প্রশাসন ও পুলিশকে দোষারোপ করেছেন সভাপতি-সম্পাদক

প্রকাশ:| মঙ্গলবার, ৩ নভেম্বর , ২০১৫ সময় ১০:২৫ অপরাহ্ণ

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রলীগের দুই গ্রুপের রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের ২৪ ঘন্টা অতিবাহিত না হতেই একসাথে সংবাদ সম্মেলন করে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ও পুলিশকে দোষারোপ করেছেন বিবাদমান ছাত্রলীগের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক।

সভাপতি-সম্পাদকএমনকি প্রকাশ্য দিন-দুপুরে দুপক্ষ নিজেদের মধ্যে সংঘর্ষে জড়ানোর পর ছাত্রলীগ নিয়ন্ত্রিত হল থেকে পুলিশ বিপুল পরিমাণ দেশীয় অস্ত্র উদ্ধার করলেও এটিকে ‘লুটপাট’ বলে অভিযোগ করেছে ছাত্রলীগ। এমনকি চবি প্রশাসন ও পুলিশের মধ্যে ‘দায়ীদের’ বিরুদ্ধে ১০ নভেম্বরের মধ্যে ‘ব্যবস্থা’ নেয়ার আল্টিমেটাম দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কাছে ১০ লাখ টাকার ‘ক্ষতিপূরণও’ দাবি করা হয়েছে সংঘর্ষে লিপ্ত চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগ।

মঙ্গলবার সন্ধ্যা সাতটার দিকে নগরীর মোমিন রোডের একটি কমিউনিটি সেন্টারে সংবাদ সম্মেলন করে এসব দাবি করেন চবি ছাত্রলীগের সভাপতি আলমগীর টিপু ও সাধারণ সম্পাদক ফজলে রাব্বি সুজন। এদের মধ্যে সভাপতি টিপু নগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দিনের অনুসারী এবং সুজন নগর আওয়ামী লীগের সভাপতি ও সাবেক মেয়র এ বি এম মহিউদ্দিন চৌধুরীর অনুসারী। এরমধ্যে টিপুর বিরুদ্ধে ২০১২ সালের ২৪ জানুয়ারি সিআরবিতে রেলওয়ের টেন্ডার নিয়ে সংঘটিত জোড়া খুনের মামলায় নাম রয়েছে।

সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, ‘ছাত্রলীগের বর্তমান কমিটি যখন পরিচ্ছন্নভাবে চবি ছাত্রলীগকে যখন এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে ঠিক তখনই প্রশাসনের ভেতরে ঘাপটি মেরে থাকা জামাত-শিবিরের এজেন্টরা ছাত্রলীগের মধ্যে সংঘর্ষ তৈরির পাঁয়তারা করছে। গত ২ নভেম্বর তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে অনাখঙ্কিত পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। এ সময় ছাত্রলীগ নেতৃবৃন্দ যখন সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করছিল ঠিক তখনই বিশ্ববিদ্যায়ের উপাচার্যের নির্দেশে পুলিশ শাহ আমানত ও শাহ জালাল হলে নির্বচারে গুলি বর্ষণ করে এবং টিয়ারশেল মারতে থাকে।’

পুলিশের উপর ছাত্রলীগের হামলা ঘটনা স্বীকার করে ছাত্রলীগ নেতারা বলেন, ‘যারাই এ অপতৎপরতা চালিয়েছে তারা যদি ছাত্রলীগের কেউ হয় তাহলে তাদের ছাত্রলীগ ছাড় দেবেনা। কিন্তু পুলিশ প্রশাসন সাধারণ শিক্ষার্থীদের মারধর বিষয়ে আমরা তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানাচ্ছি।’

এমনিক সংবাদ সম্মেলনে ছাত্রলীগ নেতারা দাবি করেন, ‘পুলিশ শুধু মারধরে সীমাবদ্ধ থাকেনি, তারা শিক্ষার্থীদের রুমে ঢুকে ছাত্র, ভর্তিচ্ছু ও তাদের অভিভাবকদের মোবাইল, নগদ টাকা লুটপাট করেছে।’

যদিও সাম্প্রতিক সময়ে ওই দুই হল শাখা ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে সাধারণ শিক্ষার্থীরা বিভিন্ন জিনিসপত্র চুরির অভিযোগ এনেছিল।

গতকালের সংঘর্ষের সময় অস্ত্রসহ অ্যাকশনে থাকা যাদের ছবি গণমাধ্যমে এসেছে তারা ছাত্রলীগের কেউ নয় বলেও দাবি করেন চবি ছাত্রলীগের সভাপতি আলমগীর টিপু। অথচ গত কয়েক বছর ধরে ছাত্রলীগের অস্ত্রধারী এসব ক্যাডাররাই বিশ্ববিদ্যালয়ে নানা অঘটনের জন্ম দিয়েচ্ছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

সোমবার ভর্তিচ্ছু শিক্ষার্থীদের অভ্যর্থনা জানানোকে কেন্দ্র করে ছাত্রলীগের দু’গ্রুপের মধ্যে সংঘর্ষের পর পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ চেষ্টা করলে সেখানে পুলিশের ওপরও হামলা চালায় ছাত্রলীগের কতিপয় নেতাকর্মী। পুলিশ সেকারণে বিকেলে ছাত্রলীগ নিয়ন্ত্রিত শাহ আমানত ও শাহ জালাল হলে অভিযান চালিয়ে বিপুল পরিমাণ দেশিয় অস্ত্র উদ্ধার করে। যদিও অস্ত্র উদ্ধারের এই ঘটনাকে সরকার সমর্থিত এই সংগঠনটির পক্ষ থেকে ‘লুটপাট’ হিসেবে অবহিত করা হয়েছে।

আর এই লুটপাটের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে সময় বেঁধে দিয়ে ১০ লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ দাবি করা হয়। টিপু বলেন, ‘আগামী ১০ নভেম্বরের মধ্যে এ ক্ষতিপূরণ দিতে হবে এবং শিক্ষার্থীদের উপর হামলায় জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নিলে ছাত্রলীগ কঠোর কর্মসূচি দিতে বাধ্য থাকবে।’

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে বিশ্ববিদ্যালয় প্রক্টর আলী আজগর চৌধুরী বাংলামেইলকে বলেন, ‘ওরা (ছাত্রলীগ) রামদা নিয়ে ঘুরবে, অস্ত্রের ঝনঝনানি দেখাবে- এসব কিভাবে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন মেনে নিবে? সরকারের ভাবমূর্তি রক্ষায়  আমরা বিশ্ববিদ্যালয়ে শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় রাখতে পুলিশ প্রশাসনকে সর্বোচ্চ কঠোর ব্যবস্থা নিতে অনুরোধ জানিয়েছি। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কাছে শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তার বিষয়টি সর্বোচ্চ। পুলিশ যদি সেদিন ব্যবস্থা না নিতো তাহলে প্রাণহানিও ঘটতে পারতো। এমনকি ভর্তি পরীক্ষা নিয়েও আমাদের চিন্তিত থাকতে হতো।’

লুটপাটের অভিযোগের বিষয়ে জানতে হাটহাজারী থানা ওসি মোহাম্মদ ইসমাইল বাংলামেইলকে বলেন, ‘আমাদের কাছে তথ্য এসেছে তারা নতুন রামদা বানিয়েছে ২শ। কিন্তু আমরা উদ্ধার করতে পেরেছি মাত্র ১শ। বাকিগুলো তারা অভিযান পরিচালনা করার আগেই গায়েব করে ফেলেছে। তারা মূলত তাদের সন্ত্রাসী কর্মকান্ডের বিষয়টি ঢাকতেই পুলিশ বাহিনীর উপর লুটপাটের অভিযোগ তুলছে। তারা পুলিশের গায়ে হাত তুলবে, পুলিশের উপর হামলা চালাবে, আর বিশ্ববিদ্যালয়ে অরাজকতা পরিস্থিতি তৈরি করবে- তাহলে পুলিশ কি তা দেখে থাকবে?’

উল্লেখ্য, গত ২ নভেম্বর ভর্তিচ্ছুদের স্বাগত জানাতে গিয়ে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে ছাত্রলীগের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের অনুসারীরা। এ সময় পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে শাহ জালাল ও শাহ আমানত হলে লাঠিচার্জ করে ছত্রভঙ্গ করে দেয় পুলিশ।

এঘটনায় পুলিশ বাদী হয়ে সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের অনুসারী ১০ জনের বিরুদ্ধে নাম উল্লেখ করে দুটি অস্ত্র মামলা ও ৩৬ জনের নাম উল্লেখ করে পুলিশের ওপর হামলার মামলা দায়ের করে। এ পর্যন্ত ৩৮ জনকে গ্রেপ্তার করে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠিয়েছে পুলিশ।

এদিকে ঘটনা তদন্তে বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারি প্রক্টর হেলাল উদ্দিন চৌধুরীকে প্রধান করে অপর দুই সহকারি প্রক্টর মিজানুর রহমান ও শহীদুল ইসলামকে সদস্য করে একটি কমিটি গঠন করেছে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় প্রক্টর।


আরোও সংবাদ