পাহাড়ে লাশের রাজনীতি…

নিউজচিটাগাং২৪/ এক্স প্রকাশ:| শনিবার, ৫ মে , ২০১৮ সময় ০৮:৪৪ অপরাহ্ণ

আঞ্চলিক রাজনীতির দ্বন্দ্ব ও ভ্রাতৃঘাতী সংঘাতে নানিয়ারচর উপজেলা চেয়ারম্যান ও পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির (এমএন লারমা) সহসভাপতি শক্তিমান চাকমাকে গুলি করে হত্যার ২৪ ঘণ্টা পেরুতে না পেরুতেই লাশ হলেন আরও পাঁচজন।

শুক্রবার নানিয়ারচর উপজেলা চেয়ারম্যান শক্তিমান চাকমার দাহক্রিয়া অনুষ্ঠানে যোগ দিতে যাওয়ার পথে ইউপিডিএফ (গণতান্ত্রিক)-এর আহ্বায়ক তপন জ্যোতি চাকমা ওরফে বর্মাসহ ১২/১৩ জন সহকর্মী হামলার শিকার হন।

শুক্রবার দুপুরে নানিয়ারচরের ক্যাংড়াছড়ি-বেতছড়ি এলাকায় দুর্বৃত্তদের ব্রাশফায়ারে এসময় নিহত হন তপন জ্যোতি চাকমা ওরফে বর্মাসহ পাঁচজন। এ ঘটনায় আরও সাতজনকে খাগড়াছড়ি হাসপাতাল নেয়া হয়। পরে চারজনকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে রেফার্ড করেন ডাক্তাররা।

এর আগে বৃহস্পতিবার সকাল সাড়ে ১০টার দিকে উপজেলা পরিষদের সামনে দিনেদুপুরে উপজেলা চেয়ারম্যান শক্তিমান চাকমাকে গুলি করে দুর্বৃত্তরা। পরে স্থানীয় হাসপাতালে নেয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।

এ ঘটনায় তার সহকারী ও উপজেলা জনসংহতি সমিতির নেতা রুপম চাকমাও আহত হন। শক্তিমানের মৃত্যুর ঘটনায় ইউপিডিএফকে দায়ী করে বিবৃতি দেয় পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি (এমএন লারমা)।

আঞ্চলিক দলের এই নেতা হত্যার পর তার দাহক্রিয়া অনুষ্ঠানে রওনা দেন গত বছরের শেষের দিকে প্রতিষ্ঠিত ইউপিডিএফ (গণতান্ত্রিক)-এর আহ্বায়ক তপন জ্যোতি চাকমা ওরেফে বর্মাসহ কয়েকজন রাজনৈতিক সহকর্মী। অনুষ্ঠানে যোগদানের পথে মাইক্রোবাস চালকসহ নিহত হন তারা পাঁচজন।

১৯৯৭ সালের পার্বত্য চুক্তিকে কেন্দ্র করে সন্তু লারমার নেতৃত্বাধীন পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি ভেঙে প্রসীত খীসা নেতৃত্বাধীন ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট (ইউপিডিএফ) গঠন হয়। এরপর ২০১০ সালে রাজনৈতিক বিরোধে আবারো ভাঙন দেয় দেয় সন্তু লারমার নেতৃত্বাধীন পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি। এসময় সুধাসিন্দু খীসা নেতৃত্বাধীন পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি (এমএন লারমা) নামে গঠিত হয়। এতে যোগ দেন শক্তিমান চাকমাও। তিনি সংগঠনটির কেন্দ্রীয় কমিটির সহ-সভাপতি ছিলেন।

গেল বছরের নভেম্বরে খাগড়াছড়িতে সংবাদ সম্মেলন করে নতুন দলের আবির্ভাব করেন তপন জ্যোতি চাকমা ওরেফে বর্মা। তার নেতৃত্বে ১১ সদস্য বিশিষ্ট আহ্বায়ক গঠন করা হয়। এ নিয়ে চারটি সংগঠনের ভ্রাতৃঘাতি সংঘাতে প্রতিনিয়ত ঝরছে রাজনৈতিক কর্মীদের নাম। সব নিয়ে পার্বত্য রাজনীতি ফের অশান্ত হয়ে উঠেছে।

এদিকে, পাহাড় থেকে অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারে দাবি জানিয়ে আসছেন সাবেক পার্বত্য প্রতিমন্ত্রী ও জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি দীপংকর তালুকদার।

তিনি বলেন, ‘এখনই সময় পাহাড়ে অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার। শক্তিমান চাকমা আমাদের কেউ নন। আমরা চাই পাহাড়ে যেন অস্ত্রের ঝনঝনানি না থাকে। সশস্ত্র সংগঠনগুলো প্রতিনিয়ত মায়ের বুক খালি করছে।’

রাঙ্গামাটির পুলিশ সুপার আলমগীর কবীর বলেন, উপজেলা চেয়ারম্যান হত্যার পর আরো কয়েকজনের লাশ পড়ল। এটা কারোরই কাম্য না। আমরা আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে কাজ করছি।

পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির (এমএন লারমা) তথ্য ও প্রচার সম্পাদক সুধাকর ত্রিপুরা বলেন, গতকালকে শক্তিমান চাকমা এবং আজকে ৫ জনকে হত্যার ঘটনা ইউপিডিএফই ঘটিয়েছে। আর আমি শারীরিক ও মানসিকভাবে অসুস্থ। এখন আর এসব নিয়ে কোনও মন্তব্য করতে চাচ্ছি না।

ইউপিডিএফ প্রসীত গ্রুপের প্রচার ও প্রকাশনা বিভাগের প্রধান নিরণ চাকমা বলেন, গত দুই দিনের ঘটনার সাথে আমাদের কোনো সম্পৃক্ততা নেই। একটি মহল পার্বত্য চট্টগ্রামকে অশান্ত করার জন্য উঠে পড়ে লেগেছে। আমাদের কাজ তো মানুষ মারা না। ইউপিডিএফ মানুষ হত্যার রাজনীতি করে না। রাঙ্গামাটির স্থানীয় সংসদ সদস্য ও পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির সহসভাপতি ঊষাতন তালুকদার বলেন, পাহাড়ে তো সমতলের চেয়ে ভিন্ন ব্যাপার-স্যাপার আছে। সরকারের উচিত অচিরেই পার্বত্য চুক্তি বাস্তবায়ন করা। পার্বত্য চুক্তিকে মুলার মতো ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে। যার কারণে বিভিন্নজন বিভিন্ন দাবি নিয়ে নতুন দল গঠন করছে। তাই সরকারকে চুক্তি বাস্তবায়ন করে সুযোগবাদীদের হাত থেকে পার্বত্য চট্টগ্রামকে রক্ষা করতে হবে। আমরা চাই অচিরেই যেন পার্বত্য জেলা পরিষদগুলো আঞ্চলিক পরিষদের ক্ষমতায়নে থাকে।

উল্লেখ্য, ইউপিডিএফ সমর্থিত হিল উইমেন্স ফেডারেশনের নেত্রী মন্টি চাকমা ও দয়াসোনা চাকমা অপহরণ মামলার আসামি ছিলেন নানিয়ারচর উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ও পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির নেতা শক্তিমান চাকমা এবং ইউপিডিএফ (গণতান্ত্রিক)-এর আহ্বায়ক। এ বছর খাগড়াছড়িতে ইউপিডিএফ নেতা মিঠুন চাকমা হত্যা মামলার এজাহারেও আসামি হিসেবে নাম ছিল শক্তিমান চাকমার।