প্রথমদিনই অনুপস্থিত ৭ সহস্রাধিক

প্রকাশ:| শুক্রবার, ৬ ফেব্রুয়ারি , ২০১৫ সময় ১০:৪৯ অপরাহ্ণ

শিক্ষাজীবনের গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা হলেও এবার মাধ্যমিক স্কুল সার্টিফিকেট (এসএসসি) ও সমমানের পরীক্ষার প্রথম দিনেই সারাদেশে ৭ হাজার ২৭৭ জন পরীক্ষার্থী অংশ নেয়নি। যদিও এবার পরীক্ষায় অংশ নেয়ার জন্য ২৭ হাজার ৮০৮টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ১৪ লাখ ৭৯ হাজার ২৬৬ জন শিক্ষার্থী নিবন্ধন করেছিল।

পরীক্ষার প্রথম দিনে শুক্রবার সকাল ৯টা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত আটটি সাধারণ বোর্ডের অধীনে এসএসসিতে বাংলা (আবশ্যিক) প্রথমপত্র, সহজ বাংলা প্রথমপত্র এবং বাংলা ভাষা ও বাংলাদেশের সংস্কৃতি প্রথমপত্রের পরীক্ষা হয়েছে।

মাদরাসা বোর্ডের অধীনে দাখিলে কুরআন মাজিদ ও তাজবিদ এবং কারিগরি বোর্ডের অধীনে এসএসসি ভোকেশনালে (সকালে) বাংলা-২ (১৯২১) সৃজনশীল এবং (বিকেলে) বাংলা-২ (৮১২১) সৃজনশীল বিষয়ের পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়।

গত ২ ফেব্রুয়ারি এ পরীক্ষা শুরু হওয়ার কথা থাকলেও ২০ দলীয় জোটের হরতালের কারণে দুবার তা পিছিয়েছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। আবারো হরতাল দেয়ায় ৪ ফেব্রুয়ারির পরীক্ষাও পিছিয়ে ৮ ফেব্রুয়ারি শনিবার নির্ধারণ করা হয়েছে।

যদিও পরীক্ষার্থীদের নিরাপত্তার কারণে বিগত বছরগুলোর তুলনায় রাজধানীর বিভিন্ন কেন্দ্রে অভিবাবকদের উপস্থিতির সংখ্যা ছিল অনেক বেশি। পুলিশের পাশপাশি পরীক্ষার্থীদের নিরাপত্তার জন্য ১৫০ প্লাটুন বিজিবি সদস্য মোতায়েন ছিল।

পরীক্ষার প্রথম দিন হরতাল না থাকলেও অবরোধ অব্যাহত থাকায় শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মধ্যে ভয় বিরাজ করছিল। চলমান অবরোধে বোমা আর আগুনে পোড়া মানুষের মিছিলে নিজের সন্তানকে দেখতে চান না কেউ।

জাহিদুল ইসলাম নামের এক অভিভাবক বলেন, ‘পরীক্ষার চেয়ে বেশি চিন্তা করছি ছেলের নিরাপত্তা নিয়ে। এতো নিরাপত্তা তবুও তো মানুষ পোড়া কমেনি। সন্তান সুস্থভাবে বেঁচে থাকলে পরীক্ষা তো দিতেই পারবে। সারাক্ষণ চিন্তায় থাকি কখন কী হয়।’

এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষার প্রথম দিনে অসদুপায় অবলম্বনের দায়ে সারাদেশে ১৯ জন পরীক্ষার্থী ও তিনজন শিক্ষককে বহিষ্কার করা খবর পাওয়া গেছে। এর মধ্যে আটটি সাধারণ শিক্ষাবোর্ডে চারজন, মাদরাসা শিক্ষা বোর্ডে চারজন এবং কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের ১১জন শিক্ষার্থীকে বহিষ্কার করা হয়েছে। আর বহিষ্কৃত তিন শিক্ষক সবাই কারিগরি বোর্ডের।

এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষা উপলক্ষে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে স্থাপিত নিয়ন্ত্রণ কক্ষের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা উপসচিব গৌতম কুমার এসব তথ্য জানান।

তিনি বলেন, ‘সারাদেশে প্রথম দিনের পরীক্ষা সুষ্ঠুভাবে শেষ হয়েছে। কোথাও কোনো প্রকার অপ্রীতিকর ঘটনার খবর পাওয়া যায়নি।’

সিরাজগঞ্জে একটি কেন্দ্রে আগুন দেয়ার ঘটনাটি সত্য নয় দাবি করে তিনি বলেন, ‘এটি গুঞ্জব। দেশের কোথাও পরীক্ষা বিঘ্নিত হওয়ার মতো কোনো ঘটনা ঘটেনি।’

তবে রোববার ছাত্রশিবিরের হরতালের কারণে পরীক্ষা হবে কী না এ বিষয়ে সুর্নিদিষ্ট করে কিছু বলতে পারেননি তিনি।

এদিকে প্রথম দিনে সাত সহস্রাধিক অনুপস্থিতির মধ্যে মাদরাসার শিক্ষার্থীর সংখ্যাই বেশি। সারাদেশে মাদরাসা বোর্ডের অধীনে ২ হাজার ৭৭০ জন শিক্ষার্থী পরীক্ষা অংশ নেয়নি। কারিগরি বোর্ডের অধীনে ১ হাজার ৩৪৮ জন, ঢাকা বোর্ডে ৭৪২ জন, কুমিল্লা বোর্ডে ৫১৫ জন, রাজশাহী বোর্ডে ৪১২ জন, যশোর বোর্ডে ৪৩২ জন, চট্টগ্রাম বোর্ডে ২১৭ জন, সিলেট বোর্ডে ১৮৮ জন, বরিশাল বোর্ডে ১৮৪ জন, দিনাজপুর বোর্ডে ৪৬৯ জন শিক্ষার্থী পরীক্ষায় অংশ নেয়নি।

এ বছর এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় অংশ নেয়া শিক্ষার্থীদের মধ্যে সাত লাখ ৩৩ হাজার ২২০ জন ছাত্র এবং ছয় লাখ ৯৯ হাজার ৫২৫ জন ছাত্রী।

এবার আটটি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডের অধীনে এসএসসিতে ১১ লাখ ১২ হাজার ৫৯১ জন, মাদরাসা বোর্ডের অধীনে দাখিলে দুই লাখ ৫৬ হাজার ৩৮০ জন এবং কারিগরি বোর্ডের অধীনে এসএসসি ভোকেশনালে এক লাখ ১০ হাজার ২৯৫ জন পরীক্ষা দেবে।

এদিকে আগামী রোববারও সারাদেশে সকাল-সন্ধ্যা হরতাল ডেকেছে বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির। এ পরিস্থিতিতে নিরাপত্তা ঝুঁকির কারণেই সহস্রাধিক শিক্ষার্থী পরীক্ষায় অংশ নেয়নি বলে মনে করছেন অনেক শিক্ষাবিদ।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা প্রশাসন বিভাগের অধ্যপক ও শিক্ষাবিদ ড. এম ওহিদুজ্জামান বলেন, ‘অবরোধ বা হরতালে পরীক্ষা পেছানো মানে শুধুই সময় পেছানো না। মানসিকভাবে শিক্ষার্থীদের পিছিয়ে দেয়া। এটা এক ধরনের নির্যাতন। পরীক্ষার্থীরা মানসিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়ছে। ফলে তারা পরীক্ষা দেয়ার মনোবল হারাচ্ছে। এছাড়া অভিবাবকরাও সন্তানের নিরাপত্তার কথা ভেবে পরীক্ষা দিতে নাও দিতে পারে।’

এমন অবস্থা চললে অনুপস্থিতির হার আরো বাড়বে বলে মনে করছেন ড. ওহিদুজ্জামান।

তিনি আরো বলেন, ‘এমন পরিস্থিতি চললে অনুপস্থিতি শুধু নয় পরীক্ষায় ভালো ফল করতে পারবে না অনেকে।’

এ প্রসঙ্গে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেট সদস্য ও রাঙ্গামাটি কলেজের অধ্যক্ষ প্রফেসর বাঞ্ছিতা চাকমা বলেন, ‘রাজনৈতিক অস্থিরতায় বছরের শুরু থেকেই শিক্ষা কার্যক্রম ব্যাহত। প্রতিনিয়ত মানুষ আক্রান্ত হচ্ছে রাজনৈতিক সহিংসতায়। এজন্য হয়ত অনেক অভিভাবক সন্তানের নিরাপত্তার কথা আগে ভেবেছেন। রাঙ্গামাটিতে পরিস্থিতি একটু ভালো হওয়া সত্বেও শিক্ষার্থীরা নিয়মিত ক্লাসে আসে না। এভাবে চলতে থাকলে শিক্ষায় বিপর্যয় আসবে।’