পাহাড়ে বাস, কাজ ঘোষনাতেই শেষ

প্রকাশ:| মঙ্গলবার, ৯ জুন , ২০১৫ সময় ০৯:১৯ অপরাহ্ণ

পাহাড়ে বাসবর্ষায় মাটি ধসে প্রাণহানি রোধে নগরীর ২৪টি পাহাড়ে গড়ে উঠা অবৈধ ও ঝুঁকিপূর্ণ বসতি উচ্ছেদে দু’দফা ঘোষণা দিয়েও পিছনে হটেছে প্রশাসন। সর্বশেষ গত ২ জুনের পাহাড় ব্যবস্থাপনা কমিটির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ৯ জুন থেকে উচ্ছেদ অভিযান শুরুর কথা থাকলেও এখানো উচ্ছেদের সিদ্ধান্তই নিতে পারেনি জেলা প্রশাসন। তাই আদৌ প্রাণহানিরোধে মাঠ পর্যায়ে কোন কার্যকর পদক্ষেপ নেয়া সম্ভব হবে কিনা সেই প্রশ্নও দেখা দিয়েছে।

প্রসঙ্গত, গত ২ জুন মঙ্গলবার সকাল ১১টায় চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিশনারের সম্মেলন কক্ষে পাহাড় ব্যবস্থাপনা কমিটির এক সভায় চট্টগ্রামের বিভাগীয় কমিশনার মোহাম্মদ আবদুল্লাহ বলেন, ‘চট্টগ্রামের ১১টি পাহাড়ে ঝুঁকিপূর্ণ বসবাসকারীদের চিহ্নিত করা হয়েছে। এতদিন মাইকিং ও নোটিশ দেয়া সত্ত্বেও তারা বসতি সরিয়ে নেয়নি। আগামী ৮ জুনের মধ্যে ঝুঁকিপুর্ণভাবে বসবাসরতদের পাহাড়ের পাদদেশ থেকে সরে যাওয়ার জন্য নোটিশ দেওয়া হবে। এর মধ্যে না সরলে আগামী ৯ জুন থেকে উচ্ছেদ অভিযান পরিচালিত হবে।’

এসময় তিনি আরো বলেন, ‘অভিযানের পূর্বে সংশ্লিষ্ট এলাকাগুলো থেকে গ্যাস, বিদ্যুৎ এবং ওয়াসার সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হবে। পাহাড়ের পাদদেশ বসবাসকারীদের সরিয়ে অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্রে নিতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণে সংশ্লিষ্ট এলাকার সহকারী ভূমি কমিশনারকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।’

জেলা প্রশাসক মেজবাহ উদ্দিন বলেন, ‘অভিযান শুরু হবে নগরীর মতিঝর্ণা ও বাটালি হিলে ঝুঁকিপূর্ণভাবে বসবাসকারীদের উচ্ছেদের মধ্যে দিয়ে। এরপর অন্যান্য পাহাড়ে ঝুঁকিপূর্ণে অবস্থায় বসবাসকারীদেরও উচ্ছেদ করা হবে।’

এমনকি এরআগেও গত মাসে পাহাড় ব্যবস্থাপনা কমিটির একটি সভায় প্রথম দফা ঘোষনা দিয়েও ঝুঁকিপূর্ণ বসবাসকারীদের উচ্ছেদ করতে পারেনি প্রশাসন।
তবে পাহাড় ব্যবস্থাপনা কমিটির সদস্য সচিব ও চট্টগ্রামের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) মোহাম্মদ ইলিয়াস হোসেন বলেন, ‘ঝুঁকিপূর্ণ চিহ্নিত পাহাড়ে বসাবাসকারীদের তালিকা তৈরির কাজ পূণাঙ্গ হয়নি। এছাড়া উচ্ছেদ অভিযানে অংশ নিতে সংশ্লিষ্ট সকল প্রতিষ্ঠানকে এখনো সেভাবে অফিসিয়ালি বলা হয়নি। পাহাড়ে বসবাসকারীদের পূর্ণাঙ্গ তালিক প্রস্তুত করার পরপরই উচ্ছেদ অভিযান শুরু করবো।’

বারবার ঘোষণা দিয়েও কেন উচ্ছেদ কার্যক্রম করছে না জেলা প্রশাসন এর উত্তরে এডিসি ইলিয়াস হোসেন বলেন, ‘আমরা সব প্রস্তুতি এখনো সম্পন্ন করতে পারিনি। পাহাড়ে বসবাসকারীরা তথ্য দিয়ে আমাদের সহযোগিতা করছে না। এছাড়া স্থানীয়রাও আমাদের তেমন সহযোগিতা করছেনা এই উচ্ছেদ কার্যক্রমে। সেজন্য হয়তো একটু দেরী হচ্ছে।’

জেলা প্রশাসন সূত্র জানায়, বর্তমানে নগরীর ১১টি পাহাড়ের পাদদেশে ঝুঁকিপূর্ণভাবে ৬৬৬টি পরিবার বসবাস করছে। এর মধ্যে নগরীর একে খান মালিকানাধীন পাহাড়ে ১৮৬ পরিবার, ইস্পাহানি পাহাড়ের দক্ষিণ পাশে হারুন খানের পাহাড় ও বায়তুন আমান সোসাইটির কাছে পাহাড়ে ৫টি, কৈবল্যধাম বিশ্ব কলোনি পাহাড়ে (পানির ট্যাংক) ২৭টি, লেকসিটি আবাসিক এলাকার পাহাড়ে ১২টি, আকবর শাহ আবাসিক এলাকা পাহাড়ে ২২টি,

পরিবেশ অধিদপ্তরের কাছে সিটি কর্পোরেশন পাহাড়ে ১১টি, ফয়েজ লেক আবাসিক এলাকার কাছে পাহাড়ে ৯টি, ফরেস্ট রিসার্চ ইন্সটিটিউট অ্যাকাডেমির উত্তর পাশে মীর মোহাম্মদ হাসানের মালিকানাধীন পাহাড়ে ৩৮টি, নাসিরাবাদ শিল্প এলাকা সংলগ্ন পাহাড়ে ৩টি, জালালাবাদ হাউজিং সোসাইটি সংলগ্ন পাহাড়ে ৩৩টি, মতিঝর্ণা ও বাটালি হিল পাহাড়ে ৩২০টি পরিবার ঝুঁকিপূর্ণভাবে বসবাস করছে। এ ১১টি পাহাড় ছাড়াও আরো ১৪টি পাহাড়ের পাদদেশে ঝুঁকিপূর্ণ বসতি রয়েছে।

জেলা প্রশাসন সূত্র জানায়, বর্ষা মৌসুমে পাহাড় ও দেওয়াল ধ্বসে গত ৮ বছরে প্রায় ২০০ মানুষের প্রাণহানি ঘটেছে। এর মধ্যে ২০০৭ সালের ১১ জুন স্মরণকালের ভয়াবহ পাহাড় ধ্বসে চট্টগ্রামে ১২৭ জনের প্রাণহানি ঘটে। ২০০৮ সালের ১৮ আগস্ট লালখানবাজারের মতিঝর্ণা এলাকায় পাহাড় ধ্বসে মারা যান ১১ জন, ২০০৯ ও ২০১০ সালে নগরীর পাহাড়তলী, সিআরবি, ক্যান্টনমেন্ট এলাকায় বিচ্ছিন্নভাবে মারা যান আরও ১৫ জন।

২০১১ সালের ১ জুলাই পাহাড় ধ্বসে একই পরিবারের ৮ জনসহ বাটালি পাহাড়ের রিটেইনিং দেয়াল ধ্বসে ১৭ জন মারা যান। ২০১২ সালে ১৭ জুন নগরীর ফিরোজ শাহ কলোনিসহ বিভিন্ন এলাকায় ২৩ জন মারা গেছেন। ২০১৩ সালে পাহাড় ও দেয়াল ধ্বসে মৃত্যু হয়েছে কমপক্ষে ৫ জনের।

২০০৭ সালে পাহাড় ধ্বসের ঘটনার পর চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিশনারের নেতৃত্বে একটি কমিটি ২৮টি কারণ নির্ধারণ করে ৩৬টি সুপারিশ প্রণয়ন করে। তবে সুপারিশগুলো আজও বাস্তবায়ন হয়নি।

পাহাড় ব্যবস্থাপনা কমিটির সিদ্ধান্তের মধ্যে ছিল- পাহাড়ের পাদদেশে বসবাসরতদের উচ্ছেদ অভিযান অব্যাহত রাখা, পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা, অবৈধ স্থাপনা নির্মাণ বন্ধ করতে পাহাড়ে পুলিশ ও আইনশৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনী নিয়োজিত থাকা, পাহাড়ে কাঁটাতারের ঘের দেয়া এবং সামাজিক বনায়নের আওতায় আনা, উদ্ধার কার্যক্রম পরিচালনা করার জন্য ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের জন্য আধুনিক ও উন্নতমানের সরঞ্জামাদি ক্রয় করা ইত্যাদি।