প্রযুক্তির ছোঁয়ায় পাল্টে গেল লিটনের জীবন

প্রকাশ:| মঙ্গলবার, ২১ জুন , ২০১৬ সময় ০৯:২৭ অপরাহ্ণ

লিটন
ইমরান এমি, আনোয়ারা:
জীবনে প্রতিষ্ঠা পাওয়ার জন্য মানুষ কত কিছুই না করেন। জীবিকার তাগিদা লিটন দেব নাথ এক সময় ডাক্তারের সহকারী হিসাবে কাজ করতেন। তা নয় বছর আগের কথা। লিটনের তখন আর এখনকার দিনলিপিতে বিশাল ফারাক।
‘তথ্য প্রযুক্তি’ মানুষের জীবন পাল্টে দিতে পারে তার বড় উদাহরণ লিটন। ২০০৪ সালের দিকে প্রযুক্তির ভুত চাপে লিটনের মাথায়। ইউটিউভ ও অন্যান্য ওয়েব সাইটের রিসোর্স সংগ্রহ করে হলেন কম্পিউটার শিক্ষায় স্বশিক্ষিত। ২০০৮ সালে একটি ভবনের সিঁডির নিচে দিলেন ‘কম্পোজের দোকান’। রাত জেগে কাজ করা। তাতেও তার মন ভরেনি। এবার তিনি স্বপ্ন দেখলেন ‘অনলাইনে’ আয় করার। স্বপ্ন পুরণ হলো। গ্রাফিক্স ডিজাইনের উপর আউটসোর্সিংয়ের কাজ করলেন বেশ কিছুদিন। এরপর তার মেধার জগতটাকে আরো প্রসারিত করলেন। এবার ওয়েব ডিজাইনিং। কক্সবাজার টুডে ডটকম নামের একটি ব্লগ সাইট দিয়ে তিনি পদার্পণ করেন ‘ওয়েব ডিজাইনের’ জগতে। এরপর তাকে আর পিছনে ফিরে তাকাতে হয়নি, নিজ উদ্যোগে দাড় করালেন নিজের প্রতিষ্ঠান “ওয়েব আর্ট আইটি”। দেশে ও দেশের বাইরের ১০০ উপরে করেছেন ওয়েব ডিজাইনের কাজ।
এই স্বপ্নবাজ, উদ্যমী আর পরিশ্রমী তরুণ কক্সবাজার শহরের বাসিন্দা। পিতৃনিবাস আনোয়ারা উপজেলার বারশত গ্রামেই। ওয়েব ডিজাইনের কাজ করার ফাঁকে পর্যটন শহরে ই-কমার্সকে জনপ্রিয় করার কাজ শুরু করেছেন। কক্সবাজারে বেড়াতে আসা পর্যটকদের কিভাবে বাড়তি সুবিধা দেয়া যায় তা নিয়ে কাজ শুরু করলেন। চিন্তা এক সময় বাস্তবে রূপ পেল।প্রতিষ্ঠা করলেন ‘কক্সবাজার-ই-শপ’ নামে একটি অনলাইন ভিত্তিক বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের। কঠোর শ্রম আর মেধার বিনিময়ে এটি কক্সবাজারের একটি বৃহৎ ই-বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। আর হয়ে উঠলেন ডাক্তারের সহকারী থেকে সফল উদ্যোক্তা। নিজে আয় করার পাশাপাশি ৪ জনের কর্মসংস্থান করলেন।
লিটন জানান, কক্সবাজার পর্যটনের রাজধানী। ঢাকা সহ দেশের যে কোন প্রান্তে ঘরে বসে ‘কক্সবাজারের পণ্য’ কেনার জন্য শুরু করি ‘কক্সবাজার-ই-শপ’। গত বছরের জানুয়ারী থেকে ই-ব্যবসায় পথ চলা শুরু হয়। হাঁটি হাঁটি পা পা করে ‘কক্সবাজার-ই-শপ’ এখন ছড়িয়ে পড়েছে টেকনাফ থেকে তেতুলিয়া পর্যন্ত।
লিটন আরো জানান, কক্সবাজারের ঐতিহ্যবাহী ফরমালিন মুক্ত সামুদ্রিক মাছ, লইট্যা, ছুরি, কোরাল, রুপচাদা সহ নানা শুটকি, বার্মিজ পণ্য। বিশেষ করে আচার, চকলেট, আদিবাসীদের ঐতিহ্যবাহী পোশাক, শামুক-ঝিনুকের তৈরি দৃষ্টিনন্দন অসংখ্য শোপিস। ভবিষ্যতে কাজ করার ইচ্ছে আছে স্থানীয় কৃষিজ পণ্য নিয়ে। যেগুলো কক্সবাজারে আসার পরও পর্যটকরা কেনার সময় পান না। এছাড়া অনেক মানুষ কক্সবাজারের পণ্য কিনতে চাইলে পান না। কারণ যখন পণ্য প্রয়োজন হয়-তখন তারা কক্সবাজারে আসতে পারেনা। এসব বিষয়কে মাথায় রেখে ‘কক্সবাজার-ই-শপ’ এগিয়ে যায়।
তিনি জানান, শুরুর পর থেকে ব্যাপক সাড়া পাচ্ছেন তিনি। প্রতিদিন আচার, শুটকি, আদিবাসী পণ্য, শামুক-ঝিনুকের তৈরি নানা পণ্য কিনছেন ক্রেতারা। তারা ঘরে বসেই হাতে কাছে পেয়ে যাচ্ছেন কক্সবাজারে আকর্ষণীয় সব পণ্য।
কক্সবাজারে এসে যারা এখানের পণ্য কিনছেন তাদের অনেকে পণ্যের মান নিয়ে ঠকছেন। কারণ কিছু অসাধু ব্যবসায়ী তাদেরকে নি¤œমানের পণ্য ধরিয়ে দিচ্ছেন। সে ক্ষেত্রে আমরা পণ্যের মান যাচাই-বাচাই করেই গ্রাহকদের দিচ্ছি। এতে ক্রেতারা সঠিক মানের পণ্য সূলভ মূল্যেই পাচ্ছেন।
তিনি আরো জানান, এসব পণ্য কুরিয়ার সার্ভিসের মাধ্যমে ক্রেতাদের হাতে পৌঁছানো হচ্ছে। সম্প্রতি ঢাকা ও চট্টগ্রামে ক্যাশ অন ডেলিভারি সার্ভিস চালু হয়েছে এবং অন্যান্য জেলায় আমাদের পণ্য সরাসরি ‘হোম ডেলিভারি’ যাচ্ছে । আমাদের দেশে উদ্যোক্তা বান্ধব কুরিয়ার সার্ভিস নেই বললেই চলে। স্ব-উদ্যোগে এগিয়ে আসা যুবকদের কাজ করার জায়গা ও সুযোগ করে দিতে হবে।
ই-কর্মাস ব্যবসায়ী লিটন আরো জানান, কক্সবাজার-ই-শপ কেবল দেশের সীমাবদ্ধ থাকবেনা। বাংলার কোটি গ্রাহকদের মন জয় করে এটি পাড়ি দিবে বিদেশেও। প্রশাসনিক সব নিয়ম মেনে কক্সবাজারের পণ্য ‘কক্সবাজার-ই-শপ’র মাধ্যমে পৌঁছে যাবে বিদেশি গ্রাহকদের হাতেও। বিশ্বের ১৩টি দেশে কক্সবাজারের শুটকী পৌছানোর প্রসেসিং চলছে। এতে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা আয় হবে। পাশাপাশি সরকারও বহু রাজস্ব আদায় করতে পারবেন।
নতুনদের কাজ করার জন্য কী করতে হবে জানতে চাইলে, তিনি বলেন, সব কিছুই নিজের উপর নির্ভরশীল, থাকতে হবে প্রচন্ড ইচ্ছে শক্তি আর পরিশ্রম করার মানসিকতা। আর নিজের কাজের প্রতি শতভাগ সততা।
আর এ ব্যবসায় তরুণদের আগ্রহী করতে তিনি এ পর্যন্ত বিভিন্ন সংস্থা ও সংগঠন থেকে পেয়েছেন সম্মাননাও।