাজার থেকে সাকার বাড়ি পর্যন্ত আধা কিলোমিটার সড়কে জনসাধারণের চলাচল নিষিদ্ধ করা হয়। বাড়ির প্রবেশ পথের প্রহরায় ছিল রাউজান উপজেলার সহকারী কমিশনার (ভূমি) দীপক কুমার রায়ের নের্তৃত্বে এক প্লাটুন বিজিবি। এ সময় জনসাধারণের পাশাপাশি সাকার বাড়িতে গণমাধ্যম কর্মীদেরও প্রবেশে বাঁধা দেয় এ নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট।

এ প্রসঙ্গে চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসক মেজবাহ উদ্দিন বলেন, ‘গণমাধ্যম কর্মীদের বাঁধা দেওয়ার প্রশ্নই আসেনা। তাকে ওই এলাকায় বিএনপি-জামায়াত কর্মীদের বিশৃঙ্খলা ঠেকানোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছিল। গণমাধ্যম কর্মীদের প্রবেশে বাঁধা দেওয়া হলে বিষয়টি আমরা খতিয়ে দেখবো।’

হুম্মামসাকা পরিবারের সংবাদ সম্মেলন
যুদ্ধাপরাধের দায়ে মৃত্যুদন্ডপ্রাপ্ত সাকার দাফন কার্যক্রম শেষে ১০টা ৪০ মিনিটে বায়তুল বিলালে সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করে পরিবার। এ সময় সাকার সন্তান হুম্মাম কাদের চৌধুরী ও ছোট ভাই জামাল উদ্দিন কাদের চৌধুরী সাংবাদিকদের সাথে কথা বলেন।

রাষ্ট্রপতির কাছে প্রাণভিক্ষা চাওয়ার বিষয়ে হুম্মাম বলেন, ‘বলা হচ্ছে- বাবা (সাকা চৌধুরী) প্রাণভিক্ষা চেয়েছেন। তাকে মানুষ বাংলার বাঘ হিসেবে চিনে। তিনি কখনো প্রাণভিক্ষা চাইবেন না। আমি যখন বাবার সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিলাম বাবা বলেছেন ‘৬ ফুট ২ ইঞ্চি তোমার বাবা বাঘ, কারও কাছে মাথা নত করে না’।

১০ মিনিটের সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, অবৈধ রায়ে বাবাকে ফাঁসি দেয়া হয়েছে। কিছুক্ষণ আগে আমরা তার দাফন কাজ সম্পন্ন করেছি। আমরা নিজেদেরকে ভাগ্যবান মনে করছি। দেশের এখন এমন পরিস্থিতি অনেক খুন-গুম হচ্ছে। অনেকে আপনজনের মরদেহ খুঁজে পাচ্ছে না। আমরা ভাগ্যবান যে সম্মানের সঙ্গে বাবাকে দাফন করতে পেরেছি। একজন বেকসুর মানুষকে হত্যা করা হয়েছে। দেশের মানুষ অবশ্যই একদিন ন্যায়বিচারের ডাক দিবে।’

সংবাদ সম্মেলনে সাকার ছোট ভাই জামাল উদ্দিন কাদের চৌধুরী বলেন, ‘প্রাণভিক্ষার বিষয়ে তিনি ( যুদ্ধাপরাধের দায়ে মৃত্যুদন্ডপ্রাপ্ত সাকা) আমাকে বলেছেন- ‘আমি যদি মার্সি (ক্ষমা) চাই, তবে মহান রাব্বুল আলামিনের কাছে চাইবো, কোন বান্দার কাছে নয়।’