পাহাড়ে চলছে বৈসাবি উৎসব, খাগড়াছড়িতে পর্যটকের ভিড়

প্রকাশ:| রবিবার, ১৩ এপ্রিল , ২০১৪ সময় ১০:৫০ অপরাহ্ণ

নুুরুচ্ছাফা মানিক, খাগড়াছড়ি॥
পাহাড়ে চলছে বৈসাবি উৎসবপাহাড়ে আজ থেকে শুরু হয়েছে প্রাণের উৎসব বৈসাবি। ত্রিপুরা সম্প্রদায়ের বৈসু, মারমা সম্প্রদায়ের সাংগ্রাই ও চাকমা সম্প্রদায়ের বিশু। আর এই তিনটি নামের প্রথম অক্ষর নিয়ে এর নাম বৈসাবি। বৈসাবির প্রস্তুতিকে ঘিরে পাহাড়ে এখন সাজ সাজ রব। পাহাড়ের প্রত্যন্তাঞ্চলের গ্রামগুলোতে চলছে বৈসাবি উৎসব উদযাপনের শেষ মর্হুতের প্রস্তুতি। ঘর সাজানো, অতিথিদের আপ্যায়নে ঘরের চৌকুটে ফুল লাগানো, নতুন জামা-কাপড় কেনা ও নিজের পছন্দের মানুষের সাথে জলকেলী বা ঘুরাঘুরি পরিকল্পনায় এখন ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছে পার্বত্য জনপদ খাগড়াছড়ির চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা জনগোষ্ঠীর তরুণ-তরুণীরা।

খাগড়াছড়ি জেলার খাগড়াপুরে আজ থেকে শুরু হয়েছে ত্রিপুরাদের ঐতিহ্যবাহী গরিয়া নৃত্য। এতে পুরো জেলা থেকে ত্রিপুরাদের ১৮টি গরিয়া নৃত্যের দল অংশ নেয়। অন্যদিকে ১লা বৈশাখকে ঘিরে জেলা প্রশাসন পক্ষ থেকে নানা অনুষ্ঠান হাতে নিয়ে হয়েছে। ১৫ই এপ্রিল হবে মারমা সম্প্রদায়ের ঐহিত্যবাহী পানি খেলা উৎসব। এখন সব মিলিয়ে পাহাড়ে এখন বৈসাবী উৎসবকে ঘিওে পাহাড়ী বাঙালীদেও মধ্যে এক মেলবন্ধন সৃষ্টি হয়েছে। পাহাড়ের বৈসাবি উৎসব সরাসরি উপভোগ করতে এখন খাগড়াছড়িতে ভিড় করেছে দেশীয় বিদেশীয় অসংখ্য পর্যটক।

বৈসুঃ ত্রিপুরা সম্প্রদায় বৈসু উৎসবের মাধ্যমে পুরাতন বছরকে বিদায় ও নতুন বছরকে স্বাগত জানায়। ত্রিপুরাদের ধর্মীয় এবং সামাজিক উৎসবের মধ্যে সবচেয়ে আকর্ষনীয় এবং অন্যতম উৎসব হল বৈসু। চৈত্র মাসের শেষের দুইদিন ও নববর্ষের প্রথমদিন(১লা বৈশাখ) সহ তিনদিন ধরে পালন করে। প্রথম দিনকে ত্রিপুরারা ‘হারি বুইসুক’, দ্বিতীয় দিনকে ‘বুইসুকমা’ এবং তৃতীয় দিন অর্থাৎ পহেলা বৈশাখের দিনকে বলে ‘বিসিকাতাল’। প্রথম দিনে ত্রিপুরা তরুণ-তরুণীরা ফুল তোলে তা দিয়ে ঘর সাজায়। ছোট ছেলে-মেয়েরা নতুন কাপড় চোপড় পড়ে ঘিরে-বেড়ায় এক ঘর থেকে আরেক ঘর, এক গ্রাম থেকে অন্য আরেক গ্রামে। বৈসুর শুরু হওয়ার প্রথমদিন থেকে গরাইয়া নৃত্য দল গ্রামে গ্রামে ঘুরে বেড়ায় এবং প্রত্যেক ঘরের উঠানে উঠানে নৃত্য করে। এই দলের শিল্পীদের একজনের কাঁধে একটি শূল থাকে। এই শূলে একটি খাদি বাঁধা থাকে। যদি কোন ঘরের উঠানে এই শূলটি বসানো হয় তবে ঘরের মালিককে গরাইয়া দেবতার পূজা দিতে হয়। এভাবে পাড়ায় স্বচ্ছল প্রত্যেক ঘরের উঠানে নৃত্য শেষে শিল্পীদের পানীয়, মুরগীর বাচ্চা, চালসহ প্রভৃতি দেওয়া হয়।

সাংগ্রাইঃ মারমা সম্প্রদায়ের মানুষের কাছে উৎসবের অপর নাম সাংগ্রাই। এরা মঘী সনের চন্দ্র মাস অনুসারে এই দিনটি পালন করে থাকে। বাংলা বছরের শেষ দুইদিন এবং নববর্ষের প্রথমদিনসহ তিনদিন সাংগ্রাই উৎসব পালন করে মারমারা। মারমা সম্প্রদায়ের সাংগ্রাই উৎসবের সবচেয়ে আকর্ষনীয় অনুষ্ঠান ‘রি লং পোয়ে’ অর্থাৎ জলখেলি বা পানিখেলা উৎসব। মারমা তরুণ-তরুণীরা বিভিন্ন দলে বিভক্ত হয়ে পানি খেলায় অংশ নেয়। ড্রামে পানি নিয়ে দুই প্রান্তে তরুণ-তরুণীরা অংশ নিয়ে এক দল অন্য দলকে পানি ছুঁড়ে খেলে পানিখেলা। সাংগ্রাইকে ঘিরে মারমা পল্লী গুলো লাগে আনন্দ ধুম। নাচে গানে, খেলাধুলায় ও খাওয়া-ধাওয়ায় মূখর থাকে গ্রামগুলো।

বিজু ঃ চাকমা জনগোষ্ঠীর অন্যতম অনুষ্ঠান হল বিজু। চৈত্রের শেষ দুদিন এবং পহেলা বৈশাখের দিন পার্বত্য জনপদ ভেসে ওঠে আনন্দ-উল্লাসে। পাহাড়ের সর্ববৃহৎ জনগোষ্ঠী চাকমা সম্প্রদায়ের প্রধান উৎসবকে ঘিরে আদাম(গ্রাম) গুলোতে লাগে আনন্দের ধুম। ফুলবিজুর মধ্য দিয়ে শুরু হয় উৎসবের। পানিতে ফুল ভাসিয়ে দিয়ে আনুষ্ঠানিক সূচনা হয় ফুলবিজুর। অতীতের সকল দুঃখ গ্লানি নদীর পানিতে ভাসিয়ে দিয়ে ভবিষ্য নিয়ে আনুক অনাবিল সুখ ও শান্তি এমন প্রত্যাশায় তারা ফুল বিজুর মধ্যে দিয়ে। রাতে বাড়ির আঙ্গিনায় সারি সারি প্রদীপ জ্বালিয়ে রাখা হয়। বিজুতে প্রতিটি ঘরে ঘরে হরেকরকম তরকারি দিয়ে রান্না করা হয় পাঁচন। হরেকরকম তরকারির সমন্বয়ে রান্না করা পাঁচন তরকারি পাঁচন তরকারি বিজু উৎসবের প্রধান খাবার। পাঁচন ছাড়াও বানানো হয় পিঠাপুলি, খই, ফলমূল, মিষ্টান্ন ছাড়াও থাকে পানীয়। বিজু উৎসবকে ঘিরে গ্রামে গ্রামে চলে ঘিলা খেলা, হা-ডু-ডু খেলা, রশি টানাটানি খেলাসহ আরও অনেক খেলা। বিজু উৎসবের সময় সন্ধ্যায় আকাশে ফানুস বাতি উড়ানো হয়। তখন মনে হয় যেন, বসন্তের ধবধবে সাদা আকাশটা প্রদীপের আলোতে ছেঁয়ে যায়।