পাহাড়ে বানিজ্যিকভাবে বাঁশ চাষের সম্ভাবনার নতুন দুয়ার

প্রকাশ:| বুধবার, ৫ জুন , ২০১৩ সময় ০৫:৩২ অপরাহ্ণ

বাংলাদেশে বাণিজ্যিকভাবে পরিবেশবান্ধব বাঁশ চাষের প্রচলন না থাকলেও দুই বন্ধুর নিজস্ব প্রচেষ্টায় নতুন একটি পদ্ধতি গ্রহনের ফলে পার্বত্যাঞ্চলে বানিজ্যিক বিত্তিতে বাশঁ চাষের ব্যাপক সম্ভাবনার সৃষ্টি হয়েছে।অল্প খরছে অত্যন্ত লাভজনক বানিজ্যিকভাবে বাঁশ চাষের এই নতুন সম্ভাবনা সৃষ্টি করেছেন খাগড়াছড়ি জেলার রামগড় উপজেলার বড়পিলাক গ্রামের দুই বন্ধু কৃষক সানাউল্ল্যাহ,নুরুলইসলাম।
তারা সাড়ে সাত একর জমির উপর বাশের বিচি দিয়ে চাষ করে এলাকার মডেল চাষী হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে।প্রচলিত সনাতন পদ্ধতি ছেড়ে অল্প সময়ে ব্যাপক বাঁশের খামার গড়ে তুলে সাফল্যের নতুন দিগন্ত খুলে দিয়েছেন তারা।
পার্বত্য চট্রগ্রামে ১৫-২০ বছর আগে প্রকৃতিকভাবে গড়ে উঠা বাশঁ বাগানে সমাহার দেখা গেলেও কালের বিবর্তনে বনাঞ্চল উজার করার ফলে বর্তমানে তেমন একটা চোখে পড়ে না।বিলুপ্তপ্রায় বাশ চাষ করে শুধু আর্থিকভাবে স্বচ্ছলতা নয় বরং বিশ্ব দরবারে বাংলাদেশের ভাবমুর্তি উজ্জ্বল করবে বলে সুশিল সমাজ মনে করে।
বাংলাদেশের মাটি পানি আর আবহাওয়া বাঁশ চাষের জন্য যেমন উপযোগী, তেমনি এদেশে বাঁশের প্রচুর চাহিদা থাকায় বাণিজ্যিক ভিত্তিতে বাঁশ চাষের ব্যাপক সম্ভাবনাও রয়েছে। এতে পরিবেশে ভারসাম্যও কিছুটা রতি হবে। এই সম্ভাবনাকে কাজে লাগিয়ে বাশ চাষ করে বাশ রায় গুরুত্বপুর্ণ ভুমিকা রাখবে। তাদের সৃজিত বাগানে বিভিন্ন প্রজাতির বাঁশ চাষ হচ্ছে। অন্য ফসলের চেয়েও এটাকে লাভজনক বলছেন চাষীরা।তারা বলেন,যেখানে একটি আম্রপালির বাগানের একটি গাছ থেকে গড়ে ৫কেজি আম পারা যায়,যার মুল্য ৩০টাকা করে দেড়শ টাকা সেখানে প্রতিটি ১নাম্বার মুলি বাশ প্রতি পিস বিক্রি করা যায় ৩০টাকা।
পৃথিবীতে প্রায় সাড়ে ৩শ প্রজাতির বাঁশ রয়েছে। এরমধ্যে বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে মুলি,বাজালি,রফাই,বরাগ,মৃতিঙ্গাসহ প্রায় ২০ প্রজাতির বাঁশ পাওয়া যায়। প্রয়োজন ভেদে একেক প্রজাতির বাঁশ একেক কাজে লাগে।
এই এলাকার বাশ বিশ্বজুড়ে সামাদৃত। এই পদ্ধতিতে বাঁশ চাষ খুবই সহজ। মাত্র তিন বছরেই বাড়ন্ত বাঁশে ভরে ওঠে বাগান। এক বছরেও বাঁশ বিক্রি করা যায়। এভানকার বাশ চাঁদপুর,সিলেট,কুমিল্লাসহ বিভিন্ন স্থানে বিক্রি হয়।
বিভিন্ন জাতের বাশ দিয়ে বিভিন্ন রকম আসবাবপত্র তৈরি করা হয়। যেমন মুলি বাশ দিয়ে বাড়ীঘর নির্মান,বাড়ীর বেড়া ,সিলিং তৈরি।বাজালি বাঁশ দিয়ে বাশের বাঁশি তৈরি হয়। বরাগ বাশ দিয়ে বাড়ীঘরের খুটিসহ বিভিন্ন গুরুত্বপুর্ণ কাজ করা হয়। বাশ দিয়ে না রকম ফার্নিচারেরও জুড়ি নেয়। বাশের ফার্ণিচারের কদও বিশ্বজুড়ে। বাশ দিয়ে মুড়া,খাট,সোফা,ওয়ারড্রবসহ নানা রকম রকমারি আসবাবপত্র তৈরি করে কাঠের চাহিদার বিরাট একটা চাহিদা পুরন করা হয়।
এ বাশি সারা পৃথিবীতে রপ্তানি হয় এবং বাংলাদেশ আয় প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা। বাঁশ চাষের এই নতুন পদ্ধতি নিয়ে মানুষের মাঝে ব্যাপক আগ্রহও সৃষ্টি হয়েছে। দেখাদেখি তাদের মধ্যেও বাঁশ চাশের আগ্রহ বাড়ছে।
কৃষক সানাউল্ল্যাহ ও নুরুল ইসলামকে বাঁশ চাষের ব্যপারে জিঙ্গাসা করলে তারা বলেন,প্রতি একশত বছর পর পর বাশে এক ধরণের বিচি হয়। যখন এ বিচি হয় তখন বাশ মরতে শুরু করে। আর গত তিন বছর পুর্বে অত্র এলাকার বাশ মরে যায়। পার্বত্য চট্রগ্রামে সিংহভাগ বাশেঁর বাগানের বিলুপ্তি ঘটে।ফলে প্রায় বাশঁ শূন্য হয়ে যায় পার্বত্যাঞ্চল।মরুভুমি হয়ে যায় এলাকা। আমরা নিজেদেও ঘরবাড়ী নির্মান করার জন্য বাশ পেতামনা। বহু দুর থেকে অনেক কষ্ট করে এ বাশ সংগ্রহ করে আনতে হত চড়া দাম দিয়ে।
একদিন চিন্তা করলাম কিভাবে বিলুপ্তপ্রায় এ বনজ সম্পদ রা করা যায়। পরে দুই বন্ধু মিলে নিজের অল্প একটু জমিতে বাশ চাষ করলাম। পরে বাঁশ চাষ করতে গিয়ে নানা সমস্যায় পরতে হয়েছে। প্রথমে যখন বাশের বিচি রোপন করি তখন এক রকম পিপড়া বাশের বিচি খেয়ে নষ্ট কওে ফেলত। পরে ফুরাডন দিয়ে পুনরায় রোপন করার পর বাশের চারা গজাতে শুরু করল। তখন খুব আনন্দ হয়েছিল। প্রথমে ত্রিশ হাজার টাকা খরচ করে এক বছরে প্রায় ৫০হাজহার টাকার মত বাশ বিক্রি করেছি। এছাড়া পুরো বাগানে বর্তমানে ৪লাখ ছোট বড় বাঁশ আছে বলে জানান যার বর্তমান বাজার মুল্য ৬০লাখ টাকা। বাশ বিক্রি করতে কষ্ট পেতে হয়না বলেও জানান তারা। বড় বড় পাইকার এসে বাশ কিনে নিয়ে যান। খুব বেশি পরিচর্চারও দরকার হয়না শুধু মাঝে মাঝে বাগান পরিস্কার করে দিলেই হয়।
তবে বাশ বেড়ে উঠার সময় উপজাতীয় কিছু লোকজন বাশবাগানের বৃহৎ তিসাধন করে। তারা কচি কচি বাশ বাগান থেকে কেটে নিয়ে ২০-২৫টাকা কেজিতে বাজারে বিক্রি করে দেয়। উপজাতীয় লোকজন এ কচি বাশ রান্না করে খায়। নিষেধ করলেও তারা শোনেনা। জালিয়াপাড়া বনবিভাগের কর্মকর্তা হাবিবুর রহমান জানান,এ ধরনের বাশ চাষ পাহাড়ে প্রথম। পরিবেশ বিপর্যয় ও বিলুপ্তপ্রায় বাশ চাষ নি:সন্দেহে প্রসংসার দাবিদার।
পরিবেশ বিপর্যয়ের হাত থেকে বাঁচতে পরিবেশবান্ধব বাঁশ চাষের এই সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে পারলে দেশের অর্থনীতিতে যেমন ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে, তেমনি বাঁশ শিল্পের মাধ্যমে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।images bas


আরোও সংবাদ