বান্দরবানের থানছিতে দুর্গমাঞ্চলে খাদ্য সংকটে পাহাড়ীরা

প্রকাশ:| মঙ্গলবার, ২৪ মে , ২০১৬ সময় ১০:২৭ অপরাহ্ণ

খাদ্য সংকট
আলাউদ্দিন শাহরিয়ার, বান্দরবান ॥
বান্দরবানের থানছি উপজেলার দূর্গমাঞ্চলে পাহাড়ী গ্রামগুলোতে খাদ্য সংকটে অনাহারে দিন কাটাচ্ছে পাহাড়ীরা। বৈরী আবহাওয়ার কারণে বিগত বছরে পাহাড়ে চাষ করা জুমের ফসল ঘরে তুলতে না পারায় এবছর মার্চ মাস থেকে খাদ্য সংকট দেখা দিয়েছে অনেকগুলো গ্রামে। খাদ্য সংকটের বিষয়টি স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা প্রশাসন’কে জানালে জরুরী ভিত্তিতে প্রশাসনের পক্ষ থেকে দুর্গত গ্রামগুলোর ৮শত পরিবারের জন্য ১৬ মে:টন চাল বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। তবে বরাদ্দকৃত খাদ্য চাহিদার তুলনায় খুবই কম বলে জানিয়েছেন স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা।
স্থানীয়দের দাবী, জেলার থানছি উপজেলার রেমাক্রী এবং তীন্দু ইউনিয়নের দুর্গমাঞ্চলে যোগী চন্দ্র পাড়া, বড়মদক ভীতর পাড়া, হৈয়োক খুমী পাড়া’সহ আশপাশের পাহাড়ী গ্রামগুলোতে খাদ্য সংকট দেখা দিয়েছে। ইউনিয়ন দুটির প্রায় আড়াই হাজার মানুষ চরমভাবে খাদ্য সংকটে ভূগছেন। এ গ্রামগুলোতে বসবাসরত পাহাড়ীদের জীবিকা নির্বাহের একমাত্র মাধ্যম হচ্ছে জুম চাষ। জুম চাষের মাধ্যমেই তারা সারাবছরের ধান’সহ অন্যান্য ফসল সংগ্রহ করে রেখে আদিকাল থেকে জীবিকা নির্বাহ করে আসছেন। কিন্তু গতবছর প্রাকৃতিক দূর্যোগের কারণে জুমের ফসল ঘরে তোলতে পারেনি পাহাড়ীরা। ফলে বর্তমান পরিস্থিতিতে পাহাড়ীদের প্রতিটি পরিবারের সদস্যদের চোখে মুখে ক্ষুধার জ্বালা। অনেক পরিবার আছে যারা দু’বেলাই ভাতের দেখা পান না। অনেকে আবার একবেলা ভাত অন্যবেলা আলু বা মিষ্টি কুমড়া খেয়ে জীবন বাচাচ্ছেন। এলাকাগুলোর অধিকাংশ মানুষই পাহাড়ী আলু, লতা-কলা গাছের ভিতরের সাদা অংশ খেয়ে বেচে আছেন। খাদ্য সংকট ২
হৈয়োক খুমী পাড়া কারকারী (গ্রাম প্রধান) হৈয়ুক খুমি বলেন, তার পাড়ায় বসবাসরত ২৭টি পরিবারের মধ্যে কারো ঘরে একমুটো খাবারের চাল নেই। প্রতিটি পরিবারেই চরম খাদ্য সংকটে রয়েছে। চালের অভাবে পাহাড়ের আলু, লতা-পাতা খেয়ে জীবন যাপন করছে পাহাড়ীরা। এ অঞ্চলের পাহাড়ীদের জীবন বাচাতে সরকারের কাছে দ্রুত খাদ্য সরবরাহ করার দাবী জানাচ্ছি।
যোগীচন্দ্র পাড়ার বাসিন্দার হাতিরাম ত্রিপুরা বলেন, খাবার মওজুদ না থাকায় পরিবারের ছয়জন সদস্য ৩দিন ধরে না খেয়ে ছিলেন। চতুর্থদিনে বিজিবি’র নির্মানাধীন একটি ক্যাম্পে কাজ করে ১০ কেজি চাল পেয়েছেন। সেগুলো দিয়ে কয়েকদিন ধরে পরিবারের খাবার চলছে। শেষ হলে আবার কি খাবো, সেটি জানিনা।
বড়মদক ভীতর পাড়ার বাসিন্দা পচাত্তোর বয়সের বৃদ্ধ ক্যমং উ মারমা ও ষাটোর্ধো স্ত্রী মাম্যাচিং দম্পতি বলেন, তারা স্বামী-স্ত্রী দুজনের সঙ্গে মেয়ের ঘরের দুই নাতনিও রয়েছে পরিবারে। পাহাড়ে কোথাও কোনো কাজের সুযোগ নেই। চিকিৎসার অভাবে একটি চোখ নষ্ট হওয়ার উপক্রম হয়েছে। তার সঙ্গে খাবারের অভাব। ঘরে খাবারের চাল না থাকায় স্ত্রী মাম্যাচিং জঙ্গলে গিয়ে পাহাড়ী আলু সংগ্রহ করে এনেছেন। সেগুলো সিদ্ধ করে খেয়ে কোনো রকম প্রাণে বেচে আছেন তারা।
রেমাক্রী ইউনিয়নের ওর্য়াড মেম্বার মাংচং ¤্রাে বলেন, সাঙ্গু সংরক্ষিত বনাঞ্চল এলাকাগুলোতে কয়েকটি পাহাড়ী গ্রাম রয়েছে। পাড়াগুলোর বাসিন্দাদের কারোর কাছেই খাবারের চাল মওজুদ নেই। জুমের ধান শেষ হয়ে যাওয়ায় পাড়াগুলোতে খাদ্য সংকট দেখা দিয়েছে। পাহাড়ীরা ভাত খেতে না পেয়ে হিং¯্র হয়ে উঠেছে। খাবারের কষ্টে মানুষজনেরা জঙ্গলী আলু, মিষ্টি কুমড়া আর কলা গাছ খেয়ে বেঁচে থাকার সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছেন।
রেমাক্রী ইউনিয়নের নবনির্বাচিত চেয়ারম্যান মুই শৈ থুই মারমা রনি জানান, রেমাক্রী ইউনিয়নে ৯৫ শতাংশ মানুষই জুম চাষের উপর নির্ভরশীল। গতবছর জুমধান ভাল না হওয়ায় খাদ্য সংকটে পড়েছে ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ পরিবার। যোগাযোগ ব্যবস্থার অভাবে বাজার জাতের সুযোগ না থাকায় বাগানের ফল গাছেই পচে নষ্ট যায়। ফলে জুমের ধানের উপর নির্ভরশীল পাহাড়ীরা। জুমের ধান হলে মুখে হাসি থাকে পাহাড়ীদের। আর জুম চাষে ধানের ফলন না হলে দুর্ভিক্ষের ছাপ লেগে থাকে সকলের চোখে মুখে।
এ জনপ্রতিনিধির দাবী, বর্ষায় আগাামী তিনমাস সারাদেশের সঙ্গে দুর্গম অর্ধশতাধিক গ্রামের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবে। তখন এ খাদ্য সংকট আরো প্রকট আকার ধারণ করবে। ইতিমধ্যে অনেকগুলো পরিবার সংকটাপন্ন । সেকারণে সংকট নিরসনে দ্রুত সরকারী-বেসরকারী ভাবে খাদ্য শষ্য বরাদ্দ দেয়া প্রয়োজন।
তিন্দু ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মংপ্রু অং মারমা জানান, তীন্দ্র ইউনিয়নের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন গ্রামগুলোতে প্রায় ৬/৭শত পরিবার এখন খাদ্য সংকটে ভুগছে। সরকারের আমলে নানামুখী উন্নয়ন হলেও যোগাযোগ ব্যবস্থা না থাকায় দূর্গমাঞ্চলে বসবাসরত পাহাড়ীদের আত্মসামাজিক কোনো পরিবর্তন ঘটেনি। চালের অভাবে পাহাড়ীগুলোর মানুষরা না খেয়ে আছেন। দ্রুত খাদ্য না পেলে খাদ্যের অভাবে মানুষ মারা যাবার শঙ্কা রয়েছে।
এ বিষয়ে জেলা প্রশাসক দিলীপ কুমার বনিক জানান, থানছি উপজেলার দুর্গত এলাকাগুলোতে ১৬ মে:টন খাদ্যশষ্য বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। জরুরী ভিত্তিতে ৮শত পরিবারকে ২০ কেজি করে চাল দেয়া হবে। নদীতে পানি না থাকায় খাদ্য পৌছাতে কিছুটা সময় লাগছে। তবে কয়েকদিনের বৃষ্টিতে নদীর পানি স্বাভাবিক হওয়ায় খাদ্য সংকটের গ্রামগুলোতে খাদ্য পৌছে দেয়া হচ্ছে। তিনি জানান, এ সংকট মোকাবেলার জন্য সরকারীভাবে পর্যাপ্ত পরিমান খাদ্যশষ্য রয়েছে। যেহেতু এই খাদ্য সংকট অক্টোবর পর্যন্ত থাকবে তাই বিষয়টি সরকারের উর্ধ্বতন মহলে জানানো হয়েছে। যাতে ভিজিএফ’র মাধ্যমে ব্যবস্থা করা যায়।


আরোও সংবাদ