পাহাড়ে জুমের ধান ঘরে তুলতে ব্যস্ত পাহাড়ীরা

প্রকাশ:| মঙ্গলবার, ৬ অক্টোবর , ২০১৫ সময় ১০:০৩ অপরাহ্ণ

পাহাড়ে জুমের ধান ঘরে তুলতে ব্যস্ত পাহাড়ীরা৪আলাউদ্দিন শাহরিয়ার বান্দরবান ॥
বান্দরবানের পাহাড়ে জুমের ফসল ঘরে তুলতে ব্যস্ত এখন পাহাড়ীরা। শিশু কিশোর এবং বাবা-মা কেউই বসে নেই ঘরে। পরিবারের সকলে জুমের ধান কাটতে নেমেছে পাহাড়ে। ফসল ঘরে তোলার আনন্দে পাহাড়ী পল্লীগুলোতে চলছে নবান্ন উৎসবও। তবে অতিবৃষ্টিতে এবছর বান্দরবানের জুমের আশানুরুপ ফলন হয়নি বলে দাবী জুমিয়া পরিবারগুলোর। চলতি বছর জেলায় প্রায় ৮ হাজার ৪৫৮ হেক্টর পাহাড়ী জমিতে জুম চাষ করা হয়েছে। আর গতবছর জুম চাষ করা হয়েছিল ৮ হাজার ৪৪৭ হেক্টর জমিতে। ফলে এবছর পাহাড়ে ১১ হেক্টর জমিতে জুম চাষ বেড়েছে জানিয়েছেন কৃষি বিভাগ।
জুমচাষীরা জানায়, পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাসরত পাহাড়ীরা প্রতিবছর জেলার বিভিন্নস্থানে শতশত পাহাড়ে জুম চাষ করে। জুমিয়ারা পাহাড়ে ধানের পাশাপাশি ভূট্টা, পাহাড়ে জুমের ধান ঘরে তুলতে ব্যস্ত পাহাড়ীরা২মরিচ, যবসরিষা, মিষ্টি কোমড়া, মারমা, টকপাতা, ফুল’সহ বিভিন্ন রকমের সবজির চাষ করে। তবে একি পাহাড়ে একাধিকবার জুম চাষ করা যায় না বলে জুমিয়ারা প্রতিবছর ভিন্ন ভিন্ন পাহাড়ে জুমের চাষ করে। জেলায় বসবাসরত মারমা, চাকমা, তঞ্চঙ্গ্যা, খুমী, লুসাই, পাংখো, বম, চাক’সহ ১১টি পাহাড়ী জনগোষ্ঠীর অধিকাংশরাই জুম চাষের উপর নির্ভরশীল। জেলা শহরে বসবারত কিছু সংখ্যক শিক্ষিত পরিবার ছাড়া দূর্গমাঞ্চলে পাহাড়ী গ্রামগুলোতে বসবাসরত পাহাড়ীরা আজও জুম চাষের মাধ্যমে জীবিকা নির্বাহ করে। তবে ১১টি পাহাড়ী জনগোষ্ঠীর মধ্যে একমাত্র ম্রো সম্প্রদায় আদিকাল থেকে এখনো পর্যন্ত জুম চাষের মাধ্যমেই সারাবছরের জীবিকা সংগ্রহ করে। জুমিয়া পরিবারগুলো প্রতিবছর বছরের মার্চ-এপ্রিল মাসের দিকে জুম চাষের জন্য পাহাড়ে আগুন দেয়। মে-জুন মাসের দিকে আগুনে পোড়ানো পাহাড়ে জুম চাষ শুরু করে। প্রায় ৩/৪ মাস পরিচর্যার পর বছরের সেপ্টেম্বর মাসের শেষদিক থেকে পাহাড়ে জুমের ধান কাটা শুরু করে। জুমের পাঁকা ধান’সহ উৎপাদিত অন্যান্য ফসল ঘরে তোলতে ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছে পাহাড়ীরা। বান্দরবানের রুমা, থানছি, রোয়াংছড়ি উপজেলা এবং ট্যুরিস্ট স্পট নীলাচল, নীলগিরি-চিম্বুক সড়কের রাস্তার দুপাশের পাহাড়ের এখন শোভা পাচ্ছে সোনালী হাসি। জুমে কাচা-পাঁকা ধানের ছড়িগুলো দুলছে বাতাসে। জুমের পাঁকা ধানের গন্ধ ছড়াচ্ছে এখন পাহাড়ী জনপদগুলোতে। চিম্বুক সড়কের ম্রোলং পাড়ার জুমচাষী মেনুলু ম্রো বলেন, অতিবৃষ্টি এবং কড়ায় বান্দরবানে পাহাড়ে জুমের ধান ঘরে তুলতে ব্যস্ত পাহাড়ীরা৩চলতি বছর জুমের ফসল ভালো হয়নি। পাহাড়ে পাঁচ একর জমিতে জুম চাষ করে আশানুরুপ ফলন পায়নি। বৃষ্টিতে ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। রুমা উপজেলার ওয়াইজংশন পাড়ার জুমচাষী ম্রানলে ম্রো বলেন, অতিবৃষ্টির কারণে এবছর পাহাড়ে সঠিক সময়ে জুম চাষ করা যায়নি। অসময়ে দেরিতে জমিতে জুমের ধান এবং সবজির বীর বপন করায় ফলন ভালো হয়নি। অতিবৃষ্টিতে গাছের গোড়ায় পচে গেছে এবং উৎপাদিত ফসলও বেড়ে উঠার আগেই পচে নষ্ট হয়ে গেছে বাগানে। স্থানীয় ম্রো সম্প্রদায়ের লেখক ও গবেষক সিইয়ং ম্রো জানান, জুমচাষ পাহাড়ী জনগোষ্ঠীর একটি আদি চাষাবাদ পদ্ধতি। এটি প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষায় ক্ষতিকারক হলেও এটি পাহাড়ী জনগোষ্ঠীদের ঐতিহ্যের অংশ। জুমিয়া পরিবারগুরো পাহাড়ে ধান ছাড়াও ভূট্টা, মরিচ, যবসরিষা, মিষ্টি কোমড়া, মারমা, টকপাতা’সহ বিভিন্ন রকমের সবজির চাষ করে। জুমে উৎপাদিত ফসলের মাধ্যমেই সারাবছরের জীবিকা নির্বাহ করে। জুমের ফসল ঘরে তোলার সময়টায় পাহাড়ী পল্লীগুলোতে নবান্ন উৎসবেরও আয়োজন চলে।
কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগের বান্দরবানের উপ-পরিচালক আলতাফ হোসেন জানান, জুমে উৎপাদিত ফসল এ অঞ্চলের চাহিদার অনেকাংশই মেটায়। তবে আদিপদ্ধতিতে জুম চাষের কারণে পাহাড়ের ক্ষয়সৃষ্টি এবং জমির উর্বরতা হ্রাস পাচ্ছে। বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে জুম চাষ করা গেলে উৎপাদিত ফসলের পরিমাণ আরো বাড়বে। সেই সঙ্গে পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করা সম্ভব হবে।
নিউজচিটাগং২৪কম/আনিস