বছর ঘুরে এলো আবার খুশির ঈদ

প্রকাশ:| বৃহস্পতিবার, ৮ আগস্ট , ২০১৩ সময় ১১:১৮ অপরাহ্ণ

ঘরে ঘরে কোরআন খতম। মসজিদে মসজিদে খতমে তারাবি। মুখে-মনে সাম্য-সংযম। মাঠে-ঘাটে দপ্তরে নিত্যকাজের ইতি। হাট-বাজার বিপণি বিতানে তরুণ-যুবার যাবতীয় উচ্ছ্বাস। প্রিয়জনের জন্য নতুন জামা কাপড় কেনা-সব আয়োজন যেন শেষ। আজ শুধু অপেক্ষা একফালি চাঁদের।
সরু সেই চাঁদের খোঁজে পশ্চিমাকাশের দিকে আজ উম্মুখ-অন্বেষণে থাকবে কোটি মানুষের চোখ। কারণ সেই চোখ চাঁদের মিলনে ভাঙবে আনন্দের বাঁধ। বার্তা রটবে কাল শুক্রবার পবিত্র ঈদুল ফিতর। আর চাঁদ চোখের মিলন না হলে ঈদ যাবে পিছিয়ে। হবে শনিবার। চাঁদ ঘিরে প্রতিবারই থাকে এই আনন্দময় অনিশ্চয়তা।
চাঁদ চোখের মধ্যে মেঘেরও থাকে কিছু খেলা। সে আড়াল ঘোচতে আছে সরকারি উদ্যোগ আয়োজন। চাঁদ দেখার সংবাদ পর্যালোচনা আর সিদ্ধান্ত জানতে সভায় বসবে চাঁদ দেখা কমিটি। আজ বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় ইসলামিক ফাউন্ডেশন মিলনায়তনে। চাঁদ দেখা গেলে সরকারি ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গে চারদিক আলোড়িত করে বেজে উঠবে সাম্যের কবি নজরুলের সেই অমর সঙ্গীত ‘ও মন রমজানের ঐ রোজার শেষে এলো খুশির ঈদ…।’
সন্ধ্যায় ঘরে ঘরে, পথে-ঘাটে, বাজারে অলিতে-গলিতে নামবে উৎসবমুখর মানুষের ঢল। পাড়া-মহল্লায় মসজিদের মাইকে ভেসে আসবে ‘ঈদ মোবারক’ ধ্বনি। শুরু হবে ঈদ শুভেচ্ছা বিনিময়। জানিয়ে দেওয়া হবে ঈদের জামায়াতের সময়সূচি।
ইতোমধ্যে নানা ঝক্কি-ঝামেলা মাথায় নিয়ে হলেও প্রিয়জনের সাথে ঈদ উদযাপনে গ্রামের বাড়ি পৌঁছেছেন নগরে বসবাসকারী অনেকেই। প্রিয়জনের সাথে ঈদ উদযাপন এ দেশের আবহমান ঐতিহ্যেরও অংশ। ধর্মীয় এই উৎসবকে কেন্দ্র করে পরিবারের সব সদস্যের পারস্পরিক দেখা-সাক্ষাৎ ও মিলিত হওয়ার সুযোগ আসে। এতে করে ভ্রাতৃত্বের বন্ধনও সুদৃঢ় হয়।
ধনী-গরিব, শিশু-কিশোর, তরুণ-তরুণী থেকে প্রবীণ-সবার মনই এখন ঈদের আগমনী বার্তায় আন্দোলিত, আবেগে উচ্ছ্বসিত। আর্থিক অসঙ্গতি, পাওয়া না পাওয়ার ব্যবধান, ঘরে ফেরার পথে নানা বিড়ম্বনা কিংবা খেয়ালি প্রকৃতির বিচিত্র মেজাজ-সবই স্লান হয়ে যায় প্রিয়জনের সান্নিধ্যে। আর ঈদই এ মিলনের সুযোগ এনে দেয়। প্রিয়জনের সাথে ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি করে সবাই ভুলে যান সব কষ্ট-বিড়ম্বনা। সব ভেদাভেদ, হিংসা-বিদ্বেষ ভুলে ঈদগাহর জামাতে এক কাতারে শামিল হবেন সবাই। নামাজ শেষে একে অপরকে ‘ঈদ মোবারক’ বলে বুকে জড়িয়ে ধরবেন। এদিক থেকে ঈদ কেবল আনন্দের বার্তাই নিয়ে আসে না, ইসলামের সাম্যের এক বড় পরিচয়ও উদ্ভাসিত হয় ঈদে।
ইসলাম ধর্মের দুই ঈদের মধ্যে এক মাসের দীর্ঘ সিয়াম সাধনার কারণে ঈদুল ফিতরের জন্য প্রস্তুতি আয়োজন থাকে একটু বেশি। নিজের আর প্রিয়জনের জন্য সাধ্যমতো পোশাক-আশাক কেনেন সবাই। নতুন কাপড় পরিধান করে ঈদগাহ ময়দানে যাওয়াটাও বাঙালির ঐতিহ্য। বর্তমান সময়ে বিশেষ করে পাঞ্জাবি পরে ঈদের জামাতে যাওয়ার রেওয়াজ প্রচলিত হয়েছে। এ কারণে রমজানের শুরু থেকেই শহর থেকে গ্রাম সর্বত্র শপিং কমপ্লেক্সগুলোতে কেনাকাটা জমে উঠে। সকাল থেকে গভীর রাত অবধি মুখর শপিং সেন্টারগুলো। রমজান শুরুর আগে থেকেই নগরীর শপিং কমপ্লেক্সগুলোতে কেনাকাটা জমে উঠতে দেখা গেছে। গতকাল বুধবারও নগরীর অভিজাত শপিংগুলোতে মানুষের বেশ ভিড় দেখা গেছে। বিশেষ করে বিপণী বিতান, রিয়াজ উদ্দিন বাজার, আগ্রাবাদ আখতারুজ্জামান সেন্টার, জিইসি মোড়ের স্যানমার ওশান সিটি,প্রবর্তকের আফমি প্লাজা, মিমি সুপার মার্কেট এবং লালখান বাজারের আমিন সেন্টারসহ শপিং সেন্টারগুলোতে জমজমাট কেনাকাটা হতে দেখা গেছে। অবশ্য eid-2অধিকাংশ মানুষ ইতোমধ্যে পোশাক-পরিচ্ছদ কেনা শেষ করেছে। এখন সর্বশেষ অনুষঙ্গ হিসেবে আতর-টুপির মতো ছোটখাট সওদাপাতি বাকী রয়েছে। অবশ্য চাঁদ রাতের দিনেও অনেক পরিবার কেনাকাটা করে থাকে।
শুধু পোশাকে ঈদের আনন্দ সীমাবদ্ধ নয়, ঘরে ঘরে সাধ্যমতো নানা উপাদেয় খাবারের আয়োজন করেন সবাই। আজ কিংবা কাল চাঁদ দেখা যাওয়ার পর মুদি-সওদাপাতিতেই বেশি ব্যস্ত হয়ে পড়বে মানুষ। পরদিন অর্থাৎ ঈদের দিন অতিথি আপ্যায়নের জন্য সেমাই, নুডলস, ফল-ফলাদি এবং নানা ধরনের নাস্তা ও এর উপকরণ কিনতে দোকানগুলোতে ভিড় লেগে যায়। সেমাই, ফিরনি, পিঠা, পায়েস, হালিম, পোলাও, কোরমাসহ মুখরোচক রকমারি খাবারের আয়োজন করবে সবাই।
নগরীর বিভিন্ন হাসপাতাল, বৃদ্ধাশ্রম, এতিমখানা ও কারাগারে থাকবে ঈদের বিশেষ খাবারের ব্যবস্থা। থাকবে বিনোদনের ব্যবস্থাও। ঈদ উপলক্ষে নগরী সেজেছে অপরূপ সাজে। নগরীর বিভিন্ন স্থাপনায় আলোকসজ্জা করা হয়েছে। বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় শোভা পাচ্ছে ঈদ মোবারক খচিত প্ল্যাকার্ড।
ঈদ উপলক্ষে আজ থেকে তিন দিনের সরকারি ছুটি শুরু হচ্ছে। ইতোমধ্যে অধিকাংশ মানুষ গ্রামের বাড়ি চলে যাওয়ায় নগরী অনেকটা ফাঁকা হয়ে গেছে। ঈদের সময়ে বেশ কয়েকদিন এ রকম অবস্থা থাকবে। মানুষজন কম থাকার সুযোগ নিয়ে চুরি-ডাকাতি ও ছিনতাই বেড়ে যায়। এ কারণে চুরি-ডাকাতি ও ছিনতাই প্রতিরোধে সিএমপির পক্ষ থেকে বিশেষ উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। এছাড়া এবার ঈদের পর দুই দিনের হরতাল থাকায় পুলিশকে সতর্কাবস্থায় রাখার পাশাপাশি গোয়েন্দা নজরদারিও বাড়ানো হয়েছে বলে সিএমপি সূত্রে জানা গেছে। পুলিশের পক্ষ থেকে অভয় দেয়া হয়েছে, নগরীতে অপরাধ কর্মকাণ্ড নিয়ন্ত্রণে থাকবে।
এদিকে চট্টগ্রাম মহানগরীর প্রধান প্রধান মসজিদ ও ঈদগাহ ময়দানে ঈদ জামাতের প্রস্তুতি চলছে। গতকাল বুধবার জমিয়তুল ফালাহ ময়দান, লালদীঘি ময়দান, এম এ আজিজ স্টেডিয়াম সংলগ্ন জিমনেসিয়াম প্রাঙ্গণসহ নগরীর বিভিন্নস্থানে ঈদগাহ মাঠে শামিয়ানা-ত্রিপল টানানোর কাজ চলতে দেখা গেছে। ঈদ উপলক্ষ্যে মসজিদ-মাজারগুলোতে আলোকসজ্জা করা হয়েছে।
এবার চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন ও কেন্দ্রীয় ঈদ জামাত কমিটির তত্ত্বাবধানে নগরীতে পৃথক পৃথক ঈদের জামাত অনুষ্ঠিত হবে। চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের উদ্যোগে ঈদের প্রধান জামাত অনুষ্ঠিত হবে নগরীর জাতীয় মসজিদ জমিয়তুল ফালাহ ময়দানে সকাল আটটা ১৫ মিনিটে। এতে ইমামতি করবেন জমিয়তুল ফালাহ্ মসজিদের খতিব মাওলানা মুহাম্মদ জালালুদ্দিন আল কাদেরী। পৌনে নয়টায় হবে দ্বিতীয় জামাত। এছাড়া, চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় ঈদ জামাত কমিটির ব্যবস্থাপনায় ঈদুল ফিতরের প্রধান জামাত অনুষ্ঠিত হবে এমএ আজিজ স্টেডিয়ামের জিমনেসিয়াম সংলগ্ন মাঠে। সকাল ৯ টায় এই জামাত শুরু হবে। এই জামাতে ইমামতি করবেন বায়তুশ শরফ সিনিয়র মাদ্রাসার অধ্যক্ষ মাওলানা মুহাম্মদ সাইয়েদ আবু নোমান। আন্দরকিল্লা শাহী জামে মসজিদে ঈদ জামাত হবে সকাল সাড়ে আটটায়।
ঈদুল ফিতর উপলক্ষে সংবাদপত্রগুলো ঈদের গুরুত্ব,তাৎপর্য ও এর মাহাত্ম্য তুলে ধরে বিশেষ ক্রোড়পত্র প্রচার করেছে। ঈদের আনন্দকে বহুগুণ বাড়িয়ে দেবে রেডিও-টেলিভিশনের বিশেষ অনুষ্ঠানমালা। বাংলাদেশ টেলিভিশনসহ বিভিন্ন স্যাটেলাইট চ্যানেলগুলো ঈদ উপলক্ষ্যে চার থেকে পাঁচ দিন বিশেষ অনুষ্ঠান সম্প্রচারের আয়োজন করেছে।