প্রবাসী কল্যাণমন্ত্রীর এপিএসের শতকোটি টাকার সম্পদ!

প্রকাশ:| সোমবার, ২৫ মে , ২০১৫ সময় ০৭:৪৮ অপরাহ্ণ

প্রবাসী কল্যাণমন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার খন্দকার মোশাররফ হোসেনের সাবেক সহকারী ব্যক্তিগত কর্মকর্তা (এপিএস) ও বহিষ্কৃত ছাত্রলীগ নেতা সত্যজিত মুখার্জির শত কোটি টাকার সম্পদের সন্ধান পেয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।
প্রবাসী কল্যাণমন্ত্রীর এপিএস
দুদকের প্রাথমিক অনুসন্ধানে এ বিপুল পরিমাণ সম্পদের খোঁজ পাওয়া গেছে।

স্কুল মাস্টারের ছেলে ও এপিএসের মতো পদে থেকে অল্প সময়ে এই বিপুল পরিমাণ সম্পদের মালিক কীভাবে হলেন তা জানতে এবং আরো বৃহত্তর অনুসন্ধানের স্বার্থে তার সম্পদ বিবরণী চেয়ে নোটিশ দেয়া হবে কমিশনের পক্ষ থেকে।

এজন্য তার স্থাবর-অস্থাবর ও তার উপর নির্ভরশীলদের যাবতীয় সম্পদের হিসেব চেয়ে নোটিশ প্রদানের সুপারিশ সম্বলিত একটি প্রাথমিক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনও তৈরি করেছেন অনুসন্ধানী কর্মকর্তা। অল্প কয়েকদিনের মধ্যে তার সম্পদ বিবরণী দাখিলের ব্যাপারে সুপারিশ করে এই অনুসন্ধানী প্রতিবেদন জমা দেয়া হবে বলে দুদকের সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।

দুদক সূত্র বাংলামেইলকে জানায়, সত্যজিত মুখার্জির বিরুদ্ধে আসা চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজিসহ বিপুল পরিমাণ অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ অনুসন্ধানে নামে দুদক। আর এসব অভিযোগ মাঠ পর্যায়ে অনুসন্ধানের জন্য সত্যজিত মুখার্জির গ্রামের বাড়ি ফরিদপুর যায় দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা, অনুসন্ধানী কর্মকর্তা ও উপপরিচালক কেএম মেজবাহ উদ্দিন। সেখানে সরেজমিনে গিয়ে ও অভিযোগ সংশ্লিষ্ট বিষয়াদি অনুসন্ধান করে দেখা যায়- সত্যজিত মুখার্জির নামে ও বেনামে প্রায় শত কোটি টাকার সম্পদ আছে। যেগুলোর কোনোটির মালিক তার বাবা অথবা তার স্ত্রীকে দেখানো হয়েছে।

অনুসন্ধানে এই বিপুল পরিমাণ সম্পদ তার বৈধভাবে উপার্জিত আয়ের সাথে সম্পূর্ণ বেমানান বলে মনে করছেন অনুসন্ধান কর্মকর্তা। তাই এগুলো তার বৈধ উপায়ে অর্জিত সম্পদ কি-না সে ব্যাপারে অধিকতর অনুসন্ধানের জন্য তার সম্পদ বিবরণী দাখিলের নোটিশ জারি করা হবে। ইতোমধ্যে তার বিরুদ্ধে নোটিশ জারির সুপারিশ সম্বলিত প্রাথমিক অনুসন্ধানী প্রতিবেদন তৈরি করেছেন অনুসন্ধানী কর্মকর্তা কেএম মেজবাহ উদ্দিন। খুব শিগগিরই তিনি এই প্রতিবেদন কমিশনে জমা দেবেন। আর কমিশন এ ব্যাপারে অনুমোদন দিলেই তার বিরুদ্ধে সম্পদ বিবরণী দাখিলের নোটিশ জারি করা হবে।

তার সম্পদ বিবরণী যাচাই-বাছাইয়ের পর সম্পদগুলোর কোনো অংশও যদি অবৈধ বলে প্রমাণিত হয় তাহলে তার বিরুদ্ধে মামলাও করা হবে বলে জানায় সূত্র।

দুদকের প্রাথমিক অনুসন্ধানে যেসব বেরিয়ে এসেছে: দুদকের প্রাথমিক অনুসন্ধানে দেখা যায়- জন্মগতভাবে ফরিদপুর জেলার বোয়ালমারী উপজেলার বাসিন্দা সত্যজিত মুখার্জি। তার বাবা মানস কুমার মুখার্জি ছিলেন পেশায় হাইস্কুল শিক্ষক। সেই সুবাদে ফরিদপুরের শহরের পাশেই রঘুনন্দনপুর গ্রামের চলে আসেন তারা। প্রবাসীকল্যাণমন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার খন্দকার মোশাররফ হোসেনের এপিএস পদে যোগদানের পরই শুরু হয় তার দিন বদলের পালা। খুব অল্প সময়ে টিনের ছাপড়া থেকে ফরিদপুর শহরের গোয়ালচামট হাউজিং এস্টেটে ২০তলা ভিত বিশিষ্ট ‘কালিদাস ভবন’ নির্মাণ কাজ শুরু করেন তিনি। যার পাঁচতলার কাজ প্রায় শেষ। ওই এস্টেটের পেছনের গ্রামই রঘুনন্দনপুর। ওই এলাকাতেও বেশ জায়গা-জমি কিনেছেন সত্যজিত। সেখানে তার ২০ শতাংশের একটি প্লটও আছে বলে দুদকের অনুসন্ধান টিম জানতে পারে।

এছাড়া ফরিদপুর শহরের জেলা পরিষদ মার্কেট স্বর্ণকুটির আধুনিক বিপণি কেন্দ্র ও একই শহরের সরকারি তিতুমীর মার্কেটে নামে-বেনামে দোকান আছে সত্যজিতের। এর বাইরে স্থানীয় হেলিপোর্ট বাজারেও আছে তার তিনটি দোকান।

শুধু যে ফরিদপুরেই সম্পদের পাহাড় গড়েছেন সত্যজিত তা নয়। ঢাকাতেও আছে নামে-বেনামে একাধিক ফ্ল্যাট। এর মধ্যে ঢাকার মিরপুর-১২ এলাকায় একটি ফ্ল্যাট ও মোহাম্মদপুর ও আদাবর এলাকাতেও তার একাধিক ফ্ল্যাট আছে। ব্যক্তিগত গাড়ির পাশাপাশি তার আছে দুটো মাইক্রোবাসও।

বাড়ি, গাড়ি, জায়গা-জমির পাশাপাশি কোটি কোটি টাকা ব্যাংক হিসাবেও জমা রেখেছেন সত্যজিত মুখার্জি। শুধু নিজের নামেই নয়, স্ত্রী সুমিকা মুখার্জি, বাবা মানস কুমার মুখার্জির নামেও ফরিদপুরের সরকারি-বেসরকারি ব্যাংকে এসব টাকা গচ্ছিত আছে। এছাড়া ইস্টার্ন ব্যাংক লিমিটেডের রাজধানীর কাকরাইল শাখায় ১৫ কোটি টাকার আমানতসহ স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংকের এলিফেন্ট রোড শাখায় গচ্ছিত আছে বিপুল অর্থ। আরও কয়েকটি সরকারি-বেসরকারি ব্যাংকে নগদ অন্তত ৫০ কোটি টাকা আছে বলে জানা যায়।

তার নামে ও বেনামে এসব সম্পদের পরিমাণ শত কোটি টাকাও ছেড়ে যাবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট অনুসন্ধানী কর্মকর্তা। আর এসব ছাড়াও তার আরো কোনো সম্পদ আছে কি না, তা ক্ষতিয়ে দেখা হচ্ছে বলে দুদক সূত্রে জানা যায়।

দুদক সুত্র আরও জানায়, ফরিদপুর জেলা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক ছিলেন সত্যজিত। তবে চাঁদাবাজিসহ নানা বিতর্কের অভিযোগে গত এপ্রিল মাসে এই পদ থেকে বহিষ্কার করা হয় তাকে। অপরদিকে এসব অভিযোগে প্রবাসীকল্যাণমন্ত্রীর এপিএস পদ থেকেও অপসারণ করা হয় তাকে। ক্ষমতাসীন দলের প্রভাব খাটিয়ে ও মন্ত্রীর এপিএস হওয়ার সুবাদে ক্ষমতার অপব্যাবহার এবং চাঁদাবাজির মাধ্যমে অল্প সময়ে এই বিপুল পরিমাণ টাকার মালিক হয়েছেন বলে মনে করছেন দুদক সংশ্লিষ্টরা।

এব্যাপারে জানতে চাইলে দুদক চেয়ারম্যান মো. বদিউজ্জমান বাংলামেইলকে বলেন, ‘তার (সত্যজিত মুখার্জি) বিরুদ্ধে অনুসন্ধান শুরু করা হয়েছিলো। তবে সর্বশেষ অবস্থা কি সে ব্যাপারে আমি জানি না। এ ব্যাপারে অনুসন্ধানী কর্মকর্তা ভালো জানেন। তবে অপরাধী যেই কেউ হোক, তার বিরুদ্ধে অপরাধ প্রমাণিত হলেই দুদক আইনানুগ ব্যবস্থা নেবে।’