বঙ্গবন্ধু কেবল বাংলাদেশের নেতা ও স্থপতি ছিলেন না তিনি মানবের মুক্তি ও বিশ্বলোকে স্মৃতির অংশী

নিউজচিটাগাং২৪/ এক্স প্রকাশ:| বুধবার, ২১ মার্চ , ২০১৮ সময় ১১:৩৪ অপরাহ্ণ

বরেণ্য ইতিহাসবিদ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বঙ্গবন্ধু অধ্যাপক ড. মুনতাসীর মামুন বলেছেন, বিশ্বমানের মুক্তিসংগ্রামের নিরিখে বঙ্গবন্ধুর ভাষণকে বিবেচনায় নিয়েছিল ইউনেস্কো। উদার অসম্প্রদায়িক গণতান্ত্রিক জাতিরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পথ করে দিয়েছিল ৭ মার্চের ভাষণ। সেই মূল্যবোধ আজকের সংঘাতপীড়িত বিশ্বে আরো প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে। ইউনেস্কো তাই কেবল বাঙালি ঐতিহ্য হিসেবে নয়, বিশ্বমানের সম্পদ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে ৭ মার্চের ভাষণকে। এই বড় পটভূমিকায় ৭ মার্চের ভাষণ ও বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্ব উপলব্ধি করার এবং বিশ্বের সামনে তা মেলে ধরার দায়ভার এখন আমাদের উপর বর্তেছে। কেননা, বঙ্গবন্ধু কেবল বাংলাদেশের নেতা ও স্থপতি ছিলেন না। তিনি মানবের মুক্তি আন্দোলনের প্রেরণা, বিশ্বলোকের স্মৃতির অংশী। গতকাল বুধবার সকালে নগরীর চট্টগ্রাম সিটি কর্পোাশেন মিউনিসিপ্যাল মডেল স্কুল এন্ড কলেজ মিলনায়তনে বঙ্গবন্ধু সাংষ্কৃতিক জোট চট্টগ্রাম জেলা আয়োজিত মহান স্বাধীনতার স্থপতি, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৯৮তম জন্মদিন ও জাতীয় শিশু দিবস উপলক্ষে ‘চেতনার সৈকতে ভোরের নোঙর বঙ্গবন্ধু’ শীর্ষক আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির ভাষণে তিনি এ কথা বলেন। তিনি আরো বলেন, হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাঙালি জাতিকে একটি পতাকা দিয়েছেন, একটি স্বাধীন ভূখন্ড দিয়েছেন এবং বিশ্বসভায় বাঙালি জাতিকে মর্যাদার আসনে নিয়ে গেছেন। তাঁরই দেখানো পথ ধরে দেশ আজ এগিয়ে চলেছে। বঙ্গবন্ধু দেশ গড়ার কাজে খুব বেশি সময় হাতে পাননি। স্বাধীনতাবিরোধী শক্তির মদদে কিছু বিশ্বাসঘাতক তাঁকে সপরিবারে হত্যা করেছিল। জাতির মুখে কালিমা লেপন করেছিল। বিদেশে থাকায় এই হত্যাকান্ড থেকে রক্ষা পেয়েছিলেন তাঁর দুই কন্যা। আমাদের সৌভাগ্য, বঙ্গবন্ধুর সুযোগ্য কন্যা শেখ হাসিনা সেদিন নিজের জীবনের মায়া না করে স্বাধীনতার অর্জনগুলো রক্ষায় এগিয়ে এসেছিলেন। দেশকে আবার বঙ্গবন্ধুর প্রদর্শিত পথে এগিয়ে নিতে প্রাণপণ লড়াই করে চলেছেন। তাঁর সেই চেষ্টা সফল হয়েছে। নানা ক্ষেত্রেই বাংলাদেশ ধারাবাহিক এগিয়ে চলেছে। স্বাধীনতার মাসে গতকাল বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশের মর্যাদার স্বীকৃতি পেয়েছে। নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতুর নির্মাণকাজ দ্রুত এগিয়ে চলেছে। দারিদ্র্যের হার দ্রুত কমছে। মানুষের মাথাপিছু বার্ষিক আয় যেখানে ৫০০ ডলারেরও কম ছিল, সেখানে আজ তা এক হাজার ৬০০ ডলার ছাড়িয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ ৩৩ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি। দেশ খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ হয়েছে। বিদ্যুৎ উৎপাদন বেড়েছে পাঁচ গুণেরও বেশি। অবকাঠামোগত উন্নয়ন দ্রুততার হওয়ায় বিনিয়োগও বাড়ছে উল্লেখযোগ্য হারে। কর্মসংস্থান বাড়ছে দ্রুতগতিতে। এখন আর বাংলাদেশি যুবকরা আগের মতো বিদেশে যাওয়ার নামে সাগরে ঝাঁপ দেয় না। এ মাসেই বাংলাদেশের কৃত্রিম উপগ্রহ কক্ষপথে যাওয়ার কথা রয়েছে। তথ্য-প্রযুক্তিতে বাংলাদেশ ঈর্ষণীয় সাফল্য অর্জন করছে। এ সবই হচ্ছে বঙ্গবন্ধুর প্রদর্শিত পথে প্রত্যাবর্তনের কারণে। তিনি আরো বলেন, বঙ্গবন্ধু শিশুদের খুবই ভালোবাসতেন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান আজ আমাদের অস্তিত্বের অংশ হয়ে গেছেন। নিজের অস্তিত্বের প্রয়োজনেই আমাদের বঙ্গবন্ধুর আত্মত্যাগকে জানতে হবে। অস্তিত্ব¡বিরোধী যেকোনো ষড়যন্ত্র সম্পর্কে সজাগ থাকতে হবে। মূখ্য আলোচকের ভাষণে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজ বিজ্ঞান অনুষদের সাবেক ডীন প্রফেসর ড. গাজী সালেহ উদ্দিন বলেন, বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর একাত্তরের রক্তাক্ত মুক্তিযুদ্ধটা হয়ে যায় ‘গ-গোলের বছর’। জিয়া ক্ষমতা দখল করে ৩০ লাখ শহীদের রক্তের বিনিময়ে লিখিত বাহাত্তরের সংবিধানের প্রস্তাবনা থেকে ‘জাতীয় মুক্তির জন্য ঐতিহাসিক সংগ্রামের’ অংশটির পরিবর্তে প্রতিস্থাপন করেন ‘জাতীয় স্বাধীনতার জন্য ঐতিহাসিক যুদ্ধের’। ১৯৭১ সালের ১০ এপ্রিল যখন মুজিবনগর সরকার গঠিত হয়, সে সময় স্বাধীনতার যে ঘোষণাপত্রটি গৃহীত ও পঠিত হয়েছিল, তার ভিত্তি ছিল এই প্রস্তাবনা। ১০ এপ্রিল সেই ঘোষণাপত্র পাঠ করেই ১৭ এপ্রিল মুজিবনগর সরকার শপথ গ্রহণ করেছিল। স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র ও প্রস্তাবনা একই সূত্রে গাঁথা। বিশেষ অতিথির ভাষণে চট্টগ্রাম সরকারি কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ বরেণ্য শিক্ষাবিদ প্রফেসর রীতা দত্ত বলেন, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান জীবদ্দশায় কখনো দুনীতিকে প্রশ্রয় দেননি। প্রয়োজনে নিজ দলের সংসদ সদস্যদের পদত্যাগ করতে বাধ্য করেছিলেন। আর সবচেয়ে বড় কথা হচ্ছে তিনি রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার চেয়ে দেশের সাধারণ নিরীহ মানুষকে বেশি গুরুত্ব দিতেন। এমনকি দলের সভাপতির পদ ছেড়ে দিয়ে দলকে শক্তিশালী করার দায়িত্ব দিয়েছিলেন জাতীয় চারনেতার অন্যতম সদস্য কামারুজ্জামানের ওপর। তিনি আরো বলেন, বাংলার হাজার বছরের ইতিহাসে বঙ্গবন্ধু একজনই জন্মেছিলেন। খ্যাতিমান চারুকলা শিল্পী দীপক কুমার দত্ত বলেন, ধর্মান্ধ অপশক্তিকে রুখতে হবে। ৭১এর পরাজিত অপশক্তি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুসহ তাঁর পরিবারকে হত্যা, জননেত্রী শেখ হাসিনার উপর গ্রেনেড হামলা, দেশজুড়ে সিরিজ বোমা হামলা, হলিআর্টিজনে হত্যাযজ্ঞের পর শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের জনপ্রিয় শিক্ষক অধ্যাপক মুহাম্মদ জাফর ইকবালের উপর হামলাকারীরা তাদেরই অনুসারী। সভাপতির ভাষণে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোশেন মিউনিসিপ্যাল মডেল স্কুল এন্ড কলেজ এর অধ্যক্ষ (ভারপ্রাপ্ত) শাহেদুল কবির চৌধুরী বলেন, ধর্মান্ধ এই অপশক্তি বিভিন্ন সময়ে বিভিন্নরূপে আত্মপ্রকাশ ঘটিয়ে বাংলাদেশের অগ্রযাত্রাকে থামানোর চেষ্টা করছে। এটা কোন বিছিন্ন ঘটনা নয়। তিনি আরো বলেন, ৭১এর পরাজিত অপশক্তি নিষ্পাপ যুবকদের মস্তিষ্কে ধর্মকে ব্যবহার করে মানুষকে হত্যা করার কাজে ব্যবহার করছে। বঙ্গবন্ধু সাংস্কৃতিক জোট চট্টগ্রাম জেলার সাধারণ সম্পাদক সংস্কৃতিকর্মী খোরশেদ আলম এর সঞ্চালনায় অনুষ্ঠিত ‘চেতনার সৈকতে ভোরের নোঙ্গর বঙ্গবন্ধ’ শীর্ষক আলোচনা সভায় শুভেচ্ছা বক্তব্য রাখেন চট্টগ্রাম কলেজের ইতিহাস বিভাগের প্রভাষক মোহাম্মদ বেলাল হোসেন, সাংষ্কৃতিককর্মী শওকত আলী সেলিম, কবি সজল দাশ, মুজিবুর রহমান। শুরুতেই জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতিকৃতিতে পুষ্পমাল্য অর্পণ এবং নেপালের কাঠমুন্ডুতে ইউএস বাংলা এয়ারলাইনস্ এ দূর্ঘটনায় নিহতদের স্মরণে ১ মিনিট দাঁড়িয়ে নীরবতা পালন করা হয় এবং ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধে ও ৫২ ভাষা আন্দোলনে শহীদ ও ৭৫এর ১৫ আগস্ট কালো রাত্রিতে জাতির জনকের পরিবারের সকল সদস্যদের আত্মার মাগফেরাত কামনা করা হয়।


আরোও সংবাদ