প্রশাসনের নাকের ডগায় বসে সাগরের মাঝখানে ছেড়ে দিচ্ছে

প্রকাশ:| রবিবার, ১৭ মে , ২০১৫ সময় ০৫:৩৪ অপরাহ্ণ

সম্প্রতি বাংলাদেশ থেকে পাচার হওয়া হাজার হাজার বাংলাদেশি ও রোহিঙ্গা সাগরে ট্রলারে ভাসমান অবস্থায় মানবেতর জীবন যাপন করায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের শীর্ষ দুই নেতা। এঘটনায় সরকারের ভূমিকা নিয়ে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়াও জানিয়েছেন তারা।

রোববার বিকেলে গণমাধ্যমে প্রেরিত এক বিবৃতিতে সংগঠনটির মহাসচিব আল্লামা জুনায়েদ বাবুনগরী ও সাংগঠনিক সম্পাদক আল্লামা আজিজুল হক ইসলামাবাদী এ ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানান। তবে এ ঘটনায় কোন বক্তব্য প্রদান করেননি সংগঠনটির আমীর আল্লামা শাহ আহমদ শফী।

হেফাজতের এ দু’নেতা বলেন, ‘বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে মানব পাচারকারী দালাল চক্র প্রশাসনের নাকের ডগায় বসে দেশের বেকার যুবক, নারী ও কিশোরদের বিদেশে ভালো চাকুরী দেওয়ার প্রলোভনে ট্রলারে করে সাগরের মাঝখানে ছেড়ে দিচ্ছে। না হয় থাইল্যান্ডের গহীন জঙ্গলে নিয়ে গিয়ে জিম্মি করে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে। এইমুহূর্তে অথৈ সাগরের মাঝে ট্রলারে ভাসমান অবস্থায় এবং জনমানবহীন উপকূলে হাজার হাজার অসহায় বাংলাদেশি এবং রোহিঙ্গা মুসলমান ভাইবোনদের নির্যাতন ও অনাহারে অকালমৃত্যুর ঘটনায় আমরা ভীষণভাবে উদ্বিগ্ন ও ব্যথিত। এই পরিস্থিতিতে সরকারের নির্মম অবহেলা ও তৎপরতাহীনতায় আমরা অত্যন্ত ক্ষুব্ধ।’

তারা আরো বলেন, ‘থাইল্যান্ড ও মালয়েশিয়ার সীমান্তবর্তী গভীর জঙ্গলে বিভিন্ন গুপ্তস্থানে পাচারকৃত অসহায় বাংলাদেশি ও রোহিঙ্গাদের আটকে রেখে পাশবিক নির্যাতন চালিয়ে অর্থ আদায় করার চেষ্টা চলছে। সম্প্রতি থাইল্যান্ডের জঙ্গলে বাংলাদেশিদের গণকবরের সন্ধান পাওয়ার ঘটনা দেশ-বিদেশে আলোড়ন তুলেছে। প্রতারক ও ভন্ড আদমব্যাপারীদের খপ্পরে পড়ে উপার্জনের তাগিদে বিদেশ গমনকারী বাংলাদেশি ও রোহিঙ্গারা অমানবিক ও নির্যাতনমূলক পরিস্থিতির শিকার হচ্ছেন। আর এদিকে দেশে পাচারকৃতদের আত্মীয়-স্বজনরা বিদেশ গমনকারী তাদের প্রিয়জনদের অনিশ্চিত ভবিষ্যত ও আশঙ্কায় দিনের পর দিন চোখের পানি ফেলে হাহাকার করছেন। সরকারের উচিত এদের পাশে দাঁড়ানো এবং প্রতারক দালাল চক্রের কবল থেকে তাদের প্রিয়জনদের উদ্ধারে কার্যকরভাবে তৎপর হওয়া।’

হেফাজতের শীর্ষ এ দু’নেতা বলেন, ‘প্রশাসনের কতিপয় পথভ্রষ্ট কর্মকর্তার সহায়তায় এইসব মানব পাচারকারী চক্রের গডফাদাররা এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরে; উপরন্তু তাদের সাথে পাচারকারীদের বিশেষ লেনদেনের সম্পর্ক রয়েছে বলে অভিযোগও উঠেছে বিভিন্ন মহল থেকে। গডফাদার ও দালাল চক্র পুরো দেশজুড়েই তাদের অবৈধ তৎপরতা অব্যাহত রেখেছে।’

‘আমরা মনে করি, মানব পাচার রোধে সরকারের চরম উদাসীনতা ও প্রশাসনের অমনোযোগিতার সুযোগেই দালাল চক্রের কার্যক্রম ও মানব পাচারের মতো জঘন্য অপরাধ উত্তরোত্তর বেড়েই চলছে। মানব পাচার একটি মানবতাবিরোধী অপরাধ। মানব পাচারের ক্ষেত্রে আর্থ-সামাজিক কারণগুলো মূলত অনুঘটক হিসেবে কাজ করে। দেশে পর্যাপ্ত কর্মসংস্থান না থাকায় বিদেশে ভালো চাকুরি পাওয়ার আশায় শিক্ষিত-অশিক্ষিত বেকার যুবকশ্রেণি অজ্ঞতার কারণে বিভিন্ন প্রতারক দালাল চক্রের ফাঁদে পা দেন। এক্ষেত্রে মিডিয়ার মাধ্যমে ও সরকারিভাবে সামাজিক সচেতনতা বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া বাঞ্ছনীয়।’

তারা আরো বলেন, ‘বেকারত্ব কমানোর জন্য সরকারের পক্ষ থেকে দেশে কর্মসংস্থান ও বিদেশি বিনিয়োগ বাড়ানোর ক্ষেত্রে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি হয়ে পড়েছে। মানব পাচারের কারণে দেশের মানুষ তাদের অনেক আত্মীয়-স্বজন ও প্রিয়জনদের অকালে হারাচ্ছেন। এরপরও মানব পাচার রোধে শাস্তিমূলক আইন থাকলেও তা যথাযথভাবে প্রয়োগ হচ্ছেনা।’

হেফাজত নেতৃবৃন্দ বলেন, ‘থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়াসহ বিভিন্ন দেশের সাথে মানব পাচারের সমস্যা এবং সেসব দেশের অভিবাসননীতি নিয়ে আমাদের সরকারের দ্বিপক্ষীয় কূটনৈতিক আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের পথ বের করা সম্ভব। এই সমস্যাগুলোর প্রতি অবহেলা ও উদাসীনতার কুফল আমরা ইতোমধ্যেই দেখতে পাচ্ছি। সুতরাং সরকারের প্রতি আমাদের জোর দাবি হলো, ইনসানিয়াত তথা আর্ত মানবতার স্বার্থে অথৈ সাগরে বিভিন্ন ট্রলারে ভাসমান অবস্থায় এবং অজানা উপকূলে আটকে পড়া বাংলাদেশি ও রোহিঙ্গা মুসলমান ভাইবোনদের নিকট অতিসত্বর যথাপরিমাণ খাদ্য ও পানি পৌঁছানোর ব্যবস্থা করা হোক এবং একইসাথে তাদেরকে উদ্ধারের ব্যাপারে ত্বরিত উদ্যোগ নেওয়া হোক। অন্যদিকে প্রশাসনের প্রতি মানব পাচারকারী দস্যু এবং তাদের দোসরদের গ্রেপ্তার করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আহ্বান জানাচ্ছি।’