পবিত্র ঈদুল আযহার শিক্ষা ও আমাদের করণীয়

নিউজচিটাগাং২৪/ এক্স প্রকাশ:| বৃহস্পতিবার, ১৬ আগস্ট , ২০১৮ সময় ০৪:৪৬ অপরাহ্ণ


মুহাম্মদ সেলিম খান চাটগামী

আগামী ১০ই জিলহজ্ব দশই জিলহজ্ব বিশ্বের লক্ষ লক্ষ মুসলমান উদযাপন করবে পবিত্র ঈদুল আযহা। ঈদুল আযহা মুসলিম জাহানের জন্য এক অতীব গুরুত্বপূর্ণ দিন। মহান রাব্বুল আলামীনকে রাজী করার জন্য যতগুলো পরীক্ষা আসুক খোদা প্রেমিকেরা কোন চিন্তাভাবনা ছাড়াই তাতে কামিয়াবী বা সফলতা অর্জন করার জন্য প্রস্তুত থাকেন। চিরাচরিত আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে দিয়ে কোরবানীর উৎসব বয়ে আনবে ত্যাগের সুমহান বাণী। এই সম্মানিত দিনে হযরত ইব্রাহিম (আ:) আদিষ্ট হলেন তাঁর প্রাণ প্রিয় পুত্র হযরত ইসমাইল (আ:) কে আল্লাহর রাহে উৎসর্গ করতে। স্থির চিত্তে আল্লাহর প্রিয়নবী হযরত ইব্রাহিম (আ:) স্বীয় প্রভুর আদেশ গ্রহণ করলেন। প্রিয় পুত্রকে কোরবানী দেয়ার পূর্ব মুহুর্তে আল্লার নবী প্রার্থনা করলেন, “কুল ইন্না সালাতী ওয়ানুসুকী ওয়া মাহ্ইয়ায়া ওয়া মামাতী লিল্লাহে রাব্বিল আলামিন।” এর ভাবার্থ হল “আমার সকল সালাত, আমার সমস্ত উৎসর্গ, আমার জীবন এবং আমার মৃত্যু একমাত্র এ বিশ্বজগতের প্রভুর জন্য।” সুবহানাল্লাহ। কি অপূর্ব আত্মসমর্পণ? পবিত্র ঈদুল আযহা যেন প্রতিবছর সারা বিশ্বের মুসলমানদেরকে নতুনভাবে স্মরণ করিয়ে দেয় সাইয়্যেদুনা হযরত ইব্রাহিম (আঃ) এর ত্যাগের আদর্শকে। এই কোরবানীর দিনে ঈমানগদার মুসলমানগণ নিজের আত্মত্যাগের শিক্ষাই গ্রহণ করে থাকে। কারণ মুসলমানদের প্রত্যেক কাজই হতে হবে এবাদত। পবিত্র কোরবানীও একটি অন্যতম এবাদত। ঈদুল আযহা নিছক কোন আনন্দ উৎসব বা পশু কোরবানীর দিন নয়, এখানে পশু “প্রতীক” মাত্র। মহান আল্লাহ তায়ালা মানুষের মন ও ঈমানই শুধু দেখেন; বাহিক চাকচিক্য ও লোক দেখানো কাজ তিনি গ্রহণ করেন না। তাই মহাগ্রন্থ পবিত্র আল-কোরআনে আল্লাহ তায়ালা এরশাদ করেছেন : পশুর রক্ত মাংস কিছুই আল্লাহর কাছে আসে না, আসে শুধু বান্দার তাকওয়া তথা একনিষ্ঠ ত্যাগ। আর এর মাধ্যমেই আল্লাহ তায়ালা তাঁর প্রিয় বান্দাকে পরীক্ষা করে দেখেন যে, তাঁরা বান্দা ‘তাকওয়া’ অর্জন করেছেন কিনা। আর তাকওয়া অর্জনের অর্থ হলো সৎকর্মশীলতা। যে ব্যক্তি সৎকর্মশীল সেই তাঁর প্রভুর কাছে সবচেয়ে প্রিয়। (আল-কোরআন)
বাস্তবিক পক্ষে মুসলমানদের আনন্দ-উৎসব, সুখ-দুঃখ, জীবন মরণ সবই আল্লাহতায়ালার জন্য। আর তাদের সবচেয়ে বড় এবাদত হল আল্লাহ তায়ালার আনুগত্যে মাথা নত করা এবং তাঁর সন্তুষ্টি অর্জন। তাই যে সকল মুসলমান আল্লাহ তায়ালার আনুগত্য ও সন্তুটি অর্জনের জন্য কোরবানী করে তার কোরবানীই আল্লাহর দরবারে পৌঁছে। এতে সন্দেহের কোন অবকাশ নেই। আজ থেকে অনেক বছর আগে আজকের মত সেদিনও জিলহজ্ব মাসের নয় তারিখ। সেদিন গভীর রাতে হযরত ইব্রাহিম (আঃ) স্বপনের মধ্যে আদিষ্ট হলেন তাঁর প্রিয় বস্তুকে আল্লাহতায়ালার নামে কোরবানী করার। কোন চিন্তাভাবনা ছাড়া সেই মুহুর্তেই তিনি তাঁর অতি আপনজন নয়নের মণি, আদরের পাত্র ¯েœহের ধন হযরত ইসমাইল (আঃ)কে কোরবানী করতে নিয়ে যাওয়া মহান করুনাময়ের প্রতি তাঁর অগাধ বিশ্বাস ও গভীর তাকওয়া এবং নির্ভরতাকেই প্রমাণ করে। কত গভীর খোদা প্রেম থাকলে তবেই এমন সম্ভব। হযরত ইব্রাহীম (আঃ) এর প্রতি পুরস্কার স্বরূপ তাঁর এ ত্যাগের দৃষ্টান্তকে আল্লাহ তায়ালা এবং তাঁর হাবীব (দ:) কিয়ামত পর্যন্ত কোরবানী প্রথম মাধ্যমে চিরঞ্জীব করে দিলেন। বস্তুত: প্রিয় নবী রাসুলে পাক (দঃ) এর পূর্বে নবী রাসুলগণের মধ্যে হযরত ইব্রাহিম (আঃ) এর ত্যাগই সর্বাপেক্ষা জ্বলন্ত উদাহরণ। মহান সৃষ্টিকর্তা হযরত ইব্রাহিম (আঃ) এর এ অকৃত্রিম ত্যাগে সন্তুষ্ট হয়ে ঘোষণা করলেন, “হে ইব্রাহিম (আঃ) তোমার প্রতি প্রদত্ত স্বপ্নাদেশকে তুমি যথাযথভাবে পালন করেছ। সুতরাং তোমার প্রাণপ্রিয় সন্তান হযরত ইসমাইল (আঃ) এর পরিবর্তে আমি দুব্বাকে কোরবানী রূপে কবুল করে নিয়েছি। আর-এ-ভাবেই আমি আমার প্রিয় বান্দাদের পুরস্কৃত করে থাকি। (আল-কোরআন) আর এ ভাবেই পুত্রের পরিবর্তে দুব্বা কোরবানী হয়ে গেল। এখন থেকেই ইসলামী শরিয়তে বিশ্বের সামর্থবান মুসলমানদের জন্য প্রতি বছর ১০ই জিলহজ্ব হযরত ইব্রাহিম (আঃ এর আদর্শ অনুসরণ করে কোরবানী করা ওয়াজিব। ১০ই জিলহজ্ব হতে ১২ই জিলহজ্ব সন্ধ্যার পূর্ব পর্যন্ত তিনদিন কোরবানী দেয়ার সময়। উক্ত তিনদিনের মধ্যে প্রথমদিন কোরবানী করা সর্বাপেক্ষা উত্তম। প্রতি বছর কোরবানী সে মহান আত্ম ত্যাগের দৃষ্টান্তকে স্মরণ করিয়ে দিতেই বার বার মুসলিম জাতির সামনে সমাগত হয়। তাই প্রত্যেক বছর লাখ লাখ কোরবানী অনুষ্ঠান সেই মহান আদর্শেরই অনুসরণ অনুকরণের মাধ্যমে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য প্রত্যেক সক্ষম ব্যক্তির কোরবানী দেয়া ওয়াজিব। এ সম্বন্ধে প্রিয় বী রাসুলে পাক (দঃ) এরশাদ করেছেন, ‘যে ব্যক্তির সামর্থ আছে সে ব্যক্তি যদি কোরবানী না দেয় তাহলে সে যেন নামাজ আদায়ের জন্য ঈদগাহে না যায়। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কোরআন মজিদে এরশাদ করেছেন; ‘হে প্রিয় হাবীব (দঃ)। আপনি আপনার জন্য নামাজ আদায় করুন এবং কোরবানী করুন।’ আমাদের প্রাণ প্রিয় নবী দু’জাহানের মুক্তিদাতা হযরত মুহাম্মদ মোস্তফা (দঃ) এরশাদ করেন, ‘কোরবানীর দিনে মানব সন্তানের কোন নেক কাজই আল্লাহর নিকট এত প্রিয় নয় যত প্রিয় (কোরবানীর পশুর) রক্ত প্রবাহিত করা।’ কোরবানীর পশুর রক্তের ফোঁটা মাটিতে পড়ার পূর্বেই (কোরবানী) আল্লাহ তা’য়ালার নিকট কবুল হয়ে যায়। অতএব তোমরা আনন্দচিত্তে কোরবানী করো।’ (আলহাদিস) উপরে উল্লেখিত কোরআন ও হাদিসের আলোকে কোরবানীর গুরুত্ব স্পষ্ট হয়ে উঠে। মানব জীবনে কোরবানীর সুফলও অপরিসীম তাই উম্মত প্রেমিক রাসুল পাক (দঃ) এরশাদ করেছেন, ‘কোরবানীর পশুর প্রত্যেক লোমের বদলে একটি করে নেকী বা সওয়াব পাওয়া যায়।’ অন্যত্র আল্লার প্রিয় হাবিব (দঃ) বলেছেন, ‘কিয়ামতের দিন কোরবানীকৃত পশুগুলো কোরবানী দাতাগণকে আপনার পৃষ্ঠে করে পুলছেরাত পার করিয়ে বেহেশতে পৌঁছিয়ে দেবে।’ (সোবহানাল্লাহ)
সুতরাং প্রত্যেক সামর্থবান ব্যক্তির কোরবানী করা অবশ্য করনীয়। তবে সে কোরবানী যেন শুধুমাত্র আনন্দ উৎসবে পরিণত না হয়।
যে সমস্ত পশু দিয়ে কোরবানী করা যাবেঃ
গরু, মহিষ, উট, ছাগল, মেষ ও দুম্বা ইত্যাদি চতুষ্পদ হালাল গৃহপালিত পশু দ্বারা কোরবানী করা বিধেয়। গরু, মহিষ এবং উট এই তিন প্রকার পশুর প্রত্যেকটিতে এক হতে সাতজন এর নামে কোরবানী করা যায় তবে শর্ত এই যে, সব কয়টি অংশ নিয়তে ও পরিমাণে সমান হতে হবে। আমাদের সমাজে এক শ্রেণীর ধনী লোক দেখা যায় যারা কোবানীকে আনন্দ উৎসব ও সামাজিক খ্যাতি অর্জনের বস্তু মনে করে। তাই তারা পশু কেনার প্রতিযোগীতায় নেমে যায়। বস্তুতঃ আল্লাহ তা’লা মানুষের বাহ্যিক কিছু বিচার করবেন না, বরং দেখেন ঈমান অর্থাৎ বিশ্বাস ও নিয়ত। কোরবানীর মাংস তিন ভাগের একভাগ ইয়াতিম মিসকীনদের দান করা, একভাগ আত্মীয় স্বজনকে দেওয়া এবং এক ভাগ নিজে রাখা মুস্তাহাব। কোরবানী পশু যবেহকারী ও মাংস প্রস্তুতকারীকে উক্ত মাংস হতে পারিশ্রমিক হিসাবে দেওয়া যাবে না। তা আলাদাভাবে দিতে হবে। যদি গরু, মহিষ বা উট কয়েকজনে মিলে কোরবানী দেয়, তা হলে দাড়ি পাল্লা দিয়ে সমান সমান ভাগ করতে হবে। কম বেশী যেন কিছুতেই না হয় সেদিকে সজাগ দৃষ্টি রাখতে হবে। অন্যথায় কোরবানী নষ্ট হয়ে যাবে। নিজের কোরবানীর নিজ হাতে যবেহ করা মুস্তাহাব। যদি নিজে করতে না পারে তাহলে অন্যের দ্বারা তা সমাধা করা যাবে।
যে সকল পশুরু দ্বারা কোরবানী জায়েয নয় ঃ
১। বণ্য পশু, ২। অন্ধ, কানা, ৩। যার কান বা লেজের এক তৃতীয়াংশ বা ততোধিক কেটে গেছে, ৪। যে পঙ্গু পশু জবাইস্থানে হেটে যেতে পারে না, ৫। এমন রুগ্ন বা কৃশ পশু বার হাড়ে মজ্জা নেই বলে মনে হয়, ৬। যে পশুর একেবারেই দাঁত নেই, ৭। যে পশুর জন্ম হতেই কোন কান নেই, ৮। যে পশুর শিং মুল হতেই ভেঙ্গে গেছে। সুতরাং কোরবানীর সময় এসব দিন নজর রেখে কোরবানী করা উচিৎ।
পবিত্র ঈদুল আযহার উৎসব উপলক্ষে বিশ্বের সকল মুসলমানদের মনে ত্যাগ ও ভালবাসার সঞ্চার হয়, আর এ ভালবাসায় বিশ্ব ভ্রাতৃত্বের পথে প্রশস্থ হয়।
পবিত্র জিলহজ্ব মাসে রয়েছে আরও একটা শুভ সংবাদ। তা হচ্ছে ঈদুল আজহার আগের দিনেই পবিত্র হজব্রত পালন করেন। কোরবানীর মত প্রত্যেক বিত্তশালী এবং সক্ষম মুসলমানদের জন্য জীবনে অন্ততঃ একবার হজ্ব পালন করা ফরজ। এই মহান হজ্ব উপলক্ষে সারা বিশ্বের মুসলমান পুরুষ ও নারী ধনী দরিদ্র সকলস্বার্থ বিদ্বেষ কলহ ভুলে আরাফাতের ময়দানে সমবেত হয়। এ হজ্ব যেন মুসলিম জাতির এক বিশ্ব সম্মেলন। তাই এ পবিত্র কাজ থেকে যে বিরত রয়েছে সে শুধু নিজের ক্ষতি করেনি এতে উম্মত প্রেমিক রাসুলে পাক (সাঃ) ও অন্তরে ব্যথা পান।
এ সম্বন্ধে প্রিয় নবী এরশাদ করেন: ‘যে ব্যক্তির মদিনা মনোয়ারা পর্যন্ত পৌঁছার সামর্থ আছে, অথচ সে আমার জেয়ারত করার জন্য আসেনি সে আমার প্রতি বড়ই অবমাননা করছে।’ অন্য হাদীসে এরশাদ করেন: যে ব্যক্তি হজ্ব করতে গিয়েছে, অথচ আমার রওজা আকদাছ এর জেয়ারত করেনি (শুধু হজ করে চলে এসেছে) সে নিশ্চয়ই আমার প্রতি জুলুম করেছে’। আল্লাহপাক সকলকে প্রিয় নবীর জেয়ারত করার তৌফিক দিন এবং পবিত্র ঈদুল আযহার এই পটভূমিতে আমি আশাকরি দেশের লক্ষ লক্ষ মুসলিম জনতা হযরত ইব্রাহীম (আঃ) ও হযরত ইসমাইল (আঃ) এর মহান আত্মত্যাগের আদর্শের কথা স্মরণ রাখবেন। দুঃখ দুর্দশাগ্রস্থ বাংলাদেশের জনগণের কাছে ঈদের এই আনন্দ সার্থক হোক মহান রাব্বুল আলামিনের দরবারে এই ফরিয়াদই করি। আমাদের অনেক ভাই বন্ধু আত্মীয় স্বজন আর্থিক সামর্থ্য না থাকায় পবিত্র কোরবানী দেয়া থেকে বঞ্চিত এই ঈদের আনন্দে আমরা যেন তাদের ভুলে না যাই!


আরোও সংবাদ