বাংলা সাহিত্যের প্রথম মহিলা কবি

নিউজচিটাগাং২৪/ এক্স প্রকাশ:| সোমবার, ১৮ ডিসেম্বর , ২০১৭ সময় ০৭:৪৬ অপরাহ্ণ


”বনে অনেক সময় এমন ফুল ফুটে, রাজোদ্যানেও তাহার তুলনা মিলে না, সে বনফুলের সৌন্দর্য্য কেহ উপলব্ধি করিতে, কিংবা সে সৌরভ কেহই ভোগও করিতে পারে না, বনের ফুল বনে ফুটে, বনেই শুকায়”। বাংলা সাহিত্যের প্রথম মহিলা কবি চন্দ্রাবতীকে এরকম ফুলের সাথে তুলনা করেছেন যতীন সরকার ।
৫০০ বছর আগে এই বঙ্গীয় উপদ্বীপে জন্ম নেয়া রক্ত-মাংসের মানবী চন্দ্রাবতী নিছক একজন পালাকারই ছিলেন না! ছিলেন বিদুষী এবং সর্বো পরি চিন্তা-চেতনায় প্রাগ্রসর এক দ্রাবিড় রমণী !

”ময়মনসিংহ থেকে কেদারনাথ মজুমদার সম্পাদিত ‘সৌরভ’ পত্রিকায় (ফাল্গুন ১৩২০ বঙ্গাব্দ/ ফেব্র“য়ারি ১৯১৩ খ্রিষ্টাব্দ) চন্দ্রকুমার দে তাঁর প্রথম প্রকাশিত প্রবন্ধ ‘মহিলা কবি চন্দ্রাবতী’ শুরু করেছিলেন। এর আগে ‘শিক্ষিত’ সমাজের কেউ কবি চন্দ্রবতী নামের সর্ম্পকে অবহিত ছিলেন না, অবহিত হওয়ার প্রয়োজনও বোধ করেননি।
পরবর্তীকালে, দীনেশচন্দ্র সেন এবং চন্দ্রকুমার দে’র যৌথ প্রয়াসে লোক মুখে ছড়িয়ে থাকা চন্দ্রাবতীর লেখা অসংখ্য গান এবং অবশিষ্ট সৃষ্টি-কর্ম উদ্ধার হয়।

চন্দ্রকুমারের অননুকরণীয় ভাষায় – “যাঁহার কবিতা লোকের প্রাণের মধ্যে মনের মধ্যে সর্বদা প্রিয়জনের স্মৃতির ন্যায় ঘুরিয়া ফিরিয়া, ভাসিয়া ভাসিয়া বেড়ায়, ছোট বড় নাই, স্থান-অস্থান নাই, মুখে মুখে ফেরে, তিনিই সাধারণের প্রাণের কবি।

চন্দ্রাবতী পূর্ব ময়মনসিংহের সর্বসাধারণের প্রাণের কবি ছিলেন। বহুদিন হইতে শুনিয়া আসিতেছি – সেই অপূর্ব মনপ্রাণ মাতান সঙ্গীত। মাঠে কৃষকের, শিশুর মুখে মুখে, আঙ্গিনায় কুলকামিনীদের মুখে, ঘাটেবাটে, মন্দিরে, প্রান্তরে, বিজনে, নদীর পুলিনে সেই সঙ্গীত; বিবাহে, উপনয়নে, অন্নপ্রাশনে, ব্রতে, পূজায় সেই সঙ্গীত ঘুরিয়া ঘুরিয়া, ফিরিয়া ফিরিয়া কানে আসিয়া বাজে, মরমের ভিতর প্রবেশ করে, — প্রায়ই শুনি চন্দ্রাবতী ভনে, চন্দ্রাবতী গায়।

শ্রাবণের মেঘভরা আকাশতলে ভরা নদীতে যখন বাহকগণ সাঁঝের নৌকা সারি দিয়া বাহিয়া যায়, তখন শুনি সেই চন্দ্রাবতীর গান, বিবাহে কুলকামিনীগণ নব বরবধূকে স্নান করাইতে জলতরনে যাইতেছে আর গাইতেছে সেই চন্দ্রাবতীর গান, তারপর ক্ষৌরকার বরকে কামাইবে তার সঙ্গীত, বরবধূর পাশাখেলা, তার সঙ্গীত সে কত রকম !”

চন্দ্রাবতীর পিতা ষোড়শ শতকের প্রখ্যাত মনসামঙ্গল বা পদ্মাপুরাণ রচয়িতা কবি দ্বিজবংশী দাস। জন্মস্থান কিশোরগঞ্জ শহরের অদূরবর্তী পাতুয়াইর গ্রাম। আচার্য দীনেশ চন্দ্র সেনের মতে – পিতা ও কন্যা একত্র হইয়া মনসা দেবীর ভাসান (১৫৭৫খৃঃ) রচনা করিয়াছিলেন।”

ব্রাহ্মণ-কুমার বাল্যসখা জয়ানন্দের সঙ্গে বালিকা চন্দ্রাবতীর বন্ধুত্ব গভীর প্রেমে পরিণত হয়, চন্দ্রকুমার লিখেছেন – ”প্রণয় যখন গাঢ় হইয়াছিল, চন্দ্রাবতী তখন মনে মনে তাঁহার প্রাণের দেবতার পদে সমস্ত জীবন-যৌবন ঢালিয়া দিলেন। বিবাহের কথাবার্তা এক রূপ স্থির হইয়া গেল, এমন সময় এক বিষম অনর্থ ঘটিল। অলক্ষ্য হইতে নিদারুণ বিধাতা কল ঘুরাইলেন। যুবক আসমানি নামের এক মুসলমান রমণীর প্রেমে আত্মবিক্রয় করিয়া ধর্মান্তর গ্রহণ করিল !!”

বজ্রাহত চন্দ্রাবতী পিতার কাছে দুইটি জিনিস চেয়ে নেন, প্রথমটি, ফুলেশ্বরী নদী-তীরে একটি শিব-মন্দির প্রতিষ্ঠা করে দেবার অনুরোধ। দ্বিতীয়টি, চিরকুমারি থেকে বাকি জীবন শিবের-সাধনায় নিয়োজিত থাকার অনুমতি। পন্ডিত পিতা কন্যার দুটি প্রার্থনাই মঞ্জুর করেন।

চন্দ্রবতী তাঁর রামায়নের ‘সীতার বনবাস’ রচনার পরপরই — আর এক দুর্ঘটনা ঘটে গেল। চির অনুতপ্ত চন্দ্রাবতীর সেই প্রণয়ী যুবক তুষানলে পুড়ে নিজেকে ক্ষমা করতে না পেরে , চন্দ্রাবতীর উদ্দেশ্যে একটা চিঠি লিখে তার সাক্ষাৎ কামনা করলেন ।
চন্দ্রাবতী পিতাকে সমস্ত জানাযে পিতা অসম্মতি প্রকাশ করে বলেছিলেন, তুমি যে দেবতার পূজায় মন দিয়েছো তারই পূজা কর। অন্য কামনা হৃদয়ে স্থান দিও না।
চন্দ্রাবতী যুবককে চিঠির মাধ্যমে সান্ত্বনা দিলেন এবং শিবের চরণে মনপ্রাণ সমর্পণ করার উপদেশ দিলেন। অনুতপ্ত যুবক পত্র পাঠ শেষে তৎক্ষণাৎ চন্দ্রাবতীর স্থাপিত শিবমন্দিরের অভিমুখে গেলেন । চন্দ্রাবতী তখন শিবপূজায় তন্ময়, মন্দিরের দ্বার ভিতর থেকে বন্ধ ।

হতভাগ্য যুবক এসেছিলো চন্দ্রাবতীর কাছে দীক্ষা নিতে কিন্তু পারেননি, চন্দ্রাবতীকে ডাকতেও তার সাহস হয় নাই, দরজা বন্ধ ও নীরবতাকে চন্দ্রাবতীর প্রত্যাখ্যানের ভাষা মনে করে ব্যর্থ-মনোরথ জয়ানন্দ, লাল রঙের সন্ধ্যামালতী ফুল দিয়ে মন্দিরের দরোজায় ৪ ছত্রের একটি পদ লিখে মন্দির ত্যাগ করেন ।

পূজা শেষ করে চন্দ্রাবতী দরজা খুলে সেই কবিতা পড়লেন, তার মনে হলো দেবমন্দির কলঙ্কিত হয়েছে । চন্দ্রাবতী পাশে ফুলিয়া নদীর (ফুলেশ্বরী) ঘাটে গেলেন পানি আনতে, গিয়ে বুঝলেন সব শেষ , অনুতপ্ত যুবক ফুলিয়ার স্রোতধারায় নিজের জীবনস্রোত শেষ করে দিয়েছে, নদীর জলে ভাসছে জয়ানন্দের মৃতদেহ ।

এখানে যতীন সরকার ও চন্দ্রকুমার দের গবেষণাতে আমরা জানি চন্দ্রাবতী আত্মহত্যার পথ বেঁচে নেন নাই, তবে এই ঘটনার পরে তিনি খুব বেশিদিন বাঁচেন নাই, পূজা করতে করতে মন্দিরে তার মৃত্যু ঘটে, কিন্তু অন্যান্য সূত্রে প্রকাশ, জয়ানন্দের মৃতদেহ দেখে চন্দ্রাবতীও ফুলেশ্বরী নদীতে নিজেকে সমর্পন করে জীবনের ইতি টেনেছিলেন !

সেই ফুলেশ্বরী নদী-তীরে চন্দ্রাবতীর শিবমন্দিরটি আজো কালের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।

চন্দ্রাবতী কায়মনোবাক্যে শিবপূজা করিতেন ও অবসরকালে রামায়ণ লিখতেন। তাঁর এই রামায়ণ এ অঞ্চলের মুখে মুখে গীত হলেও কখনো মুদ্রিত হয় নাই। নারীর দৃষ্টিকোণ থেকে রামায়ণ রচনা করে পিতৃতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থার মূলে প্রথম কুঠারাঘাত করেন তিনি। তাঁর রচনায় সীতা-চরিত্র প্রাধান্য পায় মূখ্য চরিত্রে, যার পাশে রাম চরিত্রটি পুরোপুরি ম্লান মনে হয়েছে । সীতার মানসিকতাকে এমনভাবে এঁকেছেন যেখানে নারী কেবল নারী নয় ব্যক্তি নয় বলিষ্ঠ আর ব্যক্তিত্বময় !

কবি ও সাহিত্যিক নবনিতা দেবসেন চন্দ্রাবতী রচিত রামায়ণ পাঠ করে বিস্মিত হয়ে বলেছেন, এ রচনাটি দুর্বল তো নয়ই, এটি অসমাপ্তও নয়। এ রচনাটিতে রামের জয়গান না করে একজন নারীর দুঃখ ও দুর্দশাকে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে যা তৎকালীন পুরুষশাসিত সমাজের বিরুদ্ধাচারণ হিসেবে মনে করা যেতে পারে। সুখের কথা, নবনিতা দেবসেন চন্দ্রাবতী রচিত রামায়ণের ইংরেজি অনুবাদের কাজটিও সম্পন্ন করেছেন।

চন্দ্রাবতীর বাস্তব জীবনে ঘটে যাওয়া প্রেমের বিয়োগান্তক ঘটনার বিবরণ পাওয়া যায় নয়ানচাঁদ ঘোষ রচিত ‘চন্দ্রাবতী পালা’য়। ১২টি অধ্যায়ে ৩৫৪টি ছত্রের এ লোকগাথা চন্দ্রাবতীর জীবনীর তথ্যভিত্তিক একমাত্র লিখিত দলিল।

আচার্য দীনেশ চন্দ্র সেন এক সময় সহজিয়া চন্ডীদাসের সাধনসঙ্গিনী রামীকে আমাদের সাহিত্যের প্রথম মহিলা কবির মর্যাদা দিতে চেয়েছিলেন। তবে তাঁর এই মত শেষ পর্যন্ত সর্বজন গ্রাহ্য হয় নি। চন্দ্রাবতীই যে বাংলা সাহিত্যের প্রথম মহিলা কবি, সে ব্যাপারে বর্তমানে আর কোনো সন্দেহের অবকাশ নেই ।

ডিজিটাল যুগে আমাদের অনেক প্রাপ্তি, এই প্রাপ্তি পূর্ণাঙ্গতা পাবে আমাদের লোকসাহিত্য সংস্কৃতিকে আগলে তারুণ্যের নাগালে আমাদের সমাজে ছড়িয়ে দিতে পারলে ! জবর দখল হয়ে গেছে ষোড়শ শতাব্দীতে জন্ম নেয়া বাংলার প্রথম মহিলা কবি চন্দ্রাবতীর বাড়িটি। ভবনটি এখন স্থানীয় এক প্রভাবশালী দখল করে সপরিবারে বসবাস করছেন।

তথ্য সূত্র : যতীন সরকার, লোকসাহিত্য দীনেশ চন্দ্র সেন, লায়লা আফরোজ, নেট