সাম্প্রদায়িকতা বিরোধী গণসম্মিলন

প্রকাশ:| শুক্রবার, ২০ ডিসেম্বর , ২০১৩ সময় ০৬:৪৬ অপরাহ্ণ

20চট্টগ্রামে
জামায়াতে ইসলামীর পাশাপাশি বিএনপির রাজনীতিও নিষিদ্ধের দাবি
চট্টগ্রামে সাম্প্রদায়িকতা বিরোধী গণসম্মিলনে জামায়াতে ইসলামীর পাশাপাশি বিএনপির রাজনীতিও নিষিদ্ধের দাবি তুলেছেন বিশিষ্ঠ গবেষক শিক্ষাবিদ ও কলামিস্ট প্রফেসর ড. মুনতাসীর মামুন। রাজাকারের গাড়িতে পতাকা তুলে দেয়া শুধু নয়, লাগামহীনভাবে যুদ্ধাপরাধীদের পক্ষে অবস্থান নেয়ার কারণেই পাকিস্থানের দোসর হিসেবেই জামায়াতের পাশাপাশি বিএনপিরও এদেশে রাজনীতি করার কোন অধিকার নেই বলে মন্তব্য করেন তিনি। তিনি এও বলেন, শেখ হাসিনা বিহীন বাংলাদেশ আওয়ামীলীগ ক্ষমতায় থাকলে যুদ্ধাপরাধীদের ফাঁসি দূরের কথা বিচারই হতো না।
সম্মেলনের পুরো আয়োজনটি উৎসর্গ করা হয় বর্ণবাদ বিরোধী আন্দোলনের প্রতিভূ সদ্য প্রয়াত দক্ষিণ আফ্রিকার প্রেসিডেন্ট নেলসন ম্যান্ডেলাকে। শুরুতে সদ্য প্রয়াত বর্ষিয়ান রাজনীতিক জোহরা তাজউদ্দিনসহ বিভিন্ন সময়ে সাম্প্রদায়িকতা বিরোধী আন্দোলনে শহীদদের স্মরণে ১ মিনিট নিরবতা পালন করা হয়।
গণসম্মলনে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার ধারক জনগণ ঐক্যবদ্ধভাবে স্বাধীনতাবিরোধী, মৌলবাদী ও সাম্প্রদায়িক অপশক্তির দেশ ও জাতিবিরোধী সকল ষড়যন্ত্র ও তৎপরতা বাংলাদেশের মাটি থেকে সমূলে উৎপাটন করার মানবিক আহবান জানানো হয়।
গতকাল শুক্রবার চট্টগ্রামে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে আয়োজিত সাম্প্রদায়িকতা বিরোধী এ গণসম্মিলনে বক্তারা আরো বলেছেন, বাংলাদেশে কেউ সংখ্যালঘু পরিচয়ের বিড়ম্বনা নিয়ে থাকুক এটা আমরা কেউ চাই না। বাংলাদেশের হিন্দু-মুসলমান-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান সবাই জাতিগত পরিচয়ে বাঙালি এবং নাগরিকত্বের পরিচয়ে বাংলাদেশী। হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান কিংবা আদিবাসী কেউ সংখ্যালঘু পরিচয় নিয়ে বাংলাদেশে বাস করতে চায় না। দুর্ভাগ্যের বিষয় রাষ্ট্র তাদের কপালে সংখ্যালঘুত্বের ছাপ এমনভাবে এঁকে দিয়েছে যে সেটা সহজে মুছে ফেলা যাবেনা। আমরা মনে করি সাম্প্রদায়িক নির্যাতনের বহুমাত্রিকতা এবং এর সুদুরপ্রসারী প্রভাব সম্পর্কে ধর্ম নিরপেক্ষতা ও গণতন্ত্র বিশ্বাসী রাজনৈতিক দলগুলো যথেষ্ট সচেতন নয়। সাম্প্রদায়িকতা আমাদের রাষ্ট্র, রাজনীতি, সমাজ ও সংস্কৃতি যেভাবে গ্রাস করেছে একইভাবে আচ্ছন্ন করেছে মনোজগৎ। ধর্ম নিরপেক্ষতা গণতন্ত্র ও মানবিকতার নিরন্তর চর্চা এবং সর্বক্ষেত্রে এর প্রয়োগ ব্যতিত সাম্প্রদায়িকতার মূল উৎপাটন সম্ভব নয়। আমরা মনে করি সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে সংগ্রামের ক্ষেত্রে এই গণসম্মিলন গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার হিসেবে কাজ করবে।
সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি পরিষদ আয়োজিত সম্মেলনের উদ্বোধন করেন পরিষদের প্রধান উপদেষ্টা বরেণ্য বুদ্ধিজীবী ও সমাজ বিজ্ঞানী প্রফেসর ড. অনুপম সেন। ঘোষণাপত্র পাঠ করেন পরিষদের প্রধান সমন্বয়কারী লেখক-সাংবাদিক শওকত বাঙালি।
গতকাল বিকেলে চট্টগ্রামের কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার প্রাঙ্গণে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি পরিষদের আহবায়ক প্রফেসর মো. আনোয়ারুল আজিম আরিফের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত গণ সম্মেলনটি উদ্বোধন করেন একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির কেন্দ্রীয় উপদেষ্টা প্রিমিয়ার ইউনিভার্সিটির ভিসি প্রফেসর ড. অনুপম সেন। স্বাগত বক্তব্য দেন পরিষদের সদস্য সচিব ও একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি জেলা আহবায়ক অ্যাডভোকেট সীমান্ত তালুকদার। একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি কেন্দ্রীয় যুগ্ম-সাংগঠনিক সম্পাদক শওকত বাঙালির সঞ্চালনায় আলোচনায় অংশ নেন টেলিভিশন ব্যক্তিত্ব সাংবাদিক আবেদ খান, একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির সহ-সভাপতি প্রফেসর ড. মুনতাসীর মামুন, সাধারণ সম্পাদক কাজী মুকুল, মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক গবেষক ডা. মাহফুজুর রহমান ও এ.কে.এম নাসিমুল কামাল, মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার মোজাফফর আহম্মদ, মো. সাহাবউদ্দিন, পেশাজীবী সমন্বয় পরিষদ ও চট্টগ্রাম সাংবাদিক ইউনিয়ন সাধারণ সম্পাদক রিয়াজ হায়দার চৌধুরী, চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাব সাধারণ সম্পাদক মহসিন চৌধুরী, বাংলাদেশ শিক্ষক সমিতি চট্টগ্রাম অঞ্চল সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ লকিতুল্লাহ, শিক্ষক সমিতির সাধারণ সম্পাদক প্রফেসর ড. মো. সেকান্দর চৌধুরী, প্রফেসর ড. সৌরেন বিশ্বাস, প্রফেসর বেনু কুমার দে, প্রফেসর শঙ্কর লাল সাহা, ড. কুন্তল বড়–য়া, অধ্যক্ষ হাছিনা জাকারিয়া বেলা ইসলাম, জেলা আইনজীবী সমিতি সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট কামাল উদ্দিন, নারী নেত্রী নূর জাহান খান ও জেসমিন সুলতানা পারু, আবৃত্তিকার রণজিত রক্ষিত, সংগঠক অনুপ সাহা, প্রজন্ম ৭১ সভাপতি অ্যাডভোকেট আইয়ুব খান, ড. তাপসী ঘোষ রায়, হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদ প্রেসিডিয়াম সদস্য ইঞ্জিনিয়ার পরিমল কান্তি চৌধুরী।
অন্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন শহীদ জায়া বেগম মুশতারি শফি, সাংবাদিক নেতা আবু তাহের মোহাম্মদ, এম নাসিরুল হক, মাঈনুদ্দিন দুলাল, সুমি খান, অধ্যাপক আলেক্স আলিম, চসিক কমিশনার আনজুমান আরা বেগম, রেহানা বানু রানু, সাবেক ছাত্রনেতা তারেক সোলেমান সেলিম, আবদুল হান্নান, আবদুল কাদের সুজন, শাহজাহান চৌধুরী, অধ্যাপক মাসুম চৌধুরী, হেলাল উদ্দিন চৌধুরী, জাহেদুল রহমান সোহেল, আমুস প্রেসিডিয়াম সদস্য মাহবুবুর রহমান শিবলী, পরিষদের সমন্বয়কারী সাবেক ছাত্রনেতা আবুল হাসনাত মো. বেলাল, যুগ্ম সচিব মো. অলীদ চৌধুরী, সদস্য দীপংকর চৌধুরী কাজল, পরিষদ সদস্য মো. মহিউদ্দিন সোহেল, মো. জোবায়ের, আবু নাসের চৌধুরী আজাদ, নুরুদ্দিন বাহার বাবু, নাজমুল আলম খান, শিবলী নোমান চৌধুরী, সাব্বির হোসাইন, শুভদীপ পাল, সুরজিত দত্ত সৈকত, মাউসুফ উদ্দীন মাসুম, নিখিলেষ সরকার রাজ, কামাল উদ্দিন চোহানী, মিথুন নাথ রনি, অভি চৌধুরী, মঈদুল ইসলাম, প্রকৃতি চৌধুরী ছোটন, মহিউদ্দিন তামিম প্রমুখ।
পুরো আয়োজনে সাংস্কৃতিক পর্বে গণসঙ্গীত পরিবেশন করেন অশোক সেন গুপ্ত ও অধ্যাপক মৃণালিনী চক্রবর্ত্তী’র নেতৃত্বে আওয়ামী শিল্পী গোষ্ঠী ও মহিলা পরিষদ চট্টগ্রামের শিল্পীবৃন্দ। আবৃত্তি করেন রণজিৎ রক্ষিত, অঞ্চল চৌধুরী, মিলি চৌধুরী, দেবাশীষ রুদ্র এবং প্রণব চৌধুরীর নেতৃত্বে বোধন আবৃত্তি পরিষদ। নৃত্য পরিবেশন করেন তিলোত্তমা সেনগুপ্তা।
সবশেষে লেখক-সাংবাদিক ও চলচ্চিত্র নির্মাতা শাহরিয়ার কবিরের সাম্প্রতিক ছবি ‘দেশ কোন পথে’ প্রদর্শিত হয়।
সাম্প্রদায়িকতা বিরোধী গণসম্মিলনের ঘোষণাপত্র

সাম্প্রদায়িকতা বিরোধী গণসম্মিলনে পবিত্র শহীদ মিনার প্রাঙ্গণে উপস্থিত আমাদের স্বজনরা, আমাদের প্রেরণার সারথীরা, আমাদের দুঃসময়ের অভিযাত্রীরা চট্টগ্রামের মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের চেতনা লালনকারীদের সর্ববৃহৎ প্ল্যাটফর্ম সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি পরিষদ-এর পক্ষ থেকে আমাদের আজকের আয়োজনে আপনাদের কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি। আপনাদের প্রাণময় উপস্থিতিতে এই সম্মিলন প্রাণবন্ত হয়েছে, হয়েছে সার্থক। এটির সুন্দর সমাপ্তিই প্রমাণ করবে আমাদের যুথবদ্ধ আন্তরিকতা। শেষ পর্যন্ত আমাদের বন্ধন অটুট থাকুক অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা না হওয়া পর্যন্ত।
গণসম্মিলনের শুরুতেই গভীর শ্রদ্ধায় মাথা অবনত করছি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতি। গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করছি মুক্তিযুদ্ধে আত্মদানকারী আমাদের বীর শহীদদের, মুক্তিযোদ্ধাদের। শহীদ জননী জাহানারা ইমামসহ আমাদের প্রতিটি গণতান্ত্রিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক সর্বোপরী মানবিক আন্দোলনে যাঁরা মৃত্যুর মিছিলে সামিল হয়েছেন তাঁদের সকলের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানাচ্ছি।
শ্রদ্ধা জানাই ১৯৫১ সালে একুশের প্রথম কবিতার স্রষ্টা ভাষাসৈনিক মাহবুবুল আলম চৌধুরীসহ যাঁরা চট্টগ্রামে অসাম্প্রদায়িক চেতনার অগ্নিমশাল জ্বালিয়ে সাম্প্রদায়িকতা বিরোধী সাংস্কৃতিক আন্দোলন গড়ে তুলেছিলেন।
উল্লেখ্য, একাত্তরের মানবতা বিরোধী অপরাধের বিচারের রায় কার্যকর এবং আসন্ন নির্বাচনকে কেন্দ্র করে দেশে পুনরায় সাম্প্রদায়িক নির্যাতন-নিপীড়ন মাথাচাড়া দেওয়ার প্রেক্ষাপটে চট্টগ্রাম থেকেই সূচিত হচ্ছে সাম্প্রদায়িকতা বিরোধী আন্দোলন। প্রতিক্রিয়াশীলতার বিরুদ্ধে ১৯৫১ সালে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে নগরীর হরিখোলা মাঠে সাংস্কৃতিক সম্মেলনের মাধ্যমে সর্বপ্রথম অসাম্প্রদায়িক চেতনার যে সাহসী উচ্চারণ প্রতিধ্বনিত হয়েছিল তারই ধারাবাহিকতায় ২০১৩ সালে সেই বিপ্লবী চট্টগ্রাম থেকেই পুনরায় শুরু হচ্ছে সাম্প্রদায়িকতা বিরোধী সাংস্কৃতিক আন্দোলন।
প্রিয় সমাবেশ,
২০১৩ সালের বিজয়ের মাস ডিসেম্বরে মুক্তিযুদ্ধোত্তর বাংলাদেশে আরেকটি বিজয় অর্জিত হয়েছে। ’৭১-এর একজন শীর্ষস্থানীয় গণহত্যাকারী ও মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধী জামায়াতনেতা আবদুল কাদের মোল্লার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়েছে। ৪২ বছর পর একজন শীর্ষস্থানীয় যুদ্ধাপরাধী ও গণহত্যাকারীর এই সাজা মুক্তিযুদ্ধের ৩০ লক্ষ শহীদ পরিবার এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী সমগ্র জাতির দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটালেও জামায়াত-বিএনপির জোট একে স্বাগত জানায়নি। বরং যুদ্ধাপরাধীদের বিচার বানচাল করবার জন্য বিজয়ের মাসের প্রথম দিন থেকে একের পর এক অবরোধ ও হরতাল ডেকে সাধারণ মানুষের জীবন জীবিকা ধ্বংসের পাশাপাশি গোটা দেশ অচল করে দিতে চাইছে। জামায়াত বাংলাদেশকে ধ্বংস করে ’৭১-এর পরাজয়ের প্রতিশোধ নিতে চাইছে।
১৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশের ঐতিহাসিক বিজয় এবং পাকিস্তানের পরাজয়ের দিন পাকিস্তানি জামায়াতে ইসলামী সেখানকার জাতীয় সংসদে গণহত্যাকারী কাদের মোল্লার মৃত্যুদণ্ডের জন্য শোক ও নিন্দা প্রস্তাব এনেছে, যা ক্ষমতাসীন মুসলিম লীগ সরকার গ্রহণ করেছে এবং জাতীয় সংসদে এটি অনুমোদিত হয়েছে। বিরোধী দলের আসন থেকে পিপলস পার্টি বলেছিল বটে কাদের মোল্লার বিচার বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়, পাকিস্তানের উচিত হবে না কোনও দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করা, কিন্তু সরকারি দল তা করেছে। এটিকে নিছক অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না বলে বাংলাদেশের স্বাধীন সার্বভৌম সত্ত্বার উপর অত্যন্ত ধৃষ্টতাপূর্ণ আঘাত বলে আমরা মনে করি।
কাদের মোল্লার বিচার ও দণ্ড সম্পর্কে পাকিস্তানের অবস্থান প্রমাণ করেছে১) বাংলাদেশের প্রতি পাকিস্তানের শত্র“তাপূর্ণ মনোভাব ’৭১-এ যেমনটি ছিল এখনও তাই আছে, ২) বাংলাদেশের জামায়াতে ইসলামী পাকিস্তানি জামায়াতের একটি শাখা মাত্র এবং ৩) কাদের মোল্লা সহ তার দলের নেতাকর্মীদের আনুগত্য বাংলাদেশের প্রতি নয়, পাকিস্তানের প্রতি।
শুধু তাই নয়, মুক্তিযুদ্ধের সময় অল্প কিছু এবং পরে অনেক পাকিস্তানি বুদ্ধিজীবী, পেশাজীবী, মানবাধিকার কর্মী ও রাজনীতিবিদ ’৭১-এর গণহত্যার জন্য সে দেশের নাগরিকদের পক্ষ থেকে ক্ষমা চাইলেও এখন পর্যন্ত পাকিস্তান সরকারিভাবে ক্ষমাপ্রার্থনা দূরে থাক তারা যে গণহত্যা করেছে তাও স্বীকার করেনি। মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্বপ্রদানকারী আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকলে পাকিস্তানকে ক্ষমা চাওয়া এবং পাওনা পরিশোধের দাবি জানালেও বিএনপি এবং তাদের সহযোগী স্বাধীনতাবিরোধীরা যখন ক্ষমতায় থাকে তখন তারা এ বিষয়ে পাকিস্তানকে কিছু বলা দূরে থাক পাঠ্যপুস্তক থেকে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী এবং তাদের সহযোগীদের গণহত্যার বিষয়টি মুছে ফেলে।
প্রিয় সমাবেশ,
এই গণসম্মিলন বীরদর্পে ঘোষণা করছে, বাংলাদেশে কেউ সংখ্যালঘু পরিচয়ের বিড়ম্বনা নিয়ে থাকুক এটা আমরা কেউ চাই না। বাংলাদেশের হিন্দু-মুসলমান-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান সবাই জাতিগত পরিচয়ে বাঙালি এবং নাগরিকত্বের পরিচয়ে বাংলাদেশী। হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান কিংবা আদিবাসী কেউ সংখ্যালঘু পরিচয় নিয়ে বাংলাদেশে বাস করতে চায় না। দুর্ভাগ্যের বিষয় রাষ্ট্র তাদের কপালে সংখ্যালঘুত্বের ছাপ এমনভাবে এঁকে দিয়েছে যে সেটা সহজে মুছে ফেলা যাবেনা। আমরা মনে করি সাম্প্রদায়িক নির্যাতনের বহুমাত্রিকতা এবং এর সুদুরপ্রসারী প্রভাব সম্পর্কে ধর্ম নিরপেক্ষতা ও গণতন্ত্র বিশ্বাসী রাজনৈতিক দলগুলো যথেষ্ট সচেতন নয়। সাম্প্রদায়িকতা আমাদের রাষ্ট্র, রাজনীতি, সমাজ ও সংস্কৃতি যেভাবে গ্রাস করেছে একইভাবে আচ্ছন্ন করেছে মনোজগৎ। ধর্ম নিরপেক্ষতা গণতন্ত্র ও মানবিকতার নিরন্তর চর্চা এবং সর্বক্ষেত্রে এর প্রয়োগ ব্যতিত সাম্প্রদায়িকতার মূল উৎপাটন সম্ভব নয়। আমরা মনে করি সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে সংগ্রামের ক্ষেত্রে এই গণসম্মিলন গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার হিসেবে কাজ করবে।
একথা আমরা বহুবার বলেছি দেশের ভাবমূর্তি নষ্ট হয় সংখ্যালঘু প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর উপর নির্যাতন এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনায়। যারা এই ধরনের নির্যাতনের প্রতিবাদ করেন, নির্যাতনের অবসানের জন্য কাজ করেন, তাদের কর্মকান্ডে দেশের ভাবমূর্তি নষ্ট হওয়ার বিপরীতে উজ্জ্বল হয়। বাইরের জগৎ তখন জানতে পারে দেশের সব মানুষ অসভ্য বর্বর হয়ে যায়নি, বর্বরতা প্রতিহত করবার মতো মানুষও দেশে আছে।
সাম্প্রদায়িকতা বা সংখ্যালঘু নির্যাতন মৌলবাদীরই একটি অভিব্যক্তি। ধর্মীয় মৌলবাদ কিভাবে মানুষের মগজে সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ ও সংখ্যালঘু নির্যাতনের প্রণোদনা সৃষ্টি করে বাংলাদেশ ও পাকিস্তান এর বাস্তব উদাহরণ। রাষ্ট্র যদি ধর্মভিত্তিক ও মৌলবাদী হয় সেখানে সাম্প্রদায়িকতা থাকবে না। এটা অসম্ভব ব্যাপার। রাষ্ট্র ধর্ম নিরপেক্ষ হলেও সাম্প্রদায়িকতা নির্মূল করা কঠিন-যদি ধর্মনিরপেক্ষতার কঠোর প্রয়োগ সম্পর্কে রাষ্ট্রের কর্ণধাররা আন্তরিক না হয়। মৌলবাদকে উপেক্ষা করে কখনো সাম্প্রদায়িকতা নির্মূল কিংবা সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠা করা যাবে না।
এই গণসম্মিলনের উদ্দেশ্য হচ্ছে সংখ্যালঘু ধর্মীয় ও এথনিক সম্প্রদায়ের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর উপর সব ধরণের নির্যাতন, বৈষম্য ও বিদ্বেষের অবসান এবং সব মানুষের সমান অধিকার ও মর্যাদা প্রতিষ্ঠা। আমাদের আন্দোলনের লক্ষ্য হচ্ছে ধর্মনিরপেক্ষ মানবিক সমাজ প্রতিষ্ঠা। এ লক্ষ্য অর্জনের জন্য সাম্প্রদায়িকতা ও মৌলবাদের সকল অভিব্যক্তির বিরুদ্ধে আমাদের লড়ে যেতে হবে নিরন্তর।
বাংলাদেশ থেকে সাম্প্রদায়িক সহিংসতা ও সংখ্যালঘু নির্যাতন স্থায়ীভাবে বন্ধ করতে আমাদের এই গণসম্মিলনের প্রস্তাবনাগুলি হলো ঃ
১) ধর্মনিরপেক্ষ সংবিধান, যা ধর্ম-বর্ণ-বিত্ত-লিঙ্গ-ভাষা-জাতিসত্তার নামে মানুষে সঙ্গে মানুষের বৈষম্য সৃষ্টি করবে না। ’৭২-এর সংবিধান এ ক্ষেত্রে যে কোন দেশের জন্য মডেল হতে পারে। তবে এই সংবিধানের একটি বড় অসম্পূর্ণতা ছিল। এতে সংখ্যালঘু জাতিসত্তা ও আদিবাসীদের স্বতন্ত্র সত্তার কোন স্বীকৃতি দেয়া হয়নি, যা যে কোন সভ্য দেশের সংবিধানে থাকা প্রয়োজন।
২) মানবিক মূল্যবোধসমৃদ্ধ একটি ধর্মনিরপেক্ষ গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রই কেবল ধর্ম-বর্ণ-বিত্ত-ভাষা-জাতিসত্তা নির্বিশেষে সকল মানুষের সমান অধিকার ও মর্যাদা নিশ্চিত করতে পারে। সমাজে এই মূল্যবোধ সৃষ্টি করতে পারে সংবাদপত্র, বুদ্ধিজীবী ও সিভিল সমাজের বিভিন্ন উদ্যোগ। সিভিল সমাজের শক্তিশালী অবস্থান ও আন্দোলন ছাড়া সেক্যুলার মানবিক মূল্যবোধের বিকাশ হতে পারে না।
৩) শিক্ষাকে বলা হয় জাতির মেরুদণ্ড। দেশে এমন শিক্ষা ব্যবস্থা থাকা উচিৎ নয় যা ভিন্ন ধর্মের, ভিন্ন ভাষার, ভিন্ন জাতিসত্তার মানুষের প্রতি শিক্ষার্থীদের ভেতর বিরূপ ধারণার জন্ম দেয়। দেশের মাদ্রাসা শিক্ষাকে যুগপোযোগী, বিজ্ঞানমনস্ক ও মানবিক করতে হবে।
৪) বহুকাল ধরে বঞ্চনা ও অবহেলার কারণে যে সব সম্প্রদায় ও জনগোষ্ঠী পিছিয়ে পড়েছে তাদের জন্য শিক্ষা ও কর্মজীবনের ক্ষেত্রে বিশেষ সুযোগ-সুবিধা সৃষ্টি করা প্রয়োজন যাতে দেশগঠনের কাজে এই বিপুল মানবসম্পদ সমানভাবে অংশগ্রহণ করতে পারে।
৫) ধর্ম নয় যোগ্যতা হবে সরকারি বেসরকারি চাকুরিলাভের পূর্বশর্ত। যত দিন পর্যন্ত দেশের অমুসলিম নাগরিকরা রাজনীতি, প্রশাসন, অর্থনীতি, সমাজ, শিক্ষা ও সংস্কৃতির নীতি নির্ধারণের ক্ষেত্রে যোগ্যতা অনুযায়ী প্রতিষ্ঠার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হবেন ততদিন দেশের সামগ্রিক অগ্রগতি আমরা আশা করতে পারি না। এসব ক্ষেত্রে লিখিত/অলিখিত সকল বিধিনিষেধ ও সাম্প্রদায়িক মানসিকতা দূর করতে হবে।
প্রিয় উপস্থিতি,
বাঙালির আত্মজাগরণের ফলে বাঙালি জাতীয়তাবাদের ভিত্তিতে ১৯৭১ খ্রিস্টাব্দে বহু প্রাণের বিনিময়ে বাংলাদেশ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হলে মনে হয়েছিল সাম্প্রদায়িকতার বিষবৃক্ষ (যা ধর্মের অপব্যখ্যার ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত) এই ভূখণ্ড থেকে সম্পূর্ণভাবে উৎপাটিত হয়েছে। কিন্তু বাঙালির মুক্তি সংগ্রাম ও স্বাধীনতা সংগ্রাম জনমানসে অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক স্বাধীনতার যে স্বপ্ন জাগিয়েছিল যুদ্ধ বিধ্বস্ত দেশে সে স্বপ্নকে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ নানা কারণে মূর্ত করা সম্ভব হয়নি।
মূলত বাংলাদেশের স্থপতি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে স্ব-পরিবারে হত্যার মধ্য দিয়ে ধর্মীয় সাম্প্রদায়িকতা প্রচন্ডভাবে পুনঃরুজীবিত হয়। ফলশ্র“তিতে ১৯৭৫ পরবর্তি সময়ে পঞ্চম সংশোধনীর মাধ্যমে সংবিধানের মূলনীতি থেকে ধর্মনিরপেক্ষতা বাদ দেয়া হয়। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতার বিরুদ্ধে যারা প্রত্যক্ষ ভূমিকা গ্রহণ করেছিল তাদের প্রধানমন্ত্রীর পদ প্রদান থেকে আরম্ভ করে নানাভাবে প্রশাসনে ফিরিয়ে আনা হয়। এই নীতিরই অনুসরণে এরশাদ আমলে ইসলামকে রাষ্ট্রধর্ম ঘোষণা করা হয়।
আজ সময় এসেছে বাংলাদেশে নানা সময়ে যে নগ্ন সাম্প্রদায়িক নিপীড়নের প্রকাশ ঘটেছে, যা ক্ষেত্র বিশেষে একাত্তরের নির্যাতনকেও অনেক ক্ষেত্রে ম্লান করে দেয়-তার বিরুদ্ধে সুস্থ সামাজিক শক্তিসমূহকে উজ্জীবিত ও সক্রিয় করা। তার জন্য প্রয়োজন এই সাম্প্রদায়িকতার চরিত্র উদঘাটন, নির্ণয় ও বিশ্লেষণ করে তার মূল উৎপাটনের লক্ষ্যে তরুণ সমাজকে অনুপ্রাণিত ও সংঘবদ্ধ করা। সেই প্রয়াসেরই অংশ এই গণসম্মিলন।
প্রিয় উপস্থিতি,
আমরা মুক্তিযুদ্ধের চেতনার ধারক জনগণ ঐক্যবদ্ধভাবে স্বাধীনতাবিরোধী, মৌলবাদী ও সাম্প্রদায়িক অপশক্তির দেশ ও জাতিবিরোধী সকল ষড়যন্ত্র ও তৎপরতা বাংলাদেশের মাটি থেকে সমূলে উৎপাটন করার মানবিক আহবানে এখানে সমবেত হয়েছি। আপনাদের এ আয়োজনে সামিল করতে ক’মাস ধরে আমরা নিরবচ্ছিন্ন কাজ করেছি। এটি আমরা প্রতিনিয়ত করতে চাই। আগামীতে আপনাদের এভাবে আন্তরিক সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।

ঘোষণাপত্র পাঠ : শওকত বাঙালি। প্রধান সমন্বয়কারী-সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি পরিষদ। কেন্দ্রীয় যুগ্ম সাংগঠনিক সম্পাদক ও চট্টগ্রাম বিভাগীয় সমন্বয়ক-একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি।