ফের বন্যায় পেকুয়ার লক্ষাধিক মানুষ পানিবন্ধী

প্রকাশ:| সোমবার, ২৭ জুলাই , ২০১৫ সময় ০৯:৪২ অপরাহ্ণ

পেকুয়া পানি

গিয়াস উদ্দিন, পেকুয়া
এক মাসের ব্যবধানে পেকুয়া সদর ও আশেপাশের কয়েকটি ইউনিয়নের কয়েক হাজার ঘরবাড়ী ফের পানির নীচে তলিয়ে গেছে। স্বাভাবিক জোয়ারের চেয়ে পানি বেড়েছে ৬-৭ ফুট। এতে করে কমপক্ষে লক্ষাধিক মানুষ পানিবন্দি হয়ে মানবেতর জীবন যাপন করছে। ৪ দিনের টানা বর্ষন ও পাহাড়ী ঢলের পানি প্রবল ¯্রােতে ক্ষতিগ্রস্থ বেড়ীবাঁধ দিয়ে লোকালয়ে ঢুকে গ্রাম, জনপদ সবকিছু পানির সাথে একাকার হয়ে গেছে। গত ২দিন ধরে বিদ্যুত বিচ্ছিন্ন রয়েছে পুরো পেকুয়া উপজেলা। উপজেলা প্রশাসন সূত্র জানায়, গত ২৫ জুনের বন্যায় পেকুয়া উপজেলায় কয়েক কোটি টাকার ক্ষতি সাধিত হয়েছিল। এই ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে না উঠতেই ফের ভয়াবহ বন্যার কবলে পড়েছে পেকুয়াবাসি।

গতকাল পেকুয়ার বিভিন্ন গ্রাম ঘুরে দেখা যায়, পেকুয়ার প্রায় ৯০ ভাগ ঘরবাড়ি পানির নীচে তলিয়ে গেছে। তীল ধরনের ঠাঁই নেই আশ্রয়কেন্দ্রগুলোতেও। পানিবন্দি লোকজন নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে গৃহপালিত পশু ও প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র নিয়ে দিগ¦দিগ ছুটাছুটি করতে দেখা গেছে। সবচেয়ে বেশী দুর্ভোগের মধ্যে পড়েছে নারী ও শিশুরা। মহাসড়ক পানির নীচে তলিয়ে যাওয়ায় পেকুয়ার সাথে চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারের যোগাযোগ সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে গেছে। ফ্লাট লেবেলের উপরে নির্মিত এবিসি মহাসড়কও পানির নীচে তলিয়ে যাওয়ায় একপ্রকার যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে পেকুয়া।

এদিকে প্রবল বৃষ্টিতে পানির নীচে তলিয়ে যাওয়ায় পেকুয়ার কোন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে গত ৩ দিন ধরে কোন ক্লাস হয়নি। উপজেলা পরিষদ ভবন ও উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের নীচতলায় পানি ঢুকে গেছে। এদিকে একমাস আগের বন্যার সময় আশ্রয়কেন্দ্রগুলোতে ক্ষতিগ্রস্ত পয়:নিস্কাশন ব্যবস্থা সংস্কার না করায় দুর্গন্ধ ও অপিরচ্ছন্ন পরিবেশেই আশ্রয় নিয়েছে বন্যার্থ লোকজন। অধিকাংশ নলকূপ পানির নীচে তলিয়ে যাওয়ায় খাবার পানি সংকট দেখা দিয়েছে। উপজেলা চেয়ারম্যান শাফায়েত আজিজ রাজু, সদর ইউপি চেয়ারম্যান বাহাদুর শাহকে সাথে নিয়ে হরিণাফাঁড়ি, বাঘগুজারা, সাঁকুর পাড়, গোয়াখালী, ছিরাদিয়া, বিলহাচুরা, মইয়্যাদিয়া বাইম্যাখালী সহ বেশ কয়েকটি এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, পানিবন্দি লোকজন সাঁতার কেটে কেটে নিরাপদ আশ্রয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন। এসময় তাদের আহাজারী ছিল চোখে পড়ার মতো। বাইম্যাখালী এলাকার আবদুল জাব্বার, সিকদার পাড়া এলাকার জোবাইর, ওবাইদুল হক, আবদুল হাকিম সহ আরো অনেকে জানান, গতবারের চেয়ে এবারের বন্যা ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। বেড়ীবাঁধ সংস্কার না করায় লাখ লাখ মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে বলে জানান তারা।

এ ব্যাপারে পেকুয়া সদর ইউপি চেয়ারম্যান বাহাদুর শাহর কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, মাতামহুরী নদীর বার্মার টেক ও পুরুইত্যাখালী রাবার ড্যামের দুই পাশে বিশাল অংশ জুড়ে বেড়ীবাঁধ ভেঙ্গে প্রবল ¯্রােতে পানি ঢুকার কারণে পেকুয়ার সদর, শিলখালী ও বারবাকিয়া ইউনিয়নের লক্ষাধিক মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। তিনি বলেন, একমাস আগের বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত এসব বেড়ীবাঁধ সংস্কারে দ্রুত উদ্দ্যোগ না নেয়ার ফলে সাধারণ মানুষগুলো ফের বন্যায় সর্বহারা হতে বসেছে। এরপরও বন্যার পানি যাতে দ্রুত নেমে যেতে পারে সেজন্য পেকুয়ার পশ্চীম অংশে বেড়ীবাঁধের কয়েকটি অংশে কেটে দিতে চাইলে একটি মহল বাঁধার সৃষ্টি করছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি। স্থানীয় লোকজনের সহায়তায় ২টি পয়েন্টে বেড়ীবাঁধ কেটে পানি দ্রুত নেমে যাওয়ার ব্যবস্থা করেছেন বলে জানান তিনি। এলাকায় মানবিক বিপর্যয় চলছে উল্লেখ করে তিনি বন্যা দুর্গত এলাকায় দ্রুত ত্রাণ দেয়ার পৌঁছানোর দাবি জানান।

এ দিকে বন্যা দুর্গত এলাকা পরিদর্শন করেন পেকুয়া উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান শাফায়াত আজিজ রাজু, মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান লুৎফা হায়দার রনি, ভাইস চেয়ারম্যান নুরুজ্জামান মনজু, পেকুয়া সদর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান বাহাদুর শাহ। তারা বন্যায় দুর্গত আশ্রয় কেন্দ্রগুলি পরিদর্শন করেন এবং তাদের নিকট ত্রাণ সামগ্রী বিতরণ করেন। উপজেলা চেয়ারম্যান শাফায়েত আজিজ রাজু বলেন, একমাস আগের বন্যায় অর্ধশত কোটি টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়েছিল। এই ক্ষত শুকানোর আগেই ফের বন্যায় পেকুয়ার জনপদ লন্ডভন্ড হয়ে গেছে। ২৫ জুনের বন্যার চেয়ে এবারের বন্যা দ্বীগুন ভয়াবহ। তিনি বলেন, বর্তমানে ‘জো’ চলছে, সাথে প্রবল বৃষ্টি হওয়ায় এবারে বানের পানি আরো বৃদ্ধি পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। বৃষ্টি না থামলে পরিস্থিতি আরো ভয়াবহ হতে পারে বলে জানান তিনি। তিনি পেকুয়াকে দুর্গত এলাকা ঘোষণা করে দ্রুত সরকারী ত্রাণ পৌঁছানোর জন্য সরকারের প্রতি দাবি জানান।

পেকুয়া উপজেলা নির্বাহী অফিসার মারুফুর রশিদ খান বলেন, পেকুয়ার বন্যা পরিস্থিতি খুবই ভয়াবহ। পেকুয়া সদর, শিলখালী ও বারবাকিয়া ইউনিয়নের একাংশের অধিকাংশ ঘরবাড়ী পানির নীচে তলিয়ে গেছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ক্ষতিগ্রস্ত বেড়ীবাঁধ সংস্কারে পানি উন্নয়ন বোর্ডের দীর্ঘসূত্রিতার কারণে পেকুয়ায় ফের বন্যা হল। এরপরও উপজেলা প্রশাসন বন্যা মোকাবেলায় সার্বিক প্রস্তুতি রেখেছে বলে জানান তিনি। ১মাস আগের বন্যার পরে পানি উন্নয়ন বোর্ড ও সরকারের বড় বড় কর্তারা পরিদর্শন করে গেলেও ক্ষতিগ্রস্ত বেড়ীবাঁধ সংস্কারে কোন বরাদ্দ হয়েছে কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, শুনেছি সরকার বরাদ্দ দিয়েছে কিন্তু কাজ হয়নি কেন সেটা পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তারাই ভাল বলতে পারবেন।

কক্সবাজার পানি উন্নয়ন বোর্ডের বেশ কয়েকজন কর্মকর্তার সাথে ক্ষতিগ্রস্ত বেড়ীবাঁেধর বিষয়ে ফোনে জানতে চাইলে তারা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, স্থানীয় এমপির উদাসিনতার কারণেই কাজ শুরু করা সম্ভব হয়নি। তাছাড়া জাতীয় পার্টির এমপি হওয়ায় তার সাথে আওয়ামীলীগ নেতাদের দর কশাকশির কারণেও কাজটা একমাস ধরে শুরুই করা যায়নি। সূত্র জানায়, পানি উন্নয়ন বোর্ডের ঠিকাদার না হলেও আওয়ামীলীগ নেতা নূর মোহাম্মদ ও আবুল শামা নামের দুই ব্যক্তিকে বেড়ীবাঁধ সংস্কারের কাজ দেয়া হয় বলে জানান কর্মকর্তারা।