বকুল ফুলের আগায় জ্যোৎস্না

প্রকাশ:| রবিবার, ২৬ নভেম্বর , ২০১৭ সময় ১২:২১ পূর্বাহ্ণ

 মুস্তাফা জামান আব্বাসী:: ফুলের কথা বলতে এসেছি। বাদলদিনের প্রথম কদম ফুল ক’জন প্রিয়ার হাতে পৌঁছে দেন? আমার সৌভাগ্য, পাঁচ তলার ছাদেও বাদলদিনের প্রথম কদম ফুল এসে ধরা দেয়। একদিন প্রিয়াকে বললাম, তোমার হাতের নাগালের মধ্যেই প্রথম কদম ফুল। প্রিয়া অবাক। বলল, এতদিন দেখিনি তো! বললাম, তোমাকে যে রোজ রাতে গান শোনাই, তুমি কি তা শুনতে পাও? গাইছি :’বাদল-দিনের প্রথম কদম ফুল করেছ দান,/ আমি দিতে এসেছি শ্রাবণের গান/ মেঘের ছায়ায় অন্ধকারে রেখেছি ঢেকে তারে/ এই-যে আমার সুরের ক্ষেতের প্রথম সোনার ধান’ প্রাত্যহিকতায় ভেসে যায় সব গান, সব ফুল। এমনি ব্যস্ত জীবনপ্রবাহ। সময় নেই ফুলের দিকে তাকানোর। তাই কি হয়! আজ শুনতেই হবে।

গাইছি, শুনবে কে? কবি যে গানগুলো লিখে গেলেন সে গানগুলো মন দিয়ে শুনছে ক’জন? রবীন্দ্রসঙ্গীতের আসরেও গানের গভীরে ক’জন? এই তো ক’দিন আগে অদিতির গানের আসর বসেছে ঢাকা ক্লাবে। আমিও শ্রোতা। অশ্রুসিক্ত ক’জন? হয়তো যে গানটি গেয়েছে, আর আমি।

গান শুনবে মন দিয়ে, ফুল নেবে হৃদয় দিয়ে। কবি উপস্থিত ফুলের ডালি নিয়ে। অনুভবে এনেছেন? গহন রাত্রিতে অশ্বত্থপল্লবে বৃষ্টির ঝরে যাওয়ার মর্মর শব্দ শুনতে পেয়েছেন? সঘন গহন রাত্রিতে এ গান নিজকে যে শুনিয়েছে সে পেয়েছে, কখন ‘নিশীথের অনিদ্রা দেয় যে ভরিয়া/ মায়া লোক হতে ছায়াতরণী/ ভাসায় স্বপ্ন পারাবারে নাহি তার কিনারা।’ অশ্বত্থপল্লব কবির মনে কী অনুভূতি এনেছে, ভাবতে হবে।

শ্বেতশতদলের মুকুট পরেছে ক’জন? ওরা শ্বেতশতদল চেনে না, চেনে না মালতির ঝরে যাওয়া। তাই ওরা চেনে না যখন গাই :’আমরা এনেছি কাশের গুচ্ছ, আমরা গেঁথেছি শেফালি মালা’। চেনে না ‘নবীন ধানের মঞ্জরী’। ছাত্র-ছাত্রীদের নিয়ে গিয়েছি গ্রাম দেখাতে। নদী দেখেনি, কাশফুল চেনেনি; চেনেনি শারদ লক্ষ্মীকে। ক্লাসরুমে এগুলো পাওয়া যায় না। শিউলি চেননি, বাংলাকে কতটুকু ভালোবেসেছ? রবীন্দ্রনাথ চেয়েছিলেন শান্তিনিকেতনকে বানাতে প্রকৃতির স্কুলে, যেখানে সবাই গাইবে ভোরবেলায় একসঙ্গে :’শিউলি ফুল, শিউলি ফুল…. ভোরবেলায় বারে বারেই ফিরিবারে হলি ব্যাকুল/ কেন রে তুই উন্মনা! নয়নে তোর হিমকণা’।

শনিবার সন্ধ্যাবেলায় হাঁটতে গেলাম, হঠাৎ শিউলির গন্ধ। কে যেন বলল, একটু দাঁড়াও। সুবাসটুকু মিশিয়ে নাও তোমার বুকের সঙ্গে, আমি ফুটেছি তোমার জন্য। অনুভূতির প্রয়োজন তীক্ষষ্ট হওয়া। ফুলের সুঘ্রাণ তখনই পাবে, যখন দেবে ফুলের মূল্য। সেদিন হাসনুহেনার ডালের কাছে ওরা আমাকে অনেক কিছু বলে গেল। হেনার সুগন্ধের তীব্রতা সর্বাধিক। ডালের পাশেই হয়তো কোথাও সর্পদেব লুকিয়ে। ঘ্রাণশক্তি ওদের বেশি, হাসনুহেনা সুবাস ছড়ালে ওরা আসবে। আর আমি হাঁটা ভুলে ওখানেই দম নিলাম।

হাসনুহেনা পিতার প্রিয় ফুল। আর জুঁই- যেমন শুভ্র তেমনি এর সুবাস। জুঁই ফুল আমার কৈশোর ও যৌবনকে ঘিরে। পুরানা পল্টনের হিরামন মনজিল মানে জুঁই আর গন্ধরাজ। সমগ্র বাড়ি যেন সুবাসে ম-ম। আর বর্ষায় এলো ঝমঝম বৃষ্টির শব্দের সঙ্গে কেয়া। পঞ্চাশ কেয়া গাছ। কে নিবি ফুল, কে নিবি ফুল? কে বলবে, এটি একটি শিল্পীর বাগান নয়, যে জানে এই সুরভির মূল্য? জানতেন পিতা। জন্মলঘ্নেই তাই চিনেছি চামেলি, কদম্ব ফুল, তাদের বারতা নানা ঋতুর বিন্যাসে। কোথাও বেড়াতে গেলে যখন ভেসে আসে বেলি ফুলের গন্ধ, স্মৃতিকে তা করে উতলা। তা হলে এগুলো সৃষ্টিকর্তারই নানা ছল। মনের মাধুরীকোষ্ঠে যখনই এই ফুলের প্রবেশ, তখনই স্মৃতি এসে জানান দেয় অন্য কথা, এই ফুলের সুরভি কার, জানো কি? তোমরা জানো না। সব সেই শ্রেষ্ঠ প্রেমিকের। তোমার আমার স্রষ্টার। অনেক ফুলের বাগানে গিয়ে ব্যাপারটি বুঝতে পেরেছি। গিয়েছি লন্ডনের কিউ গার্ডেনেও, সারাদিন আসমাসহ সেখানে ছিলাম। এ ছাড়াও প্যারিসের তিনটি দুষ্প্রাপ্য ফুলের বাগানে। এই বাগানগুলোর কথা খুব কম লোকই জানে। গিয়েছি আসমা ও তার বন্ধু ফাতেমাকে সঙ্গে নিয়ে। একেক ফুলের একেক গন্ধ। মিল নেই কারও সঙ্গে কারও। তারা একক।

নামাজ পড়তে যাই। একজন আমার জন্য দুটি গন্ধরাজ নিয়ে আসেন। একটি আমার জন্য, একটি আমার স্ত্রীর জন্য। বললেন, এই ফুল দুটি শুধু আপনাদের জন্য ফুটেছে, আর কারও জন্য নয়। আমার স্ত্রী উল্লসিত। রোজ এই গন্ধরাজের দস্তা। ভদ্রলোকের পরিচয় জানলাম, উনি একটি দৈনিকের সম্পাদক, অথচ তার মনটি কত পবিত্রতা দিয়ে মাখা। প্রতি ফজরে তিনি মুসল্লিদের জন্য নিয়ে আসেন তার পত্রিকাটি। নাম ‘খবর’। তার এই অনন্য ভালোবাসা আমি কোনোদিনও ভুলতে পারব না। একটি ফুলের সুবাস আমাদেরকে কত কাছে টানতে পারে!

যখন কোনো গান গাওয়া হয় তখন গানে বর্ণিত ফুলটির নাম স্মৃতিপটে উপস্থিত হয় কি? তখন ফুলটির সুবাসও ওই গানটির সঙ্গে মেলাতে সক্ষম হন কি? তখন বুঝব ওই সঙ্গীতের মর্মস্থলে প্রবেশাধিকার পেয়েছেন আপনি। ধরা যাক :’বকুল ডালের আগায় জ্যোৎস্না/ যেন ফুলের স্বপ্ন জাগায় জ্যোৎস্না/ কার গোপন কানাকানি পূর্ণশশী, ঐ ঐ ঐ দিল আনি।’ গুলশানের বারান্দায় দু’জন মুখোমুখি। পাশের বাড়ির ঝাঁকড়া বকুল গাছের একটি আগা আমার পাঁচতলার বারান্দা স্পর্শ করেছে। গাইছি আমার প্রিয়ার কানে। আকাশে পূর্ণশশী। বিয়ে বেশিদিন হয়নি, তবে জানুয়ারি মাসের ২০ তারিখে ৫৫ বছর পূর্তি হবে ইনশাআল্লাহ্‌। বকুল ডালের আগায় জ্যোৎস্না কয়েকবার গাইলাম। স্ত্রী হতচকিত। তাকে যে বকুল ডালের আগায় জ্যোৎস্নায় নিয়ে গিয়েছি, মুহূর্তে বুঝতে পারলেন। ফুল মানে ভালোবাসা, ফুল মানে প্রিয়কথার সান্নিধ্য, সুবাস মানে তার মধ্যে নিজকে সম্পূর্ণ করা। প্রতিটি গানই প্রকৃতির প্রতি সমর্পণ, স্রষ্টার দিকে ফিরে যাওয়া। হ্যাঁ, তাই।

বনফুলের কথা বলিনি। নাই-বা বলি কেমন করে! আমার অনেক কবিতায় বনফুলের কথা আছে, যাদের কথা কবিরাও প্রায়শ ভুলে যান। নিভৃতে ফোটে ওরা, কারও চোখের সামনে নয়, আবার নিভৃতে ওদের চলে যাওয়া। যারা আমার কবিতার সমর্থক [মাত্র কয়েকটি লিখেছি] পড়ে নেবেন।

প্রাণের কবি লিখছেন :’ওগো শোনো কে বাজায়/ বনফুলের মালার গন্ধ বাঁশির তানে মিশে যায়’ গানটি আমার প্রিয়। রোজই গাই। ফুল কানন নিয়ে কবি সারা পাতা ভরেছেন। পড়েছেন ক’জন। লিখছেন :’যদি শুধায় কে দিল ফুল কাননে/ মোর শপথ আমার নামটি বলিস নে।’ আমি রইব চিরদিন তোমার দৃষ্টির আড়ালে। আমাকে খুঁজতে চেষ্টা কর না। ফুলের গন্ধে আমাকে পাবে। নিশীথিনী হয়ে, সে যে আসে ফুলগন্ধের আবরণে তা কি বোঝনি? শস্যক্ষেতের গন্ধ নিয়েছ? অপূর্ব মাদকতাময়। কবি লিখছেন :’শস্যক্ষেতের গন্ধখানি একলা ঘরে দিক সে আনি, ক্লান্তগমন পান্থ হাওয়া লাগুক আমার মুক্ত কেশে।’ ‘ফুলের বনে যার পাশে যায় তারেই লাগে ভালো’- এ তো জানা কথা। আবার ‘ফুল তুলিতে ভুল করেছি’, সেও জানা কথা। বিকশিত বেদনামঞ্জরী কী, তা জানতে পেরেছি। তা একটি ফুলের গন্ধ, চৈত্রপবনে যা চিত্তবনে আনে রিনিঝিনি। সে রিনিঝিনি কামিনী ফুলের। আর কোনো ফুলের নয়। আমার প্রাণের মাঝে যে সুধা লুকিয়ে আছে তা কি জানো, তার খবর কি আছে তোমার কাছে? তা হলো পারিজাতের মধুর গন্ধ। তুমি আমার গান শুনতে চাও না, কবি বলছেন :তা হলে আমি তোমার ফুলবনে আসব না। সব সময় কুসুম ভালো লাগে না, তাই কোনোদিন প্রভাতে এসো অলকে কুসুম না দিয়ে। কুসুম দিয়ে পরিপূর্ণ কবিতার বাগান। যে কুসুম চেনে না, কবিতা থেকে সে অনেক দূরে। হৃদয়ে ভালোবাসার প্রবেশাধিকার নেই তার জন্য।

অপরাজিতা ফুটে আছে আমার টবে। নতুন ফুল এলে গিন্নির কাজ হলো ওটি আমাকে দেখানো। গ্রামে গেলে তাকে দেখাই শিমুল আর কৃষষ্ণচূড়া। কোচবিহারের স্মৃতি কৃষষ্ণচূড়া ও রাধাচূড়া। মহারানীর বাগানে কয়েক হাজার গোলাপ। স্মৃতিতে আছে কোনিয়ায় মওলানার বাগানে সহস্র গোলাপের নৃত্য। অনন্তলতা চিনতাম না, এখন চিনি। বেলী ফুলের জেগে ওঠা ও পাপড়িগুলো কীভাবে মেলে ধরে তা দেখার মতো যদি আপনার সময় থাকে তাহলে কম্পিউটারে banglar.phool-এ তা দেখতে পাবেন। সন্ধ্যামালতি নজরুলের গানে কতবার ফুটেছে! বেলী ফুলের কতগুলো নাম হয় জানেন? বেলী, মল্লিকা, বার্ষিকী, মতিয়া, মোগড়া, বনমল্লিকা, চামবা। হাসনুহেনার তিনটি নাম :হাসনাহেনা, হাসনুহেনা, রাতের রানী। ইংরেজিতে Lady of the night.

রবীন্দ্রনাথের গানে কুঞ্জবনের বিবরণ যেমন পাওয়া যায়, তেমনি পাওয়া যাবে আমাদের হাজার বিচ্ছেদি গানে। এগুলো আমার সংগ্রহ। আছে কুঞ্জবনের শত নাম। কয়েকটি :কৃষষ্ণলতা, কামলতা, তারালতা, তরুলতা, সূর্যকান্তি, জয়ন্তী।

প্রিয় কাঁঠালচাপা, যা প্রিয়জনদের উপহার দিই পকেট থেকে বের করে। নজরুলের গানে প্রায় পাঁচশ’টি ফুলের কথা আছে। আজ আমার মালঞ্চ পরিপূর্ণ ফুল দিয়ে। ভালো লাগলে আরেক দিন।

mabbasi@dhaka.net