বাজল তোমার আলোর বেণু

প্রকাশ:| বৃহস্পতিবার, ১৫ অক্টোবর , ২০১৫ সময় ১১:৩৯ অপরাহ্ণ

 

কেয়া মুখোপাধ্যায়কী সেই অমোঘ জাদু যা একটি অনুষ্ঠানকে একটি জাতির সেরা উৎসবের সঙ্গে  এক করে  দিতে পারে! সে জাদু কি লুকিয়ে থাকে বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রর পাঠে নাকি পঙ্কজকুমার মল্লিকের সুরে, নাকি বাণীকুমারের রচনায়? কোন আকর্ষণী ক্ষমতায় বাঙালির অতিবড় মহানায়ককেও হার মানতে হল একটি রেডিও অনুষ্ঠানের জনপ্রিয়তার কাছে? বাঙালি সে উত্তর খুঁজতে যায় না, শুধু পিতৃপক্ষের শেষ দিনের ভোর হলে শিরশিরে হাওয়ায় একরাশ নস্ট্যালজিয়া আজও ছড়িয়ে পড়ে তার ঘরদুয়ারে৷  লিখছেন  কেয়া মুখোপাধ্যায়

শিউলির গন্ধ-মাখা হিমে-ভেজা শরতকালের এক ভোরে পিতৃপক্ষের অবসানে দেবীপক্ষের সূচনা। রেডিয়ো থেকে ভেসে আসে এক অমোঘ উচ্চারণ:

“আজ দেবীপক্ষের প্রাক-প্রত্যুষে জ্যোতির্ম্ময়ী জগন্মাতা মহাশক্তির শুভ আগমন-বার্ত্তা আকাশ-বাতাসে বিঘোষিত। মহাদেবীর পুণ্য স্তবনমন্ত্রে মানবলোকে জাগরিত হোক ভূমানন্দের অপূর্ব্ব প্রেরণা। আজ শারদ গগনে-গগনে দেবী ঊষা ঘোষণা করছেন মহাশক্তির শুভ আবির্ভাব-ক্ষণ।”

বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের সংস্কৃত স্তোত্রপাঠে দেবীর আগমন-বার্তা। তিনবার শঙ্খধ্বনি। তারপর সুরের মূর্চ্ছণা- “বাজল তোমার আলোর বেণু”। সুপ্রীতি ঘোষের মায়াময় গায়কী।

এভাবেই প্রতি মহালয়ার ভোরে রেডিয়োতে নতুন করে আসে ‘মহিষাসুরমর্দিনী’। আকাশবাণী কলকাতার মহালয়ার বিশেষ প্রভাতী অনুষ্ঠান। যতই থাকুক টেলিভিশনের অনুষ্ঠান, যতই থাকুক দৃশ্য মাধ্যমের আকর্ষণ, টিভির মহালয়ার চেয়ে আকাশবাণীর এই অনুষ্ঠান আজও অনেক বেশি জনপ্রিয়।

কী সেই আশ্চর্য রসায়ন ‘মহিষাসুরমর্দিনী’-র? তিনজন মানুষ মহিষাসুরমর্দিনী’-র প্রাণ, এর তিনটি স্তম্ভ। রচনা ও প্রবর্তনা- বাণীকুমার। সঙ্গীত-সর্জন- পঙ্কজ কুমার মল্লিক। গ্রন্থনা ও স্তোত্রপাঠ- বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্র। কেমন করে এর সৃষ্টি, খুঁজতে খুঁজতে একটু পিছিয়ে যাওয়া যাক।

rADIO১৯২৭ সাল। বোম্বাই-এর (এখন মুম্বই) ইন্ডিয়ান ব্রডকাস্টিং কোম্পানি নামে বোম্বের (এখন মুম্বই) এক বেসরকারি সংস্থা ডালহৌসির ১নং গার্স্টিন প্লেসের একটি ভাড়া বাড়িতে চালু করল রেডিয়ো স্টেশন। নাম হল ‘অল ইন্ডিয়া রেডিয়ো’। অধিকর্তা স্টেপলটন সাহেব। ভারতীয় অনুষ্ঠানের দায়িত্বে ছিলেন ক্ল্যারিনেট বাদক নৃপেন্দ্রকৃষ্ণ মজুমদার আর প্রখ্যাত সঙ্গীতজ্ঞ রাইচাঁদ বড়াল। সে সময়ে হাতে-গোণা কিছু অভিজাত পরিবারেরই শুধু শোভা পেত রেডিয়ো। ১৯৩৬-এ এই রেডিয়ো স্টেশনের নাম হল ‘অল ইন্ডিয়া রেডিয়ো’, আরও পরে ১৯৫৭ সালে ‘আকাশবাণী।’ ১৯২৮ সালে রাইটার স্টাফ আর্টিস্ট হয়ে রেডিয়ো স্টেশনে চাকরি নিলেন বৈদ্যনাথ ভট্টাচার্য। প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে ইংরাজি অনার্সে ফার্স্ট ক্লাস আর সংস্কৃতে ‘কাব্যসরস্বতী’ উপাধি পাওয়া  বৈদ্যনাথ রেডিয়োতে যোগ দিয়ে নতুন নাম নিলেন ‘বাণীকুমার’। বহুমুখী সৃজনশীল প্রতিভা তাঁর। এই বাণীকুমারেরই পরিকল্পনা আর লেখনীতে সৃষ্টি হল কালজয়ী সঙ্গীতালেখ্য ‘মহিষাসুরমর্দিনী’।

পরে, গ্রন্থ হিসেবে প্রকাশের সময় মহিষাসুরমর্দিনী প্রসঙ্গে বাণীকুমার লিখেছেন:

“মহিষাসুরমর্দিনী” আমার প্রথম যৌবনের রচনা। কিন্তু মূল রূপটির বিশেষ পরিবর্তন না ঘটলেও এই গ্রন্থের বর্তমান রূপ বহুতর তথ্য ভাবগর্ভ বিষয় এবং বেদ-পুরাণাদি-বিধৃত শ্লোকাবলী সংযোজনায় সমলংকৃত। প্রকৃতপক্ষে এই গ্রন্থ মার্কন্ডেয় সপ্তশতী চন্ডীর সংক্ষিপ্তসার বললেও অত্যুক্তি হয় না, তদুপরি এর মধ্যে আছে মহাশক্তি-সম্বন্ধে বৈদিক ও তান্ত্রিক তত্ত্বের ব্যঞ্জনা, এবং এর অন্তরে নিহিত রয়েছে শাশ্বত ভারতের মর্মকথা। ……”

পঙ্কজ কুমার মল্লিক ছিলেন বাণীকুমারের বিশিষ্ট বন্ধু। তিনিই দায়িত্ব নিলেন সঙ্গীতালেখ্যটির সুর-সৃজনের। ভাষ্যপাঠের দায়িত্বে বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্র। সুর-সংযোজনাতে তাঁকে সাহায্য করেছিলেন আরো দুই দিকপাল- পণ্ডিত হরিশচন্দ্র আর রাইচাঁদ বড়াল।  ওজস্বী কন্ঠের সুললিত স্তোত্রপাঠে অনবদ্য বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্র। একক ও সমবেত সঙ্গীতে অংশ নিয়েছিলেন পঙ্কজ কুমার মল্লিক‚ বিমলভূষণ‚ শ্যামল মিত্র‚ দ্বিজেন মুখোপাধ্যায়‚ তরুণ বন্দ্যোপাধ্যায়‚ মানবেন্দ্র মুখোপাধ্যায়‚ অরুণকৃষ্ণ বসু‚ ধীরেন বসু‚ রবীন মুখোপাধ্যায়, সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়, আরতি মুখোপাধ্যায় , উৎপলা সেন্‚ প্রতিমা বন্দ্যোপাধ্যায়, সুপ্রীতি ঘোষ‚ ইলা বসু‚ সুমিত্রা সেন‚ কৃষ্ণা দাশগুপ্ত‚ অসীমা ভট্টাচার্য, শিপ্রা বসু।


শোনা যায়, উত্তমকুমার নিজে ভাষ্যে অংশ নেবার দায়িত্ব নিতে চাননি। তিনি বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের কাছে গিয়ে নিজের অস্বস্তি আর অযোগ্যতার কথা বলেছিলেন। তাঁকে আশ্বস্ত করে উৎসাহ দিয়েছিলেন বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্র। বীরেন্দ্রকৃষ্ণের অভিমান ছিল আকাশবাণী কর্তৃপক্ষের ওপর।


‘মহিষাসুরমর্দিনী’র সুরারোপে অসামান্য পঙ্কজ কুমার মল্লিক। প্রথম গানের আধার মালকোষ। শান্ত, প্রচ্ছন্ন আনন্দের মেজাজ এই গানে। এই গানটির সুরের রেশেই বীরেন্দ্রকৃষ্ণের ভাষ্যপাঠের সূচনা। মধ্যসপ্তক থেকে ক্রমশ তারসপ্তকে কন্ঠ বিস্তৃত তাঁর। কিন্তু অসামান্য পরিমিতিবোধ তাঁর। সম্পূর্ণ সুরে ও ছন্দে থেকেও কখনও গান গেয়ে ওঠার উপক্রম করেননি। আবার ভক্তিগদগদ চিত্তেও পাঠ করেননি। তাঁর কন্ঠের দৃপ্ত মেদহীন, ঋজুতা ভাষ্যকে আলাদা চরিত্র দিয়েছে। শুধু সুরে অবস্থিত থেকে সমগ্র সঙ্গীতের আবহের সঙ্গে সাযুজ্য রক্ষা করে গেছেন।  তাঁর ভাষ্যপাঠ ‘মহিষাসুরমর্দিনী’র প্রাণ। আর অন্তরালের সুনিপুণ পরিচালক বাণীকুমার।

নতুন সুরের দেশে নিয়ে গেলেন পঙ্কজকুমার মল্লিক

১৩৩৯ বঙ্গাব্দের (১৯৩২) আশ্বিনে প্রথম প্রচারিত হয়েছিল অনুষ্ঠানটি। তখন নাম দেওয়া হয়েছিল ‘শারদ-বন্দনা’। দু’বছর পরে, ১৩৪১ বঙ্গাব্দে, ১৯৩৪-এর ৮ই অক্টোবর প্রথম মহালয়ার সকালে ছ’টা থেকে সাড়ে সাতটা পর্যন্ত প্রচারিত হল অনুষ্ঠান। যেটুকু জানা যায়, প্রথম প্রচারের পরই ‘শারদ বন্দনা’ খুব ভালো লেগেছিল শ্রোতাদের। সমস্যা হল ১৯৩৪-এ প্রথমবার মহালয়ার ভোরে সম্প্রচারের পর। কিছু রক্ষণশীল মানুষ, ধর্মকে যাঁরা চিরদিন বিভিন্ন আচার অনুষ্ঠানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ করে রাখতে চান, তীব্র আপত্তি জানালেন তাঁরা। বললেন, এক অব্রাহ্মণ ব্যক্তির কন্ঠে কেন চণ্ডীপাঠ শুনতে হবে? প্রতিবাদ করলেন বাণীকুমার। স্পষ্ট বলে দিলেন, গ্রন্থনা ও চণ্ডীপাঠ বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্র করলে তবেই অনুষ্ঠান সম্প্রচার হবে, নচেৎ নয়। আরও একটি আপত্তি ছিল। মহালয়ার সকালে পিতৃপুরুষের তর্পণের আগেই কেন চণ্ডীপাঠ? এটা মাথায় রেখেই ১৯৩৫ ও ১৯৩৬ সালে অনুষ্ঠানটি প্রচারিত হয়েছিল ষষ্ঠীর ভোরে। কিন্তু বাণীকুমারের সিদ্ধান্ত মেনে, ১৯৩৭ সাল থেকেই আবারও মহালয়ার ভোরেই সম্প্রচারিত হয় ‘মহিষাসুরমর্দিনী।

সে সময় আগের দিনই শিল্পীরা এসে পড়তেন রেডিয়ো স্টেশনে। টেপরেকর্ডিং করা অনুষ্ঠান চালু হয়নি তখনও। আকাশবাণীর সব অনুষ্ঠানই লাইভ। অনেক পরে পুরো অনুষ্ঠানটি রেকর্ড করে রেখে সম্প্রচারের ব্যবস্থা হয়। ‘মহিষাসুরমর্দিনী’তে যাঁরা অংশ নিতেন তাঁরা সকলেই মহড়া দিতে আসতেন ক’দিন ধরে। মহড়ার অবসরে চলত চা-পানের বিরতি, নানা রঙ্গরসিকতা, গল্প।


ধর্মকে যাঁরা চিরদিন বিভিন্ন আচার অনুষ্ঠানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ করে রাখতে চান, তীব্র আপত্তি জানালেন তাঁরা। বললেন, এক অব্রাহ্মণ ব্যক্তির কন্ঠে কেন চণ্ডীপাঠ শুনতে হবে? প্রতিবাদ করলেন বাণীকুমার। স্পষ্ট বলে দিলেন, গ্রন্থনা ও চণ্ডীপাঠ বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্র করলে তবেই অনুষ্ঠান সম্প্রচার হবে, নচেৎ নয়।


প্রথম কয়েকবার ভাষ্য অংশ পাঠ করা হত স্বাভাবিক কথ্যভঙ্গিতে। সুরে নয়। একবার মহড়ায় বীরেন্দ্রকৃষ্ণ তাঁর নিজস্ব বাচনভঙ্গিতে চণ্ডীপাঠ করছিলেন সুরেলা কণ্ঠে। করতে করতে হঠাৎই কি মনে হল, রসিকতার ছলে বাংলা ভাষ্যটিও স্তোত্রের সুরের মত করে বলতে শুরু করলেন। বাকিরা নড়ে-চড়ে বসলেন। মুখে মৃদু হাসি। বাণীকুমার বসেছিলেন রেকর্ডিং কনসোলে। দ্রুত বেরিয়ে এসে বললেন,

“আরে আরে থামলে কেন? বেশ তো হচ্ছিল! ওই ভাবেই হোক না।”

বীরেন্দ্রকৃষ্ণ হেসে বললেন,

“আরে না না একটু মজা করছিলাম!”

কিন্তু বাণীকুমার গভীর আগ্রহ নিয়ে বললেন,

“মোটেই না! দারুণ হচ্ছিল! ওইভাবেই আবার করো তো।”

বীরেন্দ্রকৃষ্ণ আবার শুরু করলেন। এবার সুরে ভাষ্যপাঠ- “দেবী প্রসন্ন হলেন…”

আর ওকটি কাজও না করলে তিনি ইতিহাসপুরুষ-বাণীকুমার

মাত্র একবারই মহালয়ার ভোরে ‘মহিষাসুরমর্দিনী’র সম্প্রচার বন্ধ হয়েছিল। ১৯৭৬ সাল। দেশে তখন জরুরী অবস্থা।  আকাশবাণীর কর্তৃপক্ষ ঠিক করলেন চিরাচরিত ‘মহিষাসুরমর্দিনী’-র পরিবর্তে অন্য কিছু করা যাক। ভাষ্যে উত্তমকুমারকে রাখা হোক। মিটিং হল। সেই মিটিং-এ  বাদ পড়লেন বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্র। বাদ পঙ্কজ কুমার মল্লিক-ও। এর কিছুদিন আগেই, দীর্ঘ সাতচল্লিশ বছর আকাশবাণীর ‘সঙ্গীত শিক্ষার আসর’ পরিচালনা করার পর সেই দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে তাঁকে। এই নতুন উদ্যোগ তাঁদের অগোচরেই শুরু হয়েছিল। বাণীকুমারকে অবশ্য এসব দেখতে হয়নি। ১৯৭৪ সালেই প্রয়াত হয়েছেন তিনি। নতুন স্ক্রিপ্ট লিখলেন বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয়ের সংস্কৃতের বিভাগীয় প্রধান ডঃ গোবিন্দগোপাল মুখোপাধ্যায়। গানে বিশিষ্ট স্বনামধন্য শিল্পীরা। ১৯৭৬-এর ২৩শে সেপ্টেম্বর মহালয়ার ভোরে ‘মহিষাসুরমর্দিনী’র বদলে হল সম্প্রচার হল সেই বিকল্প অনুষ্ঠানের- ‘দুর্গে ‘দুর্গতিহারিণীম্’। এবং চূড়ান্ত ফ্লপ।

উত্তমকুমার আর হেমন্ত মুখোপাধ্যায়- আপামর বাঙালির প্রিয় এক সোনালি জুটি। কত মনের মত ছবি, মনে রাখার মত গান দু’জনে মিলে! কিন্তু অন্তত সেই একবার, বাঙালির প্রাণের আবেগের ঝড়ের মুখে হেরে গিয়েছিল এই জুটি। হারিয়েছিলেন বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্র। হারিয়েছিলেন অন্তরালে থাকা পঙ্কজ কুমার মল্লিক আর বাণীকুমার। সেই ১৯৭৬-এ। ওজস্বী কন্ঠের বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের পরিবর্তে ভাষ্যে উত্তমকুমার, ছন্দা সেন প্রমুখ। সঙ্গীত পরিচালনায় হেমন্ত মুখোপাধ্যায়। একক সঙ্গীতে কে নেই? হেমন্ত মুখোপাধ্যায়, মান্না দে, লতা মঙ্গেশকর, আশা ভোঁসলে, মানবেন্দ্র মুখোপাধ্যায়, সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়, দ্বিজেন মুখোপাধ্যায়, প্রতিমা বন্দ্যোপাধ্যায়, নির্মলা মিশ্র, আরতি মুখোপাধ্যায়, পিন্টু ভট্টাচার্য-সহ আরও নানা নামী-দামী শিল্পী। ‘তবু ভরিল না চিত্ত’। বহু প্রত্যাশিত ‘মহিষাসুরমর্দিনী’  শুনতে না পেরে ক্ষুব্ধ হয়ে পড়লেন মানুষ। সকালবেলায় রেডিয়ো স্টেশনের গেটে অগুন্তি লোক।  ভাঙচুরের উপক্রম। কেন বন্ধ হল মহিষাসুরমর্দিনী, তার জবাবদিহি চাই। পত্র-পত্রিকায় সমালোচনার ঝড়। শেষে সে বছর ষষ্ঠীর সকালে ‘মহিষাসুরমর্দিনী’ শুনিয়ে শান্ত করা হল জনরোষ।

শোনা যায়, উত্তমকুমার নিজে ভাষ্যে অংশ নেবার দায়িত্ব নিতে চাননি। তিনি বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের কাছে গিয়ে নিজের অস্বস্তি আর অযোগ্যতার কথা বলেছিলেন। তাঁকে আশ্বস্ত করে উৎসাহ দিয়েছিলেন বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্র। বীরেন্দ্রকৃষ্ণের অভিমান ছিল আকাশবাণী কর্তৃপক্ষের ওপর।

Birendra_Krishna_Bhadra_(1905-1991)

ভোর হওয়ার আগে রাত্রিবেলাতেই বেতারকেন্দ্রে চলে আসতেন বীরেন্দ্রকৃষ্ণ। ‘মহিষাসুরমর্দিনী’-র শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত উপস্থিত থেকে তারপরে বাড়ি যেতেন। রেকর্ডেড অনুষ্ঠান চালু হলেও এ অভ্যাস তিনি চালিয়ে গেছেন বরাবর। কিন্তু ১৯৭৬ সালের পর থেকে তিনি আর কখনও মহালয়ার আগের রাত্রিবেলা আকাশবাণী যাননি। অভিমান করে বলেছিলেন, “ওরা একবার আমায় জানালোও না। আমি কি নতুন কিছুকে কোনও দিন বাধা দিয়েছি?” আশ্চর্যের কথা, যখন শুনলেন, মানুষের চাহিদাকে মর্যাদা দিতে আবার সম্প্রচার হবে, তখন অভিমান, ক্ষোভ সব ভুলে আবার কাজে নেমে পড়েছিলেন।

মহিষাসুরমর্দিনী’ অনুষ্ঠানটি রচনা ও সম্প্রচারের পরিকল্পনা করে বাণীকুমার যে আসাধারণ কাজটি করেছিলেন রেডিয়োর সেইসময়ের স্টেশন ডিরেক্টর দিলীপকুমার সেনগুপ্ত সে প্রসঙ্গে বলেছিলেন,

“বাণীকুমার যদি আর কোনো কাজ নাও করতেন, তাহলেও শুধু ‘মহিষাসুরমর্দিনী’র জন্যই মানুষ তাকে মনে রাখত। …… শাজাহান যেমন তাজমহল গড়েছিলেন, যা পৃথিবীর অষ্টম আশ্চর্যের একটা হয়ে আছে, আমাদের বাণীদা হাওয়ায় তাজমহল গড়ে গেলেন, যা মানুষের কাছে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে।”

এ যে কত বড় সত্যি- বাংলার অনেকগুলি প্রজন্ম তা অন্তর দিয়ে জানে। এখনও মহিষাসুরমর্দিনী ছাড়া বাঙালির দেবীপক্ষের আগমনী গান অসম্পূর্ণ। বাণীকুমারের লেখা ‘বাজলো তোমার আলোর বেণু’-র সুর সুপ্রীতি ঘোষের কন্ঠে ইথারতরঙ্গে ছড়িয়ে পড়তেই মনে হয় পুজো এসে গেল! হোয়াটসঅ্যাপ, ইউটিউব, ফেসবুক, টুইটারের জগতের বাইরে এই একটা দিনে রেডিয়োর মনোপলি। নস্ট্যালজিক প্রৌঢ়দের কাছে তো বটেই, জেন ওয়াই-এর কাছেও কি! সারা বছরের দুয়োরাণী রেডিয়োর খোঁজ পড়ে ঠিক মহালয়ার আগে। আলমারির মাথা থেকে যত্ন করে নামানো। ঝেড়ে-মুছে রাখা। নতুন ব্যাটারি লাগিয়ে চালিয়ে দেখা। ইউটিউবে বা সিডি-তে থাকলেই বা! ভোরের নরম আলো ফোটার আগের হাল্কা ঠাণ্ডার আমেজ-মাখা শরতের ভোরে আকাশবাণীর সম্প্রচারে বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের উদাত্ত কন্ঠ আর চিরকালের প্রিয় অসামান্য কিছু গানের যুগলবন্দীর উত্তেজনা, হঠাৎ কোনোবার ভোরের অ্যালার্মের বিশ্বাসঘাতকতায় আশেপাশের বাড়ি থেকে ভেসে আসা চণ্ডীপাঠে ঘুম ভাঙার পর ‘ইস, শুরুটা শোনা হল না’-র আক্ষেপ- এই সব কিছু নিয়ে মহালয়ার ছবি বোধহয় আজও অমলিন। এ ছবি চিরকালীন।

(তথ্যঋণ:  ‘শতবর্ষে বাণীকুমার:  স্মরণে ও বরণে’ ) >>bengali.kolkata24x7.com/