ভূমি আইন সংশোধনী’১৬ বাতিলের দাবিতে খাগড়াছড়িতে কাল সকাল-সন্ধা হরতাল

প্রকাশ:| মঙ্গলবার, ৯ আগস্ট , ২০১৬ সময় ০৮:৩০ অপরাহ্ণ

ভূমি আইন
শংকর চৌধুরী,খাগড়াছড়ি: পার্বত্য চট্টগ্রাম ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন সংশোধনী আইন ২০১৬ মন্ত্রিসভায় অনুমোদন নিয়ে আবারও উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে পাহাড়। আর এই কারণেই নতুন সংশোদিত ভূমি কমিশনকে অগ্রহণযোগ্য বলে দাবী তুলে এই সংশোধনী বাতিলের দাবীতে গত কয়েক দিন ধরে খাগড়াছড়িতে বিক্ষোভ মিছিল, মানববন্ধনসহ বিভিন্ন কর্মসুচি পালন করে আসছে পাহাড়ে বাঙ্গালীদের বিভিন্ন আঞ্চলিক সংগঠন গুলো তারই অংশ হিসেবে খাগড়াছড়িতে বুধবার পার্বত্য বাঙ্গালী ছাত্র পরিষদসহ বিভিন্ন সংগঠন সকাল সন্ধা হরতালের ডাক দিয়েছে।

ভূমি কমশন গঠনের পর দীর্ঘ ১৭ বছরে প্রায় সাড়ে চার হাজার মামলার মধ্যে একটি মামলাও নিষ্পত্তি করা সম্ভব হয়নি বলে জানাযায়। আর এর কারণ হিসেবে কমিশনের আইন এবং আইনের সংশোধনীকে প্রধান কারণ হিসেবে আখ্যায়িত করছেন পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়ি ও বাঙালি ভিত্তিক আঞ্চলিক সংগঠনগুলো ।

তবে পার্বত্য চট্টগ্রামের ভূমি বিরোধ বা ভূমি সমস্যা দীর্ঘস্থায়ী পার্বত্য অঞ্চলের একটি অন্যতম প্রধান সমস্যা এই ভূমি বিরোধ নিরসনের লক্ষ্যে ১৯৯৯ সালের ৩-রা জুন পার্বত্য শান্তিচুক্তির আলোকে গঠন কার হয় পার্বত্য চট্টগ্রাম ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন। ব্রিটিশ শাসকদের ঈযরঃঃধমড়হম ঐরষষ ঞৎধপঃং জবমঁষধঃরড়হ-১৯০০-সহ বিভিন্ন সময়ে রাষ্ট্র পরিচালনা কারি সরকার কর্তৃক প্রণয়নকৃত নিয়মনীতিগুলো সমাধান দিতে পারেনি এই এলাকায় বিরাজমান ভূমি সমস্যার।

জানাযায়, গত সোমবার ১ আগষ্ট প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভার বৈঠকে পার্বত্য চট্টগ্রাম ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন আইনের ১৪টি সংশোধনী ভেটিং সাপেক্ষে চুড়ান্ত অনুমোদন দেয়া হয়েছে। এতে পার্বত্য আঞ্চলিক পরিষদের পক্ষ থেকে আইনটিতে ২৩টি সংশোধনীর জন্য প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে।

এদিকে পার্বত্য অঞ্চলের স্থায়ি শান্তি স্থাপনের লক্ষে শান্তিচুক্তি স্বাক্ষরকারী সন্তু লারমা নেতৃত্বাধীন পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি (জেএসএস) এর নেতৃবৃন্দ বলছে, ২০০১ সালের ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন আইন সংশোধন না হওয়ায় ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন কার্যকর না হওয়ার প্রধান কারণ । তাদের অভিযোগ, আইনটি প্রণয়নের ক্ষেত্রে পার্বত্য চুক্তি অনুযায়ী জনসংহতি সমিতি (জেএসএস)’র সঙ্গে কোন প্রকার আলোচনা করা হয়নি। এবং এর জন্যে জেএসএস চুক্তির সঙ্গে অসংগতিপূর্ণের অভিযোগ এনে আইনটির ২৯টি সংশোধনীর দাবি করে আন্দোলন সংগ্রাম করে আসছে দীর্ঘ দিন ধরে। এ নিয়ে সরকারের মেয়াদে দীর্ঘ আলোচনাও হয়েছে একাধিক বার।

এরপর সেগুলো পর্যালোচনা করে পারস্পরিক আলাপ-আলোচনার ভিত্তিতে ১৪টি সংশোধনী অনুমোদন করা হয়। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো আগে পাঁচ সদস্যের কমিশন কোন বিরোধ নিষ্পত্তি করতে না পারলে কমিশনের চেয়ারম্যানের সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত বলে গণ্য হতো। কিন্তু সংশোধনীর ফলে পাঁচ সদস্যের কমিশনে চেয়ারম্যানসহ সংখ্যাগরিষ্ঠের সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত বলে বিবেচিত হবে বলেও উল্লেখ্য করা হয়। আইনের সংশোধনীতে একটি নতুন ধারা সংযুক্ত করে, পার্বত্য চট্টগ্রাম ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশনের দপ্তরে সচিব বা অন্যান্য কর্মকর্তার পদে উপজাতিদের অগ্রাধিকার দিতে হবে বলা হয়। আর সেক্ষেত্রে স্থানীয় বাসিন্দারা অগ্রাধিকার পাবে বলে বলা হয়েছে ।

আর এই কমিশনে চেয়ারম্যান ছাড়া অন্য চার সদস্য হলেন পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদের চেয়ারম্যান, সংশ্লিষ্ট জেলার সার্কেল প্রধান, চট্টগ্রামের বিভাগীয় কমিশনার। এবং সংশ্লিষ্ট জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান।

অপরদিকে পার্বত্য বাঙালি ছাত্র পরিষদসহ পাহাড়ে বাঙ্গালীদের বিভিন্ন আঞ্চলিক সংগঠন গুলোর অভিযোগ, ভূমি কমিশন আইনটি বৈষম্যমূলক। পাহাড়ের একটি বৃহৎ জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্বকে বাদ দিয়ে শুধুমাত্র পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্ব নিয়ে কমিশনের বিচারিক কাজ কখনোই এ সংকটের সমাধান দিতে পারবেনা।

আর এই কারণেই ভূমি কমিশনের কার্যক্রম বরাবরই বিতর্কিত এবং অগ্রহণযোগ্য বলে দাবী তুলে এই সংশোধনী বাতিলের দাবীতে গত কয়েক দিন ধরে খাগড়াছড়িতে বিক্ষোভ মিছিল, মানববন্ধনসহ বিভিন্ন কর্মসুচি পালন করে আসছে পাহাড়ে বাঙ্গালীদের বিভিন্ন আঞ্চলিক সংগঠন গুলো তারই অংশ হিসেবে খাগড়াছড়িতে সকাল সন্ধা হরতালের কর্মসুচি দেওয়া হয়েছে।

তবে খাগড়াছড়ি জেলা বিএনপি’র সভাপতি, সাবেক সাংসদ ওয়াদুদ ভূইয়া বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রাম ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন সংশোধনী ফলে বৃহৎ একটি জনগোষ্ঠী বৈষম্যের স্বীকার হতে পারে।

এদিকে নতুন সংশোধনীকে পার্বত্য চুক্তি বিরোধী পাহাড়ি আঞ্চলিক সংগঠন ইউনাইটেড পিপলস্ ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট (ইউপিডিএফ)’র কেন্দ্রীয় সহ-তথ্য ও প্রচার সম্পাদক নিরণ চাকমা রাজনৈতিক কৌশল বলে দাবী করে তিনি বলেন,
সংশোধনীর নামে পাহাড়ি জনগোষ্ঠীকে বোকা বানিয়েছে সরকার।

নতুন এই সংশোধনীকে স্বাগত জানিয়ে খাগড়াছড়ি ২৯৮ নং আসনের সংসদ সদস্য কুজেন্দ্র লাল ত্রিপুরা বলেন, পাহাড় বাসীর দীর্ঘ দিনের প্রত্যাশা পার্বত্য অঞ্চলে বসবাসরত পাহাড়ি বাঙ্গালীর সহ অবস্থানের লক্ষে মাননীয় প্রধান মন্ত্রি শেখ হাসিনার এই যুগোপযোগী পদক্ষেপ এই সংশোধিত নতুন আইনটি কার্যকর হলে পাবর্ত্য চট্টগ্রামে বসবাসরত পাহাড়ি বাঙ্গালিসহ সকল জনগোষ্ঠী উপকৃত হবে।

তবে পার্বত্য চট্টগ্রামের ভূমি বিরোধ নিরসনে সমতার ভিত্তিতে পাহাড়ি ও বাঙালি সম্প্রদায়ের সমান সংখ্যক প্রতিনিধিত্ব নিয়ে বিচারিক প্যানেল গঠন করতে হবে। নয়তোবা বরাবরের মতোই এবারেরর কমিশনও সফলতার মুখ দেখবেন না বলে মত দিয়েছেন বিভিন্ন অভিজ্ঞমহল।