প্রকৃতিকে ভালো না বাসার কৌশল- টাইম

প্রকাশ:| বৃহস্পতিবার, ২৬ সেপ্টেম্বর , ২০১৩ সময় ১১:৫০ অপরাহ্ণ

সুন্দরবনরয়েল বেঙ্গল টাইগার। সুন্দরবনের সবচেয়ে ভয়াল সুন্দর প্রাণী। বাংলাদেশকে যাঁরা জানেন, সবাই বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবনের এই নিরাপত্তাপ্রহরীকে চেনেন। যে সুন্দরবনকে এত দিন রয়েল বেঙ্গল টাইগার পাহারা দিয়ে আসছে, সেই মানুষখেকোদের এখন নিশ্চিহ্ন হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হতে যাচ্ছে।

সুন্দরবনের ভবিষ্যৎ নিয়ে সংশয়ে পরিবেশবাদীরা। সংশয়ের কারণ, সুন্দরবন থেকে ১৪ কিলোমিটার দূরে রামপাল এলাকায় ১ হাজার ৩২০ মেগাওয়াটের কয়লাভিত্তিক তাপবিদ্যুৎকেন্দ্র তৈরি হতে যাচ্ছে। ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশ সরকার যৌথ উদ্যোগে এ বিদ্যুৎকেন্দ্র তৈরির উদ্যোগ নিয়েছে।

প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষের কাছে বিদ্যুৎ সুবিধা পৌঁছে দিতে এবং দ্রুত বর্ধনশীল বিদ্যুতের চাহিদা মেটানোর লক্ষ্য নিয়ে বাংলাদেশ সরকার এ উদ্যোগ নিয়েছে। আর তাতে সহযোগিতা করছে ভারত। এ বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন করা হলে সাশ্রয়ী বিদ্যুৎ উৎপাদন করা সম্ভব হবে বলে মনে করছে সরকার। কিন্তু এই বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের ক্ষেত্রে তৈরি হয়েছে একটি বিরোধীপক্ষ। এ পক্ষের দাবি, সুন্দরবনের এত কাছে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন করা হলে তা পরিবেশের ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলবে। এতে সুন্দরবনের সংলগ্ন পানির ডলফিন থেকে শুরু করে রয়েল বেঙ্গল টাইগারসহ বন্য প্রাণীর ওপর বিরূপ প্রভাব পড়বে।

বিশেষজ্ঞরা বলেন, বন্যাঝুঁকিতে থাকা বাংলাদেশকে সুন্দরবন সব সময় রক্ষা করেছে। সুন্দরবনের ক্ষতি হলে জলবায়ু ভয়ংকর ঝুঁকির মধ্যে পড়ে যাবে বাংলাদেশ। এ প্রসঙ্গে সুন্দরবন রক্ষা কমিটির সদস্য কল্লোল মোস্তফা জানিয়েছেন, ‘কারও পক্ষে এ ধরনের প্রকল্পে মত দিতে রাজি হওয়ার কথা নয়।’

রামপালের বিদ্যুৎকেন্দ্রের সক্ষমতার সঙ্গে ১৯৭৯ সালে যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাসে নির্মিত একটি কয়লাভিত্তিক তাপবিদ্যুৎকেন্দ্রের উদাহরণ টেনে আনছেন সমালোচকেরা। তাঁদের যুক্তি হচ্ছে, টেক্সাসের কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের সময় কর্তৃপক্ষ পরিবেশের ক্ষতি হবে না বলেছিল। কিন্তু ২০১০ সালে এসে গবেষকেরা জানান, ওই বিদুৎকেন্দ্র থেকে প্রতি বছর নির্গত ৩০ হাজার টন সালফার ডাই-অক্সাইড কৃষিক্ষেত্রে মারাত্মক প্রভাব ফেলেছে। এর পরিপ্রেক্ষিতে ওই বিদ্যুৎকেন্দ্রটি বন্ধ করে দেওয়ার দাবি উঠছে। টেক্সাসের ওই বিদ্যুৎকেন্দ্রের সঙ্গে তুলনা করলে রামপালের প্রস্তাবিত কয়লা বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে প্রতি বছর ৫২ হাজার টন সালফার ডাই-অক্সাইড নির্গত হবে।

এর আগে চলতি বছরের জানুয়ারি মাসে রামপালে কয়লাভিত্তিক তাপবিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের জন্য ছাড়পত্র দিয়েছে বাংলাদেশের পরিবেশ অধিদপ্তর। এ তাপবিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করা হলে পরিবেশগত কোনো ক্ষতি হবে না বলে ছাড়পত্র দেওয়া হলেও সমালোচকেরা বলছেন, পরিবেশ অধিদপ্তরের সিদ্ধান্তে স্বচ্ছতার অভাব রয়েছে এবং এ প্রকল্পটি নিয়ে মানুষের মনে নানা সন্দেহ রয়েছে। প্রশ্ন উঠছে, এ প্রকল্পে লাভ হবে কার? বাংলাদেশে কয়লাভিত্তিক তাপবিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনে ভারতের অতিমাত্রার আগ্রহ নিয়েও মানুষের মনে সন্দেহ তৈরি হচ্ছে।

ভারতের গুজরাট ও মধ্যপ্রদেশে দুটি কয়লাভিত্তিক তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনে যেখানে আইনি বাধা ও প্রতিরোধের মুখে আটকে গেছে, সেখানে বাংলাদেশে সুন্দরবনের কাছে এ প্রকল্প নিয়ে ভারতের কাজ করতে যাওয়ার বিষয়টি সন্দেহ তৈরি করছে। এ প্রসঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতিবিদ মোশাহিদা সুলতানা ঋতু বলেন, ‘এটা চক্রান্ত। নিজের দেশে বন্ধ করে দিয়ে অন্য দেশের আইন ভাঙছে তারা।’

রামপালের প্রকল্প পরিচালক আজিজুর রহমান অবশ্য আইন ভাঙার বিষয়টি নাকচ করেছেন। আজিজুর রহমান জানিয়েছেন, ‘তেল ও গ্যাসনির্ভর বিদ্যুৎ প্রকল্প তৈরিতে অনেক খরচ। তাই ভবিষ্যতের বিদ্যুৎ নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ প্রকল্প গ্রহণ ছাড়া বিকল্প নেই। এখানে ভারত তাদের নিয়মনীতি অনুযায়ী চলবে আর আমরা আমাদের। একদল বিশেষজ্ঞ এ প্রকল্পটি পর্যবেক্ষণ করে সুচিন্তিত মতামত দিয়েছেন। তার ভিত্তিতেই এ প্রকল্প চালু হচ্ছে। গবেষণায় কী পাওয়া গেছে এবং ভারতের সঙ্গে চুক্তিতে কী শর্ত রয়েছে, তা যে কেউ ইচ্ছা করলেই দেখে নিতে পারেন। এ ক্ষেত্রে আমরা বাংলাদেশের নীতিমালা অনুযায়ী দূষণ ঠেকানোর সব ব্যবস্থা নেব।’

পরিবেশ বিপর্যয় রোধের সব ধরনের নিশ্চয়তা থাকলেও সংশয় থেকেই যাচ্ছে। গবেষকেরা বলছেন, গত এক দশকে মানুষসৃষ্ট নানা কারণে ৫০ হাজার হেক্টর সুন্দরবন নষ্ট হয়ে গেছে। এ ছাড়াও শিপইয়ার্ড নির্মাণসহ নানা কারণে সুন্দরবন ও দক্ষিণাঞ্চলের জনগণকে নানা সমস্যায় পড়তে হয়েছে।

সুন্দরবন রক্ষায় সচেতনতা বাড়াতে লংমার্চ শুরু করেছে সুন্দরবন রক্ষা কমিটি। লংমার্চ সমর্থনকারী আবদুল্লাহ আবু দিয়ান নামের একজন জানিয়েছেন, বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশে পরিবেশের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সংরক্ষণ বিষয়ে সচেতনতার অভাব রয়েছে। সারা দেশের মধ্যে সুন্দরবনটাই বাকি রয়ে গেছে যেটা সত্যিকারের বন বলে মনে হয়। এটাও যদি কোনো রকমে ধ্বংস হয়ে যায়, তবে আমাদের পরবর্তী প্রজন্ম আর পরিবেশের গুরুত্ব বুঝবে না। কারণ, আমরা যা কেবল স্পর্শ করতে পারি, অনুভব করতে পারি এবং যা ভালোবাসি তারই গুরুত্ব দিই।’