বাড্ডায় তিন খুন: বাউল সুমনের অনুসারীদের দিকে আঙুল

প্রকাশ:| শুক্রবার, ১৪ আগস্ট , ২০১৫ সময় ০৯:২৭ অপরাহ্ণ

রাজধানীর বাড্ডায় দুর্বৃত্তদের গুলিতে আওয়ামী লীগ ও স্বেচ্ছাসেবক লীগ নেতাসহ তিনজনের মৃত্যুর পেছনে ওই এলাকার যুব লীগের সাবেক যুগ্ম-সম্পাদক মৃত বাউল সুমনের স্ত্রী ও তার অনুসারীদের হাত রয়েছে বলে ধারণা নিহত মাহবুবুর রহমান গামার স্বজনের। তবে নিহতদের মধ্যে দু’জন যেহেতু রাজনীতির সঙ্গে সরাসরি জড়িত ছিলেন তাই হত্যাকাণ্ড রাজনৈতিক কারণে হতে পারে বলেও অনুমান পুলিশের। এছাড়া কোরবানি ঈদে পশুর হাটের ইজারা নিয়ে দ্বন্দ্বের কারণেও এই খুন হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
11
প্রাথমিকভাবে পুলিশের ধারণা, হত্যাকারীদের টার্গেট ছিল মাহবুবুর রহমান গামা। গামার সঙ্গে থাকার কারণেই বাকিদের টার্গেটে পরিণত হন।

স্থানীয় ব্যবসায়ী জাকির হোসেন ঘটনার বিষয়ে বিশেষ কিছু জানাতে না পারলেও হত্যাকাণ্ডে ৪/৫ জন অংশ নেন বলে তার কথা থেকে জানা যায়। জাকির বাংলামেইলকে বলেন, ৪/৫ জন যুবক এসে গুলি করতে শুরু করলে তারা সেখান থেকে পালিয়ে যান।

বৃহস্পতিবারের ঘটনায় নিহত গামা বাদে বাকি দুজন হলেন- শামসু মোল্লা ও ফিরোজ আহমেদ মানিক। শামসু মোল্লা ঢাকার ৬ নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের যুগ্ম-সম্পাদক। আর ফিরোজ আহমেদ মানিক উত্তর বাড্ডার এইচ এ এফ নামের একটি বেসরকারি হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ছিলেন।

গামা ও শাসমু সরাসরি রাজনীতির সঙ্গে জড়িত থাকায় হত্যাকাণ্ডের পেছনে রাজনৈতিক কারণ থাকার সম্ভাবনাও হিসেবে রাখছে পুলিশ। এক্ষেত্রে ক্ষমতাসীন দলের নেতা-কর্মীদের আধিপত্য বিস্তারের বিষয়টিই মূলত গুরুত্ব পাচ্ছে।

এছাড়া ওই এলাকার গার্মেন্টসের ঝুট ব্যবসার নিয়ন্ত্রণের বিষয়টি মাথায় রাখতে হচ্ছে পুলিশকে। পুলিশ বলছে, গার্মেন্টসের ঝুট ব্যবসার ক্ষেত্রে বাড্ডা এলাকায় নতুন মেরুকরণ হয়েছে। আর এ নিয়ে ক্ষমতাসীন দলের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতা-কর্মীরা ক্ষুব্ধ ছিলেন। এটা হত্যার অন্যতম কারণ হতে পারে।

এর বাইরে আসন্ন ঈদ-উল-আযহায় কোরবানির পশুর হাটের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে ক্ষমতাসীন দলের নেতা-কর্মীদের মধ্যে দন্দ্ব ছিল।

হত্যাকাণ্ডের পর প্রাথমিক তদন্তে নেমে এসব বিভিন্ন বিষয় নিয়ে পুলিশকে ভাবতে হলেও তারা এখনই নিশ্চিত করে বলতে নারাজ ঠিক কী কারণে এ ঘটনা ঘটেছে। ঘটনার পর প্রায় ২৪ ঘণ্টা পেরিয়ে গেলেও এখনো কাউকে শনাক্ত বা গ্রেপ্তারও করা সম্ভব হয়নি। শুক্রবার সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্তও এ ঘটনায় কোনো মামলা হয়নি বলে জানিয়েছেন বাড্ডা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আব্দুল জলিল।

স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের সঙ্গে কথা বলেও ঝুট ব্যবসা সংক্রান্ত বিরোধের বিষয়টির আভাস পাওয়া যায়; যদিও তারা সরাসরি মুখ খুলতে নারাজ। তারা বলছেন, ঝুট ব্যবসার নতুন মেরুকরণে বাড্ডা এলাকার গার্মেন্টস ব্যবসা এবং সাব-কন্ট্রাটিংয়ের নিয়ন্ত্রণ নেন ঢাকা মহানগর উত্তরের স্বেচ্ছাসেবক লীগের সহ-সাংস্কৃতিক সম্পাদক মাহবুবুর রহমান গামা। এ নিয়ে ক্ষমতাসীন দলের স্থানীয় অনেক নেতা-কর্মী ক্ষুব্ধ ছিলেন।

badda-clashবাড্ডা থানা পুলিশের একটি সূত্র এবং ক্ষমতাসীন দলের স্থানীয় নেতা-কর্মীরা জানিয়েছেন, এর আগে ওই এলাকার গার্মেন্টসের ঝুট ব্যবসা এবং সাব-কন্ট্রাটিং নিয়ন্ত্রণ করতেন বাড্ডা থানা যুব লীগের যুগ্ম-সম্পাদক বাউল সুমন। কিছুদিন আগে তার মৃত্যু হলে ওই ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ নেন গামা। আর এ নিয়ে বাউল সুমনের অনুসারীরা গামার উপর ক্ষুব্ধ ছিলেন। ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ যাওয়ার পাশাপাশি তাদের আধিপত্যও কমে আসছিল।

নিহত গামার মামাতো ভাই আমিনুর রহমান রিপনের দাবি, এই হত্যাকাণ্ডের পেছনে বাউল সুমনের স্ত্রী ও তার অনুসারীদের হাত রয়েছে।

ঘটনাকে রাজনৈতিক বলেই মনে করছেন নিহত শামসুদ্দিন মোল্লার ছোট ভাই জাহিদ মোল্লা। তিনি বলেন, ‘আমার ভাইয়ের অপরাধ তিনি রাজনীতি করতেন। এ কারণেই তাকে হত্যা করা হয়েছে।’

হত্যাকাণ্ডের কারণ কী হতে পারে- বাড্ডার থানার ওসি আব্দুল জলিলের কাছে এ বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে বাংলামেইলকে তিনি বলেন, ‘এখনো খুনের কারণ বা কারা হত্যা করেছে এই বিষয়ে নিশ্চিত করে কিছু বলতে পারছি না। তবে ধারণা করছি, আধিপত্য বিস্তার ও গার্মেন্টসের ঝুট ব্যবসা নিয়ে দ্বন্দ্বের জেরে এই হত্যাকাণ্ড ঘটতে পারে।’

ঢাকা মহানগর পুলিশের গুলশান বিভাগের উপ-কমিশনার মোস্তাক আহমেদ বলেন, ‘এটি একটি পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড। এর পেছনের কারণ এবং কারা জড়িত পুলিশ তা অনুসন্ধান করছে।’

ঢাকা মহানগর উত্তরের আওয়ামী স্বেচ্ছাসেবক লীগের সাধারণ সম্পাদক ফরিদুর রহমান খান ইরান বাংলামেইলকে বলেন, ‘কী কারণে, কারা গামার মতো ভালো মানুষকে হত্যা করলো বুঝতে পারছি না। সে খুবই শান্ত ছিল, কারো সঙ্গে দ্বন্দ্ব আছে বলে কখনোই শুনিনি।’

হত্যাকাণ্ড
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন, বৃহস্পতিবার রাত পৌনে ৯টার দিকে বাড্ডার আদর্শনগর পানির পাম্প এলাকায় ১৫ আগস্টের কর্মসূচি নিয়ে স্থানীয় ক্ষমতাসীন দলের কয়েকজন নেতা-কর্মীর মধ্যে আলোচনা চলছিল। ওই সময় কয়েকজন যুবক অতর্কিতে গুলি করে পালিয়ে যান।

এতে মাহবুবুর রহমান গামা, শামসুদ্দিন মোল্লা, ফিরোজ আহমেদ মানিক ছাড়াও স্থানীয় একটি রিকশা গ্যারেজ ম্যানেজার আব্দুস সালাম গুলিবিদ্ধ হন। এর পরপরই গামা, শামসুদ্দিন ও ফিরোজকে ইউনাইটেড হাসপাতালে এবং সালামকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেয়া হয়। হাসপাতালে নেয়ার পরপরই শামসু ও মানিককে মৃত ঘোষণা করেন চিকিৎসকরা। শুক্রবার সকালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান গামা।