পাঁচ সেকেন্ডের দৃশ্য বদলে দিয়েছে ভিখারি মনোজের জীবন

প্রকাশ:| শুক্রবার, ১৯ ডিসেম্বর , ২০১৪ সময় ০৭:০৪ অপরাহ্ণ

রাস্তায় লাঠি হাতে দাঁড়িয়ে অন্ধ ভিখারি। নাচতে নাচতে এসে তার ভিক্ষার বাটি থেকে পয়সা তুলে পালালেন বলিউডের আমির খান! বাস্তব নয়। আমিরের ‘পিকে’ ছবির সেকেন্ড পাঁচেকের দৃশ্য। এটুকুতেই জীবন বদলেছে ভারতের আসামের মনোজ রায়ের। দিল্লির যন্তরমন্তরের সামনে ভিক্ষা করে দিন কাটানো ওই তরুণের ভাগ্যে জুটেছে যশ। তার নামে খোলা হয়েছে ‘ফেসবুক’ অ্যাকাউন্ট। এসেছে প্রেমও! কারণ, ছবির পর্দার ওই ভিখারি তো মনোজই।

তেজপুর জাহাজঘাটে জন্ম মনোজের। বয়স যখন চার দিন, তখন মারা যান তার মা। বাবা মুটের কাজ করতেন। আচমকা তিনিও অসুস্থ হন। পঞ্চম শ্রেণিতেই স্কুল ছেড়ে চাকরির খোঁজ শুরু করেন মনোজ। কিছু না পেয়ে দিল্লি পাড়ি দেন। মূক-বধির-অন্ধ সেজে যন্তরমন্তরের সামনে ভিক্ষার বাটি নিয়ে বসেন। দিনে জমত শ’চারেক টাকা। এক দিন সব কিছু বদলে যায়। মনোজ জানান, সে দিন বিকেলে দু’জন তার কাছে যান। অভিনয় করতে পারে কি না, তা জিজ্ঞাসা করেন তারা। মনোজ বলেন, “অভিনয় করেই ভাত জোগাড় করছি। তাই এক কথায় বলে দিলাম, ভালোই পারি। ওরা একটা মোবাইল নম্বর আর কুড়ি টাকা দিল।” পর দিন ওই নম্বরে ফোন করেন মনোজ।
পাঁচ সেকেন্ডের দৃশ্য বদলে দিয়েছে ভিখারি মনোজের জীবন
তার পরই ঢাউস গাড়ি নিয়ে যন্তরমন্তরের সামনে হাজির হয় সিনেমা ইউনিটের লোকজন। তা দেখে চোখ কপালে মনোজের আশপাশের ভিখারিদের। নেহরু স্টেডিয়ামে ‘অডিশন’ দিতে নিয়ে যাওয়া হয় তাকে। সেখানে তখন হাজির আরও ৭-৮ জন ‘অন্ধ’ ভিখারি। পর পর কয়েক দিন ওই স্টেডিয়ামেই যেতেন তিনি। মনোজের কথায়, “কী সিনেমা, কে অভিনয় করছেন, পরিচালক রাজকুমার হিরানিই বা কে, কিছুই জানতাম না। বিনা পয়সায় ভালো খাবারের লোভেই ওখানে যেতাম।”

তেমনই এক দিনের কথা বলতে গিয়ে হেসে ফেলেন মনোজ। তিনি বলেন, “খাওয়াদাওয়ার পর এক দিন খুব সিগারেট খেতে ইচ্ছে করছিল। একটা অল্পবয়সী ছেলের কাছে গিয়ে সে কথা বললাম। ও পকেট থেকে সিগারেট বের করে দিল।” সেটা হাতে নিয়ে ফেরার সময় কয়েক জন ‘বডিগার্ড’ তাকে ঘিরে ধরে। মনোজ বলেন, “ওরা আমাকে বলল, তোর এত সাহস আমির খানের ছেলের কাছে সিগারেট চাস!”

সে দিনই মনোজ জানতে পারেন আমিরই ছবির নায়ক। বাকিদের বাদ দিয়ে শেষে মনোজকেই বেছে নেন পরিচালক। তার পরের গল্প একেবারেই যেন রূপকথা।

ওই তরুণের কথায়, “আমাকে একটা পাঁচতারা হোটেলে নিয়ে যাওয়া হলো। তেজপুরে ব্রহ্মপুত্রে সাঁতার শিখেছি। দিল্লিতে স্নানের জায়গাই জুটত না। হোটেলের ঘরে বাথটাব, সুইমিং পুলে আরামে ডুব দিতাম!” সেই ঘোর এখনও কাটেনি মনোজের। তিনি বলে চললেন, “আমির খান, সুশান্ত সিংহ রাজপুত, আনুশকা শর্মার সঙ্গে সামনাসামনি আলাপ হলো। সুশান্ত নিজে এসে কথা বললেন। আনুশকাও। আমিরকে বললাম, আমি তার খুব বড় ফ্যান। সব যেন স্বপ্নের মতো লাগছিল।”

শ্যুটিং এ ভাবেই শেষ হয়। শেষ হয় মনোজের রূপকথার দিনগুলোও। পারিশ্রমিক হাতে পেয়েই মুম্বাইয়ের ট্রেনে চেপে বসেন মনোজ। ‘মায়ানগরী’ ঘুরতে গিয়ে নিমেষে পকেট ফাঁক। তিনি ফেরেন গৌহাটিতে। আমিরের সঙ্গে এক ছবিতে কাজ করার পর কি আর ভিক্ষার বাটি নিয়ে রাস্তায় বসা যায়? সে কথা ভেবে শোণিতপুরের বেদেতিতে একটি দোকানে কাজ নেন মনোজ।

‘পিকে’র বিজ্ঞাপন টিভিতে দেখানোর পর রাতারাতি ‘হিরো’ হয়ে যান তিনি। বেদেতির দোকানের কর্মী, খদ্দেররা তাকে ‘হানি সিংহ’ বলে ডাকতেন। তা বদলে যায় ‘পিকে হানি সিংহে’। এখন এক ডাকে তাকে চেনেন বেদেতির বাসিন্দারা। সোস্যাল নেটওয়ার্কিং সাইটে তার নামে অ্যাকাউন্ট খোলা হয়েছে। সেখানে প্রেমের প্রস্তাবও মিলেছে। সলজ্জ মনোজ জানান, বড়দিনে প্রথম বার প্রেমিকার মুখোমুখি হবেন তিনি। সবই আমিরের দয়ায়। তার আশা, ‘পিকে’ মুক্তি পাওয়ার পর অসমীয়, বাংলা ছবির পরিচালকরাও তাকে কাজ করতে ডাকবেন। ফের তিনি ফিরবেন রূপকথার জীবনেই।- ওয়েবসাইট