ফেব্রুয়ারিতে সারা দেশে ২৪ শিশু হত্যাসহ, নিহত ২৮

প্রকাশ:| সোমবার, ২৯ ফেব্রুয়ারি , ২০১৬ সময় ০৮:০৭ অপরাহ্ণ

ফেব্রুয়ারিতে ২৪ শিশু হত্যা, পারিবারিক সহিংসতায় নিহত ২৮

ঢাকা, ২৯ ফেব্রুয়ারি ২০১৬.. দেশের বিভিন্ন স্থানে মাসে মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনায় আহত ২৫৬২ ও নিহত হয়েছে ৪৬৫ জন । দেশের সামগ্রিক মানবাধিকার পরিস্থিতি উদ্বেগজনক বলে মনে করে দেশের অন্যতম মানবাধিকার প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ মানবাধিকার বাস্তবায়ন সংস্থা। পুরো মাস জুড়েই আলোচনার শীর্ষে ছিল শিশু হত্যা ও নির্যাতন ।

পারিবারিক কোন্দলে আাহত ও নিহতের সংখ্যাও এই মাসে তুলনামূলক বেশী। নারী নির্যাতন, পারিবারিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক সহিংসতা, কথিত ক্রস ফায়ারে মানুষ হত্যা, অজ্ঞাত লাশ উদ্ধার, ভারতীয় সিমান্ত রক্ষী বাহিনীর কর্তৃক নিরিহ মানুষ হত্যা গতানুগতিক ভাবেই যেন চলছে। মানুষের পারিবারিক, সামাজিক ও নৈতিক মূল্যবোধের অবক্ষয় বাড়ছে।

বাংলাদেশ মানবাধিকার বাস্তবায়ন সংস্থার ফেব্রুয়ারি মাসের গবেষনা সেলের পাওয়া তথ্য-উপাত্ত থেকে দেখা যায়,

শিশু হত্যা ও নির্যাতনঃ বিগত কয়েক মাসের মধ্যে ফেব্রুয়ারি মাসেই শিশু নির্যাতন ও হত্যার ঘটনা ঘটেছে সবচেয়ে বেশী। এই মাসে ৪০ জন শিশুকে নির্যাতন করা হয় এর মধ্যে হত্যা করা হয় ২৪ শিশুকে। ১২ ফেব্রুয়ারি নাটোরের বাগাতিপাড়ার মাকুপাড়া বাজারে স্কুলপড়ুয়া তিন শিশুকে রশি দিয়ে হাত বেঁধে নির্মম নির্যাতন করা হয়। একই দিনে রাজশাহীর দুই স্কুল ছাত্রকে চুরির অপবাদ দিয়ে হাত পা বেঁধে সাত ঘন্টা ধওে নির্যাতন করা হয়। ৮ ফেব্রুয়ারি রাজধানীর গুলশান মডেল স্কুলের চার ছাত্রকে পুলিশ বেধড়ক পিটিয়েছে। । ২ ফেব্রুয়ারি সদ্যভূমিষ্ঠ ছেলে সন্তানকে চারতলা বাড়ির বারান্দা থেকে ফেলে দেয় তার মা। শুধু নির্যাতন নয় বেড়ে গেছে শিশু হত্যা ।

৭ ফেব্রুয়ারী নোয়াখালীর সুবর্ণচরে দুই বছরের এক শিশুকে কুপিয়ে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা। ১০ ফেব্রুয়ারি ময়মনসিংহের ভালুকায় শিশু কন্যাকে হত্যার পর আতœহত্যা করে বাবা। ১৬ ফেব্রুয়ারি অপহরনের পর মুক্তিপণ না পেয়ে গাজীপুরে চার বছরের এক শিশুকে হত্যা করা হয়। ১৪ ফেব্রুয়ারি হবিগঞ্জের সুদ্রাটিকি গ্রাম থেকে রহস্যজনক ভাবে নিখোজ হয় ৪ শিশু,পরবর্তীতে তাদেও লাশ মাটিচাপা অবস্থায় পাওয়া যায়। কিশোরগঞ্জে পরকীয়ায় আসক্ত হয়ে দেড় বছরের শিশুপুত্রকে হত্যা করে মা। মাসের শেষের দিনেও কুমিল্লায় হত্যা করা হয় দুই শিশুকে।

যৌতুকঃ ফেব্রুয়ারি মাসে যৌতুকের জন্য প্রাণ দিয়েছেন ৬ জন নারী এবং যৌতুকের কারনে আহত হয় ২৩ জন নারী । মুন্সিগজ্ঞের গৃহবধূ রাশিদা বেগমকে যৌতুকের কারনে ব্লেড দিয়ে কেটে রক্তাক্ত করে স্বামী ও দেবর। তাছাড়া রাঙ্গামাটির গৃহবধূ নূর বানু ও পাবনার শম্পা বেগম ও মাত্র পঁচিশ হাজার টাকার জন্য শাহজাদপুরের নাজমা খাতুনকে প্রাণ দিতে হয়েছে।

পারিবারিক কলহঃ চলতি মাসে বেশ কিছু পারিবারিক সহিংসতার ঘটনা অলোচিত হয়েছে। পারিবারিক কলহে চলতি মাসে নিহত হয় ২৮ জন ও আহত হয় ৬৯ জন । পারিবারিক কলহের জের ধরে বেয়ালমাড়িতে ভাইয়ের হাতে খুন হন বোন। তাছাড়া পাবনায় পারিবারিক কলহের কারনে এক মা ও তার সন্তানের বিষ পানে মৃত্যু হয়। পারিবারিক সদস্যদের মধ্যে দ্বন্দ, রাগ, পরকীয়া সহ বিভিন্ন পারিবারিক কারনে এই সব মৃত্যু সংগঠিত হয়।

ধর্ষন ঃ এই মাসে মোট ধর্ষণের শিকার হয়েছে ২৫ জন নারী ও শিশু । এদের মধ্যে ৭ জন নারী, গণধর্ষণের শিকার হয় ৬ জন ও ধর্ষনের পর হত্যা করা হয় ৩ জনকে। এই মাসে ৯ জন শিশুধর্ষিত হয়। পিরোজপুরে শিরিন আক্তার নামের এক কলেজ ছাত্রীকে ধর্ষনের পর হত্যা করা করে দুর্বৃত্তরা। ফেব্রুযারি মাসে ধর্ষনের ঘটনা বেশী সংগঠিত হয়েছে ঢাকা বিভাগে।

ক্রস ফায়ারে নিহত ঃ গত মাসে কথিত ক্রস ফায়ারের নামে মৃত্যু হয় ১৩ জনের, এর মধ্যে পুলিশের ক্রস ফায়ারে নিহত হয় ৩ জন , র‌্যাব কর্তৃক ৮ জন ও অন্যান্য বাহিনী কর্তৃক ২ জন।

আত্মহত্যা ঃ চলতি মাসে আত্মহত্যা করেছে মোট জন ৩৬ । এদের মধ্যে ৭জন পুরুষ ও ২৯ জন নারী। এর মধ্যে ঢাকা ও রাজশাহী আতœহত্যা করে ২০ জন নারী। বাকী ঘটনাগুলো ঘটে বারশাল, চট্টগ্রাম,ও খুলনায় । পারিবারিক দ্বন্দ্ব, প্রেমে ব্যর্থতা ও যৌন হয়রানীর কারণে আত্মহত্যার ঘটনা ঘটেছে বলে রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়।

খুন ঃ সারা দেশে সন্ত্রাসী কর্তৃক নিহত ৭৩ জন ও আহত হয় ১৪২ জন। ২১ ফেব্রুয়ারি পঞ্চগড়ে মঠ পূজারীকে নৃশংসভাবে জবাই করে হত্যা করা হয়। সিলেটে সন্ত্রাসী কর্তৃক আহত হন এক সাংবাদিক। তাছাড়া সিদ্ধিরগঞ্জে নিজ বাড়ীতে খুন হন এক বৃদ্ধা ।

সামাজিক অসন্তোষঃ বিভিন্ন কারনে সামাজিক অসন্তোষের শিকার হয়ে নিহত হয়েছেন ৩১ জন এবং আহত হয়েছেন ৬৩২ জন। বেশীর ভাগ ঘটনাই ঘটেছে জমি জমা , দুই গ্রামের খেলা নিয়ে সংঘর্ষ বা তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে।

রাজনৈতিক সহিংসতা ঃ রাজনৈতিক সহিংসতায় আহত হয়েছে ১৭২ জন ও নিহত হয়েছে ২ জন। বেড়ে গেছে রাজনৈতিক অন্তঃকোন্দলে আহতের সংখ্যা । আধিপত্য বিস্তার, টেন্ডার বানিজ্য, এলাকা দখল, চাঁদাবাজী নিয়নন্ত্রন ও ক্ষমতার দাপট প্রদর্শনের জন্য আওয়ামী লীগের অন্তঃকোন্দলে আহত ১২৯ জন বিএনপির অন্তঃ কোন্দলে আহত হয় ৭ জন।

তাছাড়া মাদকের প্রভাবে বিভিন্ন ভাবে আহত হয়েছে ৬ জন ও নিহতের সংখ্যা ১ জন। তাছাড়া পানিতে ডুবে, অসাবধানবশত, বিদ্যুৎপৃস্ট হয়ে মৃত্যুবরন করেছে ৩৪ জন। এ মাসেও চিকিৎসকের ভুল চিকিৎসায় মৃত্যু হয় ৬ জনের। চলতি মাসে বিরোধী রাজনৈতিক দলকে নিয়ন্ত্রনের জন্য রাজনৈতিক অজুহাতে গনগ্রেফতার হয়েছে ৭২৫ জনেরও বেশী।

(তথ্য সুত্রঃ ফেব্রুয়ারি, ২০১৬ মাসে দেশে প্রকাশিত বিভিন্ন দৈনিক পত্র-পত্রিকা এবং সংস্থার বিভিন্ন জেলা, উপজেলা ও পৌরসভা শাখার মাধ্যমে সংগৃহিত তথ্য। এর বাইরেও মানবাধিকার লংঘন জনিত কিছু ঘটনা থাকতে পারে যা আমাদের সীমাবদ্ধতার কারনে সংগ্রহ করা সম্ভন হয়নি)