পাহাড়ে নবান্ন উৎসবের প্রস্তুতি; জুমে ভালো ফলন

mirza imtiaz প্রকাশ:| সোমবার, ১০ সেপ্টেম্বর , ২০১৮ সময় ০৯:১৭ পূর্বাহ্ণ

জুমের ফসল ঘরে তুলতে ব্যস্ত এখন বান্দরবানের পাহাড়িরা। শিশু-কিশোর, তাদের মা-বাবারা কেউই বসে নেই ঘরে। পরিবারের সকলে জুমের ধান কাটতে নেমেছে পাহাড়ের জুমখেতে। ফসল ঘরে তোলার আনন্দের সাথে পাহাড়ি পল্লিগুলোতে চলছে নবান্ন উৎসবের প্রস্তুতিও। এ বছর জুমের আশানুরূপ ভালো ফলন হয়েছে, দাবি জুমিয়াদের।

কৃষি বিভাগের দেয়া তথ্যমতে, চলতি বছর জেলায় প্রায় ৮ হাজার ৯৮৮ হেক্টর জমিতে জুমচাষ হয়েছে। গত বছর জুমচাষ হয়েছিল ৮ হাজার ৯৬৭ হেক্টর জমিতে। এছাড়া ২০১৬ সালে ৮ হাজার ৯৩৭ হেক্টর জমিতে এবং ২০১৫ সালে জুমচাষ হয়েছিল ৯ হাজার ৫০ হেক্টর পাহাড়ি জমিতে। গত বছরের তুলনায় এ বছর বান্দরবান জেলায় জুমচাষ বেড়েছে ২১ হেক্টর পাহাড়ি জমিতে। এ বছর উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয় ১২ হাজার ৭৩৫ মেট্রিক টন।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগের উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা ভবতোষ চক্রবর্তী বলেন, জেলায় প্রতি বছর জুমচাষ ক্রমান্বয়ে বাড়ছে। গত তিন বছরের হিসাবে দেখা গেছে ২১ থেকে ৩০ হেক্টর পর্যন্ত প্রতিবছর জুমচাষ বেড়েছে। এবছর জুমের বাম্পার ফলন হয়েছে। জুমধান কেটে ঘরে তোলা শুরু করেছে জুমিয়ারা। জুমচাষ থেকে জুমিয়ারা সারা বছরের খাদ্য সংরক্ষণ করে।
জানা গেছে, পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাসরত পাহাড়িরা প্রতি বছর জেলার বিভিন্ন স’ানে শত শত পাহাড় আগুনে পুড়িয়ে জুমচাষ করে। তারা পাহাড়ে ধানের পাশাপাশি ভুট্টা, মরিচ, যব,সরিষা, মিষ্টিকুমড়া, মারফা, টকপাতা, ফুলসহ বিভিন্ন রকমের সবজি উৎপাদন করে। তবে একটি পাহাড়ে একাধিকবার জুমচাষ করা যায় না বলে জুমিয়ারা প্রতিবছর ভিন্ন ভিন্ন পাহাড়ে জুমচাষ করে। জেলায় বসবাসরত ম্রো, মারমা, তঞ্চঙ্গ্যা, খুমি, লুসাই, চাকমা, পাংখো, বম, চাকসহ ১১টি পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর অধিকাংশই জুমচাষে নির্ভরশীল।

জেলা শহরে বসবাসরত কিছু সংখ্যক শিক্ষিত পরিবার ছাড়া দুর্গম অঞ্চলের পাহাড়ি গ্রামগুলোর পাহাড়িরা আজও জুমচাষে জীবিকা নির্বাহ করে। তবে ১১টি পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর মধ্যে একমাত্র ম্রো সমপ্রদায় আদিকাল থেকে এখনো পর্যন্ত জুমচাষেই সারাবছরের জীবিকা সংগ্রহ করে। জুমিয়া পরিবারগুলো প্রতিবছর মার্চ-এপ্রিল মাসের দিকে জুমচাষের জন্য পাহাড়ে আগুন লাগান। আর মে-জুন মাসের দিকে আগুনে পোড়ানো পাহাড়ে জুম চাষ আরম্ভ করেন। প্রায় ৩/৪ মাস পরিচর্যার পর বছরের সেপ্টেম্বর মাস থেকে জুমধান কাটা শুরু হয়। জুমের সেই পাকা ধানসহ উৎপাদিত অন্যান্য ফসল ঘরে তুলতে ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছে এখন পাহাড়িরা। রুমা, থানছি, রোয়াংছড়ি, আলীকদম, লামা উপজেলা এবং ট্যুরিস্ট স্পট নীলাচল, নীলগিরি-চিম্বুক সড়কের দুপাশের পাহাড়গুলোতে এখন শোভা পাচ্ছে জুমধানের সোনালি হাসি। জুমে কাচা-পাঁকা ধানের ছড়াগুলো দুলছে বাতাসে। জুমের পাকা ধানের গন্ধ ছড়াচ্ছে এখন পাহাড়ি জনপদগুলোতে।

চিম্বুক সড়কের ম্রোলং পাড়ার জুমচাষি মেনুলু ম্রো, রিংরাং ম্রো বলেন, এবছর জুমের আশানুরূপ ফসন হয়েছে। প্রায় পাঁচ-সাত একর জমিতে ধানসহ বিভিন্ন ধরনের সবজি লাগিয়েছি। এখন জুমের পাকা ধান কেটে ঘরে তোলা হচ্ছে।
ওয়াইজংশন পাড়ার জুমচাষি মাংরি ম্রো বলেন, আগাম লাগানো জুমখেতের ধান পেকেছে। কিন’ যারা একটু দেরিতে চাষ করেছিল, তাদের খেতের ধান এখনো পাকেনি। তবে খুবই ভালো ফলন হয়েছে এবার। তাই নবান্ন উৎসবের প্রস’তিও চলছে পাহাড়ি গ্রামগুলোতে।

স’ানীয় ম্রো সম্প্রদায়ের লেখক ও গবেষক সিংইয়ং ম্রো বলেন, জুমচাষ পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর একটি আদি চাষাবাদ পদ্ধতি। এটি প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষায় ক্ষতিকারক হলেও পাহাড়ি জনগোষ্ঠীগুলোর ঐতিহ্যের অংশ। জুমিয়া পরিবারগুলো পাহাড়ে ধান ছাড়াও ভুট্টা, মরিচ, যব, সরিষা, মিষ্টিকুমড়া, মারফা, টকপাতাসহ বিভিন্ন রকমের সবজির উৎপাদন করে। জুমে উৎপাদিত ফসলের মাধ্যমেই সারাবছরের জীবিকা নির্বাহ করে জুমিয়া পরিবারগুলো। জুমের ফসল ঘরে তোলার সময়টায় পাহাড়ি পল্লিগুলোতে ঢাকঢোল পিটিয়ে নবান্ন উৎসবও আয়োজন করে তারা। তবে লাভজনক না হওয়ায় অনেকে জুমচাষ ছেড়ে মিশ্রফল চাষের দিকেও ঝুঁকছে।

এ বিষয়ে জেলা কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগ বান্দরবানের উপ-পরিচালক মো. আলতাফ হোসেন জানান, জুমে উৎপাদিত ফসল এ অঞ্চলের খাদ্য চাহিদার অনেকাংশই পূরণ করে। তবে আদি পদ্ধতিতে জুমচাষের কারণে পাহাড়ে ক্ষয় সৃষ্টি হয় এবং জমির উর্বরতা হ্রাস পায়। বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে জুমচাষ করা গেলে উৎপাদিত ফসলের পরিমাণ আরো বাড়বে। সেই সঙ্গে পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করা যাবে। সেই লক্ষে জুমচাষিদের নতুন প্রযুক্তি ব্যবহারের জন্য বিভিন্ন ধরনের প্রশিক্ষণ দিয়ে উদ্বুদ্ধ করা হচ্ছে।