পার্বত্য চট্টগ্রামে বাংলা নাটক

প্রকাশ:| রবিবার, ২৫ আগস্ট , ২০১৩ সময় ০৯:৪১ অপরাহ্ণ

নন্দলাল শর্মা >>
সাহিত্যের অন্যান্য শাখার তুলনায় নাটক রচনাতেও পার্বত্য চট্টগ্রামের লেখকরা পিছিয়ে নেই। এখানে বেশ কয়েকজন নাট্যকার জন্মগ্রহণ করেছেন। তাদের কিছু কিছু রচনা প্রকাশিত হয়েছে। স্বাধীনতা লাভের পর বাংলাদেশের নাট্য সাহিত্যে যে পরিবর্তন সূচিত ও অগ্রগতি সাধিত হয়েছে তার স্বর্ণ পরশ থেকে পার্বত্য চট্টগ্রাম বঞ্চিত।

পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রথম নাট্যকার কুমার কোকনদাক্ষ রায় (জন্ম ১৯১১) প্রথম ছোটগল্পকার হিসেবে বাংলা সাহিত্যের আসরে আত্মপ্রকাশ করলেও তিনি নাট্যকার হিসেবে বাণীর প্রসাদ লাভ করেন। কলকাতার দেশ, মাসিক বিচিত্রা এবং রাঙ্গামাটির গৈরিকা ও পার্বত্য বাণীতে তার নাটিকা প্রকাশিত হয়েছে।
কুমার কোকনদাক্ষ রায়ের প্রধান নাটিকা ‘পথের মায়া’ ১৯৩৭ সালে গৈরিকায় প্রকাশিত হয়। নাটিকাটি কোথাও সংরক্ষিত নেই। কলকাতার কাগজে প্রকাশিত নাটিকাগুলোসহ ষাটের দশকে চট্টগ্রাম বেতার থেকে প্রকাশিত তার ‘পথের কান্না’ নাটিকাটিও হারিয়ে গেছে। সবগুলো নাটিকা পাওয়া গেলে তার নাট্যপ্রতিভার সামগ্রিক মূল্যায়ন করা সম্ভব হতো।
গৈরিকায় প্রকাশিত ‘দক্ষিণের মন্ত্র গুঞ্জরনে’ (১৯৪০), ‘নীড়ের মায়া’ (১৯৪১), ‘ত্রয়ী’ (১৯৪৩), ‘এম.এ ও বি.এ’, (১৯৪৫) এবং পার্বত্য বাণীতে প্রকাশিত ‘দখিন হাওয়া’ (১৯৬৯) ও ‘বধূ কোন আলো’ (১৯৬৯) নাটিকাই আমাদের আলোচনার ভিত্তি।
‘দক্ষিণের মন্ত্র গুঞ্জরনে’ চার দৃশ্যে রচিত একাঙ্কিকা। প্রেমের বিচিত্র স্বরূপ এতে উন্মোচিত হয়েছে। সনাতন পদ্ধতিতে মন্ত্র পাঠ করে যাকে সহধর্মিণী হিসেবে পাওয়া যায়, সে কেবল মন্ত্রের জোরে জীবনসঙ্গিনী হতে পারে না। স্বামীর অতৃপ্ত মন তাই মন্ত্রবহির্ভূত পাত্রীতে মনের ঐক্য খুঁজে পেলে তাকেও পেতে চায় একান্ত আপন করে। আলোচ্য নাটিকায় নায়ক শিশিরের মাধ্যমে এ সত্য প্রকাশিত হয়েছে।
বিবাহিত স্ত্রী শুক্লার প্রেমে তৃপ্ত নন শিশির। তিনি ভালোবাসেন এনাকে। তাই শুক্লাকে বাপের বাড়ি পাঠিয়ে এনার সাথে তিনি মিলিত হয়েছেন গভীর রাতে। এ মুহূর্তে এনার প্রতি শিশিরের উক্তিতে নাটিকার বক্তব্য বিষয় ফুটে উঠেছে। তিনি বলেছেন, ‘ভগবান জানেন তোমায় আমি কত চাই; কিন্তু তোমায় পেলুম জীবনের দ্বিতীয় শুভ মুহূর্তে। তোমার স্পর্শই আমায় প্রথম বুঝিয়ে দিলে বিয়েই সব নয়, তার চেয়েও বড় হচ্ছে মনের মিলন। তোমায় যেন কত যুগ ধরে দেখেছি, তোমায় চেয়েছি প্রতি রক্তকণিকা দিয়ে তোমায় পেয়েছি অন্তরের অনুভব দিয়ে। তোমায় যত দেখেছি ততই আমি মুগ্ধ হয়েছি।’ এই নীরব অভিসারে শুক্লার আকস্মিক উপস্থিতি নাটকীয় দ্বন্দ্বকে ঘনীভূত করেছে। শুক্লা এনার কাছে জানতে চেয়েছে, ‘কোনো অভিনয় করছ না’ত?’ আত্মপ্রত্যয়ে দীপ্ত এনা সহজভাবে উত্তর দিয়েছে, ‘অভিনয় নয়, যা সত্যি তাই তুমি দেখলে। জীবনের প্রতিদিনের অভিনয়ের ভেতর আজ এই নিশুতি রাতের অভিনয়টাই প্রকৃত সত্য অভিনয়। এতদিন আমাদের তিনজনের ভেতর চলছিল রৌদ্রছায়ার খেলা। আজ নির্ঝরের স্বপ্ন সত্যই ভেঙ্গে গেল।’ এনার আত্মপ্রকাশে তার নিজের মন হালকা হলেও শুক্লার মনে অগ্ন্যুৎপাত শুরু হয়। অগ্ন্যুৎপাত আরো বেড়ে যায় যখন শিশির বলেন, ‘শুক্লা, আমি এনাকে বিয়ে করব ঠিক করেছি।’ আর সহ্য করতে পারে না শুক্লা। সে চিৎকার করে বলে, ‘তোমার পৌরুষকে তুমি করেছ অপমান, তার চেয়েও তুমি অপমান করেছ আমার নারীত্বকে, আমার আসন্ন মাতৃত্বকে, আমার বাবা-মাকে। সমাজের চক্ষে আমার পরাজয়, আমি কিছুতেই তাদের কাছে আমার মুখ দেখাতে পারব না। এ পরাজয়ের অপমানের চেয়ে আমার আত্মহত্যাই ভালÑ আমি আত্মহত্যা করব।’
সব সমস্যার সমাধান করেন শুক্লার দাদা। তিনি এনাকে শিশিরের পড়ার ঘরে নিয়ে তালাবদ্ধ করে রাখেন এবং বলেন, ‘এ ঘর কাল শোবার ঘরে ঈড়হাবৎঃ হবে আর আপনিই হবেন শুক্লার অতিথি।’ তিনি শুক্লাকে বলেন, ‘প্রেমকে আমি চিরদিন ভক্তি করি, তুমি এনার কথাও ভেবে দেখো।’ তিনি শিশিরকেও অনুরোধ করেন শুক্লার কথা ভেবে দেখতে। নাটিকাটি পড়ে পাত্রপাত্রীদের সম্পর্কে আমাদের বেশ ভাবতে হয়। ‘মনের ঐক্যই প্রণয়ের মূল’Ñ তাই এনাকে জয়ী হতে হবে। কিন্তু সনাতন মন্ত্রকেও অস্বীকার করা সম্ভব নয়, তাই শুক্লাও শিশিরের হয়ে থাকবে।
‘নীড়ের মায়া’ নাটিকাও প্রেমের পটভূমিতে রচিত। স্ত্রী লীলার প্রেমে সন্তুষ্ট নয় অমল। তাই সে শীলাকেও ভালোবাসে। শীলা অমলের পূর্ব প্রণয়িনী। একদিন লীলা ছোট বোন তন্দ্রা ও স্বামী অমলসহ বেড়াতে যায় পাহাড়ে। সেখানে লীলা ও তন্দ্রার সাময়িক অনুপস্থিতিতে অমলের সাথে দেখা করে শীলা। রাতে নিকটস্থ পাইন বনে শেষ দেখা করার জন্য অমলকে অনুরোধ জানায় সে। পাইন বনে মিলিত অমল ও শীলার সংলাপগুলো চমৎকার। না পাওয়ার বেদনাই সূক্ষ্ম আনন্দরূপে শীলার অন্তরকে প্রসন্নতা দান করেছে। সে এনা নয়। আপন মহিমায় সে প্রেমকে নতুন করে অনুভব করেছে। তাই অমলের কাছে থেকে জোর করে বিদায় নেয় সে। শীলা চলে যাওয়ার পরপরই অমলের কাছে আসে লীলা। সে জানায়, ‘পথে শীলার সঙ্গে দেখা, সে আমায় আলিঙ্গন করে ক্ষমা করে গেছে।’ তার এ উক্তি শুধু শীলাকে নয়, তাকেও মহীয়সী করে তুলেছে।
‘ত্রয়ী’ নাটিকায় নায়িকার সংখ্যা বেড়ে তিনজন হয়েছে। নায়ক চঞ্চল সত্যিই চঞ্চল-অস্থিরচিত্ত ধনী যুবক। শিলংয়ে হোটেলে নৃত্যসঙ্গিনী হিসেবে বান্ধবীরূপে পরিচিত হয়েছে হেনা, সুলেখা ও স্বপ্নমায়ার সাথে। হেনার উক্তিতে সে যুগের সামাজিক একটা রূপ প্রতিফলিত হয়েছে। নাচের পর গভীর রাতে হোটেলে খেতে বসে সে বলেছে, ‘বাইরে আমি রাতের পর রাত কাটিয়ে দিতে পারি, কোলকাতায় আমার সঙ্গীদের নিয়ে তাই তো হত। মা শত আপত্তি করলেও পধৎব করতুম না। ঞধাবৎহ ষরভব আমার তো ভাল লাগে।’
তিনজনের মধ্যে হেনাকেই বেশি পছন্দ করে চঞ্চল। কিন্তু হেনার অনুপস্থিতিতে এক সন্ধ্যায় সে সুলেখার হাতে আংটি পরিয়ে দিয়ে বলে, ‘আজ থেকে আপনিও আমার জীবনের একজন শ্রেষ্ঠ বান্ধবী।’ আবার একরাতে চঞ্চল হেনার কাছে জানতে পায় সুলেখাকে আংটি পরানোর কথা সে জানে। জেনেও চঞ্চলের হাতে নিজের আংটি পরিয়ে দিয়ে সে বলে, ‘আমার সমস্ত জবাব চাই, সুলেখার জবাবের পর, তার আগে নয়Ñ আপনাকে সময় দিলুম।’
শেষ দৃশ্যে হোস্টেলের নিজ কক্ষে বসে আছে অসুস্থ চঞ্চল। তিন দিন জ্বর থাকায় কোনো বান্ধবীর সাথে সাক্ষাৎ ঘটেনি। এক সন্ধ্যায় স্বপ্নমায়া আসে দেখা করতে। সে চঞ্চলকে কবিগুরুর ‘ঝুলন’ কবিতা আবৃত্তি করে শোনাচ্ছে। হঠাৎ প্রবেশ করে হেনা ও সুলেখা। হেনা চঞ্চলের হাত থেকে নিজের আংটি খুলে নেয়। সুলেখাও ফেরত দেয় চঞ্চলের আংটি। চঞ্চল তাদের ভুল ভাঙাবার চেষ্টা করতেই ওরা বিদায় নেয়। বিয়োগান্তক এ নাটিকায় প্রমোদ সহচরী ও ধনী যুবকের বিলাসচিত্র সুন্দরভাবে চিত্রিত হয়েছে।
গৈরিকায় প্রকাশিত কুমার কোকনদাক্ষ রায়ের শেষ নাটিকা ‘এম.এ ও বি.এ’। দীর্ঘ নয় দৃশ্যে রচিত এ একাঙ্কিকায় বিএ পাস মানসী ও তার এমএ পাস বান্ধবী মুকুলিকা উভয়েই মিহিরের প্রতি আসক্ত। মিহির ভালোবাসে মানসীকে; কিন্তু মুকুলিকা নিজেই সে আসন গ্রহণ করতে চায়। মানসীর অন্যত্র বিয়ের ব্যবস্থা হয়। কিন্তু সে বিয়ের রাতেই মিহিরের সাথে পালানোর ব্যবস্থা করে। কিন্তু বধূবেশিনী মানসী নিজেই সেখানে হাজির। পরের ব্যাপারটি কাকতালীয়। নাট্যকার জোর করে মুকুলিকা ও মিহিরের বিয়ে দিয়েছেন। নির্ধারিত দিনে সময় বাবু কেন মানসীকে বিয়ে করতে আসেননি তার কোনো পটভূমি বা ব্যাখ্যা নাটকে নেই।
বিয়ের পর মুকুলিকা বুঝতে পারে তার স্বামীর জীবনে মানসীর প্রয়োজন খুবই বেশি। তাই মিহিরের সাথে মানসীর বিয়ের ব্যবস্থা করে সে। তার বান্ধবী চম্পা নবদম্পতিকে অভিনন্দন জানিয়ে বলেছে, ‘সত্যি আমার ভাবতেও ভারী আশ্চর্য লাগে কেমন করে একটি এমএ পাস মেয়ে ও একটি বিএ পাস মেয়ে একটি স্বামীর ঘর করবে।’
এরপর দীর্ঘকাল আর কোনো নাটিকা রচনা করেননি কুমার কোকনদাক্ষ রায়। ১৯৬৯ সালে পার্বত্য বাণীতে তার দুটি নাটিকা প্রকাশিত হয়। ‘দখিন হাওয়া’ নাটিকায় কাঞ্চনগড়ের রাজকুমারী সুনীতা স্বামীর মুখে বারবার শুনতে চায় যে তিনি তাকে পেয়ে সুখী হয়েছেন। একদিন রঞ্জনা পাহাড়ে তাদের সাথে দেখা হয় কমলের প্রাক্তন প্রেমিকা রঞ্জনার সাথে। কমল ও সুনীতার সাথে কিছুদিন বাস করে সে। তার যথার্থ পরিচয় জেনেও সুনীতা তাকে যেভাবে গ্রহণ করেছে তা স্বাভাবিক হয়নি। সুনীতা নারীসুলভ ঈর্ষার ঊর্ধ্বে। এ নাটিকায় নাট্যকারের প্রথম দুটি নাটিকার কাহিনীই যেন নতুনভাবে ফিরে এসেছে। কিন্তু প্রথম নাটিকা দুটির শিল্প-কৌশল এখানে অনুপস্থিত।… ‘বধূ কোন আলো’ নাটিকায় কিছুটা বৈচিত্র্য আছে। নন্দিতা বরকে না দেখে বরের ছবি দেখে বিয়েতে সম্মতি দিয়েছে। কিন্তু বিয়ের পর বরের মুখ দেখে সে মূর্ছিত হয়। পাশাপাশি দুই বন্ধুর ছবিতে পল্লবকে অলকেশ মনে করে সে মনে মনে প্রণয়ের মালা গেঁথেছে। নন্দিতার বান্ধবী কাকলি পল্লবকে সব কথা জানিয়ে বিয়ে বাড়ি থেকে তাকে সরিয়ে নেয়। পল্লব ও কাকলির আকস্মিক অন্তর্র্ধানকে সহজভাবে মেনে নিতে পারে না অলকেশ। তাই বাসরঘরে এ প্রসঙ্গ উত্থাপন করে সে। কিন্তু নন্দিতা উত্তরে জানায়, ‘আমি পল্লব আর কাকলির বিষয় নিয়ে আর কোনো কথা শুনতে চাইনে। আমার জীবনে তাদের চিন্তার চেয়েও অনেক কিছু চিন্তার কারণ থাকতে পারে। জীবনের শ্রেষ্ঠ মুহূর্তে আমি আমাদের নিয়ে সুখী হতে চাই।’ নন্দিতা অলকেশকে মেনে নেবে না বলে দৃঢ়তা প্রকাশ করার পর আকস্মিকভাবে মেনে নেওয়ায় নাটিকার নাট্যগুণ ক্ষুণœ হয়েছে।
নাট্যকার কুমার কোকনদাক্ষ রায় ইংরেজি ও বাংলা সাহিত্যে সুপ-িত। তাই নাটিকাগুলোতে তার রসবোধ ও পা-িত্যবোধ উভয়েরই সাক্ষাৎ মেলে। প্রথম যুগের রচনায় তার নাট্য প্রতিভার যথার্থ পরিচয় মেলে। কিন্তু শেষ দিকের রচনায় নাটকীয় কলাকৌশল কিছুটা ক্ষুণœ হয়েছে। তার নাটিকার পাত্রপাত্রীরা অভিজাত শ্রেণীর। সাধারণ মানুষ কিংবা পার্বত্য চট্টগ্রামের উপজাতীয় জীবনযাত্রা তার নাটিকায় উপেক্ষিত। তার নাটিকার মূল উপকরণ প্রেম। প্রেমের বিচিত্র চিত্রায়ণে তিনি নিজ নাট্য প্রতিভাকে উজাড় করে দিয়েছেন। মনে হয় নাটিকা মঞ্চস্থ হচ্ছে না বলেই নাট্য রচনায় তার অনীহা সৃষ্টি হয়েছে।
রাজগুরু অগ্রবংশ মহাথের রচিত ‘পরিণাম’ পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে পুস্তকাকারে প্রকাশিত একমাত্র নাটক। ১৯৬০ সালে প্রকাশিত পাঁচ অঙ্কের পাঁচটি করে দৃশ্য আছে। বৌদ্ধধর্ম শাস্ত্রে সুপ-িত শ্রীমৎ মহাথের বৌদ্ধধর্মীয় কাহিনী অবলম্বনে এ নাটক রচনা করেছেন। চম্পকনগরের অধিপতি সন্তুরাজ ও তদীয় ভ্রাতা অসন্তুর প্রচলিত কাহিনীই এ নাটকের বিষয়বস্তু। নাটকে সনাতন হিন্দুধর্মের সাথে তুলনা করে বৌদ্ধধর্মের শ্রেষ্ঠত্ব প্রতিপন্ন করতে নাট্যকারের সচেতনতা পরিলক্ষিত হয়। পরিণামে সদ্ধর্মের জয় অনিবার্য এ কথাই নাট্যকার প্রমাণ করতে চেয়েছেন। বিবেকের উপস্থিতি এবং সংগীতের অতি প্রয়োগ নাটকটিকে আধুনিক নাট্যগুণ থেকে বঞ্চিত করেছে। অনেক সংলাপে কবিত্বময় বর্ণনা আছে। আর অনেক সংলাপে পাত্রপাত্রীর প্রাণের উত্তাপ নেই, কৃত্রিমতা নেই। যেমন, ‘জীবনের একি পরিহাস, বহুদিন গতপ্রায়। বণিকের হাতে বন্দিনী হয়ে জীবন কেটে যাচ্ছে কিন্তু এখনও স্বামী কিংবা পুত্র যুগলেন কোনো সন্ধান পেলুম না। বোধ হয় এ জীবনে আর হবে না দেখা তাদের সনে। প্রাণ সদা ব্যথায় আকুল, জানিনে এ পরিণাামের অভিনয় কতদিন পরে পরিসমাপ্ত হবে।’ রাজগুরু বৌদ্ধকাহিনী অবলম্বনে আরো নাটক রচনা করলে বৌদ্ধ নাট্য সাহিত্য সমৃদ্ধ হতে পারত।
রাজমাতা বিনীতা রায় (জন্ম ১৯০৭) রজিদ ‘গ্রামের কল্যাণ’ নাটিকা ১৯৬৩ সালে ‘পাবলিক হেলথ ডিপার্টমেন্ট পার্বত্য চট্টগ্রাম’ কর্তৃক মঞ্চস্থ, পুরস্কৃত ও পুস্তকাকারে প্রকাশিত হয়েছে। পরিবার পরিকল্পনা সম্পর্কে জনসাধারণকে অবহিত করার উদ্দেশ্যে এ নাটকাটি রচিত ও বিনামূল্যে প্রচারিত হয়ে জনপ্রিয়তা লাভ করেছিল। তিন অঙ্কে ও পনেরোটি দৃশ্যে রচিত এ নাটিকায় সুখী ও পরিকল্পিত পরিবারের গুণাবলি ব্যক্ত হয়েছে। গ্রামের সাধারণ মানুষ পরিকল্পিত পরিবার না গড়ে কীভাবে দুঃখ ও দারিদ্র্যের শিকার হয়ে পরে ডাক্তারের পরামর্শে সুখী জীবন গঠনে ব্রতী হয়েছে তা এ নাটিকায় ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। নাটিকাটি ভিন্ন নামে ১৯৭৬ সালে বাংলাদেশ টেলিভিশনে প্রচারিত হয়েছে।
মূলত কবি হলেও কার্তিম চন্দ্র তঞ্চঙ্গা (জন্ম ১৯২০) দুটি নাটক রচনা করেছেন। তার নাটক দুটি প্রকাশিত হয়নি। ঐতিহাসিক কাহিনী অবলম্বনে রচিত ‘বিজয়গিরি’ চার অঙ্কের নাটক। চম্পকনগরের রাজা উদয়গিরির পুত্র বিজয়গিরিকে রাজ্যভার অর্পণ করে শ্রীবৌদ্ধমন্দিরে গমন করতে চান। কিন্তু উদয়গিরি বের হতে চান দিগি¦জয়ে। এ সময় উদয়নপুরের রাজা জংলি কুকীরাজ কালঞ্জয় দ্বারা আক্রান্ত হয়ে তাদের শরণাপন্ন হন। বিপুল বিক্রমে বিজয়গিরি মিত্ররাজ্য পুনরুদ্ধার করেন। রোয়াং দেশের রাজা মঙ্গল উদয়পুর লুণ্ঠন করতে এলে সেনাপতি তা প্রতিহত করেন। বিজয় অভিযানে বের হয়ে বিজয়গিরি রোয়াং রাজ্য জয় করেন। এই হলো নাটকের সংক্ষিপ্ত কাহিনী। ঐতিহাসিক ঘটনার প্রতি অনুগত থেকেও নাট্যকার কতিপর কাল্পনিক চরিত্র নাগরিকগণ, ব্রাহ্মণ-ব্রাহ্মণী, গয়ারাম, গঙ্গারাম প্রভৃতি উপস্থাপন করে হাস্যরস সৃষ্টি করেছেন। এ নাটকের সংলাপ কখনো গদ্যে আবার কখনো মিলহীন প্রবহমান পয়ার ছন্দে রচিত হয়েছে। বিচ্ছিন্ন ঘটনাকে কখনো দৃশ্যে উপস্থাপিত করা হয়েছে। বিবেক চরিত্র ও সংগীতের সংযোজন নাটকটিকে যাত্রাভিনয়ের মর্যাদা দান করেছে। ভগবান গৌতমবুদ্ধের অতীত জাতক কাহিনী অবলস্বনে কার্তিক চন্দ্র তঞ্চঙ্গ্যা ‘মানুষ দেবতা’ নামে তিন অঙ্কের একখানা নাটক রচনা করেছেন। রাজস্থলী বৌদ্ধবিহারে নাটকটি মঞ্চস্থ হয়েছে। মঘবা নামে বোধিসত্ত্ব মানুষকে পঞ্চশীল পালনে ও জনহিতকর কার্যে উদ্বুদ্ধ করেন। মাতালদের বিচার করে উৎকোচ লাভ করে ম-ল। মদ্যপান বন্ধ হয়ে গেলে মঘবাকে ডাকাত বলে রাজ সমীপে নালিশ করে। বিনা বিচারে মঘবার শাস্তি হয়। কিন্তু মওহমী মঘবাকে পদদলিত না করায় নিজের ভুল বুঝে মঘবাকে মুক্তি ও ম-লকে প্রাণদ-ে দ-িত করেন। জাতকের এ কাহিনীকে যাত্রাগানের মতো নাট্যকার উপস্থাপন করেছেন। আধুনিক নাট্যকলা শ্রীতঞ্চঙ্গ্যার নাটকে অনুপস্থিত। ঐতিহাসিক ও ধর্মীয় চেতনাই তাকে নাট্য রচনায় উদ্বুদ্ধ করেছে।
ষাটের দশকে বরেন ত্রিপুরার (জন্ম ১৯২৫) ‘সবজান্তার ভাষাবিভ্রাট’ রাঙ্গামাটিতে মঞ্চস্থ হয়ে দর্শকের প্রশংসা অর্জন করেছিল। বিদেশি অনেক ভাষা শেখার পর জনৈক বাঙালি ভদ্রলোক বিভিন্ন উপজাতীয় ভাষা শেখার জন্য পার্বত্য চট্টগ্রামে আসেন। কিন্তু তার ভাষা শেখায় বিভ্রাট সৃষ্টি হয়। মারমারা তোতা পাখিকে ‘কী’ বলেন। কিন্তু ভদ্রলোক কী, কী বলে প্রশ্ন করতে থাকেন। চাকমা ভাষা নিয়েই সবচেয়ে বেশি সমস্যা হয়ে দেখা দেয়। ভদ্রলোক জানতে চান চাকমা ভাষায় কচ্ছপকে কী বলে। উত্তর পেলেন ‘দুর’। ভদ্রলোক ভাবলেন লোকটি তাকে দূর করে দিচ্ছে। তিনি উত্তেজিত হলেন। এভাবে একাঙ্কিকাটির সর্বত্রই হাস্যরস সৃষ্টি করা হয়েছে।
‘মসিজীবী’ নামে বরেন ত্রিপুরা আরেকটি হাস্যরস প্রধান একাঙ্কিকা রচনা করেছেন। দেবী সরস্বতীর বাহন রাজহংসের পালক তুলে নেন তিনজন উদ্ধত দেবতা। দেবী নালিশ জানালে নারায়ণ তাদেরকে মর্ত্যে নেমে অনাহারে মৃত্যুবরণের নির্দেশ দেন। দেবতাত্রয় দেবী সরস্বতীর সাথে দেখা করে তার সহানুভূতি লাভ করলে নারায়ণ বিচারের রায় শিথিল করেন। দেবতাত্রয়কে মর্ত্যে আসতে হবে তবে তারা উপোস করবে না, আধপেটা হয়ে খাবে, মিষ্টি কথায় ভুলবে; কিন্তু ঐক্যবদ্ধ হতে পারবে না। আর তাদের পেশা হবে রাজহংসের পালক। মর্ত্যে জন্মগ্রহণ করে এরাই কেরানি নামে অভিহিত হয়েছেনÑ এ কথাই নাট্যকার উপস্থাপন করেছেন। তার নাটিকা দুটি অপ্রকাশিত। কবি ও গবেষকরূপে পরিচিত হলেও সলিল রায় (১৯২৮-১৯৮১) দুটি নাটিকা রচনা করেন। নাটিকা দুটি প্রকাশিত হয়নি। ‘বুদ্ধের শরণে জাগি’ (রচনাকাল ১৯৬৫) তার একটি সার্থক মঞ্চসফল কাব্যনাট্য। নাটক রচনা করলেও সলিল রায় মূলত কবি। তাই তার নাটকে কাব্যগুণের কাছে নাট্যগুণ মাথানত করেছে, বুদ্ধের জীবনভিত্তিক এ নাটকটি প্রবহমান পয়ার ছন্দে লেখা। নাটকের কাহিনী আমাদের জানা থাকলেও পরিবেশন পদ্ধতি সুন্দর ও আকর্ষণীয় বলে রচনাটি বারবার পড়তে ইচ্ছা করে। নগর ভ্রমণে বের হয়ে সিদ্ধার্থ সন্ন্যাসী দর্শন করে তাকে প্রশ্ন করেছেনÑ
গৈরিক বসনা
কে তুমি প্রশান্তমূর্তি চির সুখীমনা
দেখে যেন মনে হয় তব শান্ত প্রাণে
অতুল সান্ত¦না রসে সিঞ্চিত ধীমান।
‘বিশ্বগঠন সমিতি’ (রচনাকাল ১৯৬৬) নাটিকায় ষাট বছরের বৃদ্ধ ঠাকুরমা নাতি-নাতনিদের গল্পচ্ছলে বিজ্ঞান শিক্ষা দিয়েছেন। সম্রাট মার্ত- দেবের সাথে যুদ্ধ করতে চান জ্যোতিষ্কদেব। নতুবা তাকে একশো দুজন কিংকর-কিংকরী দিতে হবে নজরানা হিসেবে। দূতকে মার্ত-দেব বলে দিলেনÑ
দিগি¦জয়ী রাজে তব কহ প্রত্যাদেশ
পাঠাক চরণে মোর, কর সবিশেষ।
নতুবা সম্মুখ যুদ্ধে বুঝিবে বিক্রম
কে কারে সংহার করে কেবা কার যম।
যুদ্ধ জয়ী হয়ে জ্যোতিষ্কদেব একশো দুজন কিংকর-কিংকরী লাভ করেন। কিন্তু তাদের খরতাপ সহ্য করতে না পেরে তিনি তাদের ত্যাগ করেন। কিংকর-কিংকরীরা হাদ্রু, অকসি, সুবর্ণ, রজত, কৃষ্ণ ইত্যাদি ক্রমপাতে সমিতি গঠন করে। সমিতির উদ্দেশ্যÑ সর্বজনীনতা, সমতা, স্বার্থত্যাগ, সহযোগিতা, একতা, আত্মনির্ভরশীলতা, শৃঙ্খলা ও গুণের কদর। ক্রমে এদের অনেক সন্তানাদি জন্মে এবং তারা সৃষ্টি করে সমৃদ্ধ জগৎÑ পৃথিবী। তাদের সমিতির নাম হলো ‘বিশ্বগঠন সমিতি’। ঠাকুরমা ও তার নাতি-নাতনিদের সংলাপ গদ্যে আর মূল পাত্রপাত্রীদের সংলাপ পদ্যে রচিত। নাট্যকারের স্বচ্ছ চিন্তার ফসল ‘বিশ্বগঠন সমিতি’তে গল্পচ্ছলে পৃথিবী সৃষ্টির ইতিহাস বর্ণিত হয়েছে। কাব্যময় সংলাপগুলো আরো সরল হলে নাটিকাটি ছোটদের কাছে অধিকতর আকর্ষণীয় হতে পারত।
বীরকুমার তঞ্চঙ্গ্যা (জন্ম ১৯৩৭) ১৯৬৯ সালে ভগবান বুদ্ধের জীবন অবলম্বন করে ‘অমিতাভ’ নামে একখানা তিন অঙ্কের নাটিকা রচনা করেন। নাটিকাটি অপ্রকাশিত; কিন্তু সাফল্যের সাথে মঞ্চস্থ হয়েছে। লুসাইদের প্রচলিত উপকাহিনী নিয়ে রচিত মাত্র তিন দৃশ্যে সমাপ্ত বীরকুমার তঞ্চঙ্গ্যার লেখা একটি সার্থক একাঙ্কিকা ‘রক্তের কলঙ্ক’। ছোটগল্পকার এবং সম্প্রতি পারবত্যদর্শনবিষয়ক প্রবন্ধ রচনা করে লেখক সুধী মহলের প্রশংসা অর্জন করলেও আমার মতে ‘রক্তের কলঙ্ক’ তার শ্রেষ্ঠ সৃষ্টি।
hqdefaultলুমান সর্দারের মেয়ে ডারলিমপুইয়ের স্বয়ম্ভর অনুষ্ঠান। সর্দারের ইচ্ছা লুংলাই রাজ্যের সর্দার পুত্র লালডিংয়ের সাথে মেয়ের বিয়ে হোক। কিন্তু লালডিং বীর নন, ভীরু কাপুরুষ। ডারলিমপুইয়ের ইচ্ছা রাজ্যের অদ্বিতীয় বীর সেনানী থাংলিয়ানাকে বিয়ে করবে। কিন্তু সে অকুলীন। তাই সমাজপতিরা ডারলিমপুইয়ের ইচ্ছা পূরণকে বাহুল্য মনে করেন। প্রথানুযায়ী বরকে নরমু- নিয়ে একটা নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে বাসরঘরে প্রবেশ করতে হবে। নির্দিষ্ট সময়ে তা সম্পন্ন না হলে মেয়েকে চিরকুমারী থাকতে হবে। পুরোহিত লালডিং মনে করেন, থাংলিয়ানার কপালে রক্ত চিহ্ন দিয়ে তাকে নরমু- শিকারের অধিকার প্রদান করে। কিন্তু পরে এ কথা জেনে সে থাংলিয়ানাকে হত্যা করার চক্রান্ত প্রতিহত করতে সচেষ্ট হয়। তাদের নির্দেশে থাংলিয়ানা নরমু- নিয়ে লালডিংয়ের ছদ্মবেশে লালডিংয়ের ছিন্নশির নিয়ে বাসরঘরে প্রবেশ করতে চায়। ঠিক তখনই ছদ্মবেশী থাংলিয়ানাকে লালডিং মনে করে হত্যা করে লিয়ানা। এভাবে বংশ অহংকার আর প্রণয়ের চক্রান্ত একটি কুমারী জীবনে চিরকুমারীত্বের অভিশাপ নিয়ে আসে। লুমান সর্দারের বংশ গৌরব, লালডিংয়ের বাহুল্য আস্ফালন, থাংলিয়ানার বীরত্ব, পুরোহিতের কপটতা ও স্বার্থচিন্তা, ডারলিমপুইয়ের প্রণয়ের একনিষ্ঠা এবং প্রৌঢ় চিরকুমারী থুয়াঞ্চির হাহাকারে নাটিকাটি সত্যিই উপভোগ্য হয়েছে। স্বল্প পরিসরে নাট্যকার নাট্য দ্বন্দ্ব সৃষ্টিতে দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন। নাটিকার প্রতিটি চরিত্র স্ব-স্ব বৈশিষ্ট্যে সমুজ্জ্বল এবং প্রতিটি সংলাপ প্রাণবন্ত।
পার্বত্য চট্টগ্রামের নাট্যকারদের রচনায় স্থানীয় উপজাতীয় কাহিনী বা জীবন আশ্চর্যজনকভাবে অনুপস্থিত। কেবলমাত্র ‘রক্তের কলঙ্ক’ নাটিকায় একটি উপজাতীয় কাহিনী উপস্থাপিত হয়েছে। স্থানীয় জীবনযাত্রা নিয়ে নাটক রচিত হলে তার ঐতিহাসিক ও সামাজিক মূল্য হবে অপরিসীম। চাকমা ভাষায় লেখা যে কটি নাটকের পা-ুলিপি দেখার সৌভাগ্য আমার হয়েছে তাতে স্থানীয় জীবনযাত্রা বিধৃত হয়েছে। বাংলা নাটক রচনায় স্থানীয় জীবনধারার প্রতিফলন ঘটালে বাংলা নাট্য সাহিত্য সমৃদ্ধ হবে। এ ব্যাপারে আমি পার্বত্য চট্টগ্রামের নাট্যকারদের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি। >>অর্থনীতি প্রতিদিন