প্রাণবন্ত হয়ে উঠছে মাটির তৈরি নানা সামগ্রী

প্রকাশ:| মঙ্গলবার, ১০ সেপ্টেম্বর , ২০১৩ সময় ১০:১৫ অপরাহ্ণ

hosto shelpoগৃহস্থালির গন্ডি পেরিয়ে লক্ষ্মী রানীর দুই হাতের নিখুঁত ছোঁয়ায় প্রাণবন্ত হয়ে উঠছে মাটির তৈরি নানা সামগ্রী। পটুয়াখালীর বাউফল উপজেলার পালপাড়া গোবিন্দ পালের স্ত্রী লক্ষ্মী রানী। এক যুগ ধরে তিনি মাটি দিয়ে তৈরি করছেন হাঁড়ি-পাতিল, জালের কাঠি, পুতুল, কলস, বাচ্চাদের খেলনাসহ নানা ধরনের সামগ্রী। এসব বাহারি ডিজাইন, রঙ, ফিনিশিংয়ের কারণে পণ্যগুলো নজর কাড়ে সবার। সাধারণ মৃৎশিল্পীদের প্রচেষ্টায় এলাকায় চারটি আধুনিক মানসম্পন্ন কারখানা গড়ে উঠেছে। এ কারখানার বেশিরভাগই নারী শ্রমিক।

গোবিন্দ পালের ঘরে সম্ভাবনাময় নারী লক্ষ্মী রানী। গ্রামীণ জনপদের উজ্জ্বল নক্ষত্র বাউফলের নারী লক্ষ্মী রানী পাল। সাংসারিক কাজ আর সন্তান লালন-পালনের মধ্যেই নিজেকে সীমাবদ্ধ রাখেননি এ নারী। গৃহস্থালির গ-ি পেরিয়ে লক্ষ্মী রানীর দু’হাতের নিখুঁত ছোঁয়ায় প্রাণবন্ত হয়ে উঠছে মাটির তৈরি নানা সামগ্রী। তার এ শিল্প তাক লাগিয়ে দিয়েছে নিজ উপজেলাসহ বিভিন্ন দেশের মানুষের মনে। মাটির তৈরি সাধারণ পণ্যে লক্ষ্মীর দুই হাতের পরশে হয়ে উঠছে নান্দনিক ও দৃষ্টিনন্দন। বাহারি সব ডিজাইন, রঙ, ফিনিশিংয়ের কারণে লক্ষ্মীর তৈরি মাটির পণ্যগুলো নজর কাড়ে সবার।

জেলার বাউফল উপজেলার মদনপুরা ইউনিয়নের পালপাড়ায় লক্ষ্মীর বাড়ি। উপজেলার কাগুজিরপুল এলাকার পালপাড়া বললে আরও সহজেই চিনে ফেলে বাউফলবাসী। তার এ কাজের উৎসাহ জুগিয়ে ছিলেন তার স্বামী গোবিন্দ চন্দ্র পাল। বেশিরভাগ নারী শ্রমিকদের ওপর ভিত্তি করে ওই এলাকায় ৪টি আধুনিক মানসম্মত কারখানা গড়ে ওঠেছে। সাধারণ মৃৎশিল্পীদের মতো প্রায় এক যুগ আগে থেকে তার স্বামী গোবিন্দ শুধু মাটির তৈরি হাঁড়ি-পাতিল, জালের কাঠি, পুতুল, কলস, বাচ্চাদের খেলনা, রসের হাঁড়িসহ গ্রামবাংলার ঘরে ব্যবহার উপযোগী নানা ধরনের মাটির সামগ্রী তৈরি করে স্থানীয় বাজারে বিক্রি করতেন। প্রায় ৫ বছর আগে লক্ষ্মী গোবিন্দের বউ হয়ে আসে। এরপরই পাল্টে যায় গোবিন্দের জরাজীর্ণ মৃৎশিল্প কারখানাটি। প্রতিবেশী বয়োজ্যেষ্ঠরা হাস্যরসে বলেন, এ যেন গোবিন্দের গৃহে লক্ষ্মী দেবীর আবির্ভাব। কিছু দিন পার না হতেই লক্ষ্মী তার সাংসারিক কাজ শেষে স্বামীর সঙ্গে মাটির কাজে সহযোগিতা করত। এরপর গোবিন্দের মৃৎশিল্পে লক্ষ্মীর দুই হাতের ছোঁয়ায় বয়ে আনে এক মডেল মৃৎশিল্প। তৈরি পণ্যের আধুনিক সব ডিজাইন দিতে হাত দেন লক্ষ্মী।

ঢাকার বাজারে তার রকমারি ডিজাইন করা উৎপাদিত পণ্যের ব্যাপক চাহিদা থাকায় বাজারমুখী সরবরাহ হয় তার পণ্যগুলো। বিশেষ করে আড়ংয়ে লক্ষ্মীর পণ্যের বেশ কদর। শুধু আড়ং নয়, ওই প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে লক্ষ্মীর পণ্য এশিয়া মহাদেশের গ-ি পেরিয়ে ইউরোপ, আমেরিকা ও অস্ট্রেলিয়া মহাদেশে ছড়িয়ে পড়েছে বলে জানা গেছে। পণ্যগুলো দখল করে নিয়েছে কানাডা, আমেরিকা, গ্রেট ব্রিটেন, নেদারল্যান্ডস, অস্ট্রেলিয়া এবং জাপানের মতো শিল্পোন্নত দেশের বাজারগুলোও। মৃৎশিল্পের মডেল লক্ষ্মীর এ সফলতার পেছনে কোনো একাডেমিক্যাল জ্ঞান কিংবা সার্টিফিকেট নেই। শুধু নিজের মেধা, বিচক্ষণতা আর কৌশলকে কাজে লাগিয়ে বিশ্ববাজার দখল করেছেন। এ পেশাকে আধুনিকতার ছোঁয়া লাগাতে লক্ষ্মী শ্বশুর বাড়িতে পা রেখেই নতুন কিছু করার জন্য ভাবতে শুরু করেন। প্রথমে ক্যাটালগের ডিজাইন দেখে কাজে হাত দেন তিনি। অভিজ্ঞতা বেড়ে যাওয়ার কারণে এখন নিজেই মনের মাধুরী মিশিয়ে ডিজাইন তৈরি করেন। ৫ বছর আগে স্বামীর পুরনো চাক্তিতেই কাজ শুরু করেন। পণ্যের চাহিদা ও লোকবল বেড়ে যাওয়ায় নতুন করে দুটি চাক্তিসহ ২৫ এবং ৪০ ফুট দৈর্ঘাকার একটি বৃহৎ কারখানা তৈরি করেছেন তিনি। ওই কারখানায়ই কাজ চলে এখন।

তৈরি করেন ৫৮ ধরনের ক্রোকারিজসহ শোপিস সামগ্রী। এর মধ্যে গ্ল্যাস, মগ, প্লেট, তরকারির বাটি, মিষ্টির বাটি, জগ, ফুলদানি, চায়ের কাপ-পিরিচ, মোমদানি, এস্ট্রে, পা-ঘষনি (ঝামা) উল্লেখ্যযোগ্য। কোনো ধরনের কেমিক্যাল ছাড়াই মাটির এ পণ্যগুলোয় যে রঙ করা হয়, তাও স্থানীয়ভাবে সংগ্রহ করা এবং প্রাকৃতিক সব উপাদান দিয়ে তৈরি। বিশেষ করে, লাইট অরেঞ্জ রঙের মধ্যে মনোমুগ্ধকর কালো যে সেট দেয়া হয় তা একটি গাছের কষ দ্বারা তৈরি। প্রথমে ১০ হাজার টাকা পুঁজি নিয়ে যাত্রা শুরু হয় তার। বর্তমানে স্থানীয় বাজারদরে ১ লাখ ৫০ হাজার টাকার পণ্য সরবরাহ করেন আড়ংয়ে প্রতি মাসে। একা কাজ সামাল দিতে না পারায় তার প্রতিষ্ঠানে সকাল থেকে সন্ধ্যা অবধি নিয়োমিত পারুল বেগম (২৫), চেহের ভানু (৩৫), সেলিনা বেগম (২৮), শান্তি রানী (৩৫), সখিনা বেগম (৩৫), ফাতেমা বেগম (২৪), মাজেদা বেগম (৪৫) ও ফজিলা বেগম (৪০), নিলুফা বেগম (১৮) ও শিউলি বেগম (২৮) কাজ করে যাচ্ছেন। তারা প্রত্যেকে লক্ষ্মীর মতোই দক্ষ কারিগর। কাজ অনুযায়ী মাসে আয় হয়। প্রত্যেকের আয় ২-৩ হাজার টাকা মাসে। এসবই তাদের বাড়তি আয়। উপার্জনের এ অর্থের একটি অংশ পুঁজি করেন, পাশাপাশি সন্তানদের লেখাপড়া, বাড়তি খাদ্যসহ সংসারের সমৃদ্ধির জন্য ব্যয় করেন। নিজেদের সংসারের রান্নাসহ আনুষঙ্গিক কাজ মেটাতে দুপুরে দু’আড়াই ঘণ্টা ছুটিও পান কারখানা থেকে। মাজেদা বেগম জানান, তার আয়ের টাকা দিয়ে ২ সন্তান রাসেল (১১) এবং রিপার (৬) লেখাপড়ার আর্থিক জোগান দেন। নিজের উপার্জন দিয়ে ১ লাখ টাকা ব্যয়ে ঘর তুলেছেন। এখন আর স্বামীর বাজার সদাইয়ের দিকে তাকিয়ে থাকতে হয় না। ভালো খেতে মন চাইলে নিজের আয় দিয়ে তা মেটাতে পারেন। সন্তানদের পুষ্টিকরসহ বাড়তি খাদ্যেরও জোগান দেন তিনি। সংসারে অভাব কী সেটা এখন বোঝেন না পারুল। নিজের আয়ে চলছে ৪০০ টাকার একটি ব্যাংক ডিপিএস। লক্ষ্মীর কারখানার অন্যসব নারী শ্রমিকও পারুলের মতো নিজেদের আয় দিয়ে স্বাবলম্বী। একই প্রতিষ্ঠানের ফাতেমা বেগম বলেন, ‘থ্রিতে পড়া পোলা সবুজ আর ওয়ানে পড়া মাইয়া রুনুরে ভালো খাওয়াতে পারমু, স্কুলে দিতে পারমু, অ্যা বিয়ার পর চিন্তাই করতে পারি নাই’। তাদের দাবি, এ প্রতিষ্ঠানগুলো গড়ে না উঠলে এবং পণ্যগুলো ঢাকা আর বিদেশে রফতানি না হলে কারখানাগুলোয় কর্মরত পরিবারের সদস্যদের অভুক্ত দিন কাটাতে হতো। শুধু লক্ষ্মী রানী নয়, ৩৫ বছরের সবিতা রানী পাল, ৫০ বছরের কমলা রানী পাল এবং ৫৫ বছরের খুকু রানী পালেরও বিশাল কারখানা। তাদের ওই কারখানায় রয়েছে ১৪ জন নারী শ্রমিকÑ হোসনে আরা (৩৫), ফাতেমা বেগম (৩২), ঝরনা রানী (২৮), হাসিনা বেগম (২৭), সবিতা রানী (৩০), মিনারা বেগম (৩২), কল্পনা রানী (৪২), দেখী রানী (৩৫), শিল্পী বেগম (২৫), সঙ্গীতা রানী পাল (২৮), শিখা রানী (২৫), নুর সাহেদা বেগম (৩০), রাহিমা বেগম (২২) এবং চম্পা বেগম (৩০)। নারীদের শ্রমের আদলে গড়ে ওঠা এ শিল্প পল্লীগুলোয় প্রায় ৫০ জন নারী-পুরুষ কাজ করেন। বাউফলের এ শিল্পটির কারণে এ ৫০ পরিবারে এখন অর্থনৈতিক সচ্ছলতা পুরোপুরি। লক্ষ্মী, সবিতা, কমলা, কিংবা খুকু রানীর মৃৎসামগ্রীগুলো ঢাকা, আড়ং এবং ঢাকা হেন্ডিক্র্যাফস্ট কিনে নেয়। প্রতি মাসে প্রতিটি কারখানা থেকে প্রায় ১ লাখ ৫০ হাজার থেকে ২ লাখ টাকার মাটির সামগ্রী সাপ্লাই দেয়া হয়।

বর্ষা মৌসুমে কাজে একটু ভাটা পড়ে কারণ ওই সময় সূর্যের লুকোচুরির ফলে উৎপাদিত পণ্যসামগ্রী রোদে শুকানো দায় হয়ে যায়। সে ক্ষেত্রে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় যদি একটি বৃহদাকার বৈদ্যুতিক ল্যাম্প সেটের ঘর এবং একটি বৈদ্যুতিক চুল্লি তৈরি করে দেয়া হয়, তাহলে ১২ মাসের উৎপাদন প্রায় দ্বিগুণ হবে। বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের সম্ভাবনা বৃদ্ধিসহ সরবরাহ বাড়বে। লক্ষ্মী জানায়, স্বল্প শর্তে দীর্ঘমেয়াদি সরকারি ব্যাংকগুলো থেকে ঋণ বিতরণ করা হলে এ শিল্পের সঙ্গে জড়িত মালিকদের অর্থসঙ্কট কেটে যেত। বৈদ্যুতিক চুল্লি স্থাপন এবং উৎপাদিত পণ্যগুলো বিদেশে সরাসরি রফতানির ব্যবস্থা করা হলে বাউফলে গড়ে উঠবে অসংখ্য মৃৎশিল্পের মানসম্মত কারখানা। এ পদক্ষেপ নেয়া হলে এ শিল্পকে ঘিরে আরও অনেক গরিব-দুস্থের কর্মসংস্থানসহ দেশি-বিদেশি অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি অর্জন সম্ভব হতো। সমৃদ্ধিশালী এ কাজে লক্ষ্মী, সবিতা, কমলা এবং খুকু আমাদের সম্পদ, আর এখানে কর্মরত শ্রমিকরা হচ্ছে সে সম্পদের অলঙ্কার।