বাঘ কেন কমছে?

প্রকাশ:| মঙ্গলবার, ২৮ জুলাই , ২০১৫ সময় ১০:১৫ অপরাহ্ণ

পাভেল পার্থ::
দিনে দিনে বাঘ নিখোঁজ হয়ে যাচ্ছে। শুধু বৃহত্তম বাদাবন নয়, গোটা দুনিয়া থেকেই। বলা হয়ে থাকে, ১৯১৩ সালের দিকে গোটা দুনিয়ায় প্রায় ১ লাখ বাঘ ছিল। ২০১৩ সালে এসে দাঁড়িয়েছে ৩ হাজার ২৭৪ এবং ২০১৪ সালে ৩ হাজার। বাংলাদেশে বাঘের সংখ্যা ও সম্পর্ক নিয়ে বনজীবী ও নানা এজেন্সির ভেতর তথ্যগত ফারাক আছে। ২০০৪ সালে জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচি ও বন বিভাগ যৌথ জরিপে বাঘের সংখ্যা সুন্দরবনে দেখানো হয় ৪৪০। ২০০৬ সালে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় ও জিওলজিক্যাল সোসাইটি অব লন্ডনের জরিপে দেখা যায়, সুন্দরবনে বাঘ আছে ২০০। ২০১৫ সালে বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে সমাপ্ত জরিপে সুন্দরবনের বাঘের সংখ্যা দেখানো হয়েছে ১০৬। বাঘের এই অস্তিত্ব বছর বছর কমলেও সুন্দরবন ঘিরে এবং সুন্দরবনজুড়ে করপোরেট যন্ত্রণাগুলো কিন্তু দশাসই হয়ে উঠছে। সুন্দরবনে শেল কোম্পানিকে খননের অনুমোদন দেয়া হয়েছে। সুন্দরবনের ভেতর দিয়ে বিপজ্জনক নৌপথ চালু আছে। সুন্দরবনের পাশে রামপাল তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র হচ্ছে। সুন্দরবনের আশপাশে লাগাতার বাণিজ্যিক চিংড়ি ঘের গড়ে তোলা হচ্ছে। বন বিভাগ, প্রশাসন, রাজনৈতিক খবরদারি সব কিছুর সামনেই চলছে বিচারহীন বাঘ বাণিজ্য। সুন্দরবনের আশপাশে শুরু হয়েছে প্রশ্নহীন পর্যটন বাণিজ্য। লাগামহীনভাবে জোয়ারভাটার জমিতে গড়ে উঠছে নিত্যনতুন স্থাপনা। পাশাপাশি সুন্দরবনের ঐতিহাসিকতাকে বিবেচনা না করে, একের পর এক উন্নয়ন প্রকল্প জাপটে ধরছে মুমূর্ষু অরণ্যের কলিজা। সুন্দরবন তড়পাচ্ছে, এমন একটি তড়পানো বনে শুধু বাঘ কেন যে কোনো প্রাণেরই টিকে থাকা মুশকিল। বাঘ তো কমবেই, এভাবেই। বছরের পর বছর নানা কিসিমের বাঘ জরিপ হয়, সেখানে বেশ কিছু নির্দেশনাও থাকে। কিন্তু তারপরও একটি সার্বভৌম রাষ্ট্র, রাষ্ট্রের এজেন্সি কেন সেসব নির্দেশনা মানতে পারে না। বলা হচ্ছে, বাঘের টিকে থাকার সবচেয়ে বড় সমস্যা বিচরণস্থল, খাদ্যের জোগান, মানুষের উপদ্রব আর চোরা শিকার। যদি তাই হয় তবে এসব নিয়ে কেন জোরদার প্রশ্ন ওঠে না? রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশ কি এসব নিয়ে সত্যিকার অর্থে প্রশ্ন তুলতে চায়? এমনকি বিশ্বব্যাংক কি কখনোই বাঘ চায়? কারণ বাঘ হত্যায় রাষ্ট্র ও বহুজাতিক বাজারের অবস্থান এবং মনস্তত্ত্ব এক ও অভিন্ন। এটি নয়া উদারবাদী প্রক্রিয়া। এ প্রক্রিয়া বাঘ, বন, বন বিভাগ ও বনজীবী চায় না। চায় একতরফা বাণিজ্যের বাহাদুরি। তারাই বাঘ হত্যা করে বাঘের বাজার টিকিয়ে রাখছে। তারাই সুন্দরবনে বিদ্যুৎ প্রকল্প কি বহুজাতিক খননের জন্য উন্মত্ত হয়ে আছে। তাহলে শুধু শুধু বছর বছর বাঘের সংখ্যা জরিপ করে এক-আধ দিন লোক দেখানো মায়াকান্না কেঁদে লাভ কী? এতে কোনোভাবেই বাঘের প্রতি মায়া বা দরদ জন্মায় না।

সুন্দরবনে বাঘের সঙ্গে বনজীবী মানুষের, মানুষের সঙ্গে বাঘের, বাঘের সঙ্গে বনবিবির, বনের সঙ্গে বন বিভাগের তৈরি হয়েছে এক জটিল বহুমাত্রিক ঐতিহাসিক সম্পর্ক। কিন্তু অধিকাংশ উন্নয়ন খবরদারি কি জরিপ প্রকল্প এই সম্পর্ককে বিবেচনা করে না। যেমন ‘বাংলাদেশ টাইগার অ্যাকশন প্লান ২০০৯-২০১৭’ বাঘ ও বনজীবীর সম্পর্ককে ‘বাঘ-মানুষ দ্বন্দ্ব বা সংঘর্ষ’ হিসেবেই দেখছে। যদিও বাদাবনের বনজীবীরা বাঘের সঙ্গে বা মানুষের সঙ্গে বাঘের এ সম্পর্ককে কখনোই ‘দ্বন্দ্ব বা সংঘর্ষ’ হিসেবে পাঠ করেন না। বনভূমি লুটপাট ও কৃষি জমিকে চিংড়ি ঘের বানানোর মাধ্যমে বাঘ ও বনজীবীর খাদ্যভা-ার নিশ্চিহ্ন করে এবং বাস্তু সংস্থান উলটেপালটে দিয়ে সুন্দরবনের খাদ্যহীন বাঘ-বনজীবীর সাম্প্রতিক আচরণকে কোনোভাবেই ‘সংঘর্ষ’ হিসেবে প্রচার করে ঐতিহাসিক সত্যকে ঢেকে ফেলা যাবে না। বিষয়টি বোঝার জন্য সুন্দরবনে সংঘটিত বাঘ ও বনজীবী মৃত্যুর বছর কয়েক আগের ঘটনা টেনে আনছি। সুন্দরবন পশ্চিম বন বিভাগের সাতক্ষীরা রেঞ্জের সূত্র অনুযায়ী, জুলাই ২০০০ থেকে জুন ২০০৯ পর্যন্ত শুধু সাতক্ষীরা রেঞ্জেই ১১৬ জন বনজীবী বাঘের হামলায় নিহত হয়েছেন। পাশাপাশি খাদ্যহীন অসহায় ক্ষুধার্ত ও তৃষ্ণার্ত বাঘ যখন বন ছেড়ে গ্রামে চলে আসে তখন বাঘ উদ্ধার করতে না পারা ব্যর্থ বন বিভাগের জন্য অপেক্ষা করতে করতে মানুষও বাধ্য হয়ে পিটিয়ে বাঘ মেরে ফেলে। শ্যামনগরের আবাদ চ-ীপুর গ্রামে একটি ঘরের চালার ওপর বাঘকে ঘিরে রেখে ২২ জানুয়ারি ২০১০ সালে ভোর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত অপেক্ষা করেন হাজারো গ্রামবাসী। রাষ্ট্র গ্রাম থেকে বাঘটিকে বনে ফিরিয়ে নিয়ে যেতে চূড়ান্তভাবে ব্যর্থ হলে সরকার ও জনপ্রতিনিধিদের সামনেই গ্রামবাসী অনেকে বাঘটিকে পিটিয়ে মারতে বাধ্য হয়।

৪ জুলাই ২০১০ বেলা ১১টায় সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার বুড়িগোয়ালিনী ইউনিয়নের দাঁতিনা খালী গ্রামের আজিজ সানা (৫০) একটি নৌকায় ৬ জন জেলে নিয়ে তুষখালীর খালে মধু আহরণ করতে গিয়ে বাঘের হামলায় নিহত হন। ৬ জুলাই ২০১০ মালঞ্চ নদীর তীরে কাঁকড়া ধরতে গিয়ে বাবা নওসের আলী (৬৫) ও ছেলে ইসমাইল হোসেন (১৩) নিহত হন বাঘের হামলায়। ৮ জুলাই ২০১০ মুন্সীগঞ্জ ইউনিয়নের পূর্ব কালিনগর (আইটপাড়া) গ্রামের ঈমান আলী (২৭) বাঘের হামলায় মারা যান। ১৩ মে ২০১০ তারিখে শ্যামনগরের হরিনগর পশ্চিমপাড়ার রাহুল মোড়ল (১২) ও রুবেল মোড়ল (২০) কদমতলা ফরেস্ট স্টেশন থেকে কাঁকড়া ধরার পাস নিয়ে তুষখালী ভাড়ানিতে কাঁকড়া ধরার সময় বাঘের হামলায় আহত হন। ১৪ মে নীলডুমুর গ্রামের মো. ছবিরুদ্দিন (৫০) বড়কাখালী এলাকায় মাছ ধরার সময় বাঘের হামলায় নিহত হন। ১৫ মে কলবাড়ী গ্রামের মজিবর গাজী (৩৬) হুদুসিংয়ের খালে কাঁকড়া ধরার সময় বাঘের হামলায় গুরুতর আহত হন। ১৬ মে ছোট ভেটখালী গ্রামের নাছিমা বেগম (৩২) সর্দারদের বাছা খালে কাঁকড়া ধরার সময় বাঘের হামলায় নিহত হন। ১৭ মে মীরগাঙ গ্রামের হরিপদ ম-ল (৪৫) গোলামীর দুনে খালে কাঁকড়া ধরার সময় বাঘের হামলায় নিহত হন। বাঘের এই পরপর আক্রমণগুলো সবই ঘটেছে গ্রামের বিপরীতে নদীর তীরের কাছাকাছি সুন্দরবন এলাকায়। সুন্দরবন পশ্চিম বন বিভাগের সাতক্ষীরা রেঞ্জেই ঘটেছে একটির পর একটি এ প্রশ্নহীন বাঘ হামলা ও মৃত্যু। দুঃখজনক হলো, বাঘের হামলায় একের পর এক বনজীবী এবং কখনও মানুষের হামলায় বাঘের মৃত্যু হলেও রাষ্ট্র কখনোই এসব মৃত্যুতে কোনো যন্ত্রণা অনুভব করেনি। বিপন্ন সুন্দরবনের অসহায় ক্ষুধার্ত বাঘ ও সুন্দরবনের ওপর নির্ভরশীল বনজীবী কারোরই খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারেনি রাষ্ট্র। ক্ষুধাকাতর মানুষ তো না হয় তার ভিটেমাটি ছেড়ে শহরে এসে পেটে-ভাতে দিনমজুরি কি চেয়েচিন্তেও বাঁচতে পারে; কিন্তু বন ছেড়ে বাঘের পক্ষে তো আর শহরে এসে দিনমজুরি বা ভিক্ষা করাও সম্ভব নয়। ক্ষুধাকাতর বাঘ তাহলে যাবে কোথায়? বাঁচবে কী করে? সুন্দরবনের বাঘ ও বনজীবীদের এই চরম খাদ্যহীনতা ও নিরাপত্তাহীনতাকে আড়াল করে সুন্দরবনকে প্রাকৃতিক সপ্তাশ্চর্যের শীর্ষে নেয়ার এক জবরদস্তিও আমরা দেখেছি।

২০০০ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর রাশিয়ার ভøাদিভস্টকের স্কুল পড়–য়া খুদে শিশুদের সঙ্গে নাগরিক সমাজ বাঘের অধিকার রক্ষায় এক বর্ণাঢ্য র‌্যালির আয়োজন করে। পরে এর সূত্র ধরে ‘সেভ দ্য টাইগার ফান্ডের’ সহযোগিতায় ফনিক্স নামের এক রাশিয়ান বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে বাঘ দিবসের সূচনা ঘটে। ডব্লিউডব্লিউএফ এবং বিশ্বব্যাংকসহ অন্যান্য বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ২০১০ সালের সেপ্টেম্বরে রাশিয়ায় বিশ্ব বাঘ সম্মেলনের আয়োজন করে। যেখানে দুনিয়ার ১৩টি দেশ মিলে বাঘ রক্ষায় একটি সম্মিলিত কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করে। এরই অংশ হিসেবে ডব্লিউডব্লিউএফ ২০১০ সালের ২৯ জুলাইকে বাঘ দিবস ঘোষণা করেছে। চীনা প্রাণী-জ্যোতিষশাস্ত্র বা জোডিয়াক অনুযায়ী ১৪ ফেব্রুয়ারি ২০১০ থেকে ১১ ফেব্রুয়ারি ২০১১ সালকে সোনালি বাঘ বর্ষ ঘোষণা করা হয়। বাংলাদেশেও বাঘ দিবস পালনের ধাক্কা লাগে। একক আয়তনে দুনিয়ার সবচেয়ে বড় ম্যানগ্রোভ বনভূমি সুন্দরবনের বাঘ রক্ষায় পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয় ‘বিপন্ন বাঘ ও সুন্দরবন রক্ষার’ আহ্বান জানিয়ে বিশ্বব্যাংক, সেভ দ্য টাইগার ফান্ড এবং ইউএসএআইডির বিতর্কিত আইপ্যাক কর্মসূচির সহযোগিতায় খুলনা ও সাতক্ষীরার শ্যামনগরে বাঘ দিবস পালন শুরু করে। কিন্তু এসব দিবস সুন্দরবনের বাঘ-বনজীবীর ঐতিহাসিক সম্পর্ককে দুম করে ‘সংঘর্ষ’ হিসেবে ঘোষণা করেছে। যেখানে বনজীবীরা বিশ্বাস করে এখনও মা বনবিবি হলো বাদাবনের রক্ষাকবচ। আর বনবিবির বাহন হলো বাঘ। সুন্দরবন অঞ্চলের জনগণের কোনো ধরনের পূর্ব সম্মতি ও সিদ্ধান্ত ছাড়া ঘোষিত ‘বাংলাদেশ টাইগার অ্যাকশন প্লান ২০০৯-২০১৭’ বাঘ-মানুষের এ সহাবস্থান সম্পর্ককে বরাবর এক ‘সংঘর্ষ’ হিসেবেই দেখেছে। আশা করি, এ বছরের বাঘ দিবসে অন্তত এই একটি দৃষ্টিভঙ্গির বদল ঘটবে। পরিবেশ ও বনমন্ত্রী নিশ্চিতভাবে সুন্দরবনের বাঘ ও মানুষের এই করুণ আহাজারি টের পান। আশা করি, বাঘ দিবসে রাষ্ট্রের সব নথিপত্র থেকে বাঘ ও মানুষের সম্পর্ককে যেখানে ‘সংঘর্ষ’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে, তা বাতিল করে সেখানে ‘সহাবস্থান’ ধারণাটি চালু করতে ন্যায়পরায়ণ হবেন। তা না হলে বাঘবিরোধী এক করপোরেট মনস্তত্ত্বই বিকশিত হতে থাকবে বছরের পর বছর। আর কমতে থাকবে বাঘের সংখ্যা; বাড়বে জরিপ আর উন্নয়নের বাহাদুরি। হয়তো বাঘ শুধু টিকে থাকবে বনবিবিরই বাহন হয়ে আর বাদাবনের করুণ স্মৃতিকথায়।

পাভেল পার্থ : গবেষক, প্রতিবেশ ও প্রাণবৈচিত্র্য সংরক্ষণ

animistbangla@gmail.com