পার্বত্য চট্টগ্রামে আনারস বিপ্লব

প্রকাশ:| মঙ্গলবার, ১৪ মার্চ , ২০১৭ সময় ১২:০২ পূর্বাহ্ণ

নিউজচিটাগাং স্পেশাল:বাংলাদেশের অনেক স্থানেই আনারস চাষ করা হয়। চট্টগ্রাম, পার্বত্য চট্টগ্রাম জেলায় ব্যাপক আকারে আনারস চাষ হয়। এক কথায় পার্বত্য চট্টগ্রামে আনারস চাষে বিপ্লব ঘটেছে। সাধারণত চারা রোপণের ১৫-১৬ মাস পর মাঘ মাসের মাঝামাঝি থেকে চৈত্র মাসের মাঝামাঝি সময়ে আনারস গাছে ফুল আসে। আনারস একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থকরী ফসলও বটে। পুষ্টিগুণের দিক থেকেও আনারস অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এতে প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন ‘এ’, ‘বি’ ও ‘সি’ রয়েছে।

আমাদের দেশে সারাবছরই বিভিন্ন ধরনের শাকসবজি ও ফলের চাষ করা হয়। আনারস একটি পুষ্টিকর ও সুস্বাদু ফল। এর বৈজ্ঞানিক নাম Anarus comosus. বাংলাদেশের অনেক স্থানেই আনারস চাষ করা হয়। তবে মূলত সিলেট, মৌলভীবাজার, টাঙ্গাইল, চট্টগ্রাম ও পার্বত্য চট্টগ্রাম জেলায় ব্যাপক আকারে আনারস চাষ হয়। আনারস একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থকরী ফসল।

জলবায়ু ও মাটি : ২৫-৩০০ সে. তাপমাত্রায় আনারস সবচেয়ে ভালো জন্মে। সব ধরনের মাটিতেই আনারস চাষ হতে পারে। দেখা গেছে জৈব সারসমৃদ্ধ মাটিতে আনারস ভালো জন্মে। মাটির পিএইচ ৪.৫ থেকে ৬.৫ হলে আনারস গাছের বৃদ্ধির জন্য সবচেয়ে ভালো।
জাত : পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলে বিভিন্ন দেশে আনারসের অগণিত জাত রয়েছে। এগুলোকে ৩টি শ্রেণিতে ভাগ করা হয়েছে। যেমন_১. কুইন শ্রেণির জাত-প্যাটালকুইন, রিপণিকুইন, জেডকুইন, হানিকুইন, সিলেট ও কুমিল্লার পাহাড়ি অঞ্চলে চাষ করা হয়।

পার্বত্য রাঙ্গামাটি জেলায় বাংলা নতুন বছরকে স্বাগত জানাতে মৌসুমের আগেই বাজারে আসতে শুরু করছে রসালো ফল আনারস।
এবারে স্থানীয়ভাবে চাহিদা মিটিয়ে আনারস যাচ্ছে চট্টগ্রাম, ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে। বাজারে আনারসের চড়া দাম থাকায় কৃষকেরা বেজায় খুশি। পার্বত্যাঞ্চল থেকে চাষীরা আনারস এনে শহরের পাইকারী বাজার বনরূপা, সমতাঘাট, রিজার্ভবাজার, তবলছড়ি, ট্রাকটার্মিনাল ও কলেজগেইট ব্যবসায়ীদের কাছে পাইকারী দরে বিক্রয় করছেন। পাইকারী ব্যবসায়ীরা দেশের বিভিন্ন স্থানে বিক্রি করছে রসালো এ ফল। তবে গ্রীস্মকালীন এ ফল বাজারে আগাম আসায় কৃষকরা ন্যায্য মূল্য পাবে বলে আশা করা যাচ্ছে।
উপজেলা নানিয়ারচরের আনারস চাষী সজিব চাকমা জানান, আনারস চাষের উপযুক্ত জায়গা হলো ঢালু জমি ও উর্বর মাটি। তাই একদিকে পাহাড় অন্যদিকে মাটি উর্বর হওয়ায়, এখানে আনারস চাষ সব সময় বাম্পার ফলন হয়। এ এলাকার আনারস স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে যাচ্ছে। এ অঞ্চলের আনারসের সুনাম বাংলাদেশের সব জায়গায় আলাদা কদর রয়েছে। কাঠাল, তরমুজের জন্য এ অঞ্চলের আলাদা সুনাম রয়েছে। এখানে ফরমালিন মুক্ত সব ধরণের মৌসুমী রসালো পাওয়া যায়। তিনি বলেন, চাষীরা দিনে দিনে ফল চাষের দিকে ঝুঁকছেন।
কাট্টলীর কৃষক অমিত চাকমা বলেন, এবছর আনারসের বাম্পার ফলন হয়েছে। গত বছরের তুলনায় এবছর আনারস ফলন ভাল হয়েছে এবং বাজারেও ভাল দামে বিক্রি করতে পারছেন। জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক রমনী কান্তি চাকমা জানান, এবছর আড়াই হাজার খন্ড পাহাড়ি ঢালু জমিতে বিভিন্ন জাতের ফলের চাষাবাদ হয়েছে। এর উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৫০ হাজার মেট্রিক টন।
তিনি জানান, বাজারে চাহিদার কথা ভেবে কৃষকেরা আগাম আনারস সরবরাহের জন্য কিছু হরমোন জাতীয় প্রযুক্তি প্রয়োগ করছেন। আশা করা হচ্ছে এবারে কৃষকরা যথাযথ মূল্য পাবেন।

বান্দরবানে এ বছর আনারসের বাম্পার ফলন হয়েছে। স্বল্প খরচে অধিক লাভজনক হওয়ায় এই জেলায় আনারস চাষ বাড়ছে দিন দিন। আকারে বড় এবং খেতে সুস্বাদু পাহাড়ে উৎপাদিত জাইনকিউ আনারসের প্রচুর চাহিদা রয়েছে সারাদেশে। তবে এ বছর কোথাও কোথাও আনারস অন্যান্য বছরের তুলনায় আকারে ছোট হওয়ার খবর পাওয়া গেছে।
কৃষি বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে বান্দরবান জেলায় ৪ হাজার ৭৯০ হেক্টর পাহাড়ি জমিতে জাইনকিউ আনারস চাষ হয়েছে, যা গত বছর ছিল ৪ হাজার হেক্টর। এ বছর উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছিল ১ লাখ ৬৪ হাজার টন। এই লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে যেতে পারে।
আনারসে ছেয়ে গেছে বান্দরবানের হাট-বাজার। ভালো ফলন হওয়ায় আনন্দে ভাসছেন পাহাড়ি চাষিরা। প্রতিদিন সদর উপজেলার লাইমীপাড়া, ফারুকপাড়া, স্যারণপাড়া এবং গেজমনীপাড়াসহ রুমা, থানচি ও রোয়াংছড়ি উপজেলার বিভিন্ন এলাকা থেকে পাইকারি দরে আনারস কিনে চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে ট্রাক, পিকআপ এবং নৌকায় করে নিয়ে যাচ্ছেন ব্যবসায়ীরা।
চট্টগ্রামের সাতকানিয়ার পাইকারি ব্যবসায়ী নূরে আলমসহ অনেকেই জানান, তারা ছোট ১০০ আনারস ১২০০-১৩০০ এবং বড় ১০০ আনারস ১৮০০-২২০০ টাকা দরে কিনছেন। এগুলো তারা চট্টগ্রাম এবং কক্সবাজারসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় নিয়ে গড়ে তিন হাজার টাকায় বিক্রি করেন।
লাইমিপাড়ার আনারসচাষি নুদুম বম জানান, তার তিন একর জমিতে আনারসের ফলন ভালো হয়েছে। তবে আকারে ছোট হওয়ায় দাম কম হচ্ছে এ বছর।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগের শস্য উৎপাদন বিশেষজ্ঞ আলতাফ হোসেন জানান, লাভজনক হওয়ায় বান্দরবানে আনারস চাষ বাড়ছে। দেশে জাইনকিউ এবং হানিকিউ_ এই দুটি জাতের আনারস চাষ হয়। পাহাড়ি বান্দরবানে উৎপাদিত জাইনকিউ আনারস আকারে বড়, রসালো এবং খেতে খুবই সুস্বাদু। ফলন বাড়াতে আনারসচাষিদের নতুন নতুন প্রযুক্তি দেয়া হচ্ছে। স্বল্প খরচে অধিক লাভজনক হওয়ায় পাহাড়িরা জুম চাষ ছেড়ে দিন দিন মিশ্র ফল চাষের দিকে ঝুঁকছেন। এ অঞ্চলের পাহাড়িরা এখন জাইনকিউ আনারস চাষ করে স্বাবলম্বী হয়ে উঠছেন। ভাগ্য বদলে যাচ্ছে পাহাড়বাসীর।
এ বছর কোথাও কোথাও আনারস ছোট হওয়া সম্পর্কে তিনি বলেন, একই জমিতে বার বার চাষের কারণে এমনটা হতে পারে।
আনারসসহ মৌসুমি ফল সংরক্ষণের কোনো ব্যবস্থা নেই বান্দরবানে। এ ব্যাপারে কৃষক সমিতির সভাপতি ওসমান গনি জানান, সংরক্ষণের অভাবে প্রতি বছর বান্দরবানে অনেক মৌসুমি ফল নষ্ট হচ্ছে। জেলায় ফল সংরক্ষণের জন্য একটি হিমাগার স্থাপনের দাবি জানান তিনি।

আনারসের বাগান করে ভাগ্য পরিবর্তন করেছেন পানছড়ির লতিবান ইউনিয়নের কুড়াদিয়াছড়ি গ্রামের বাসিন্দা তুষিত কুমার চাকমা (৪৩)। মৌসুম না হওয়া সত্ত্বেও তাঁর বাগানের আনারসে এখন রং ধরেছে। তিনি বলেন, ‘চোখ বন্ধ করে বলতে পারি আমি অনেক লাভ করতে পারব।’ গত ২৬ ফেব্রুয়ারি তুষিত কুমার চাকমার বাগান ঘুরে দেখা যায়, বাগানের প্রতিটি গাছে আনারস ধরেছে।
তুষিত কুমার চাকমা আনারস চাষের কাহিনি বলেন প্রথম আলোকে। তাঁর ভাষায়, ‘প্রায় সাত-আট বছর আগে মৌলভীবাজার জেলার শ্রীমঙ্গলে বেড়াতে গিয়েছিলাম। সেখানকার পাহাড়গুলোতে আনারসের বাগান দেখে আমিও উদ্বুদ্ধ হই। চেষ্টা চালাই সেখানকার কৃষকদের সঙ্গে বাগান নিয়ে আলোচনা করার। পরিচিত হই স্থানীয় এক ত্রিপুরা আদিবাসীর সঙ্গে। তিনি আমার আগ্রহের কথা শুনে সব ধরনের সহযোগিতার আশ্বাস দেন। পরে আমাকে ১২ জন শ্রমিক ঠিক করে দেন যাঁরা আমার এখানে (খাগড়াছড়িতে) এসে বাগানে কাজ করবেন।’
সেই ১২ জন শ্রমিক নিয়ে তুষিত তিন বছর আগে বাগানের কাজ শুরু করেন। পাঁচ একর জায়গাজুড়ে এক লাখ ২৫ হাজার আনারসের চারা রোপণ করেন। প্রথম বছর ফলন হয়নি। দ্বিতীয় বছর শ্রমিকেরা হঠাৎ চলে যাওয়ায় এবং যোগাযোগের অসুবিধার কারণে বাগানের অনেক আনারস পেকে পচে যায়। তৃতীয় বছরে ওই শ্রমিকেরা আবার আসেন, ঠিকমতো বাগান পরিচর্যা করেন, ফলে মৌসুম না হওয়া সত্ত্বেও বাগানে এখন প্রচুর আনারস ধরেছে।
তিনি জানান, এ পর্যন্ত তাঁর বাগানের পেছনে খরচ হয়েছে প্রায় এক লাখ ৮০ হাজার টাকা। তবে ইতিমধ্যেই খরচের টাকা উঠে এসেছে। প্রায় এক মাস আগে থেকে বাগানের আনারস (এ বছর) বিক্রি শুরু করেছেন। এ পর্যন্ত বাগানের ৬-৭ শতাংশ আনারস বিক্রি করেছেন বলে তিনি জানান। তুষিত কুমার চাকমা বলেন, ‘স্থানীয়ভাবে আমরাও (আদিবাসী) আনারসের বাগান করি। কিন্তু আমরা আনারসের বাগান করতে যে কষ্ট-পরিশ্রম করতে হয় তা করি না, সহ্য হয় না। তাই আমরা সফল হতে পারি না। কিন্তু বাগান শ্রমিকেরা এই কষ্ট মেনে নিয়ে কাজ করে। ফলে তাঁরা সফল হন।’
বাগানের শ্রমিক সুরেশ ব্যানার্জি (২৮) নিজের পরিচয় দিয়ে বলেন, ‘আমরা বংশ পরম্পরায় চা-বাগান, আনারস ও লেবুর বাগানে কাজ করে যাচ্ছি। আনারসের বাগানে কখন কী করতে হবে তা আমাদের জানা আছে।’ তিনি বলেন, হরমোন প্রয়োগ করে এই আনারসের আগাম ফলন ফলানো হয়েছে।
খাগড়াছড়ি সদর উপজেলার কৃষি কর্মকর্তা যুগল পদ দে জানান, স্থানীয় যে আনারস (গাছের পাতা কাঁটাযুক্ত) উৎপন্ন হয় তা হানি কুইন জাতের। এর বৈশিষ্ট্য হলো অত্যধিক রসালো, পাকলে মিষ্টি, চোখ ভাসা ভাসা। এই জাতের আনারস হরমোন ব্যবহার করে বছরে তিন বার ফলন ফলানো যায়। অফ-সিজনে (অ-মৌসুম) দুবার ও মৌসুমে একবার। তিনি আরও জানান, সাধারণত সেপ্টেম্বর-অক্টোবরে আনারস লাগানো হয়। এপ্রিল-মে মাসে ফুল আসে আর জুন-জুলাইতে ফলন হয়। আনারসের ফলন ফলাতে হলে গাছে প্রচুর পানি দিতে হয়।
তুষিত কুমার চাকমার বাগান ঘুরে দেখা যায়, বাগানে প্রতিটি গাছে ফলন এসেছে। তবে অনেক গাছের ফল আকারে ছোট। শীতকালে অর্থাৎ শুকনো মৌসুমে তিনি বাগানে কোনো সেচের ব্যবস্থা রাখেননি বলে জানান।

২. কায়েন শ্রেণির জাত_ স্মুথ কায়েল, হিনো, জায়েন্টকিউ, সিলেট, চট্টগ্রাম ও মধুপুর এলাকায় চাষ করা হয়।
৩. স্প্যানিশ শ্রেণির জাত_ ঘোড়াশাল, জলডুপী সিলেটের বিয়ানীবাজারে চাষ করা হয়।
বংশ বিস্তার : সাধারণত অযৌন পদ্ধতিতে আনারস গাছের বংশ বৃদ্ধির জন্য নিম্নবর্ণিত ৫ (পাঁচ) প্রকারের চারা পাওয়া যায়।
১. সাকার বা গোড়ার চারা (এৎড়ঁহফ ংঁপশবৎ) : এ প্রকারের চারা ভূমিসংলগ্ন গাছের গোড়ার অংশ থেকে তেউড় বের হয়। রোপণের জন্য উত্তম। ১২-১৮ মাসের মধ্যে গাছে ফল আসে।
২. সাকার বা কা-ের চারা (ঝঃবস ঝঁপশবৎ) : পাতার কক্ষ থেকে বের হয়ে বলে একে কা- চারা বলে। বংশবৃদ্ধির জন্য এ চারা উত্তম। ফল আসতে সময় লাগে ১৫-১৬ মাস।
৩. সস্নিপ (ঝষরঢ়) : এজাতীয় চারা ফলের বোঁটা থেকে বের হয়। ফল পেতে ১৮ মাসের মতো সময় লাগে।
৪. ক্রাউন (ঈৎড়হি) : ফলের ওপরে পাতার যে মুকুট থাকে তা লাগিয়েও আনারসের চাষ করা হয়। এই চারা লাগালে ফল পেতে ২৪ মাসের মতো লাগে।
৫. স্ট্যাম্প (ঝঃঁসঢ়) : পুরানো বা বয়স্ক গাছের কা- মাটি চাপ দিয়ে রাখলে অনেক চারা পাওয়া যায়।
জমি তৈরি : বন্যা ও বৃষ্টির পানি দাঁড়ায় না, পানি নিষ্কাশনের সুবিধাযুক্ত উঁচু জমি আনারস চাষের উপযোগী। সমতল ভূমিতে চাষ দিয়ে জমি ভালো ভাবে তৈরি করতে হয়।
চারা রোপণ : বছরের যে কোনো সময়ই আনারসের চারা লাগানো যেতে পারে। তবে জুলাই-সেপ্টেম্বর আনারস লাগানোর উপযুক্ত সময়। চারা একসারি পদ্ধতিতে বা দুই সারি পদ্ধতিতে রোপণ করা যেতে পারে।
এক সারি পদ্ধতিতে ৫০ সে.মি. দূরে দূরে সারি ৪০-৫০ সে.মি. দূরত্বে চারা রোপণ করতে হয়। দুই বেডের মাঝখানে পানিনিষ্কাশনের জন্য নালা হিসেবে ৫০ সে.মি. জায়গা রাখা হয়। দুসারি পদ্ধতিতে চারা রোপণ করা শ্রেয়। কারণ এতে দু’সারির পাশাপাশি গাছ পারস্পরিক ঠেকনার কাজ করে। এজন্য ফলসহ হেলে পড়ে না।
ফল আহরণ ও ফলন : আনারস আগস্ট-সেপ্টেম্বর মাসের মধ্যেই ফল পাওয়া যায়। ফসল ভালো হলে হেক্টরপ্রতি ৩০ থেকে ৫০ টন ফল প্রতিবছর আহরণ করা যেতে পারে। ফলে বোঁটার দিক থেকে চারভাগের এক ভাগ পাকা শুরু করলে চোখের মধ্যবর্তী স্থানে সোনালী হলুদ রং ধারণ করে, আনারস ফল আহরণের সময় ধারালো চাকু দিয়ে ৫ সে.মি. বোঁটা রেখে কাটতে হয়।
পুষ্টিমান

আনারসে প্রচুর পরিমাণ ভিটামিন ‘এ’, ‘বি’ ও ‘সি’ আছে।

বাজার সম্ভাবনা

আনারস অত্যন্ত সুস্বাদু ও পুষ্টিকর ফল। টিনজাত খাদ্য হিসেবে আনারস সংরক্ষণ করা যায়। আনারস ফল হিসেবে খাওয়ার পাশাপাশি আনারস দিয়ে জ্যাম, জেলি ও জুস তৈরি করা যায়। আনারস চাষ করে পারিবারিক চাহিদা পূরণের পাশাপাশি বাড়তি আয় করা সম্ভব। এছাড়া দেশের চাহিদা মেটানোর পর অতিরিক্ত উৎপাদন বিদেশে রপ্তানি করা সম্ভব। এক্ষেত্রে বিভিন্ন রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান সহায়তা দিয়ে থাকে। আনারস বিদেশে রপ্তানি করার জন্য এসব প্রতিষ্ঠানের সাথে যোগাযোগ করা যেতে পারে।

আনারস উৎপাদন কৌশল

চাষের উপযোগী পরিবেশ ও মাটি

জলবায়ু – আশ্বিন মাসের মাঝামাঝি থেকে অগ্রহায়ণ মাসের মাঝামাঝি সময় আনারস চারা লাগানোর উপযুক্ত সময়। তবে সেচের সুবিধা থাকলে মাঘ মাসের মাঝামাঝি থেকে ফাল্গুন মাসের মাঝামাঝি সময়েও চারা লাগানো যায়।

আশ্বিন মাসের মাঝামাঝি থেকে অগ্রহায়ণ মাসের মাঝামাঝি সময় আনারস চারা লাগানোর উপযুক্ত সময়। তবে সেচের সুবিধা থাকলে মাঘ মাসের মাঝামাঝি থেকে ফাল্গুন মাসের মাঝামাঝি সময়েও চারা লাগানো যায়। – See more at: http://infokosh.gov.bd/atricle/%E0%A6%86%E0%A6%A8%E0%A6%BE%E0%A6%B0%E0%A6%B8-%E0%A6%9A%E0%A6%BE%E0%A6%B7#sthash.CNjvQQLn.dpufমাটির প্রকৃতি
মাটির প্রকৃতি – দো-আঁশ ও বেলে দো-আঁশ মাটি আনারস চাষের জন্য বেশি উপযোগী।

জাত

১. হানিকুইন: পাকা আনারসের শাঁস হলুদ বর্ণের হয়। চোখ সূঁচালো ও উন্নত। গড় ওজন প্রায় এক কেজি। পাতা কাঁটাযুক্ত ও পাটল বর্ণের। হানিকুইন বেশ মিষ্টি আনারস।

২. জায়েন্ট কিউ: পাকা আনারস সবুজাভ ও শাঁস হালকা হলুদ, চোখ প্রশস্ত ও চেপ্টা। গড় ওজন প্রায় দুই কেজি। গাছের পাতা সবুজ ও প্রায় কাঁটাবিহীন।

৩. ঘোড়াশাল: পাকা আনারস লালচে এবং ঘিয়ে সাদা রঙের হয়। চোখ প্রশস্ত গড় ওজন প্রায় ১.২৫ কেজি। পাতা কাঁটাযুক্ত, চওড়া ও ঢেউ খেলানো থাকে।

বংশ বিস্তার

স্বাভাবিক অবস্থায় আনারসের বীজ হয় না। তাই বিভিন্ন ধরণের চারার মাধ্যমে আনারসের বংশ বিস্তার হয়ে থাকে। সাধারণত পার্শ্ব চারা, বোঁটার চারা, মুকুট চারা ও গুঁড়ি চারা দিয়ে আনারসের বংশ বিস্তার হয়ে থাকে। এর মধ্যে পার্শ্ব চারা বাণিজ্যিকভাবে চাষের জন্য সবচেয়ে ভালো।

জমি তৈরি

১. মাটি ঝরঝরে করে চাষ ও মই দিয়ে জমি সমতল করে নিতে হবে যাতে বৃষ্টির পানি কোন স্থানে জমে না থাকতে পারে।

২. জমি থেকে ১৫ সে.মি. উঁচু এবং এক মিটার প্রশস্ত বেড তৈরি করতে হবে।

৩. এক বেড থেকে অপর বেডের মধ্যে ৫০-১০০ সে.মি. দূরত্ব রাখতে হবে।

চারা রোপণ পদ্ধতি

১. এক মিটার প্রশস্ত বেডে দুই সারিতে চারা রোপণ করতে হবে।

২. সারি থেকে সারির দূরত্ব ৫০ সে.মি. এবং চারা থেকে চারার দূরত্ব ৩০-৪০ সে.মি. রাখতে হবে।

সার প্রয়োগ

কৃষকদের মতে গুণগত মানসম্পন্ন ভালো ফলন পেতে হলে আনারস চাষের জমিতে যতটুকু সম্ভব জৈব সার প্রয়োগ করতে হবে। মাটি পরীক্ষা করে মাটির ধরণ অনুযায়ী সার প্রয়োগ করতে হবে। তবে জৈব সার ব্যবহার করলে মাটির গুণাগুণ ও পরিবেশ উভয়ই ভালো থাকবে। বাড়িতে গবাদি পশু থাকলে সেখান থেকে গোবর সংগ্রহ করা যাবে। নিজের গবাদি পশু না থাকলে পাড়া-প্রতিবেশি যারা গবাদি পশু পালন করে তাদের কাছ থেকে গোবর সংগ্রহ করা যেতে পারে। এছাড়া ভালো ফলন পেতে হলে জমিতে আবর্জনা পচা সার ব্যবহার করা যেতে পারে। বাড়ির আশেপাশে গর্ত করে সেখানে আবর্জনা, ঝরা পাতা ইত্যাদির স্তুপ করে রেখে আবর্জনা পচা সার তৈরি করা সম্ভব।

সেচ ও নিষ্কাশন

* শুকনা মৌসুমে আনারস ক্ষেতে সেচ দেওয়া খুবই প্রয়োজন।
* বর্ষা মৌসুমে বেশি বৃষ্টির সময় গাছের গোড়ায় যাতে পানি জমে না থাকে সেজন্য নালা কেটে পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা করতে হবে।

রোগবালাই ও তার প্রতিকার

আনারস চাষের জমিতে পোকার আক্রমণ হলে স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত জৈব কীটনাশক ব্যবহার করা যেতে পারে। এতে পোকা দমন না হলে স্থানীয় কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের ইউনিয়ন পর্যায়ে কৃষি কর্মকর্তা অথবা উপজেলা কৃষি অফিসে পরামর্শের জন্য যোগাযোগ করা যেতে পারে।

চাষের সময়ের পরিচর্যা

১. চারা বেশি লম্বা হলে ৩০ সে.মি. পরিমাণ রেখে আগার পাতা সমান করে কেটে দিতে হবে।

২. আনারসের জমি সর্বদা আগাছামুক্ত রাখতে হবে।

ফল সংগ্রহ

সাধারণত চারা রোপণের ১৫-১৬ মাস পর মাঘ মাসের মাঝামাঝি থেকে চৈত্র মাসের মাঝামাঝি সময়ে আনারস গাছে ফুল আসে। জ্যৈষ্ঠ মাসের মাঝামাঝি থেকে ভাদ্র মাসের মাঝামাঝি সময়ে আনারস পাকে। পাকা ফল সংগ্রহ করতে হবে।

উৎপাদিত ফলের পরিমাণ

প্রতি বিঘা জমিতে প্রায় ৩-৪ টন হানি কুইন আনারস ও ৪-৫ টন জায়েন্ট কিউ আনারস জন্মে।

মূলধন

এক বিঘা (৩৩ শতাংশ) জমিতে আনারস চাষের জন্য প্রায় ২০০০০ টাকার প্রয়োজন হবে। মূলধন সংগ্রহের জন্য ঋণের প্রয়োজন হলে নিকট আত্মীয়স্বজন, সরকারি ও বেসরকারি ঋণদানকারী ব্যাংক বা বেসরকারি প্রতিষ্ঠান (এনজিও)- এর সাথে যোগাযোগ করা যেতে পারে। এসব সরকারি ও বেসরকারি ঋণদানকারী ব্যাংক বা বেসরকারি প্রতিষ্ঠান (এনজিও) শর্ত সাপেক্ষে ঋণ দিয়ে থাকে।

প্রশিক্ষণ

আনারস চাষের আগে অভিজ্ঞ কারও কাছ থেকে আনারস চাষ সম্পর্কে খুঁটিনাটি জেনে নিতে হবে। এছাড়া চাষ সংক্রান্ত কোন তথ্য জানতে হলে স্থানীয় কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের ইউনিয়ন পর্যায়ে কৃষি কর্মকর্তা অথবা উপজেলা কৃষি অফিসে যোগাযোগ করা যেতে পারে। এছাড়া বাংলাদেশের প্রতিটি জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের প্রশিক্ষণ কেন্দ্র আছে। এসব প্রশিক্ষণ কেন্দ্র নির্ধারিত ফি এর বিনিময়ে কৃষি বিষয়ক প্রশিক্ষণ দিয়ে থাকে।

আনারস একটি সুস্বাদু ও পুষ্টিকর ফল। বাণিজ্যিক ভিত্তিতে আনারস চাষ করে পারিবারিক পুষ্টির চাহিদা পূরণ করার পাশাপাশি অতিরিক্ত উৎপাদন বাজারে বিক্রি করে বাড়তি আয় করা সম্ভব।