নৌ-মন্ত্রী ও সংসদীয় কমিটির বক্তব্যের প্রতিবাদ

প্রকাশ:| মঙ্গলবার, ২১ অক্টোবর , ২০১৪ সময় ১০:০৬ অপরাহ্ণ

আলোচনার প্রস্তাবকে স্বাগত জানাই আর্থিক কেলেংকারির ঘটনা উদঘাটন করে দুর্নীতিবাজদের চিহ্নিত করে শাস্তি দিন
-মহিউদ্দিন চৌধুরী

চট্টগ্রাম বন্দরে আর্থিক কেলেংকারি, বিভিন্ন অনিয়ম দুর্নীতি লুটপাট ও স্বেচ্ছাচারিতা বিরোধী আন্দোলন প্রসঙ্গে নৌ-পরিবহন মন্ত্রী শাহজহান খান ও সংসদীয় কমিটির পক্ষে প্রদত্ত বক্তব্যকে কেন্দ্র করে চট্টগ্রাম বন্দর রক্ষা পরিষদের আহবায়ক, চট্টগ্রাম মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি ও সাবেক মেয়র আলহাজ্ব এ.বি.এম মহিউদ্দিন চৌধুরী আজ ২১ সেপ্টেম্বর এক বিবৃতি প্রদান করেছেন। বর্তমানে সৌদি আরবের পবিত্র মক্কা নগরীতে আসন্ন হজ্বের আনুষ্ঠানিকতা পালনরত মহিউদ্দিন চৌধুরী প্রেরিত বিবৃতিতে আন্দোলনের দাবী-দাওয়া নিয়ে নৌ-মন্ত্রী বিলম্বে হলেও যে আলোচনার বৈঠকে বসার প্রস্তাব দিয়েছেন তাকে তিনি স্বাগত জানিয়েছেন। পাশাপাশি প্রতিবাদ জানিয়েছেন, ‘বন্দর রক্ষার নামে অরক্ষিত করার আন্দোলন করা হচ্ছে’ বলে বিভ্রান্তিকর বক্তব্য দেয়ায়। উল্লেখ্য গত ২০ সেপ্টেম্বর কর্ণফুলী দূষণরোধে ড্রেজিং কার্যক্রমের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে নৌ-পরিবহন মন্ত্রী শাহজাহান খান ‘বন্দর রক্ষার নামে চলছে অরক্ষার আন্দোলন’ বলে বক্তব্য দেন। পাশাপাশি এ আন্দোলনের যৌক্তিকতা, মহিউদ্দিন চৌধুরীর সম্পৃক্ততা, অনিয়ম, দুর্নীতির অভিযোগের প্রাসঙ্গিকতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেন।
বিবৃতিতে মহিউদ্দিন চৌধুরী বলেন, চট্টগ্রাম বন্দরে দুর্নীতির কিছু সুনির্দিষ্ট অভিযোগ এনে চট্টগ্রাম বন্দর রক্ষা পরিষদ বাধ্য হয়ে আন্দোলন শুরু করেছে। এর আগে আমি লিখিতভাবে বন্দরের সরকারি অর্থের লুটপাঠ, অবৈধ ও চুক্তিভঙ্গকারী ঠিকাদার সাইফ পাওয়ারটেকসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের আর্থিক কেলেংকারীর বিভিন্ন ঘটনা নিয়ে নৌ-মন্ত্রীসহ সরকারের উর্দ্ধতন বিভিন্ন সংস্থার কাছে জানিয়েছি। কিন্তু দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করেও সংশ্লিষ্ট সংস্থা সমূহ রহস্যময় নীরবতা পালন করে আসছে। যা শুধু দুঃখজনক নয়, উদ্বেগজনকও বটে। এ অবস্থায় বন্দরের স্বার্থে তথা জাতীয় স্বার্থে চট্টগ্রাম বন্দর রক্ষা পরিষদ সরকারি অর্থের অপচয় ও লুটপাট বন্ধে সরকারকে সজাগ করার জন্য আন্দোলনে নামতে বাধ্য হয়েছে। অতীতেও চট্টগ্রাম বন্দরসহ এ অঞ্চলের বিভিন্ন দাবী-দাওয়া ও সমস্যা নিয়ে আমাকে মাঠে নামতে হয়েছে। এবারও বন্দরের বিভিন্ন শ্রমিক সংগঠন ও ব্যবহারকারী এবং বন্দরের সাধারণ কর্মকর্তা কর্মচারীদের পুনঃ পুনঃ আহবানে এবং এই আহবানের যৌক্তিকতা থাকায় আমি তাদের আহবানে সাড়া দিয়েছি। বিবৃতিতে তিনি দৃঢ়তার সাথে উল্লেখ করেন, চট্টগ্রাম বন্দরের চলার গতি বন্ধ করার কোন উদেশ্য এই আন্দোলনের লক্ষ নয়। চিহ্নিত দুর্নীতিবাজ, সরকারি অর্থের লুটপাঠকারী, অবৈধ ষ্টিভিডোরিং লাইসেন্সবিহীন ও চুক্তিভঙ্গকারী এক ঠিকাদারের স্বেচ্ছাচারিতা এবং বেআইনীভাবে ঢাকা আইসিডি, চট্টগ্রামের সিসিটিতে অনিয়ম ও এনসিটিতে টেন্ডার প্রক্রিয়া বাদ দিয়ে ডিপিএম ভিত্তিতে কাজ করানোর অবৈধ প্রক্রিয়ার বন্ধের দাবী জানিয়ে এ আন্দোলন চলছে। দুঃখের সাথে বলতে হচ্ছে, চট্টগ্রাম বন্দর রক্ষা পরিষদের এইসব দাবী দাওয়ার বিপরীতে কোন ধরনের তদন্ত না করে আন্দোলন নিয়ে জনমনে বিভ্রান্ত সৃষ্টি করে দুর্নীতিবাজদের আড়াল করার হীন অপপ্রয়াস চলছে। যা কোনভাবেই কাম্য হতে পারে না।
বিবৃতিতে মহিউদ্দিন চৌধুরী প্রশ্ন রাখেন, ঢাকা আইসিডিতে কন্টেইনার হ্যান্ডলিংয়ের জন্য চুক্তি করেও অবৈধ ঠিকাদার সাইফ পাওয়ারটেক গত প্রায় ১৮ মাস ধরে যে কাজ শুরু করেনি তা কি বৈধ ? চুক্তি অনুযায়ী ঐ ঠিকাদারকে কালো তালিকাভূক্ত ও জামানত বাজেয়াপ্ত না করা কি বৈধ ? এইসব ব্যাপারে বন্দর রক্ষা পরিষদের আন্দোলন কি অবৈধ ? প্রায় ৪৬৮ কোটি টাকা ব্যয়ে এনসিটি গত ৮ বছর ধরে পূর্ণাঙ্গভাবে চালু না করে অবৈধ সাইফ পাওয়ারটেক নামক একটি ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান দিয়ে ডিপিএম ভিত্তিতে কাজ করানো কি বৈধ ? পাশাপাশি সরকারি ক্রয় নীতির ব্যত্যয় ঘটিয়ে কন্টেইনার পরিবহনে ৩ টি স্ক্র্যাপ জাহাজ কিনা এবং তাও আবার পুরাতন জাহাজকে নতুন দেখিয়ে বন্দরের অর্থ লুটপাট করা কি বৈধ ? এছাড়া ভিটিএমআইএস প্রকল্পসহ বন্দরের অর্থায়নে বিভিন্ন প্রকল্প এবং ক্যাপিটেল ড্রেজিংয়ের নামে ১৬৫ কোটি টাকা হাতিয়ে নেয়ার ঘটনা কি অনিয়ম দুর্নীতির পর্যায়ে পড়ে না। এইসব ঘটনা নিয়ে সহযোগিতা না করায় ৩ চেয়ারম্যানসহ বন্দরের ১৩ কর্মকর্তাকে বন্দর থেকে সরিয়ে দেয়া কি নিয়ম নীতির পর্যায়ে পড়ে ? এ ধরনের অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে গিয়ে বদলীর আদেশ পেয়ে ৩ কর্মকর্তার হার্ট এ্যাটাকে মৃত্যুর ঘটনা কি দুঃখজনক নয় ? বিবৃতিতে তিনি বলেন, এইসব ঘটনার বিপরীতে প্রতিকার চেয়েইতো বন্দর রক্ষা পরিষদের আন্দোলন শুরু হয়েছে। এ আন্দোলন বন্দর তথা জাতীয় স্বার্থে। তিনি প্রশ্ন রাখেন, এই বন্দরকে ঘিরে মাফিয়া চক্রের সম্পৃক্ততা না থাকলে প্রায়শ’ অবৈধ পণ্যের বিভিন্ন চালান কিভাবে আসছে এবং এরূপ চালান ও মাঝে মাঝে ধরা পড়ছে। এমনকি অবৈধ অস্ত্রের চালানও অতীতে এই বন্দরে ধরা পড়ার রেকর্ড রয়েছে। তিনি বলেন, নৌ-মন্ত্রী তার বক্তব্যে স্বীকার করেছেন ক্যাপিট্যাল ড্রেজিং কাজে ব্যাংক প্রটেকশনের ৭০ শতাংশ এবং নদী খনন কাজে ৪৮ শতাংশ কাজ শেষ করে ঠিকাদার পালিয়ে গেছে। যার কারণে ঐ ঠিকাদারের কাজ বাতিল করা হয়েছে। কিন্তু এই ঠিকাদার আদালতে গেছে। তিনি বলেন, এখনতো সেই নদী আবার ভরাট হয়ে গেছে। তাহলে কি বন্দর তহবিল থেকে ঠিকাদারকে প্রদত্ত ১৬৫ কোটি টাকা পানিতে গেল না ? এখন মন্ত্রী বলছেন, বন্দর নিজেই ড্রেজিং করবে। তিনি বলেন, বর্তমান সিটি মেয়রের সাথে আলাপ করে আমি চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের উদ্যোগে বিনা অর্থে কর্ণফুলী নদীতে ড্রেজিং কাজ করার প্রস্তাব দিয়েছি। এই প্রস্তাব কেন এখনো গ্রহণযোগ্যতা পেলনা-তা নিয়ে কি রহস্যের জন্ম দেয় না ? তিনি বলেন, এনসিটি পরিচালনা নিয়ে মন্ত্রী বিভিন্ন মহলকে দোষারোপ করেছেন এবং বলেছেন এই নিয়ে তারা বিভ্রান্তিকর অবস্থায় রয়েছেন। কেন এই দোষারোপ, কেন এই বিভ্রান্তি ? বন্দরের বিধিবিধান অনুযায়ী পদক্ষেপ গ্রহন করা হলেইতো কোন বিভ্রান্তি থাকার অবকাশ থাকে না। তিনি বলেন, বন্দরের রিজার্ভ ফান্ড নিয়ে বন্দর রক্ষা পরিষদ কোন বক্তব্য দেয়নি। বন্দরের নিজস্ব চলার গতিতে এই ফান্ডের উত্তরোত্তর বৃদ্ধি ঘটছে এবং ঘটতে থাকবে। সবশেষে মহিউদ্দিন চৌধুরী তার বিবৃতিতে নৌ-মন্ত্রীর পক্ষে উদ্ভুত পরিস্থিতিতে আলোচনায় বসে সমস্যা সমাধানের প্রস্তাব দেয়ায় তিনি তাকে সাধুবাদ জানান এবং বলেন তার পবিত্র হজ্ব পালন শেষে এধরণের বৈঠকের আয়োজন হলে তিনি তাতে ব্যক্তিগতভাবে উপস্থিত থেকে সমস্যা কোথায় এবং কারা বন্দর তথা সরকারি অর্থের বেপরোয়া লুটপাঠে লিপ্ত তা তিনি চিহ্নিত করে দিতে স্বচেষ্ট থাকবেন। প্রসঙ্গক্রমে তিনি নৌ-পরিবহন মন্ত্রণালয় সংক্রান্ত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির পক্ষে ইতিমধ্যে প্রদত্ত বক্তব্যে বিরোধীতা করে বিবৃতিতে বলেন, আপনারা বন্দরে সরেজমিনে এসে আমাদের অভিযোগ তদন্ত করে দেখুন। নিশ্চয় এতে আমাদের অভিযোগের যথার্থতা খুঁজে পাবেন। কোন ধরনের তদন্ত না করে অহেতুকভাবে আমাকে দোষারোপ করা এবং জনমনে বিভ্রান্তি ছড়িয়ে দেয়া কাম্য হতে পারে না। এটা শুধু অন্যায় নয় ও চট্টগ্রামবাসীর প্রতি প্রহসনের সামিল। তিনি সংসদীয় কমিটির সব সদস্যদের কাছে একটি শক্তিশালী তদন্ত কমিটির মাধ্যমে চট্টগ্রাম বন্দরে চলমান দুর্নীতি সমুহের উদঘাটন করার আহবান জানান। এতে তার পূর্ণ সহযোগিতা থাকবে বলে মত ব্যক্ত করেন।