বরিশাল শহরকে পর্যটকের দৃষ্টিতে চেনা

প্রকাশ:| শনিবার, ১০ অক্টোবর , ২০১৫ সময় ১১:৪১ অপরাহ্ণ

প্রাচ্যের ভেনিসখ্যাত বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলের বিভাগীয় শহর বরিশাল। কীর্তনখোলা নদীতীরে সুপ্রাচীন বন্দরকে ঘিরে ৪৫ বর্গকিলোমিটার এলাকায় স্নিগ্ধ শহরটি গড়ে ওঠে। ১৭৯৬ সালের আগে জেলাটির নাম ছিল বাকলা। নবাব আলীবর্দী খানের সময় আগা বাকের খান চন্দ্রদ্বীপের একাংশে জমিদারি লাভ করে বাকেরগঞ্জ বন্দর প্রতিষ্ঠা করেন। কালপরিক্রমায় সেই বরিশাল এখন জেলা ও বিভাগ হয়েছে, হয়েছে মেট্রোপলিটন শহর। একসময় লবণ ও মাছের জন্য বিখ্যাত ছিল। ইংরেজ ও পর্তুগিজ বণিকরা বড় লবণের চৌকিকে ‘বরি সল্ট’ বলত। বরি সল্ট থেকে পরবর্তী সময়ে বরিশাল নামকরণ হয়েছে। ধানের জন্যও বরিশালের খ্যাতি আছে। যেদিকে চোখ যায় সবুজে সবুজময়। নারকেল-সুপারি ও অন্যান্য গাছ আকাশমুখী ওঠে গেছে। কীর্তনখোলা নদীতীরে ধান-নদী-খালের অপূর্ব সমাহার। জেলা শহরের কয়েকটি স্থান যে কোনো পর্যটককেই অভিভূত করবে। যেদিকে তাকান সবুজের সমারোহ মোহনীয় করে।
বরিশাল শহরকে পর্যটকের দৃষ্টিতে চেনা
অক্সফোর্ড মিশন চার্চ এশিয়া মহাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম এবং বাংলাদেশের শৈল্পিক গির্জাগুলোর অন্যতম স্থাপত্য নিদর্শন। বগুড়া রোডে অবস্থিত সুরম্য প্রাচীন স্থাপনা ইপিফানি গির্জা নাম হলেও অক্সফোর্ড মিশন নামেই পরিচিত। লাল ইটের গির্জাটি সিস্টার এডিথের নকশায় মূল আকৃতি দেন ফাদার স্ট্রং। ১৯০৩ সালে নির্মাণ কাজ শুরু হয়ে শেষ হয় ১৯০৭ সালে। গ্রিক স্থাপত্যশৈলীতে নির্মিত আকর্ষণীয় গির্জাটির ভেতরে আছে সুবিশাল প্রার্থনা কক্ষ। প্রাচীর দিয়ে ঘেরা ভেতরে ঢুকলেই দেখবেন সবুজ ঘাসের কার্পেটে মোড়া মাঠ, ১৩টি পুকুর, অক্সফোর্ড মিশন প্রাইমারি স্কুল এবং অক্সফোর্ড মিশন হাই স্কুল, হাসপাতাল, লাইব্রেরি, ছাত্রছাত্রী হোস্টেল, খেলার মাঠ, ফুলের বাগান ও ঔষধি গাছ। মূল বেদির ওপর বিশাল আকৃতির ক্রস রয়েছে। ৩৫ একর জমির একাংশে গির্জার ভেতরে কাঠ দিয়ে খোদাই করা আর মার্বেল পাথরের টাইলস খচিত মেঝে। গির্জাটি একতলা হলেও উচ্চতায় পাঁচ তলার সমান। ভেতরের দৃশ্য অত্যন্ত মনোরম, শান্ত-স্নিগ্ধ পরিবেশ, সারি সারি পাম্প ট্রি। দীঘির পাশে ফাদার্স হাউস জলের মাঝে প্রতিবিম্ব তোলে। মাদার্স হাউসও রয়েছে। গির্জার মধ্যে আকর্ষণীয় একটি ঘণ্টা রয়েছে, যা এশিয়ার মধ্যে সবচেয়ে বড়, প্রতিদিন সাতবার এটি বাজানো হয়। গির্জাতে অসংখ্য করিডোর ও ৪০টি খিলানপথ, যা এর কাঠামোকে সুদৃঢ় করেছে। দূর থেকে মনে হয় রেলগাড়ির ইঞ্জিন। এ ইঞ্জিনের যাত্রীরা বিশ্বাসের সুতা ধরে স্বর্গে চলে যাবেন। বিকাল ৪টা পর্যন্ত দর্শনার্থীদের জন্য খোলা থাকে। অনুমতি নিয়েই ঘুরে দেখতে পারেন। দেখার জন্য সময় খুবই কম থাকে, কেননা বেশিরভাগ সময় প্রার্থনা হয়। শত বছরের ঐতিহ্যে ঘেরা গির্জাটি ঘুরে দেখুন ভালোলাগা মনে রয়ে যাবে।বগুড়া রোডে কবি জীবনানন্দ দাশের বাড়ি। শহরের আম্বিয়া হাসপাতালের সামনে সরকারিভাবে দোতলা লাইব্রেরি ও জাদুঘর তৈরি করা হয়েছে। পাশেই ধানসিঁড়ি লেখা গেট দিয়ে ভেতরে ঢুকলেই টিনের বাড়ি। দেশ বিভাগের পর তার পরিবার এখান থেকে কলকাতা চলে যায়। সেই সময়কালের শুধু ভিটে ও দুইটি চৌকাঠ আজও অক্ষত রয়েছে। কলেজ রোডে ব্রজমোহন (বিএম) বিশ্ববিদ্যালয় কলেজটি ১৮৮৪ সালের ২৭ জুন অশ্বিনী কুমার দত্ত তার বাবা ব্রজমোহন দত্তের নামে প্রতিষ্ঠা করেন। ১২৬ বিঘা জমির ওপর নির্মিত কলেজ ক্যাম্পাসটি মনোরম। বড় বড় ভবন, বড় দীঘি, মসজিদ, মন্দির, মাঠ, প্রশাসনিক ভবন, ছাত্রাবাস, একাডেমিক ভবন রয়েছে। হাজারো শিক্ষার্থীর পদচারণায় এলাকাটি মুখর। নথুল্লাবাদ বাসস্ট্যান্ডের পাশেই চারণকবি মুকুন্দ দাসের নির্মিত কালী মন্দির। শক্তির আরাধনায় বাড়ির আঙিনাতে কালী মন্দিরটি বানিয়েছিলেন। এখানে বসে তিনি গান গাইতেন। তার গান শোনার জন্য মহাত্মা গান্ধী, মাওলানা মোহাম্মদ আলী, মাওলানা শওকত আলী, নেতাজী সুভাষচন্দ্র বোসও এসেছিলেন।শহরের পাশে কীর্তনখোলা নদীতে বৈকালিক নৌভ্রমণে আনন্দ পাবেন। সকালে স্টিমার ঘাটে অসংখ্য লোকের পদচারণা, লঞ্চের আনাগোনা ও প্রাণচাঞ্চল্য উপভোগ করুন। সদর রোডে ঐতিহ্যবাহী অশ্বিনী কুমার টাউন হল (১৯২০-১৯৩০ নির্মিত) রয়েছে, জেলার গুরুত্বপূর্ণ সভা, সেমিনার, অনুষ্ঠান এখানে হয়। কালীবাড়ি রোডে বাংলা ১২৯৫ সালে সনাতন ধর্মের এক বিপর্যয়কর পরিস্থিতিতে সৃষ্ট শ্রীশ্রী ধর্ম রক্ষিণী সভা দেখবেন যেখানে কারুকার্য ম-িত ভবন, অফিস, কামিনী সুন্দরী সংস্কৃত কলেজ, আকর্ষণীয় বিষ্ণু মন্দির আছে। শহরের কেন্দ্রীয় মন্দির অঙ্গনটি তার আত্মমহিমায় আজও সমুজ্জ্বল। কলেজ রোডে শ্রী অমৃত লাল দে’র পৃষ্ঠপোষকতায় ১৯০৪ সালের রামকৃষ্ণ মিশন দেখলে ভালো লাগবে। শহরের মধ্যে এয়ারপোর্ট, বেলস পার্ক, বরিশাল শিশু পার্কও দেখতে পাবেন। জেলা স্কুলের সামনে দেখতে পাবেন বরিশাল পৌরসভায় ব্যবহৃত প্রথম গাড়িটি। শহরের মধ্যস্থলে বিবির পুকুর অনেক ফোয়ারায় সাজানো হয়েছে। ফোয়ারায় লাইটিং দেখার জন্য বিকাল-সন্ধ্যা-রাতে শহরবাসী এখানে বসে থাকে। পাশেই পূর্ণাত্মা লেচু শাহ (রহ.) এর মাজার। চট করে জিয়ারত করতে পারেন। মাজারের উল্টো দিকে দই ঘরের চিঁড়া-দইয়ের মিশ্রণ, মাঠা খেতে অপূর্ব। শহরের মধ্যে সদর রোডে সকাল-সন্ধ্যা হোটেলের নাস্তা অসাধারণ। অপূর্ব স্বাদের লুচি-সবজি, ডাল ও হালুয়া দীর্ঘদিন মুখে লেগে থাকবে।সড়কপথে বরিশাল যেতে গাবতলী বা কল্যাণপুর থেকে বাস ছাড়ে। সাকুরা, হানিফ, দ্রুতি, ইলিশ কিংবা অন্য কোনো পরিবহনে যেতে পারেন। আর নদীপথে যেতে সাগর, সুরভি, পারাবত, দ্বীপরাজ, সুন্দরবন কিংবা স্টিমারে যেতে পারেন। আকাশপথে যাওয়ার ব্যবস্থাও রয়েছে। সকালে গ্রিনলাইন লঞ্চে গেলে অনেক উপভোগ্য হবে আপনার ভ্রমণ। থাকার জন্য হোটেল দিদার, নূপুর, গুলবাগ, ইম্পেরিয়াল, আলী ইন্টারন্যাশনাল, পুণম এবং সরকারি সার্কিট হাউস, বিভিন্ন এনজিও রেস্ট হাউসও রয়েছে।কামরান চৌধুরী : এনজিও কর্মকর্তা ও পর্যটন লেখক