পাহাড়ি বনে দেখা মেলে পান্ডাদের

নিউজচিটাগাং২৪/ এক্স প্রকাশ:| শুক্রবার, ৯ মার্চ , ২০১৮ সময় ১০:৫৭ অপরাহ্ণ

‘কুংফু পান্ডা’ সিনেমাটি নিশ্চয় তোমরা অনেকেই দেখেছ। অ্যানিমেশন এই সিনেমাটির প্রধান চরিত্র হলো ‘পো’ নামের একটি পান্ডা যে কি না ধীরে ধীরে কুংফু মাস্টারে পরিণত হয়। ক্যারাটে আর কুংফুর রকমারি সব ধরণ পো’র দখলে চলে আসে ধীরে ধীরে। তবে তার আগ পর্যন্ত সময়ে কিন্তু খানিকটা গোবেচারা, লাজুক এবং বোকা একটি প্রাণী হিসেবেই সবার সাথে পরিচয় হয় পো’র। খানিকটা অলসও সে। খাওয়া-দাওয়া ছাড়া যেন আর কোনোকিছুরই গুরুত্ব নেই তার কাছে। কেবল পো নয়, আসলে সব পান্ডার বৈশিষ্ট্যই এমনই। দেখতে নাদুস-নুদুস পান্ডাদের কথাই তোমাদের জন্য তুলে ধরা হয়েছে এই লেখায়।

পান্ডা মূলত চীন দেশের একটি প্রাণী। বড়সড় ভাল্লুকের মতো দেখতে পান্ডারা আসলে স্তন্যপায়ী। চীনের মধ্যাঞ্চলের কিছু পাহাড়ি বনে দেখা মেলে পান্ডাদের। একটা সময় অন্যান্য এলাকাতেও এরা বাস করলেও এখন সিচুয়ান, সাংশি আর গানসু প্রদেশেই কেবল দেখা যায় পান্ডাদের। কৃষি কাজ কিংবা বিভিন্ন ধরনের শিল্প-কারখানা স্থাপনের জন্য বন-জঙ্গল ধ্বংস করে দেওয়ার কারণেই আর সব জায়গায় পান্ডারা বাস করতে পারে না। কারণ পান্ডারা বাসস্থল হিসেবে সেই বনগুলোকেই বেছে নেয় যেখানে বড় বড় পাতাওয়ালা গাছ থাকে।

পান্ডারা দেখতে অনেকটাই ভাল্লুকের মতো। এদের পা, ঘাড়, কান আর চোখের চারপাশ ঘন কালো লোমে আবৃত থাকে। এদের শরীরের বাকি অংশগুলো সাদা লোমে ভরা। এদের শরীরের ঘন লোম এদেরকে প্রবল শীত থেকেও রক্ষা করে। বিশাল শরীরের একেকটি পান্ডা দেখতে যেমন নিরীহ, তেমনি এরা ব্যবহারেও খুব নিরীহ। চীনে তাই পান্ডাকে ‘শান্তির প্রতীক’ হিসেবেও মনে করা হয়ে থাকে। তবে পান্ডা সহজে নিজেরা কাউকে আক্রমণ না করলেও অন্যরা কেউ পান্ডাদের আক্রমণ করলে বা বিরক্ত করলে এরা ভয়ংকর হয়ে উঠতে পারে।

আকার আকৃতিতে পান্ডারা ছোট নয়। চার পায়ের ওপর দাঁড়ানো পূর্ণবয়সী একটি পান্ডার উচ্চতা ২ থেকে ৩ ফুট পর্যন্ত আর দৈর্ঘ্যে ৪ থেকে ৬ ফুট পর্যন্ত হয়ে থাকে। পুরুষ পান্ডারা তুলনামূলকভাবে মেয়ে পান্ডাদের চেয়ে বড়সড় হয়। পুরুষ পান্ডাদের ওজন তাই ২৫০ পাউন্ড পর্যন্ত হলেও মেয়ে পান্ডাদের ওজন ২২০ পাউন্ড পর্যন্ত পৌঁছায়। পান্ডারা সাধারণত ২০ থেকে ২৫ বছর বয়স পর্যন্ত বাঁচে। তবে মজার বিষয় হলো—চিড়িয়াখানায় থাকা পান্ডারা ৩৫ বছর বয়স পর্যন্ত বাঁচতে পারে।

পান্ডারা এমনিতে মাংসাশী প্রাণীদের অন্তর্ভুক্ত হলেও এদের খাবারের ৯৯ শতাংশই হলো বাঁশ। একেকটি পান্ডা প্রতিদিন গড়ে ২৫ থেকে ৩০ পাউন্ড বাঁশ খেয়ে থাকে! এত বিপুল পরিমাণ খাওয়ার জন্য দিনের প্রায় ১৬ ঘণ্টা সময়ই এদের কাটে খাওয়ার কাজে। বাঁশ ছাড়াও কিছু লতাপাতা, ঘাস, ফলমূল, পোকা ইত্যাদিও খায় পান্ডা। চিড়িয়াখানাতে অবশ্য পান্ডাদের আখ, গাজর, আলু, আপেল এবং বিশেষ ধরনের বিস্কুটও খাওয়ানো হয়ে থাকে। তবে সেখানেও তাদের মূল খাবার বাঁশ। সে কারণেই চিড়িয়াখানাতে পান্ডাদের লালন-পালন করা অত্যন্ত ব্যয়বহুল। খাওয়ার সময় বাঁশ সুন্দর করে ধরার জন্য পান্ডার হাতে একটি বিশেষ আঙুল থাকে। আর পান্ডারা তাদের দাঁতের মাধ্যমে বাঁশের ওপরের দিকের শক্ত আবরণ ছাড়িয়ে ভেতরের নরম অংশটি বের করে নিয়ে আসে খাওয়ার জন্য।

পান্ডাদের বাচ্চা হয় সাধারণত আগস্ট-সেপ্টেম্বর মাসে। একটি থেকে দুটি বাচ্চা একসাথে জন্ম নেয় পান্ডাদের। বাচ্চা জন্মগ্রহণের সময় ওজন হয় মাত্র ৯০ থেকে ১৩০ গ্রাম। এসময় তাদের গায়ের রঙ থাকে গোলাপী। নবজাতক পান্ডা চোখেও যেমন দেখতে পায় না, তেমনি এদের দাঁতও থাকে না। এরা কেবল মা পান্ডার বুকের দুধ খেয়েই বড় হতে থাকে। দুয়েক সপ্তাহের মধ্যেই এদের শরীরের রঙ হয় ধূসর। জন্মের মাসখানেক পর এদের শরীরের রঙ বড় পান্ডাদের মতো হয়ে থাকে। আড়াই মাসের মধ্যেই শিশু পান্ডা হামাগুড়ি দিতে শেখে আর ছয় মাসের মধ্যেই অল্প অল্প করে বাঁশ খাওয়া শুরু করে পান্ডারা। এক বছর বয়সের মধ্যেই পান্ডার ওজন প্রায় ৪৫ কেজি হয়ে যায়। জন্মের দেড় থেকে দুই বছর পর্যন্ত তারা মা পান্ডার অধীনেই থাকে।

পান্ডাদের ঘ্রাণশক্তি অত্যন্ত প্রখর। একটি পান্ডা অন্য একটি পান্ডাকে চিনে থাকে তার গায়ের গন্ধ দিয়েই। তাছাড়া রাতের বেলাতেও খাবার বাঁশকে চিনে নিতে সে গন্ধের সাহায্য নেয়। তবে এরা নানারকম ডাকও দিতে সক্ষম। প্রায় ১১ ধরনের ডাক পান্ডারা দিতে পারলেও এগুলোর কোনো অর্থ বিজ্ঞানীরা বের করতে পারেননি। পান্ডারা চার পায়ে চললেও কখনও কখনও মানুষের মতো করে দুই পায়ে দাঁড়াতে পারে। তবে পেছনের দুইটি পায়ে খুব বেশি জোর না থাকায় এরা বেশি সময় এভাবে দাঁড়িয়ে থাকতে পারে না। এরা সাঁতারও জানে। আর গাছে চড়তেও বেশ ওস্তাদ পান্ডারা। খেলাধুলার অংশ হিসেবে এরা ঢাল বেয়ে গড়িয়ে গড়িয়ে পড়ে।

আবাসস্থল কমে আসার কারণে পান্ডাদের সংখ্যাও দিন দিন পৃথিবী থেকে কমে যাচ্ছে। ২০০৮ সালের এক জরিপে বিশ্বব্যাপী মাত্র দেড় হাজারের কিছু বেশি পান্ডা জীবিত রয়েছে বলে জানিয়েছেন বিজ্ঞানীরা। পান্ডাদের সংখ্যা যেভাবে কমতে শুরু করেছে, তাতে করে হয়তো আর দুই-তিন দশক পরে পান্ডাদের দেখা পাওয়াই মুশকিল হয়ে যাবে।

মজার তথ্য

১. চীনে পান্ডাদের ‘শান্তির প্রতীক’ হিসেবে মনে করা হয়।

২. পান্ডার শরীরের সাদা ও কালো রঙকে চীন দেশে বিশ্বব্যাপী সমতার প্রতীক মনে করা হয়।

৩. ২০ থেকে ৩০ লক্ষ বছর ধরে পৃথিবীতে রয়েছে পান্ডারা।

৪. পান্ডার শরীরের হাড়ের ওজন একই আকৃতির অন্য প্রাণীদের হাড়ের তুলনায় দ্বিগুণ।

৫. হাঁটার সময় পান্ডার সামনের পায়ের আঙুলগুলো পেছনের দিকে মুখ করে থাকে।

৬. পান্ডাদের গায়ের লোম দেখতে নরম মনে হলেও এগুলো বেশ রুক্ষ। পূর্ণবয়স্ক পান্ডাদের গায়ের লোম ৪ ইঞ্চি পর্যন্ত লম্বা হয়।

৭. পান্ডাদের ৪২টি দাঁত থাকে। মানুষের মতোই এদের দাঁতও সাজানো থাকে দুই পাটিতে।

৮. পান্ডারা গ্রীষ্মকালে ৪ হাজার মিটার পর্যন্ত উচ্চতায় উঠে যেতে পারে।

৯. পান্ডাদের লেজের পেছনে একটি গ্রন্থি থেকে বিশেষ ধরনের গন্ধযুক্ত তরল নিঃসৃত হয়। লেজের মাধ্যমে এই তরল দিয়ে পান্ডা নিজেদের এলাকা চিহ্নিত করে থাকে।

১০. পান্ডারা প্রবল শীতে গাছের কোটর বা গুহায় আশ্রয় নেয়।