পণ্ড হয়ে গেছে তিন টাকায় ডিম বিক্রির প্রচারাভিযান

প্রকাশ:| শুক্রবার, ১৩ অক্টোবর , ২০১৭ সময় ০৬:১০ অপরাহ্ণ

বাজারে যা আট টাকার কমে পাওয়া যায় না, সেই ডিম তিন টাকায় বিক্রির ঘোষণা দিয়েছিল বাংলাদেশ পোল্ট্রি ইন্ডাস্ট্রিজ সেন্ট্রাল কাউন্সিল (বিপিআইসিসি) ও প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর। সেজন্য পত্রিকায় বিজ্ঞাপনও দেওয়া হয়েছিল।

কথা ছিল, শুক্রবার বিশ্ব ডিম দিবসে ঢাকার খামারবাড়িতে কৃষিবিদ ইনস্টিটিউট মিলনায়তনে সকাল ১০টা থেকে ডিম বিক্রি হবে। জনপ্রতি কেনা যাবে সর্বোচ্চ ৯০টি ডিম।

কিন্তু সকাল ৮টার মধ্যে কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশন প্রাঙ্গণ পরিণত হয় জনসমুদ্রে। ৯টার দিকে ক্রেতাদের লাইন বিজয় সরণি পার হয়ে যায়।

নানা বয়সের, নানা পেশার মানুষ ঢাকার বিভিন্ন এলাকা থেকে ডিম কিনতে জড়ো হয়েছিলেন খামার বাড়িতে। কেউ সঙ্গে এনেছিলেন বালতি; কারও হাতে ছিল ডিম রাখার খালি খাঁচি বা কার্টন।

কিন্তু ভিড়ের চাপ আর অব্যবস্থাপনার কারণে বিশৃঙ্খলা, পুলিশ আর স্বেচ্ছাসেবীদের সঙ্গে হাতাহাতি, পুলিশের লাঠিপেটা আর বিক্ষোভের মধ্যে সকাল ১০টার আগেই পণ্ড হয়ে গেছে তিন টাকায় ডিম বিক্রির প্রচারাভিযান।

ক্রেতাদের ধাক্কাধাক্কিতে কেআইবি মিলনায়তনের বাইরে খালি জায়গায় ডিম বিক্রির জন্য বানানো প্যান্ডেল ভেঙে যায়। ভিড়ের চাপে ভেঙে যায় কাউন্টারে রাখা বেশ কিছু ডিম।

বিশ্ব ডিম দিবস উপলক্ষে শুক্রবার ৩ টাকায় ডিম কিনতে ঢাকার খামারবাড়িতে হাজারো মানুষের ভিড়

বিশ্ব ডিম দিবস উপলক্ষে শুক্রবার ৩ টাকায় ডিম কিনতে ঢাকার খামারবাড়িতে হাজারো মানুষের ভিড়

বিশ্ব ডিম দিবস উপলক্ষে শুক্রবার ৩ টাকায় ডিম কিনতে ঢাকার খামারবাড়িতে হাজারো মানুষের ভিড়

বিশ্ব ডিম দিবস উপলক্ষে শুক্রবার ৩ টাকায় ডিম কিনতে ঢাকার খামারবাড়িতে হাজারো মানুষের ভিড়

আয়োজকদের মুখপাত্র বাংলাদেশ পোল্ট্রি ইন্ডাস্ট্রিজ সেন্ট্রাল কাউন্সিলের সদস্য বিশ্বজিৎ রায়  বলেন, ভর্তুকি মূল্যে বিক্রির জন্য এক লাখ ডিম এনেছিলেন তারা। সকাল ১০টায় বিক্রি শুরুর কথা থাকলেও মানুষের ভিড় দেখে ৯টার দিকেই বিক্রি শুরু হয়ে যায়।

কিন্তু এত মানুষের চাপে আধা ঘণ্টার মধ্যে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। ফলে ১০টা বাজার আগেই ডিম বিক্রি বন্ধ ঘোষণা করে কর্তৃপক্ষ।

“মানুষ এত অভূতপূর্ব সাড়া দেবে, তা আমরা ভাবতে পারিনি। ফলে যা হওয়ার তাই হয়েছে। আমরা দুঃখিত। তবে ব্যর্থ হয়েছি তা বলব না,” বলেন  বিশ্বজিৎ।

পরে কাউন্সিলের সভাপতি মসিউর রহমান ফেইসবুকে এক বিবৃতিতে বলেন, “ডিম দিবস উপলক্ষে আমরা সাধারণ মানুষকে একটি বার্তাই দিতে চেয়েছি- তা হল ডিম একটি পুষ্টিকর খাদ্য এবং সকলেরই ডিম খাওয়া দরকার। আমরা চেয়েছিলাম সাধারণ মানুষ, বিশেষ করে নিম্ন আয়ের মানুষরা যেন কম দামে পরিবারের জন্য এক মাসের ডিম কিনে নিয়ে যেতে পারেন।”

‘বিশৃঙ্খলার কারণে’ প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী ডিম বিক্রি করতে না পারলেও প্রতিশ্রুতি থেকে সরে যাচ্ছেন না বলে জানিয়েছেন মসিউর। তিনি বলেছেন, আগামীতে আলোচনা সাপেক্ষে আবারও কম দামে ডিম বিক্রির ব্যবস্থা করা হবে।

বিশ্ব ডিম দিবস উপলক্ষে শুক্রবার ৩ টাকায় ডিম কিনতে ঢাকার খামারবাড়িতে হাজারো মানুষের ভিড়

বিশ্ব ডিম দিবস উপলক্ষে শুক্রবার ৩ টাকায় ডিম কিনতে ঢাকার খামারবাড়িতে হাজারো মানুষের ভিড়

তিন টাকার ডিম কেনার সৌভাগ্য হয়েছে খুব কম মানুষেরই। বিক্রি বন্ধ করে দেওয়ার আগে ভিড়ের চাপে ভেঙে যায় কাউন্টারে রাখা বেশ কিছু ডিম

তিন টাকার ডিম কেনার সৌভাগ্য হয়েছে খুব কম মানুষেরই। বিক্রি বন্ধ করে দেওয়ার আগে ভিড়ের চাপে ভেঙে যায় কাউন্টারে রাখা বেশ কিছু ডিম

এই ‘অনাকাঙ্ক্ষিত’ পরিস্থিতির জন্য আয়োজকরা ‘আন্তরিকভাবে দুঃখিত’ বলে দায় সারতে চাইলেও খালি হাতে বাড়ি ফেরার আগে খামারবাড়ি মোড় থেকে ফার্মগেইট পর্যন্ত সড়কে এলোমেলো অবস্থান নিয়ে  বিক্ষোভ করতে দেখা যায় ক্ষুব্ধ ক্রেতাদের।

পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কৃষিবিদ ইনস্টিটিউট মিলনায়তনের সামনের সড়কে যান চলাচল নিয়ন্ত্রণ করে ট্রাফিক পুলিশ।

পুরানা পল্টন থেকে ডিম কিনতে আসা গৃহবধূ সাবিনা সুলতানা বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, ফেইসবুক, জাতীয় পত্র-পত্রিকায় ব্যাপক প্রচারণা দেখে তিনি ডিম কিনতে এসেছিলেন। তার পরিচিত একজন এসেছেন নারায়ণগঞ্জ থেকে। কিন্তু ডিম বিক্রির আয়োজন দেখে তার মনে হয়েছে, মানুষের সঙ্গে ‘তামাশা’ করা হচ্ছে।

“কাউকে ডিম কিনে নিয়ে যেতে দেখলাম না। তাহলে এত ডিম গেলে কোথায়? পুরো ব্যাপারটা একটা ধোঁকাবাজি। তারা মানুষের সঙ্গে প্রতারণা করেছে।”

হায় ডিম!

প্রচার এবং ‘প্রতারণা’

বিপিআইসিসির কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, গত পাঁচ বছর ধরেই ডিম দিবসে মানুষকে উৎসাহিত করতে বিভিন্নভাবে প্রচার চালিয়ে আসছেন তারা। কিন্তু সেসব শোভাযাত্রা কিংবা আলোচনা অনুষ্ঠানে দুইশ লোকও হত না।

এবার তিন টাকায় ডিম বিক্রির আয়োজন করার পর পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দেওয়ার পাশাপাশি ফেইসবুকেও প্রচার চালানো হয়। তা নিয়েও আবার পত্রিকায় খবর প্রকাশিত হয়। সব মিলিয়ে আয়োজকরা এবার প্রত্যাশার তুলনায় অনেক বেশি প্রচার পেয়ে যান।

বিশ্বজিৎ রায় বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, খামারবাড়িতে টিসিবির ট্রাক থেকে প্রতিদিনই নিত্যপণ্য বিক্রি হয়। সেখানে যারা নিয়মিত কিনতে আসেন, তাদের সঙ্গে আরও কিছু বেশি ক্রেতা ডিম কিনতে আসতে পারেন বলে ভেবেছিলেন তারা।

“কিন্তু সকালে এত মানুষ দেখে আমরা হতভম্ব। ডিম দিতে পারিনি ঠিক, তবে ডিমের প্রচার হয়েছে।”

ভিড়ের চাপে ডিম বিক্রি বন্ধ করে দেওয়ার পর ক্ষুব্ধ ক্রেতাদের বিক্ষোভ

ভিড়ের চাপে ডিম বিক্রি বন্ধ করে দেওয়ার পর ক্ষুব্ধ ক্রেতাদের বিক্ষোভ

সকাল ১০ টায় ডিম বিক্রি শুরুর কথা থাকলেও ৮টার মধ্যে খামারবাড়ি পরিণত হয় জনসমুদ্রে; ডিম কিনতে অনেকেই সঙ্গে এনেছিলেন বালতি, ডিমের খাঁচি

সকাল ১০ টায় ডিম বিক্রি শুরুর কথা থাকলেও ৮টার মধ্যে খামারবাড়ি পরিণত হয় জনসমুদ্রে; ডিম কিনতে অনেকেই সঙ্গে এনেছিলেন বালতি, ডিমের খাঁচি

ডিম না পেয়ে হতাশ, ক্ষুব্ধ ত্রিশোর্ধ্ব সাবিনা সুলতানা বলেন, “ওরা তিন টাকায় ডিম বিক্রির জন্য লাখ টাকার প্রচার চালিয়েছে। হাজার হাজার মানুষকে জড়ো করে, লাঞ্ছিত করে এখন খালি হাতে বিদায় করছে।”

এই ‘প্রতারণার’ শাস্তির দাবি করেন তিনি।

আদনান নামের এক তরুণ জানান, তিনি থাকেন পশ্চিম রাজাবাজারের একটি মেসে। ডিম কেনার জন্য অনেক উৎসাহ নিয়ে সকাল ৯টার মধ্যে খামার বাড়ি এসে তিনি হট্টোগোলের মধ্যে পড়েন।

“সকালে নাস্তা না করেই চলে এসেছি। মনে করেছিলাম কম টাকায় কিছু ডিম কিনে নেব। এখন সময়ও গেল, ডিমও পেলাম না। এসবের কোনো মানে হয় না।”

আয়োজকরা যখন মাইকে ডিম বিক্রি বন্ধের ঘোষণা দিয়ে দুঃখ প্রকাশ করছিলেন, সবাইকে ফিরে যেতে অনুরোধ করছিলেন, চার পাশ থেকে তখন ‘ডিম চাই, বিচার চাই’; ‘ভুয়া, ভুয়া’; ‘ডিম চোরের বিচার চাই’ স্লোগান দিচ্ছিলেন ক্রেতারা।

আয়োজকরা এক লাখ ডিমের ব্যবস্থা করার কথা বললেও ওই সংখ্যা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেন অনেকে।

বিক্ষোভের মধ্যে ক্রেতাদের একজন  বলেন, “কিনতে পেরেছে এমন কাউকে তো দেখলাম না। এক লাখ ডিম মিথ্যা কথা। জনগণ অত সহজে ছাড়বে না।”


আরোও সংবাদ