পেকুয়ায় সংরক্ষিত বনাঞ্চলের পাশেই অবৈধ ৪ ইটভাটা, পুড়ছে বনের কাঠ

প্রকাশ:| শনিবার, ১১ জানুয়ারি , ২০১৪ সময় ০৮:০৬ অপরাহ্ণ

মুহাম্মদ গিয়াস উদ্দিন, কক্সবাজার প্রতিনিধি
কক্সবাজারের পেকুয়া উপজেলায় সংরক্ষিত বনাঞ্চলের পাশেই গড়ে উঠেছে অবৈধ ৪ ইটভাটা! আর এসব অবৈধ ইটভাটাগুলোতে দেদারছে পুড়ানো হচ্ছে বনাঞ্চলের গাছ। জানা যায়, সরকারের পরিবেশ আইন অনুযায়ী সংরক্ষিত বনাঞ্চলের ৩ (তিন) কিলোমিটারের ভিতরে কোন ইটভাটা স্থাপন করে ইট পুড়া নিষিদ্ধ রয়েছে। কিন্তু অবৈধভাবে গড়ে উঠা পেকুয়ার ওই ইটভাটাগুলোতে পরিবেশ অধিদপ্তরের নীতিমালা মানা হচ্ছেনা। এখানে গড়ে উঠা ইট-ভাটাগুলোর দুরত্ব সরকারী বনাঞ্চলের মাত্র এক কিলোমিটারের মধ্যেই। পাহাড় বেষ্টিত বনাঞ্চলের সন্নিকটে অবৈধ ইটভাটাগুলোতে অবস্থান হওয়ায় প্রতিনিয়ত পোড়ানো হচ্ছে বনাঞ্চলের রকমারী গাছ-গাছালি। অন্যদিকে ইট উৎপাদনের জন্য ব্যবহার হচ্ছে ফসলী জমির উপরিভাগ (টপ সয়েল)। মানসম্মত ইট তৈরীতে খনিজ কয়লা পুড়ানোর জন্য সরকার বাধ্যতামূলক করে আইন পাশ করলেও এসব ইট-ভাটাগুলোতে প্রতিনিয়িত পুড়ানো হচ্ছে বনের কাঠ। সামান্য কয়লার গুড়া ওই ইটভাটাগুলোর সামনে লোক দেখানোর জন্য মজুদ রাখা হয়েছে মাত্র। তাও এগুলো জ্বলানোর উপযোগী নয়, মাসের পর মাস স্তুপ অবস্তায় পড়ে থাকে ইট ভাটাগুলোতে।
চট্টগ্রাম দক্ষিন বন বিভাগের অধীনে পেকুয়া উপজেলার বারবাকিয়া ও টইটং ইউনিয়নের সংরক্ষিত বনাঞ্চলের নিকট অবৈধভাবে এসব ইটভাটা গড়ে ওঠলেও তাদের বিরুদ্ধে নেই কোন আইনি ব্যবস্থা। ফলে তারা আরো দ্বিগুন উৎসাহিত হয়ে বেপরোয়া ভাবে বন ও পরিবেশের মারাত্মক্ষ ক্ষতি সাধন করে এ অবৈধ ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে। অপরিকল্পিতভাবে গড়ে ওঠা এসব ইটভাটার কারনে প্রতিনিয়িত উজাড় হচ্ছে সংরক্ষিত বনাঞ্চল। আর হুমকির মূখে পড়েছে পরিবেশের ভারসাম্য।
স্থানীয়রা জানান, বিগত ১০/১২বছর পূর্বে পেকুয়া উপজেলার টইটং ও বারবাকিয়া ইউনিয়নের সংরক্ষিত বনাঞ্চলের নিকট ৩টি ইটভাটা গড়ে ওঠে। এরমধ্যে স্থানীয় ঠিকাদার শাহাব উদ্দিনের মালিকানাধীন এবিএম ব্রিকস, আহমদ নবীর মালিকানাধীন এপিএম ব্রিকস দু‘টির ব্যাবদান মাত্র ৩০০ফুট, অন্যদিকে টইটং ইউনিয়নে সংরক্ষিত বনাঞ্চলের এক কিলোমিটারের মধ্যেই। এছাড়া বারবাকিয়া ইউনিয়নের পাহাড়িয়াখালী এলাকায় জনৈক আবু তাহেরের মালিকানাধীন এবিএম ব্রিকস নামে অবৈধ ইট-ভাটাগুলো গড়ে ওঠলেও বিগত দু’বৎসর পূর্বে স্থানীয় গুটিকয়েক বিএনপি-জামায়াত নেতা সিন্ডিকেট করে আরো ১টি ইটভাটা গড়ে তোলে।
জানা গেছে, অবৈধভাবে গড়ে ওঠা ইটভাটাগুলোতে সংশ্লিষ্ট পরিবেশ অধিদপ্তরের কোন ছাড়পত্র ছাড়াই অবৈধভাবে গড়ে ওঠেছে। নতুন গড়ে ওঠা ইটভাটা মালিকরা তথ্য গোপন করে সংশ্লিষ্ট বনবিট কর্মকর্তা ও পরিবেশ অধিদপ্তরের অসাধু কর্মকর্তাদের মোটা অংকের টাকা দিয়ে ম্যানেজ করে ঠিকই ইটভাটা করেছে। অভিযোগ ওঠেছে, ওই ইটভাটার মালিক তথ্য গোপণ করে প্রতারণার আশ্রয় নিয়ে আধুনিক পদ্ধতিতে ইট উৎপাদনের শর্তারুপ করে সেটির অনুমোদন নিলেও বাস্তব ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে সরকরী ইট পুড়ানো আইন লংঘন করছেন।
সরেজমিন পেকুয়ার ইট-ভাটাগুলো পরিদর্শন করতে গিয়ে দেখা যায়, ওই ইটভাটাগুলোতে ইট উৎপাদনের জন্য কাঠ পোড়ানো হচ্ছে দেদাঁরছে। ভাটার চিমনি দিয়ে প্রতিনিয়ত বের হচ্ছে কালো ধোঁয়া। দুষিত হচ্ছে পরিবেশ। ইটভাটায় কাজে নিয়োজিত শ্রমিকদের কাছে জানতে চাইলে নাম প্রকাশ না করার শর্তে তারা জানায়, কাঠ পোড়ালে চিমনি দিয়ে এভাবে কালো ধোঁয়া বের হয়। অন্যদিকে কয়লা পোড়ানো হলে বের হবে সাদা ধোঁয়া। দেখা গেছে এসব ইটভাটায় মওজুদ রাখা হয়েছে কাঠ। কিছু খনিজ কয়লা স্তুপিকৃতবস্থায় পড়ে আছে। লাকড়ি দিয়ে ইট উৎপাদন করলে খরচ লাগে কম। তাছাড়া পাহাড়-বেষ্টিত ইটভাটায় অহরহ কাঠের লাকড়ি মিলে। এক শ্রেণীর অসাধু কাঠচোর সংরক্ষিত বনাঞ্চল থেকে গাছ, গাছের ডালপালা কেটে ভাটিতে বিক্রি করে। এসব কাঠচোর সিন্ডিকেটের সাথে রয়েছে ইটভাটার মালিকদের গভীর সম্পর্ক। এ সুবাধে কাঠচোর সিন্ডিকেট পাহাড় থেকে গাছ কেটে এনে অভাধে বিক্রি করে তাদের কাছে। পাহাড় অঞ্চলে অধিকাংশ মানুষ লাকড়ির আর কাঠ বিক্রির উপর জীবিকা নির্বরশীল। তারা অনেকে কাঁধে বহন আবার কিছু ভ্যানগাড়ি, পিকআপ, জীপযোগে পরিবহন করে উপজেলা ছোট-বড় বাজার,ইটভাটাসহ অন্যত্র পাচার করে থাকে। এদিকে এ কাজ নির্বিঘেœ চালিয়ে গেলেও এদের বিরুদ্ধে নেই কোন ব্যবস্থা। সংশ্লিষ্ট বনবিভাগ ও প্রশাসন নিরব থাকায় দিনদিন তাদের দৌরাত্য বেড়েই চলেছে।
এদিকে স্থানীয় পরিবেশ প্রেমী নজরুল ইসলাম, জহিরুল ইসলাম, নুরুল আলম, আবদুল কাদের, সমিরুল কাদের, আনোয়ারুল ইসলামসহ আরো একাধিক জানিয়েছেন, বনবিভাগের অসাধু কর্মকতারা ওই অবৈধ ইট-ভাটা গুলোর মালিকদের কাছ থেকে মোটা অংকের মাসোয়ারা নিয়ে প্রতিনিয়ত বনের গাছ দিয়ে নির্বিচারে ইট-পুড়ানোর কাজে বিক্রি অব্যাহত রেখেছে। তারা এসব অবৈধ ইট-ভাটা বন্ধ করে দেওয়ার জন্য সরাসরি বন ও পরিবেশ মন্ত্রীর হস্থক্ষেপ কামনা করেছেন।
এ ব্যাপারে চট্টগ্রাম দক্ষিণ বন বিভাগের বারবাকিয়া বনবিট কর্মকর্তা মোঃ লিয়াকত আলী খান বলেন, ইট-ভাটা গুলোতে অবৈধ ভাবে বন বিভাগের গাছ নিধন করে কাঠ পুড়ানোর অভিযোগ পাওয়া গেলে তাদের বিরুদ্ধে শিগগিরই ব্যবস্থা নেওয়া হবে।